#দূরত্বের_আড়ালে
#পর্ব_৭
#লেখনীতে_মারিয়া_আক্তার_মাতিন
প্রণীতা বাড়ি পৌঁছেছে কিছুক্ষণ হলো। আসার পর থেকে একদণ্ড শান্তি মিলছে না মনে। একে, মনের উপর ঝড় চলছে যে ঝড় থামানোর নিদারুণ প্রচেষ্টায় মত্ত সে। অপরদিকে,আহিয়ানের জন্য দুশ্চিন্তা। আহিয়ানের জন্য তার মনে কোনো অনুভূতি এখনো জন্মায়নি। তার মনে উনাকে নিয়ে যতো দুশ্চিন্তা তার সবকিছুর মূলে সে নিজেকেই দায়ী সাব্যস্ত করছে। তার জন্যই আহিয়ান এমন বিপদের মুখে -এটাই তার বিশ্বাস। সে বাবা-মাকে এখনো কিছু জানায়নি। আগে পরিস্থিতি কতদূর তা দেখা জরুরি। সে তড়িঘড়ি করে ফোন হাতে নিলো। কীবোর্ডে আঙুলগুলো চালালো অকপটে। অতঃপর সেন্ড করলো ম্যাসেজটি।
-“আমি বাড়ি এসে পৌঁছেছি। এবার উনাকে ছেড়ে দিন।”
মুহূর্তের মাঝেই রিপ্লাই এলো,“বেশ,ছেড়ে দিব।”
প্রণীতার মুখমণ্ডল আনন্দে উচ্ছ্বসিত হলো। কিন্তু তা বেশিক্ষণ স্থায়িত্ব লাভ করলো না। সত্যিই ছেড়ে দিবে তো? মনের খচখচানি ভাব দূর করতে সে ফের ম্যাসেজ দিলো,“সত্যি তো?”
-“আমার উপর বিশ্বাস নেই?”
প্রণীতা থমকালো। এই কথাটা সে ফারাজের মুখে শুনেছিল। একবার ফারাজ তার পরিবারের সাথে এক অনুষ্ঠানে যাবে। সেই থেকেই প্রণীতার চিন্তার পাহাড় জমেছে। অনুষ্ঠানে কতো মেয়েরা থাকবে,তারা সেজেগুজে নিজেদের নায়িকা উপস্থাপন করবে। ফারাজ যদি তাদের দিকে নজর দেয়? বা সেই মেয়েরাও যদি ফারাজকে ঘিরে ধরে? কারণ তার ফারাজ দেখতে মাশাল্লাহ। তাই তো তার এতো চিন্তা। প্রণীতা বারবার করে বলছিল,“তুমি কিন্তু কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলেও তাকাবে না। কোনো মেয়ের ধারেকাছেও ঘেষবে না। মেয়েরা তোমার সাথে কথা বলতে চাইলেও তাদের সাথে কথা বলবে না। সর্বোপরি,তুমি মেয়েদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলবে। মনে থাকবে তো?”
ফারাজ সেদিন প্রণীতাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল,“মনে থাকবে ম্যাডাম৷ আমার উপর বিশ্বাস নেই?”
-“নিজের থেকেও বেশি বিশ্বাস করি তোমায়। কিন্তু ভয় হয় যে!”
ফারাজ প্রণীতার কপালে চুমু খায়। নিজের বুকে প্রণীতার মাথা রেখে বলে,“আমার চোখদুটো কেবল তোমায় দেখতে মরিয়া। এই চোখ আর অন্য কোনো নারীকে দেখবে না। তুমি শুধু আমায় বিশ্বাস করো। তোমার বিশ্বাসটুকু সাথে নিয়েই আমি যেতে চাই দূর-দূরান্তরে।”
প্রণীতা অতীত ছেড়ে বর্তমানে ফিরলো। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে বিদ্রুপের হাসি৷ সে আপনমনে বলে উঠলো,“তোমায় বিশ্বাস করাটাই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।”
প্রণীতা মনে মনে ভাবলো,নিজের ভালোবাসার মানুষকে বিশ্বাস করেই বাজেভাবে ঠকে গেলাম সেখানে আপনার মতো একজন অপরিচিত মানুষকে বিশ্বাস করাটা নিতান্তই বিলাসিতা নয় কি? সে রিপ্লাই দিলো,“আপনি কে যে আপনাকে আমি বিশ্বাস করতে যাব? আগে বলুন,সত্যি বলছেন কিনা?”
অপর পাশ হতে রিপ্লাই এলো,“আমি যে সত্য বলছি তার প্রমাণ আজই পাবেন।”
প্রণীতা কিছুটা নিশ্চিন্ত হওয়ার চেষ্টা করলো। তবুও মনের মাঝে একটা ভয় থেকেই যায়। সে এবার আর বেশি ভাবলো না। উপযুক্ত প্রমাণের অপেক্ষায় নিজেকে সপে দিলো।
দিনের আলো ফুরিয়ে প্রকৃতিতে বিরাজ করছে রাতের আঁধার। বিশাল গগনে জ্বলজ্বল করছে অজস্র তারার মেলা। শো শো করে হিমেল হাওয়া এসে আছড়ে পড়ছে। বেলকনিতে দাঁড়িয়ে এরূপ মনোরম পরিবেশ উপভোগ করছে প্রণীতা। তার দেহমন জুড়িয়ে দিচ্ছে এই শীতল হাওয়া। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠে। সে কিছুটা বিরক্ত হয়। বিরক্তির সাথে রুমে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করে। তারপর ফের বেলকনিতে আসে। সম্পূর্ণ অপরিচিত নাম্বার দেখে প্রণীতা বলে,“হ্যালো,কে বলছেন?”
-“প্রণীতা,আমি আহিয়ান। আঙ্কেলের কাছ থেকে তোমার নাম্বারটা নিলাম একটা জরুরি কাজের জন্য৷ তুমি কিছু মনে করো না।”
প্রণীতার চিন্তার প্রহরের সমাপ্তি ঘটলো। মনে মনে আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শুকরিয়া আদায় করলো। যাক,আহিয়ানকে তাহলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। নিজের উপর থেকে একটা ভার যেন সরে গেছে। সে বেশ প্রফুল্লচিত্তে বলল,“আপনি তাহলে ঠিক আছেন? জানেন,আপনার জন্য আমার কতো চিন্তা হচ্ছিল?”
অপরপাশে থাকা মানবটির অভিব্যক্তি ঠাহর করা গেল না। বলল বড়ো বিষণ্ণ সুরে,“আমার জন্য তোমার চিন্তা হয়,প্রণীতা?”
-“হবে না কেন? আজ আমার জন্যই আপনি এতোবড় একটা বিপদের মুখে পড়লেন। আল্লাহ রহম করেছে যে আপনার কিছু হয়নি।”
-“প্রণীতা,আমার তোমাকে কিছু বলার আছে। জানিনা এই কথাগুলো শোনার পর তোমার অনুভূতি কেমন হবে। কিন্তু এই কথাগুলো শোনা তোমার জন্য খুবই জরুরি।”
-“হ্যাঁ,বলুন না,কী বলবেন।”
আহিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বুকের মাঝে থাকা কষ্টগুলো পাথরচাপা দিয়ে বলল,“ফারাজ তোমায় ঠকায়নি। সে এখনো তোমায় পাগলের মতো ভালোবাসে।”
প্রণীতা স্তব্ধ হয়ে গেল। মনে হলো,সে কিছু ভুল শুনেছে। আহিয়ান ফারাজের কথা জানলো কীভাবে? সে তো বলেনি। তাহলে কি বাবা বলেছে? আচ্ছা বেশ,বাবা বলেছে কিন্তু এমন কথার মানে কী? ফারাজ তাকে ঠকায়নি? তাকে তো খুব নির্মমভাবে ঠকিয়েছে। প্রণীতা আকাশসম বিস্ময় নিয়ে বলল,“আপনি এসব কী বলছেন?”
-“আমি ঠিকই বলছি প্রণীতা। ফারাজ তোমায় ঠকায়নি। শোনো,আমরা চোখে যা দেখি তা সবসময় সত্যি হয় না। তার পিছনেও লুকিয়ে থাকে চরম সত্য। যে সত্য মানতে না পারলেও মানতে হয়। তুমি তো কেবল ফারাজ যা দেখিয়েছে তাই দেখেছো কিন্তু এর আড়ালে যে কতো সত্য লুকিয়ে আছে তার একাংশ সম্পর্কেও তুমি অবগত নও।”
-“আপনি যা বলছেন বুঝে বলছেন? আপনার মাথা ঠিক আছে তো? আর আপনি হঠাৎ ফারাজের কথা তুললেন কেন?”
-“আমার মনে হলো সত্যিটা তোমায় জানানো দরকার৷ কতোদিন একজনের সম্পর্কে মিথ্যা ধারণা পোষণ করবে? তাই মনের মাঝে থাকা সকল রাগ,দুঃখ দূর করে ফারাজের সাথে সুখী হও।”
প্রণীতার রাগ হলো খুব। একজন বিশ্বাসঘাতককে নিয়ে সে কোনো কথাই শুনতে চায় না। সে বুঝতে পারছে না আহিয়ান হঠাৎ ফারাজের গুণগান গাইছে কেন! যে যেভাবে পারছে তাকে ব্যবহার করছে,তাকে বুঝ দিচ্ছে। কেন সে কি খেলার পুতুল? যে তাকে যা বোঝানো হবে সে তাই বুঝবে? সে কণ্ঠে রাগ ঢেলে বলল,“আপনার বলা শেষ হয়েছে? এবার তাহলে আমারটা শুনুন। আসলে আপনাদের সবাইকেই না আমার চেনা হয়ে গেছে। বিকেলে তো খুব ভালোবাসার কথা বলছিলেন তাহলে এখন কেন এতো ফারাজের গুণগান গাইছেন? ভালোবাসা বুঝি ফুরিয়ে গেছে? তাই একজন বিশ্বাসঘাতককে মেনে নিতে বলছেন? সে যে আমায় ঠকায়নি সেটা আপনিই বা কীভাবে জানলেন? আরে,আপনার যদি আমাকে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে না থাকে তাহলে না করবেন। আপনাকে তো কেউ জোর করছে না যে আমাকে বিয়ে করতেই হবে। শুধু শুধু নিজের ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলবেন না।”
এই বলে প্রণীতা ফোন কে’টে দেয়। আজ তার দুঃখ হচ্ছে না। হচ্ছে প্রচণ্ড রাগ। যে রাগের আগুন নেভানো দায়। পুরুষ মানেই বিশ্বাসঘাতক,ছলনাকারী। সবাই কী সুন্দর তাকে ব্যবহার করছে। যখন যেভাবে পারছে হাতের পুতুলের মতো তাকে নাড়াচ্ছে। রাগে তার চোখদুটো অশ্রুতে টলমল করলো। বিড়বিড় করে বলল,“আমাকে এখন আর কেউ হাতের পুতুলের মতো ব্যবহার করতে পারবেন না। সেই সুযোগই আমি দেব না।”
ফারাজ বাড়িতে ঢুকলো এইমাত্র। তাকে দেখামাত্রই মহিমা চৌধুরী দ্রুত পায়ে তার কাছে আসেন। বললেন বড়ো উদ্বিগ্ন গলায়,“কীরে,তুই সেই কখন বাসা থেকে বের হলি আর মাত্র আসলি? এখন তোর আসার সময় হলো? আমরা কখন থেকে তোর জন্য না খেয়ে বসে আছি। আয় তাড়াতাড়ি খেতে আয়।”
এই বলে মহিমা ছুট লাগান ডাইনিং এর দিকে। ফারাজ কিছু না বলে নিজ রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলো। তারপর নিচে এসে ডাইনিং টেবিলে সবার সাথে যোগদান করলো। হোসাইন চৌধুরী গম্ভীর গলায় বললেন,“ফারাজ,তুমি পরিবারের ছোট ছেলে দেখে এটা ভেবো না যে তোমার তৎক্ষনাৎ সিদ্ধান্ত আমরা সবসময় মেনে নিব। এইযে তুমি আমার এতোবড় ব্যবসা ছেড়ে বাইরের দেশে চলে গেলে,তাতে তোমার বড়ভাইয়ের উপর কতোটা চাপ পড়েছে জানো তুমি?”
ফারাজের বড় ভাই মেহরাজ বলল,“বাবা,এখন এসব কথা বাদ দাও না। আর আমি কি কখনো বলেছি যে আমার উপর চাপ পড়েছে?”
-“সব কথা মুখে বলতে হয় না। মানুষটাকে দেখেই বুঝা যায় তার পরিস্থিতি। আর আমি তো একজন বাবা। বাবা হয়ে ছেলের অবস্থা বুঝবো না?”
মহিমা বিরক্ত হয়ে বললেন,“খাওয়ার মাঝে এসব কথা বলার কী দরকারটা পড়েছে শুনি? ছেলেটা এতোদূর থেকে আসলো এখন একটু আরামে খেতে দাও তো। বেশি কথা বলবে না।”
ফারাজ এবার মুখ খুলল,“সরি বাবা। সরি ভাইয়া। আমি জানি আমার জন্য তোমরা অনেক চাপে পড়েছো। কিন্তু আমি যে কাজের জন্য গিয়েছিলাম সে কাজটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ।”
হোসাইন বললেন,“কী এমন গুরুত্বপূর্ণ কাজ শুনি?”
-“সময় হোক বাবা। সব জানতে পারবে। আর সেই সময়টাও খুব সন্নিকটে।”
অতঃপর ফারাজের ঠোঁটে ফুটে উঠলো রহস্যময়ী হাসি। মনে মনে বলল,“প্রস্তুত হোন নিজের আগাম শাস্তির জন্য।”
চলবে…….