“মেঘলা আকাশ”পর্ব ৭.

0
326

“মেঘলা আকাশ”পর্ব ৭.

মায়া তার হাঁটু ভাঁজ করে হাতের উপর মাথা রেখে বসে আছে। ভাবী খেতে ডাকাডাকি করছে। তার খাওয়ার ইচ্ছে নেই। না খেয়েই কলেজে যাবে। একটু আগে আতিকা যখন কলেজে যাওয়ার জন্য ফোন করেছিল, তখন অজান্তেই সামান্য করে মায়ার মুখ থেকে গতকালের হাবীব ভাইয়ের কাছে যাওয়ার কথাটা স্লিপ হয়ে গেছে। অগত্যা তার অন্তরঙ্গ বান্ধবীকে সে সবকথা জানিয়েছে। জানিয়েছে কেন হাবীব ভাই সেই বাসায় থাকবে। মায়ার কেন যেন মনে হয়েছিল হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। এবং তাই হয়েছে। আতিকা রেগে বসেছে। আর এই মেয়েটির রাগ সহজে ভাঙার নয়। সে সইতে পারছে না, কীভাবে মায়া তাকে না জানিয়ে গতকাল ওখানে গিয়েছে।
“বলছি তো। তোকে জানানোর কথা মাথায় আসেনি। তাছাড়া আমি শুধু বাসাটা দেখতে গিয়েছি।”
“হু। হাবীব ভাই তোর জন্য এখানে থাকবে। আর তুই কিনা নিয়মিত ওখানে যাবি। কেবল বাসা দেখতে যাবি। যতসব!” বলেই কল কেটে দিলো।
মায়ার কিছুই করার রইল না। আশ্চর্য! সে বেস্ট ফ্রেন্ড বলে কি পার্সোনাল বলতে কিছুই নেই? সবসময় ওদের পারমিশনেই সবকিছু করবে নাকি? তার লাইফ, সে কি চলতে পারে না নিজের মতো করে?
মায়া কলেজে গিয়ে আতিকাকে ঠিক করতে চাইল। কিন্তু কোনো কাজই হয়নি। সে ভেবে পায় না, এতো রাগী একটি মেয়েকে কবে সে বেস্টফ্রেন্ড বানিয়ে বসেছে। আচ্ছা, এটা কি একটা ভালো দিক নয় যে, এখন থেকে আতিকাকে হিসাব দিয়ে বেড়াতে হবে না?
সেই দুপুর সে হাবীব ভাইয়ের সাথে খাবার খায়। হাবীব ভাইকে দেখতেই সে সব অভিমান ভুলে গেল। ভুলে গেল, তার কাছে আতিকার অভিযোগ করার কথা ছিল। সবটা সময় চলে গেল হাবীব ভাইয়ের কথা শুনতে শুনতে, তার কলেজ লাইফের কথা। এসব শুনেছে সে বিয়ের রাতেও। আরও শুনতে ইচ্ছে হয়। শুধু কাহিনিই না, কথাগুলোও। কি সুন্দর করেই না লোকটা কথা বলে।
মন ফুরফুরে হতেই সে আতিকাকে কল দিতে গেল। কিন্তু আতিকা কি কথা বলবে? আরেকবার ঠিক এভাবেই রাগারাগি হয়েছিল। এ সময় বন্ধুত্ব প্রায় ভাঙার অবস্থায় এসেছিল। কিন্তু সঠিক মুহূর্তে জীবনে জেরিন আর রাইসা চলে আসে। যার কারণে ওরা আতিকাকে আস্তে আস্তে সহজ করে দেয়।
শেষমেশ সে আতিকাকে কল দেয়।
“কাল আমি কলেজে যাচ্ছি। কিছু লাগবে?”
“না। আমি তোর সাথে কথা বলার জন্য ফোন করেছি।”
“কী কথা বলবেন?”
“আশ্চর্য এভাবে কথা বলছিস কেন?”
“কীভাবে বলব? তুই বল, তুই কীভাবে কথা বলেছিস আমাদের সাথে? মনে আছে, একবার বলেছিস বেস্টফ্রেন্ড না থাকলে রিলেশন করে মজা পাওয়া যায় না। বেস্টফ্রেন্ডের সাথে হাসাহাসি করা যায়? এখন কী হয়েছে? দুই মাস যাবৎ দেখছি, আপনার অহংকারে মাটিতে পা পড়ছে না।”
“আমার অহংকারে মাটিতে পা পড়ছে না?”
“হ্যাঁ। কারণ তোর মতো করে আমরা কেউ হাবীব ভাইয়ের মতো লোক পাইনি।”
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

“তাই নাকি?”
“নয়তো কী? তুই সারাক্ষণ কি আমাদের সাথে হাবীব ভাইয়ের গুণগান গেয়ে বেড়াস না? হাবীব ভাই এটা, হাবীব ভাই ওটা।”
“দেখ, লিমিট ক্রস করিস না। তুই চাস, আমি আমার প্রতিটি পার্সোনাল কথা তোকে জানাবো? তুই কে শুনি? তোর যদি এতই সমস্যা থাকে তবে বন্ধুত্ব রাখিস না।”
ওই দিকটা বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ রইল। এদিকে রাগে মায়া কাঁপছে। এতো কটু কথা সে আগে কখনও কারও কাছে শোনেনি। এমনকি মাও তাকে উঁচু আওয়াজে ডাক দেয় না।
আতিকা কিছুক্ষণ পর বলল, “জেরিন বলেছে ওর বইগুলো তোর হয়তো পড়া শেষ হয়েছে, দিতে বলেছে। ওর আপুর লাগবে।”
“ওর যদি দরকার হয়, ওকে ফোন করতে বল।”
আতিকা কিছুই না বলে ফোনটা রেখে দেয়। মায়া তখন থেকে রাত অবধি রাগে গিজগিজ করলো। ভাবীর জিজ্ঞেস করাতে বলল, “রাইসার সাথে ঝগড়া হয়েছে।” আতিকার কথা সে মুখেও আনতে চায় না।
“ওহ। দুপুরে ওর বাসায় ছিলে?”
মায়া সত্যটা বলতে বলতে থেমে যায়। মেজাজ ঠান্ডা করে সে হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
“কাল কলেজে গিয়ে সব মিটমাট করে নিয়ো। কলেজ জীবনে বন্ধু হচ্ছে লবণের মতো। একা থাকতে খুব কষ্ট হবে।”
পরদিন মায়া কলেজে গেল ঠিকই, কিন্তু আতিকার সাথে বন্ধুত্ব করার জন্য নয়। এতকিছু হওয়ার পর সে আর আতিকাকে চায় না। কিন্তু কলেজে আতিকার অনুপস্থিতি তাকে ততটা বিমর্ষ করে তোলেনি, যতটা রাইসাদের না আসাতে সে হয়েছে। ওরা কেন আসেনি? মায়ার কলেজে এক মিনিটও থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তার ওই তিনটা বান্ধবীই যথেষ্ট ছিল বলে সে আর কারও সাথে পরিচিতই হয়নি। সেই যেন ভিনগ্রহী। কাউকে চেনে না। কেউ তাকে চেনে না। সে একরাশ হতাশা নিয়ে ক্লাস সব না করেই বাসায় চলে আসে। এরপর পুরোটা সময় মন খারাপ।
মায়া দরজার ওপাশ থেকে শুনতে পাচ্ছে, মা আর ভাবীর কথা। ওরা ওর সম্বন্ধেই কথা বলছে।
“আমি আসার আগে মায়া কি এমনই ছিল?”
“কেমন?”
“এইযে, একেকদিন একেক মেজাজে থাকা? সবাইকে ছোট..” ভাবী থেমে গেল।
“কী?”
“না কিছু না।”
ভাবী মনে করছে, মায়া সবাইকে ছোট করে দেখে? মায়ার যদি শক্তি থাকত, তবে সে সামনের টেবিলটাই ভেঙে গুড়ো করত।
“ও আগে এমন ছিল না। পড়ার চাপ এখন বাড়ছে তো! তাই হয়তো মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে। নইলে সে এই পুরো বাড়িটাকে একসময় মাতিয়ে রাখত। ওর বাবাও ওর জন্য চিন্তা করে। আমি ওঁকে বলেছি, সময়ের সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“মা, কেউ যেন এসেছে।”
পরক্ষণে দরজা খোলার আওয়াজ হয়। কে যেন এসেছে।
“মা, আসসালামু আলাইকুম।”
“আরে নয়ন, কেমন আছিস বাবা?”
ইশ, হাবীব ভাই কি এভাবে আসতে পারত না ভাইয়াকে দেখার নাম করে? লোকটার সাথে আজকে সারাদিন কোনো যোগাযোগই হয়নি। যার জন্য এতকিছু হয়েছে, তাকেই কেন মায়া অবহেলা করেছে, সে তা জানে না। আচমকা তার দুনিয়াকে খুব নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে।
বাইরে মনে হয় সবকিছু একটু বেশিই চুপচাপ। রুম থেকে বেরিয়ে দেখে ভাবী তার রুমে আছে। কিন্তু আর কেউ নেই। বাইরেই যেন কেউ কথা বলছে। খোলা দরজার কাছে এসে সে বাইরে বেতের চেয়ারে নয়ন ভাই আর মাকে কথা বলতে দেখতে পেলো।
“তোমার কী মনে হয়?”
“এমন হবে বলে আমার কিছুটা মনে হয়েছিল।”
“কেন বাবা?”
“রাজীবের সাথে ওর খুব ভালো একটা বন্ডিং ছিল। ওর বিয়ে হওয়ার পর থেকে বোধ হয় মায়া একটু এমন হয়েছে।”
“এরকম ব্যাপার নাকি? হতেও তো পারে। নাফিসা তেমন কারও সাথে মিশে না। নইলে নাফিসাই ওকে সঙ্গ দিতে পারত। যাইহোক, ওর সাথে একটু কথা বলে দেখো। মন খারাপ। এবার আতিকা অথবা জেরিনের সাথে কিছু হয়েছে কিনা কে জানে।”
“আমি? আমি রাজীবের সাথে দেখা করতে এসেছি। ওইদিন ওর সাথে থাকতে পারিনি বলে রাতেই আসা। ওর সাথে দেখা করে চলে যাব।”
“মনে তো হচ্ছে, মায়ার সাথে তোমারও কথা কাটাকাটি হয়েছে।”
“না না, অমন কিছু না।”
“তাহলে এবার বিয়ে করে ফেলছো নাকি, যে আমার মেয়ের দিকে খেয়াল নেই?”
