অর্ধাঙ্গিনী পর্ব-৩৬

0
42

#অর্ধাঙ্গিনী
#নুসাইবা_ইভানা
#পর্ব-৩৬

“নয়না চোখ বন্ধ রেখেই জিয়ানের শার্ট খামচে ধরলো।
“জিয়ান দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে আসলো৷
” নয়না এখনো চোখ খুলেনি। হৃদযন্ত্রে ধুকপুক আওয়াজ হচ্ছে ।
“এই যে ম্যাডাম চোখ খুলে একবার দৃষ্টি স্থীর করুন৷ সুনয়না তোমার মনকর্ষণ করা আঁখি পল্লব মেলে দাও।
” নয়না পিটপিট করে চোখ খুললো,পূর্ণ চাঁদের আলোতে জিয়ানের চেহারা স্পষ্ট হলো নয়নার দৃষ্টিতে৷ নয়না জোড়ে চিৎকার করলো।
জিয়ান নয়নার মুখের উপর হাত রেখে ফিসফিস করে, বলে কেস খাওয়াতো চাচ্ছো কেনো বৌ!কই তোমার জন্য সাত সমুদ্র তেরো নদী পারি দিয়ে আসলাম কিসমিস খাওয়াবা তা’না সোজা কেস খাওয়ানোর ধান্দা?
“নয়না কথা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু জিয়ান নয়নার মুখ চেপে ধরার কারনে কথা বের হচ্ছে না।
” শোনো বৌ ঝগড়া হ্যাসবেন্ড ওয়াইফের পার্সোনাল ইস্যু সো সেটা পার্সোনালি মিটমাট করে নেই। যদি রাজি থাকো আলতো করে আমার হাতে কামড়ে দাও তোমার মুখ খুলে দিচ্ছি। আর রাজি না থাকলে এভাবে তুলি নিয়ে যাবো তোমাকে।
“নয়না জিয়ানের হাতে দাঁত বসিয়ে বেশ জোড়ে কামড় বসালো কিন্তু কাজ কিছুই হলো না৷ কারন রেজা চৌধুরী কি এতোই বোকা নাকি! হাতের তালুতে কেউ জোড়ে কামড় বসাতে পারে নাকি।
” জিয়ান নয়নাকে কোল থেকে নামি দিলো৷
“নয়নার শরীরে ওড়না নেই সেদিকে তার খেয়াল নেই। কোমড়ে হাত রেখে বলে,আপনার সাহস কি করে হলো আমাকে কোলে তোলার?
” স্যরি। তোমাকে কোলে তুলে ভুল করেছি তোমাকে তো মাথায় তোলা দরকার ছিলো জানেমান৷
“চুপ একদম চুপ স্যরি! আপনার স্যরির আচার বানিয়ে খিচুড়ির সাথে খেয়ে ফেলুন৷ সুনয়না তালুকদারের কারো সস্তা স্যরি চাইনা৷
” তুমি চাইলে আমি তোমাকে পৃথিবীর সবচেয়ে দামী স্যরি দিতে পারি।
“ওহহহ আচ্ছা তো কোথায় আপনার দামি স্যরি?
” তারজন্য তোমাকে আমার কাছাকাছি আসতে হবে, চোখে চোখ রেখে একে অপরের বাহুতে অবস্থান করতে হবে,এরপর ঠোঁটে ঠোঁট রেখে স্যরি বলবো। ব্যাস পৃথিবীর সবচেয়ে দামী স্যরি হয়ে যাবে৷
“ছিহহহহ লুচু লোক, অসভ্য লোক মেয়েদের ইজ্জত লুট করার ভালোই ট্রেনিং জানেন দেখি! তা আজ পর্যন্ত কতজনকে এরকম দামী স্যরি দিয়েছেন?
” তোমার কসম বৌ এই স্যরি এই মূহুর্তে আবিস্কার হয়েছে শুধুমাত্র তোমার জন্য। এখনো এই অধম এই স্যরি আর কাউকে নিবেদন করেনি।
“প্লেন ড্রাইভারের বাচ্চা,ধোঁকা বাজ, ইতর,লুচ্চা, লাফাঙ্গা। একদম কথায় কথায় বৌ বৌ করবেন না। আমি পিউর সিঙ্গেল।তবে আগামীকাল বিবাহিতা হয়ে যাবো৷ সো দশ হাত দূরত্ব রেখে দাঁড়ান। আপনার মত ধোঁকাবাজ প্লেন ড্রাইভার আমার দরকার নেই৷
” জিয়ান নয়নার হাতে টান দিয়ে একদম নিজের বুকের কাছে নিয়ে আসলো,নয়নার ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে বলে,তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী, আমার জীবনসঙ্গিনী, আমার সুখ, দুঃখের চিরসাথী। আমাকে তুমি এজন্মে তোমার থেকে আর আলাদা করতে পারবে না। আমি মানেই তুমি তোমার অস্তিত্ব জুড়ে শুধুই আমি। আমি শুধুমাত্র তোমার প্লেন ড্রাইভার। ক্যাপ্টেন রেজা চৌধুরী তা স্বীকার করছে।
“জিয়ান নয়নার এতোটা কাছে যে,নয়নার মুখে জিয়ানের গরম নিশ্বাস আছড়ে পরছে,এলোমেলো লাগছে নয়নার, হৃদয়ে কেমন তুফান বইছে! গলা শুকিয়ে আসছে। হার্টবিট ফাস্ট হচ্ছে। নয়না দু’কদম সরে এসে জোড়ে জোড়ে নিশ্বাস নিলো।নিজেকে কিছুটা সহজ করার চেষ্টা করছে। মনে মনে বলে,একদম গলে যাস না নয়ন৷ ভুলে যাস না এ’কদিন সে কি কি করেছে। নয়না নিজের বুকের বামপাশে হাত রেখে নিজের হৃদয়ের উথাল-পাথাল থামানোর চেষ্টা করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি হৃদপিণ্ড বাহিরে চলে আসবে!
” জিয়ান নয়নার পেছনে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বলল,আমি তোমাকে ঠকাইনি নয়না তুমি ভুল বুঝেছো আমাকে। যাস্ট একটা কনফিউশান ক্লিয়ার করলেই তুমি বুঝে যাবে।
“নয়নার অবচেতন মন মাত্র আন্দাজ করলো তার সাথে ওড়না নেই। মূহুর্তেই নিজের হাত দুটো জড়িয়ে নিলো। ইতস্তত বোধ করতে লাগলো।
“জিয়ান নয়নার আরো খানিকটা কাছে এসে নয়নার হাত ধরে বলে,তোমার সব লজ্জার মালিক এখন আমি। আমার আর তোমার মাঝে কোন লাজ নেই। তুমি কি জানোনা আমরা আমাদের পোষাক! তোমার সব রুপ আমার জন্য উন্মুক্ত।বলেই নয়নাকে জড়িয়ে ধরলো, নয়নার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।জিয়ান নয়নার অতিরক্তি কাছে আসলেই নয়নার এই সমস্যা দেখা দেয়। জিয়ান নয়নাকে নিজের বক্ষ থেকে সরিয়ে বলে,কি হয়েছে তোমার?এমন করছো কেন পাখি? আমাকে বলো কোথায় কষ্ট হচ্ছে। নয়না কিছুই বলতে পারছে না। নয়নার প্যানিক এট্যাক হয়েছে৷ তার চোখের সামনে ভাসতে লাগলো সেই রাতের দৃশ্যগুলো। ঝাপসা হয়ে আসছে নয়নার চারপাশ।
” জিয়ান বেকুল হয়ে পরলো প্রেয়সী এই অবস্থা দেখে।রাত তখন সারে তিনটা। জিয়ান অনিকেতকে কল করলো,রিং হচ্ছে কিন্তু রিসিভ হচ্ছে না৷ কারো পায়ের আওয়াজ পেয়ে নয়নাকে নিয়ে দেয়ালের পেছনে লুকিয়ে পরলো৷ততক্ষণে নয়না বেহুশ। বিয়ে বাড়ি অনেক আত্মীয় স্বজনরা এসেছে তাই বাড়ি ভর্তি মানুষ। জিয়ান নয়নাকে নিজের মধ্যে জড়িয়ে নিলো।লোকটা চলে যেতেই নয়নাকে কোলে তুলে আবার জাহানারা বেগমের পাশে শুয়ে দিলো,খানিকক্ষ তাকিয়ে রইলো নয়নার দিকে,আবছা আলোতে মেয়াটাকে আরো স্নিগ্ধ লাগছে! নয়নার কপালে চুমু দিয়ে বের হয়ে আসার সময় দরজা আলতো হাতে চাপিয়ে দিয়ে আসলো৷ নিচে আসতেই ঘটলো এক বিপত্তি। হঠাৎ করে পেছন থেকে একজন জিয়ানকে ডেকে বলে,এই ছেলে কে তুমি? তোমাকে তো এর আগে দেখিনি কখনো?
“জিয়ান শুকনো ঢোক গিলে পকেট থেকে মাক্স বের করে পরে নিলো,এরপর সামনে ফিরে দেখে মধ্য বয়স্ক একজন পুরুষ। জিয়ান নিজেকে ধাতস্ত করে বলে,আমি ডেকোরেশনের লোক।
“লোকটা মেবাইলের আলো জ্বালাচ্ছে এই সুযোগ জিয়ান ফুড়ুৎ।
” আতিফ সাহেব সামনে টচ ধরতেই দেখে সামনে কেউ নেই! সে ভীত হলো! মনে মনে ভাবলাম হয়ত জ্বিন ভুত তাই দ্রুত প্রস্থান করলো৷
🌿মেহনুর খেতে বসেছে
“মিতা বেগম মেহনূরের পাশে বসে যত্ন করে খাবার তুলে দিচ্ছে। জানিস তুই একদম তোর মায়ের মত হয়েছিস৷ সেই চোখ সেই নাক।
” মেহনূরের হাতের লোকমটা আর মুখে উঠলো না৷ ঠুকরে কেঁদে উঠলো মেহনূর।
“মিতা বেগম উঠে এসে নয়নার মাথা তার বুকে চেপে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,চিরজীবন কেউ বেঁচে থাকে না মা৷ তোর এক মা চলে গেছে তাতে কি আমি তো আছি। জানিস সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো এতোকিছু হয়ে গেছে আমার বোনের মত ফ্রেন্ডের সাথে আমি তা জানতেও পারলাম না। তার শেষ সময় তাকে একবার দেখতে পারলাম না৷
” আম্মি আম্মু বারবার তোমাদের কথা বলছিলো কিন্তু আমরা কোনভাবে তোমাদের কন্টাক্ট করতে পারিনি৷
“লাস্ট পাঁচটা বছর তোর মায়ের সাথে আমার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তোর বাবা পছন্দ করতেন না আমাদের দু’জনের সখ্যতা৷
” বাবা ‘ এই শব্দটা এখন হৃদয়ে কাটার মত বিঁধে। আম্মু যখন মৃত্যুর মুখে তখন সে তার নতুন জীবন সাজাতে ব্যস্ত৷ আমি নিজের ছোট বিজনেস আর চাকরির বেতন দিয়ে লড়ে গেছি আম্মুর জন্য। একসপ্তাহ আগে আম্মুর একটা পুরোনো ডায়েরি খুঁজে পাই সেখানেই তোমার ডিটেইলস পেয়েছি আম্মি।অশান্ত মনটাকে শান্ত করার জন্য ছুটে এসেছি তোমার কাছে৷
“মিতা বেগম মেহনূরে কপালে চুমু দিয়ে বলে,একদম মন খারাপ করবি আমি আছি তোর জন্য। জানিস রেজার বিয়ের ইনভিটেশন দেয়ার জন্য অনেক বার ট্রাই করেও কন্টাক্ট করতে পারিনি৷
” রেজার বিয়ে!
“হ্যা রেজার বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। মেয়েটা দারুণ দেখতে তবে বয়স একটু কম। মানিয়ে নিতে পারলেই হয়।
” মেহনুরের গলা যেনো কেউ চেপে ধরেছে সেতো এই আশা নিয়ে এসেছিলো তার মায়ের শেষ ইচ্ছে পূরণ করবে রেজাকে বিয়ে করে। কিন্তু এটা কি হলো!
#চলবে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে