অর্ধাঙ্গিনী পর্ব-৪০

0
21

#অর্ধাঙ্গিনী
#নুসাইবা_ইভানা
#পর্ব -৪০
জিয়ান নয়নার ঠোঁটের দিকে নিজের ঠোঁট এগিয়ে নিচ্ছে। তার পরিটা ঘুমিয়ে আছে একদম তার বক্ষপিঞ্জরে। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে এমন দৃশ্য দেখে হৃদয় জুড়িয়ে গেলো জিয়ানের৷ ইচ্ছে হলো প্রিয়তমার ওষ্ঠদ্বয়ে আলতো করে আদর মেখে দিতে৷ এমন সময় দরজায় কেউ কড়া নাড়লো। জিয়ান বিরক্ত নিয়ে উঠে এসে দরজা খুলে দেখে পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে৷

জিয়ান শান্ত স্বরে বলল,”দেখুন আমার ওয়াইফ ঘুমাচ্ছে সো ডু নট ডিস্টার্ব। আপনাদের কিছু বলার থাকলে রিসিপশনে ওয়েট করুন আমি আসছি৷”
“এই তুই কাকে এটিটিউট দেখাস! তোর বাপেরা দাঁড়িয়ে আছে। ওটা তোর বৌ নাকি ভাড়া করা মা***গী আমাদের জানা আছে।”

জিয়ান নিজের রাগ সংযাত করতে না পেরে নাক বরাবর ঘুষি বসিয়ে দেয় মূহুর্তেই লোকটার নাক দিয়ে রক্ত বের হতে থাকে। জিয়ান দরজা বন্ধ করে বাহিরে এসে বলে,”আমার ওয়াইফের ব্যাপারে একটা বাজে ওয়ার্ড বের করলে আমি সব আইন কানুন ভুলে যাবো৷ আমার ওয়াইফের সম্মান রক্ষা করার জন্য দুই চারটা লা’শ ফেলে দিতেও পিছপা হবো না৷”
“তিনজন পুলিশ জিয়ানের দিকে তেড়ে আসে।”
“পেছন থেকে একজন বলে,স্টপ।”
“পুলিশগুলো পেছনে তাকিয়ে দেখে এসপি স্যার৷সবাই একত্রে সালাম দেয়৷”
“তোমরা নিজেদের ডিউটি না করে ওনাদের ডিস্টার্ব করছো কেনো?”
“স্যার এই লোকটা একটা মেয়ে নিয়ে হোটেলে উঠেছে আবার নিরাপত্তারক্ষীর সাথে মিস বিহেভিয়ার করেছে। এই দেখুন ওর নাক ফাটিয়ে দিয়েছে৷”

জিয়ান বলল,”স্যার আমি ওনাকে বারবার বলেছি আমরা হ্যাসবেন্ড-ওয়াইফ তবুও ওনারা আমার ওয়াইফকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছে৷ কোন পুরুষ যার শরীরে রক্ত মাংস আছে সে নিজের ওয়াইফ সম্পর্কে এমন বাজে কথা সহ্য করতে পারে না। আমিও পরিনি। তাই আমি এরজন্য স্যরি বলতে পারবো না৷ কারন কবুল বলার পর থেকে আমার ওয়াইফের জান,মাল, ইজ্জতের হেফাজতের দায়িত্ব আমার৷ যতদিন আমি বেঁচে আছি ততদিন এই দুঃসাহস যে করবে সে যেহোক তাকে আমি ছাড়বো না৷”

এসপি সাহেব বললেন,”দুঃখিত আপনাকে ডিস্টার্ব করার জন্য। হ্যাসবেন্ড এমন প্রটেক্টটিভ হওয়া উচিৎ। মিস্টার চৌধুরী ইন্জয় ইউওর ট্রিপ।”

জিয়ান দরজা বন্ধ করে রুমে আসলো৷ঘুমন্ত নয়নার দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,”তুমি বড় হবে কবে? সব ভুলে আমাদের দু’জনের একটা স্বপ্নের সংসার হবে। কিউট কিউট কয়েকটা বাচ্চা হবে। এই দেখো তুমি নিজেই বাচ্চা আবার আমি তোমার থেকে বাচ্চার বাবা হওয়ার আশায় আছি!”
নয়নার লম্বা চুলগুলো একপাশ থেকে ছড়িয়ে ফ্লোরে গড়াগড়ি খাচ্ছে। ঘুমন্ত সিন্ড্রেলা মনে হচ্ছে নয়নাকে। জিয়ান নয়নার রেশমি চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে বলে, “আমি তোমার হৃদয়ে পৌঁছাতে চাই আমি তোমার হৃদমহলের রাজা হয়ে তোমার হৃদয়ে রাজত্ব করতে চাই। সুখ,দুঃখ, হাসি, আনন্দ জীবনের প্রতিটা মূহুর্তে তোমার সঙ্গ চাই প্রিয়তমা অর্ধাঙ্গিনী। নয়নাকে দেখতে দেখতে আবারও ঘুমে তলিয়ে গেলো জিয়ান৷”

সকালের মিষ্টি রোদ জানালার পর্দা গলিয়ে জিয়ানের চোখেমুখে খেলা করছে। মৃদু বাতাসে দোলখাচ্ছে পর্দাগুলো সাথে রোদের ঝলক খেলা করছে চোখেমুখে৷ জিয়ান চোখ খুলে,নিজের পাশ ঘেঁষে শুয়ে থাকা রমনীকে দেখতেই তার ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো মুচকি হাসি৷ জিয়ান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে সকাল আটটা বাজে। জিয়ান দ্রুত উঠে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে অফহোয়াইট রংয়ের পাঞ্জাবি সাথে সাদা পাজামা পরলো৷ নিজের পছন্দের পারফিউম লাকসত, দু লাকসত এল এল বারো, ফ্রেশ স্পাইসি স্প্রে করছে। নয়নার এতো কড়া পারফিউমের ঘ্রানে ঘুম ভেঙে গেলো৷ মিটিমিটি করে চোখ খুলে জিয়ানকে পারফিউম স্প্রে করতে দেখে বলে,”পারফিউমের পুকুরে সাতার কেটে এসেছেন!”

জিয়ান নয়নার দিকে এগিয়ে এসে বলে,”সারারাত পারফিউমের গোডাউনকে বুকের মধ্যে রেখেছি তো তাই স্মেল ছড়িয়ে পড়ছে।”
“তা আপনি এতো ফিটফাট হয়ে নায়ক সেজে যাচ্ছেন কই!”
“সোফার উপর দেখো শাড়ি, আর দুই তিনটা ড্রেস আছে যেটা ভালো লাগে পরো। দ্রুত ফ্রেশ হও শ্বশুর বাড়ি যেতে হবে তো৷”

নয়না ভ্রু কুঁচকে তাকালো, তারপর মিনমিন করে বলল,”এমন সেজেগুজে বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে নিশ্চিত মেয়ে পটানোর ধান্দা।”
“আর মেয়ে পটানোর ধান্দা-টান্দা নেই বেব, তুমি পটে গেলেই হবে। যাও ফ্রেশ হয়ে আসো। একটাই পটছে না আবার অন্য মেয়ে পটাবো! এতো ধৈর্য আর সময় কোনটাই নেই তোমার মানুষটার।”
“জিয়ানের শেষের কথাটুকু নয়নার হৃদয়ে বাড়ি খাচ্ছে,তার মস্তিষ্ক আর হৃদয় জুড়ে বারবার প্রতিধ্বনি হচ্ছে নিজের মানুষ শব্দটা! এই শব্দের ভার এতো কেনো?যেনো হৃদয় দখল করে নিলো!

🌿

জাহানারা বেগম তার ভাইকে বলল, “জামাই প্রথমবার তোমাদের বাসায় আসবে ভাই আমার জামাইয়ের কদরে যেনো কোন কমতি না থাকে৷”

“চিন্তা করিস না দশটা না পাঁচটা না আমার একটা মাত্র বোনঝি-জামাই তার আপ্যায়ন হবে রাজকীয়। তা ওরা এখনো আসছে না কেন?”