নয়ন ভাই লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। নয়ন ভাই কেন বিয়ে করছিল না মায়ের তো তা জানার কথা নয়!!
“আমি সব বুঝি। তো খোরশিদা কোনো মেয়েকে দেখিয়েছে?”
“হুম।”
“মেয়েকে পছন্দ হয়েছে?”
“ওরা আমাকে পছন্দ করেছে। তাছাড়া মায়ের অনেক ভালো লেগেছে ওদের। মেয়ের ব্যাকগ্রাউন্ডও ভালো। আমাকে আগে থেকেই জানতো। আমি চাকরি পেয়েছি দেখে কথাবার্তা এগিয়ে নেয়। রাজীবকে এসবই জানাবো ভেবেছিলাম। আমি কিছু ডিসাইড করতে পারছি না তাই।”
মায়ার খুব অস্বস্তি হচ্ছে। লোকটা একসময় তার সাথে সবকিছুই শেয়ার করত তার মনের কথা বাদে। আজ এসবকিছু মায়ার কানে এভাবেই পৌঁছচ্ছে?
বলতে বলতে ভাইয়া চলে এসেছে। নয়ন ভাইকে দেখে ভাইয়ার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“নয়ন নয়ন।” ধপ করে ওরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলো। ওই আওয়াজ মায়াও শুনতে পেলো। “দোস্ত, বিয়েসাদি, চাকরিবাকরি এগুলো করেও শান্তি নেই। দেখ, আগে আমরা রাতদিন সাথে থাকতাম। আর আজ? মনে হচ্ছে, তোকে দেখেছি বছর হয়ে গেছে দোস্ত।”
মা বলে উঠলেন, “নয়নও এখন বিয়েসাদি করবে। পাত্রী দেখে এসেছে। না জানি কী হবে এর পর।”
হঠাৎ ভাইয়ার মুখের উজ্জ্বলতা কমে গেল, যা একটু আগে এসেছিল।
“সত্যি?”
“মায়ের জ্বালায় পারা যায় নাকি? মা খুশি হবে।”
“ওহ্।”
“তোরা বস।” মা বললেন, “আমি যাচ্ছি।”
মা আসার সময় মায়াকে দেখতে পেলেন। তারও মুখটা ভাইয়ার মতো হয়ে গেছে। তিনি তাকে না দেখার মতো করে চলে গেলেন। মায়া দাঁতে দাঁত চাপলো। হয়েছে কি এই বাসার সবার? নয়ন ভাই ছাড়া মায়ার জন্য আর কেউ কি নেই? অথবা কী এমন আছে এই লোকটাতে, যার কারণে এতদিন তার দিকেই সবাই মুখিয়ে রয়েছে?
“আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসি। তারপর বেরুব।” রাজীব ভাইয়া মায়াকে হনহন করে এদিকে হেঁটে আসতে দেখে বলল, “কী হয়েছে? এখনও রাগ?”
মায়া কিছু না বলে হাতের উপর হাত ভাঁজ করে রাখে। ভাইয়া মুখ বাঁকিয়ে ভেতরে চলে যায়।
“বসো মায়া।”
নয়ন ভাইয়ের কথায় সে আকাশ থেকে পড়ল। লোকটা তার সাথে এতটা নিঃসঙ্কোচে কথা বলতে পারবে তা কখনওই ভাবেনি।
মায়া তাচ্ছিল্য করে ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বসলো।
“জীবন যেন সবারই সুন্দর করে চলছে।”
“চলাতে পারলে কেন চলবে না?”
“মানুষ হাতে বড় কিছু পেলে বড় বড় কথা বলতে শুরু করে। আপনিই তার প্রমাণ।”
“আমি আবার বড় কী পেয়েছি?”
“পাননি? না পেলে কি চাকরি পেয়ে আপনার বুকটা এতটা ফুলে উঠত?”
“আমার বুক ফুলে উঠেছে?”
“দেখিয়ে দিতে হবে? আমার সাথে কথা বলতে বাঁধছে। ভাইয়ার সাথে দেখা করার ফুরসত পাওয়া যায় না। চাকরি না পেতেই বিয়ে করে ফেলছেন। আর কী কী বলব?”
“ব্যস্ততা নামেও কিছু থাকে মায়া। আমার না আসাতে তোমার কেন এতো জ্বলছে?”
“আমার জ্বলতে বয়েই গেছে। আপনার চেয়ে ধনী একটা লোক আমাকে বিয়ে করে নিয়ে যাবে। তার তো আপনার মতো স্ট্যাটাসের অহংকার নেই।”
নয়ন ভাই চুপ করে রইল।
(চলবে..)
লেখা: ফারিয়া কাউছার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here