“মেঘলা আকাশ”পর্ব ৬.

0
248

“মেঘলা আকাশ”পর্ব ৬.

আচ্ছা, জীবন কি কারও এতটা সুন্দর হয়? এইযে, এই সকালটা, মধুর এক দিনকে সামনে তুলে ধরা সকালটা, এটার কি কোনো তুলনা হয়? অথবা ওই বিরক্তিকর কাকের ডাকটা, কাকের বাজখাঁই গলায় কা কা করাও কি কারও ভালো লাগার মতো? এইযে, মিষ্টি রোদটা, রোদেরও কি মায়া আছে? মায়া জানালা দিয়ে আসা রোদের সামনে নিজের হাতটা তুলে ধরলো। কিছুক্ষণ উল্টিয়ে পাল্টিয়ে দেখল। রোদের এভাবে অন্যজনকেও মায়াময়ী করা খুবই মনোরম।
সে উঠে গরম চা খেয়ে নেয়। ভাবী বাসার টুকিটাকি কাজ করছে। তিনি আসার পর থেকে মায়াকে একদমই কাজ করতে দেন না। বলেন, “বাপের বাড়ি হচ্ছে আহ্লাদের। শ্বশুরবাড়িতে সারাজীবন কাজ করতে হয়। বাপের বাড়িতেও করবে, শ্বশুরবাড়িতেও করবে এমনটা হয় নাকি?”
কিন্তু এছাড়া ভাবীর সাথে তেমন একটা ভাব তার হয় না। মায়ারও ইচ্ছে হয় না, ভাবীকে বিরক্ত করতে। কারণ বিয়ের পরের প্রথম সময়গুলো হয় অমূল্য। এগুলো আর ফিরে আসে না। এ সময় দুটো মন খুব কাছে আসে। আর মেয়েরা এই সময় খুব আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠে, যার ফলে তাদের ব্যক্তিগত জীবনে কারও নাক গলানো তাদের ভেতর বিরক্তির সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে মা পাকুরা করছে। একটু পর এনে দেবে। ভাইয়া দোকানে যাওয়ার আগে মায়াকে দেখে হেসে গেলো। আজ কেন যেন দোকানে যেতে চায়নি। কিন্তু ফালতু অকাজের অ্যাসিসটেন্টটা বড়ই অশুভ। এসব মানুষ দুনিয়াতে আছেই কেন সে বুঝতে পায় না। ওই লোকটার কারণে পারল না ভাইয়া। দামী শাড়িগুলো সস্তায় বিক্রয় হয়ে যাওয়ার ভয়ে চলে গিয়েছে। ভাইয়ার মুখের উজ্জ্বলতা দেখে মায়ার মন ভরে গেছে। ভাইয়া এখন আর রাতে ছাদে উঠে মায়ার সাথে বসে গল্প করে না। সে এখন জেরিনের পড়ে ফেলা বইগুলো এনে পড়ছে। তাই তার সঙ্গের বিশেষ একটা অভাব বোধ হচ্ছে না।
মা টেবিলে পাকুরা এনে রাখতেই টের পেল কিছু একটা হতে চলেছে। মায়ের মতো বিরস মহিলার মুখটা চকমক করছে। কারণটা সে জানতে চাইল না। বাবার কথা মনে পড়ে গেছে।
সে কিছু পাকুরা বাবার জন্যও নিয়ে যায়। বাবা হুইলচেয়ারে বসে একটা বই পড়ছেন।
“কিরে মা, আজ পাকুরা হলো কোন খুশিতে? এতদিন তোর মা তো বানায়নি। তোর মা বানায়নি বলে তুইও তো বানাসনি।”
সে নাকমুখ কুঁচকে বলল, “বানাতে ইচ্ছে হয়নি। ভর্তি এটা সেটা, সময়গুলো যেন কোথায় চলে গেছে। আর মা তো বানায়নি, কারণ নয়ন ভাই বিয়ের পর আর আসেনি।”
“মনে হচ্ছে, নয়ন এলে শুনবে কিছু বকা। তেনার কিসের এতো ব্যস্ততা, যে তোমার মা’কেও দেখতে আসতে পারেনি?”
“বাবা, লোকটা আমাদের ঘরের মানুষ নয় যে, মাসে অন্তত দুইবার তার আসা লাগবে।”
“কী বলিস। ও তো রাজীবের মতোই। মনে হয়, নিজের আরেকটা ছেলেকে দেখছি।”

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

“হু দেখুন।”
“বিরক্ত হচ্ছিস কেন।”
“কই না তো।”
মায়া বিরক্তি নিয়ে বাবার দিকে প্লেট ঠেলে দিয়ে রুম থেকে বেরুয়। অমনিই তার সামনে নজরে পড়ে টেবিলের সামনের চেয়ারে বসে থাকা নয়ন ভাইকে। সিরিয়াসলি? এটা নয়ন ভাই? ও কনফার্ম করতে আরেকটু সামনে গেল।
“কিরে মায়া, ওকে সালাম দে।” মা বললেন।
“ওহ হ্যাঁ। আসসালামু আলাইকুম।”
তিনি না তাকিয়ে ইশারায় সালাম নিলেন। আশ্চর্য, আগে তো কোনো শিরোনাম না করে খাওয়ার ভেতর ঢোকে পড়ত! আজ কী হয়েছে?
“বাবা, খাও না। তোমার জন্যই করেছি। কিন্তু একটা কথা বলে দেই। তুমি যদি আগামীতে এমন আচরণ আরেকবার করো তাহলে এই পাকুরার স্বাদ তুমি ভুলেই যাবে। কারণ আমি তোমাকে আর কখনও বানিয়ে দিবো না।”
“কেন মা? কী করেছি আমি?”
“কী করেছো? আজ দেড়-দুই মাস পর ফোন করে বলছো, আজ মা একটু বাসায় আসছি!! আমি তো ভেবেছি, তুমি আমাদের ভুলেই গেছ। সেই যে বিয়ের পর গেলে!”
“কী বলছেন এসব? আমি আপনাদের ভুলতেই পারি না। আসলে পড়াশোনার চাপে ছিলাম একটু।”
“তোমার আবার কিসের পড়াশোনা?”
“ওহ্, বলতেই ভুলে গেছি। আজ খবরটা দেওয়ার জন্যই তো এসেছি। প্যাকেটে মিষ্টি এনেছি। আমার চাকরী হয়েছে।”
“তাই নাকি?”
“রাজীবকে আগেই বলেছি। ভেবেছি আপনাকে আমিই জানাই।”
“তা খুব ভালো করেছো। পুরুষ মানুষ হয়ে আজ এতদিনে গতি করলে। আমি তো ভেবেছি..”
মায়ের মুখের ভঙ্গি দেখে নয়ন ভাই না হেসে পারলো না। মায়া চেয়ারে বসতে বসতে হা করে সেই হাসি চেয়ে রয়েছে। লোকটা কি পরিমাণ শুকিয়ে গেছে! দেখে মনে হচ্ছে, এতদিন তেমন একটা হাসেইনি। মায়ার বড় করুণা হচ্ছে তার জন্য।
“আসলে আমার মাঝে এতদিন কনফিডেন্স আর কমিটমেন্টের অভাব ছিল। কোনোকিছু করতে ভরসা পেতাম না। যার ফলে কোনো কাজই ঠিক করে করতে পারিনি। যাইহোক, এতদিনে আমার গতি হয়েছে দেখে আমার নিজেরও ভালো লাগছে।”
“তোমার মা ভালো আছে তো?”
মায়া নিজে পাকুরা খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। নয়ন ভাই এতদিনে এসেছে। হয়তোবা জিজ্ঞেস করতে পারে তার নতুন কলেজের কথা। কিন্তু মায়ের রান্নাঘরে চলে যাওয়ার পর থেকে মনে হয়েছে, সে ব্যতীত এখানে অন্য কোনো প্রাণীই নেই। কিন্তু ওই যে, সামনে নয়ন ভাই তো বসে আছে। বসেই খালি আছে। এই লোকটার মাঝে কোথা থেকে কনফিডেন্স আর আর আরেকটা কী যেন বলেছে? কমিটমেন্ট! এসেছে কোত্থেকে এসব দুর্লভ জিনিস? না। এটা নয়ন ভাই না।
মায়া উঠে নিজের রুমে চলে আসে। আজ কলেজে বিশেষ ক্লাস নেই। আতিকারও কথা ছিল না যাওয়ার। নইলে সে মায়ার পাওয়া নতুন ফোনে কল দিয়ে জানিয়ে দিত। তবু সে যাবে। আজ হাবীব ভাই আসবে। আজ প্রথম তাকে রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবে। উফ, সেই হলুদের রাতের পর আজ সে তার সাথে দীর্ঘ সময় কাটাতে পারবে। এই দুইমাস কেবল তাকে দেখেছে, ফোনে কথা হয়েছে। কিন্তু সময় কাটাতে পারেনি। আতিকারা রাগ করবে বলে সে যে কয়দিন কলেজে এসেছে তাদেরকে ফেলে হাবীব ভাইয়ের সাথে যায়নি। আর হাবীব ভাইও একটা জিনিস! কোথায় এমন প্রেমিক পাওয়া যাবে যে কিনা নতুন প্রেমে পড়ার পর প্রেমিকার সাথে দেখা করার জন্য অধৈর্য হয়ে পড়ে না? হাবীব ভাইই এমন, যে কিনা সুযোগই পায় না মায়ার সাথে দেখা করার। সারাক্ষণ পালাই পালাই ভাব।
একঘণ্টা পর যখন মায়া একটা সাধারণ কলেজের স্টুডেন্টের মতো রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষায় থাকে, তখন সেও বুঝতে পারে পালাই পালাই ভাবটা কেন আসে। আশ্চর্য! সেরাতও তারা নিঃসঙ্কোচে অনেক গল্প করেছে দিঘীর পারে। তবু আজও কিসের এতো লজ্জা আর দ্বিধা?
হাবীব ভাই তার কাছে এসে মুচকি হাসে। মায়ার কেন যেন অন্য সবকিছু ঝাপসা মনে হচ্ছে। যখন সে তার সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হাঁটতে লাগল, তখন পালাই পালাই ভাবটার ফলে তার কাছে মনে পড়ে গেল নয়ন ভাইয়ের কথা। একসময় তিনিও এভাবে মায়ার সাথে চোখে চোখ রাখতে পারতেন না। পালাতেন। ইশ, কার কথা এসময়ে সে ভাবছে!!
মায়া বাসায় আসার পর থেকে মন খারাপ। সে কাউকে তার কারণটা জানায়নি। রাতে শোয়ার পর সে এপাশ-ওপাশ করতে থাকে। হাবীব ভাই বলেছে, তারা এখন এখানে আর থাকছে না। মাঝে মাঝেই এখানে আসবে। মায়ার চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা পানি পড়তেই হঠাৎ ফোনটা মনে হয় বেজে উঠল।
“মায়া, শুয়ে পড়েছ?”
“হুম।”
“রাগ করেছো? আমার কিন্তু কিছু করার নেই। বাবা কিন্তু আমার কথা কখনও শুনতে চান না। তাই অবশেষে.. কিন্তু মায়া আমি যে কয়দিন এখানে আছি, সে কয়দিন তোমার সাথে কাটানোর কথা ভেবেছি।
“মানে?”
“বাবারা চার-পাঁচদিন পর চলে যাবেন। এখানে আমার এক পরিচিত লোকের জায়গায় আমি থাকব। তুমি যখনই ইচ্ছে হয়, চলে আসতে পারো।”
“তাই?”
“হুম। বাবাকে বলেছি, ফ্রেন্ডের বাসায় যাব।”
“ওহ্। আপনি আপনার বাবাকে এতটা কেন ভয় পান?”
“আমার বাবা দুনিয়া দেখেছে। জীবনে অনেককিছু জয় করেছে। আমার বাবার মতো শক্ত পুরুষ খুব কম দেখা যায়, যাদের সহজে কেউ দমাতে পারে না। স্বাভাবিকই তাঁর সামনে কোনোকিছুর উঁচুনিচু হয় না।” বলে কিছুক্ষণ হাবীব ভাই চুপ করে রইলো।
“আচ্ছা। আমি যাব। আপনি আমাকে ঠিকানাটা জানাবেন।”
“ওকে। রাত অনেক হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়।”
তার সেই রাতে খুব ভালো ঘুম হয়েছে। তার পরদিন সে দেখে এলো হাবীব ভাইয়ের বাসা। ছিমছাম একটা ফ্ল্যাট লোকটা তাকে কিছুদিনের জন্য দিয়েছে (টাকার বিনিময়ে)। কিন্তু মায়ার ওখানে যেতেই মনে হলো, সে মস্ত বড় একটা ভুল করেছে। সে কি জানতো, এখানে এসে তার মনের পরিবেশটা পাল্টে যাবে? সে ঘরগুলো, রান্নাঘর, বিছানা, জানালা এবং হাবীব ভাইকে যতই দেখছে, বাসনা জাগছে বিয়ে করার, সংসার করার। লোকটাকে আপন করার যে কিনা তাকে খুব ভালোবাসে। নইলে দূরে চলে যাবার আগে লোকটা এতো কাছে আসতে চাইত?
হাবীব ভাই তার বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, “মায়া, কোথায় হারিয়ে গেছ?”
মায়ার হুঁশ হলো। “আমরা কি বিয়ে করে এমন একটা জায়গায় সুখের সংসার করতে পারি না।”
হাবীব ভাই থতমত খেল, “এখন? বিয়ে? কিন্তু বাবাকে এখন আমি মানাতে পারব না।”
“কখন পারবেন?”
হাবীব ভাই তার চোখের গভীরতা দেখে বলল, “একটু সময় লাগবে আমার। আমার একটা কথা বলার আছে। দুটো বছর তুমি অপেক্ষা করো। বাবা বিয়ের কথা তুললে আমি তাঁর সামনে তোমার কথা তুলে ধরব। তার আগে কিছু কাজ আছে।”
“কী কাজ?”
“পরে জানাব।”
বাসায় এসে মায়া ভাবলো, বোকার মতোই সে বিয়ের কথা তুলেছে। ওখানে গিয়ে যে তার কী হয়েছে!! তার সামনে আরও পথ আছে। হাবীব ভাই ঠিকই বলেছে। অন্তত দুই বছর ওয়েট করা উচিত। কিন্তু ওকে সেরাতে স্বপ্নে এক অদ্ভুত লম্বা মানুষ এসে বলল, “আমার নাম দুই বছর। দেখো, আমি খুউউব লম্বা।”
(চলবে..)
লেখা: ফারিয়া কাউছার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here