বিয়ে বাড়িতে গেট আগেই সাজানো ছিলো সেখানে মেয়েরা ফুলের ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ আতিফ সাহেবের বৌয়ের হাতে মিষ্টিজাতীয় খাবারের ট্রে।

জিয়ান গাড়ি থেকে বের হয়ে নয়নাকে বের করে আনলো,নয়নার পরনে রেড মেরুন রঙের একটা ড্রেস। দুজনকে নব বিবাহিতা কাপল লাগছে। মনে হচ্ছে আজ এদের বিয়ের রিসিপশন।
“জিয়ান নয়নার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলো। নয়না জিয়ানের হাতে হাত রাখলো। ছ’ফুট লম্বা একটা মানুষের পাশে নিজেকে ছানাপোনা লাগছে নয়নার। নয়নার চেহারায় অস্বস্তি ফুটে উঠেছে।

জিয়ান ফিসফিস করে বলল,”লম্বা ছেলেরা বাটার মাশরুম বৌ পায় সো ডিয়ার বাটার মাশরুম বি কম্ফোর্টেবল।ঠোঁটের কোনের হাসিটা ফেরত আনেন মিসেস চৌধুরী। ওটা ছাড়া বাটার মাশরুমের রুপ ফুটবে না ঠিকঠাক।”

গেটের সামনে আসতেই জিয়ান নয়নার উপর ফুলের বর্ষণ হতে লাগলো৷ মিষ্টিমুখ করিয়ে জামাইকে ঘরে এনে বসানো হলো। আদনান এসে বলে, “দুলাভাই ইট’স নট ফেয়ার। বিয়ে আমার ফুল এটেনশন পাচ্ছেন আপনি।”

“শালাবাবু কিছুক্ষণ অপেক্ষা করো, তুমিও পাবা এমন রাজকীয় ট্রিটমেন্ট আর তো মাত্র কিছু সময়।” বাড়ি ভর্তি মানুষ সবার চোখ কপালে এতো সুন্দর জামাই! তো মানুষ ভাগ্য গুণেই পায়! যেমন দেখতে তেমন ব্যবহার।
জিয়ান নয়না একটা রুমের মধ্যে পাশাপাশি বসে আছে৷ বাকি সবাই রেডি হচ্ছে বরযাত্রী যাওয়ার জন্য। জিয়ান হুট করে নয়নার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো৷
“কি হচ্ছে!”
“চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে দাও তো খুব ক্লান্ত লাগছে। আসার পরে একটা দিনও রেস্ট করা হয়নি। তোমার পিছু ছুটতে ছুটতে হয়রান হয়ে গেছি বয়স তো কম হয়নি৷”

নয়না বলে,”টেনে সব চুল ছিড়ে ফেলি? আপনার বয়স কত হলো! এই বয়সে আমার মত বৌ পেয়েছেন মাথায় করে রাখা উচিৎ আমাকে আপনার৷”
“তোমার যদি টাকলু জামাই পছন্দ হয়ে থাকে তাহলে ঠিকাছে। মাথায় না বেব তোমাকে হৃদয়ে রাখবো সুইটু।”
“হোয়াট?”
“শুনো এইজন্মে তোমাকে আর ছড়ছি না। সো মুখ বন্ধ করে কাজে লেগে পড়ো৷ আর হ্যা আজ বিকেলে আমাদের ফ্লাইট আমরা দুজন ঢাকা ব্যাক করবো। এতো কষ্ট করে ছুটি নিয়ে বৌয়ের সাথে প্রাইভেট টাইম স্পেন্ড করার জন্য এসেছি। এই এতো মানুষের মধ্যে বৌকে ঠিকঠাক ভালোবাসাও দিতে পারছিনা৷ সো চুপচাপ আমার সাথে ফিরবে৷ বিয়ে করেছি বৌয়ের সাথে সোহাগ করা হলো না এখনো স্যাড লাইফ!”
“আমি আম্মুকে রেখে যাবো না।”
“ওরেহহহ আমার আম্মু ভক্ত বৌতাহহহ। তোমার আম্মু তিনদিন পর ব্যাক করবে।আমি চলে যাওয়ার পর আম্মুর আঁচলের তলে আবার ঢুকে যেও।”
“সরেন আমি রেডি হবো।বৌ আনতে যেতে হবে না?”
“তুমি তো রেডিই আছো আর কি রেডি হবে?”
“নয়না হুট করে উঠে পরলো জিয়ানের মাথা বেডের উপর পরলো,বৌ তুমি পূর্ন বৌ হবা কবে? এভাবে কেউ বরকে ফেলে উঠে!”

নয়না লাগেজ থেকে লেহেঙ্গা বের করতে করতে বলে,”আমার নাম সুনয়না। সো এতো সুন্দর নাম থাকতে মৌ মাছির মত ভন ভন করবেন না বৌ বৌ করে।” নয়না ওয়াশরুমে দিকে যাচ্ছে।
“ডিয়ার ওয়াইফি তুমি চাইলে এখানেও চেঞ্জ করতে পারো মাইন্ড করবো না।”
“নয়না চোখ রাঙিয়ে বলে অসভ্য লোক।”
“অসভ্য হয়েছি আমি তোমারি প্রেমে।” বলেই চোখ মারলো৷

🌿

মান্নাত এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে আছে। চোখভর্তি অশ্রু বুকভর্তি কষ্ট।
“মিস মান্নাত আপনার আয়ারল্যান্ডে কোন সমস্যা হবে না৷ আমার ক্লাস ফ্রেন্ড ফাইজু ওর ফ্যামিলি নিয়ে ওখানে থাকে। আপনি আপাতত ওর বাসায় উঠবেন৷ ও আপনাকে সব রকম সাহায্য করবে৷ আর হ্যা অতিতের কথা ভেবে নিজেকে ছোট ভাববেন না৷ আপনার সাথে যা হয়েছে সে-সব অন্যায় তাই সেখানে আপনার কোন দোষ নেই৷ টেক কেয়ার।”

“মান্নাত মুখ দিয়ে কোন কথা বের করছে না। তার চোখ যেনো শত কথা প্রকাশ করছে।

“রিতু ছুটে এসে মান্নাতকে জড়িয়ে ধরে বলে, তোর সাথে এতোকিছু হয়ে গেলো আমি কিছুই জানতে পারলাম না! তুই না চাইলে তোকে দেশ ছেড়ে যেতে হবে না। তুই আমার বাসায় আমার সাথে থাকবি।”
“মান্নাত জানে এই দুনিয়া তার জন্য এতো সহজ নয়। একজন মেয়ে যাকে ক্লাস টেইনে থাকতে তিনজন পুরুষ ধ’র্ষ’ণ করেছে সেই মেয়েকে কোন পরিবার ভালো চোখে দেখবে না৷”
“মান্নাত একবার পিছনে ফিরে জাহিনের দিকে তাকালো৷ তার বলতে ইচ্ছে করছে আমাকে একবার জড়িয়ে ধরবেন! কিন্তু সে জানে এই অন্যায় আবদার করা যাবে না৷ চোখের জলটুকু মুছে সামনে এগিয়ে গেলো।”

“অন্তর বলল,তুই মেয়েটাকে ইনসাফ না দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছিস কেনো!”

“এই সমাজ এসব জানার পর মেয়েটাকে বেঁচে থাকতে দিবে না। ওই তিন জা’নোয়ারের ডিটেইলস বের কর৷ ওদের আ’সল জায়গা কে’টে লবন মরিচ লা’গিয়ে কুকুরকে খা’ওয়াবো যাতে ভবিষ্যতে কোন মেয়ের সাথে এই ঘৃণ্য কাজ না করতে পারে৷”
#চলবে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে