ভবঘুরে পর্বঃ০২

0
495

ভবঘুরে পর্বঃ০২
লেখাঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ

বলতে বলতে মেয়েটা বাচ্চাদের মতো দাঁত খিঁচিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে দিল৷ আবিদ চোরাচাহনিতে আশেপাশে দ্রুত তাকিয়ে মেয়েটাকে থামানোর চেষ্টা করল,
-‘আরে কি বাচ্চাদের মতোন কান্নাকাটি শুরু করলেন! কেউ দেখলে কী ভাববে বলুন তো?
-‘ কাঁদব না? আমি ব্যথা পেয়েছি না? একই সুরে কাঁদতে কাঁদতে বলল মেয়েটি।
আবিদ একটু সামনে ঝুঁকে ভুরু কুণ্ঠিত করল,
-‘ ও,ব্যথা পেয়েছেন? দেখি কোথায় ব্যথা পেলেন?
মেয়েটা খেঁকিয়ে উঠল,
-‘দূরে যান। সুযোগ পেলেই কাছে আসার ধান্দা।’
চকিতে আবিদের চোখে-মুখে একটা অপমানের বাজ পড়ল। অনভিপ্রেত এই অপবাদে তার মুখ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল। কোনোমতে দাঁতের নিচে অধর চেপে রাগটাকে খেদিয়ে দূর করল সে। এরপর কপট দুঃখিত গলায় করজোড়ে বলল,
– ‘এক্সট্রিমলি স্যরি ম্যাম। যাই। ঘুমান আপনি। জ্বরের ঘোরে পাগল হয়ে গেছেন মনে হয়।’
বলে কোনো প্রতুত্ত্যরের অপেক্ষামাত্র না করে দরজার নব ঘুরালো। ঠিক সেসময়ে ইশতিয়াক সাহেব চাপা হাস্যোজ্জল মুখে রুমের ভেতরে ঢুকলেন। পেছনে পেছনে খাবারসমেত ট্রে হাতে এগিয়ে এলো একজন কিশোরী। ভৃত্য হবে বোধহয়! আবিদের আর বের হওয়া হল না। ইশতিয়াক ভ্রু নাচিয়ে রসাত্মক গলায় বলল,
-‘কী হে? কোথায় ছুটলে আবার?’
আবিদের মুখে বুলি জোগাল না। আশ্চর্যজনকভাবে চোখ এবং ডান হাত দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে তাক করল আবিদ। ইশতিয়াক সাহেব তাকালেন সেদিকে। মেয়েটা এখনো অনবরত ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কেঁদে হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে চলেছে। আচমকাই মেয়েকে এমন ব্যত্যয় অবস্থায় দেখে আতঙ্কিত হয়ে ছুটে এলেন তিনি। কপালে, মুখে, চিবুকে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করল,
-‘ কি রে উরবি? তুই এখানে কেন? কখন এলি। শরীর খারাপ? চোখমুখ এমন দেখাচ্ছে কেন?।’
বাবার আহ্লাদীপনায় মেয়ে বেজায় বিরক্ত হয়ে বলল,
– ‘একসঙ্গে এতো প্রশ্ন করলে কোনটার জবাব দিব বাবা?’
ইশতিয়াক সাহেব আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে হাত উঁচিয়ে বললেন,
-‘ওকে ওকে। কুল। একটা একটা করে বল।’
বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিশোরী মেয়েটার উদ্দেশ্য করে বলল,
-‘তুমি হাঁ করে দেখছ কী? টেবিলের উপর খাবার রেখে নিজের কাজে যাও।’ এরপর পুনশ্চ মেয়ের দিকে ফিরলেন, ‘হ্যাঁ বল কেমনে কি হয়েছে।
মেয়ে বাবার উপর শঠ অভিমানী গলায় বলল,
-‘ এসব কী বাবা?’
-‘ কোনসব?’
-‘এইযে, ঐ মেয়েটাকে তুমি করে বলো আর আমাকে তুই করে’
বাবা হেসে মেয়ের গালে টোকা দিয়ে বলল,
-‘বেশি ভালোবাসি বলেই তো তুই করে বলি।’
মেয়ে মুখ গোঁজ করে বলল,
– ‘ভালোবাসা উৎলে পড়ে একেবারে। হু! ‘
বাবা-মেয়ের আহ্লাদিত মাখামাখি কথোপকথন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আবিদ গোগ্রাসে গিলছে আর মিটিমিটি হাসছে। যেন মজার কোনো দৃশ্য সে মনভরে উপভোগ করছে। আদতেই তার জন্য এই দৃশ্য ভীষণ মজার এবং আনন্দের। ছোট থেকেই সে এমন দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছে বহুবার, কিন্তু নিজে সেই দৃশ্যে অভিনয় করার সুযোগ কোনোকালেই মেলেনি। কাজেই এমন সুধাময় দৃশ্যগুলো সে ঈর্ষার চোখে দেখে না। ভালোবাসার রংতুলিতে মনের দেয়ালে আঁচড় কেটে এমন দ্বিধাহীন,ছলনাহীন,অমায়িক স্নেহার্দ্র দৃশ্যগুলো মনের অন্তস্তলে জমিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে। ঈর্ষা জিনিসটা তাকে কখনো স্পর্শ করতে পারেনি। জীবণভর ঈর্ষাগুলোকে ভালোবাসাতে রূপ দিয়ে ব্যতিব্যস্ত ছিল সে। তবুও কেন জানি আবিদের মুখের হাসি মেয়েটার কাছে তাচ্ছিল্যের হাসি মনে হল। বাবার অগোচরেই আবিদকে একবার চোখ রাঙাল সে। আবিদের মুখের হাসি জোলো বাতাসের ঝাপটায় জ্বলন্ত বর্তিকার মতো ধপ করে নিভে গেল। আফসোস। মানুষ হাসির বর্ণ চিহ্নিত করতে পারে না। বলতে শুরু করল মেয়েটা,
-‘ মামির সঙ্গে ঝগড়া করে পুকুরে নেমে গোসল করছিলাম সকালে। অনেক্ষণ সাঁতার কাটছি। মামি পুকুর পাড় থেকে চিল্লাচ্ছিল আর ঢিল ছুড়তেছিল৷ এজন্য আরো বেশিক্ষণ থাকছি পুকুরে। এতোদিন পর গ্রামে আসছি মন খুলে একটু চলাফেরাও করতে পারি না। তারওপর ঐ লোকটা এসে আমার গায়ের ওপর শুয়ে পড়ল৷’
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

ইশতিয়াক সাহেব আদুরে গলায় বললেন,
-‘মামির সঙ্গে এসব করতে নেই মা। আর ছেলেটা হয়তো অন্ধকারে না দেখে করে ফেলেছে। ওর তো দোষ নেই।’
-‘ হুম, কচু মামি। ওনি শুধু আমার তিন বছরের বড়। ছোট মামা কেন বিদেশে পড়ে আছে। মামিকে নিয়ে যেতে পারে না ওখানে?’
-‘ আহ আস্তে বল। তোর মামি শুনলে মন খারাপ করবে।’
-‘করুক’
ইশতিয়াক সাহেব পুনরায় মেয়ের কপালে হাত দিয়ে আঁতকে উঠার ঢংয়ে বললেন,
-‘ আচ্ছা বাদ দে,জ্বরে তো গা পুড়ে যাচ্ছে রে। চল তোর ঘরে গিয়ে রেস্ট নিবি।’
মেয়েটা ঝট করে নিজের কপাল থেকে বাবার হাতটা সরিয়ে দিয়ে দেয়ালে হেলান দিল। হাত ভাঁজ করে গুঁজল বুকের দুইপাশে৷ মুখ কড়কে বলল,
– ‘গুল্লি মারি আমার ঘরের। এটাই আমার ঘর। তুমি জানো না এই ঘরে আমি থাকি মাঝেমধ্যে?’
বাবা মেয়েকে লাই দেয়া গলায় বলল,
– ‘জানি,কিন্তু আজ তো গেস্ট এসেছে মা। অন্যঘরগুলো তেমন গুছানো নেই।’
মেয়েটা আগের স্বরে তুচ্ছজ্ঞান করে বলল,
-‘ ধ্যাত্তেরি গেস্ট!কোত্থেকে কোন লোক একটা ধরে নিয়ে এসে বলতেছ গেস্ট!’

আবিদের বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠল কথাটা শুনে। ধীরে ধীরে সেই চিনচিনে ব্যথাটা অদ্ভুত বিষণ্ণতার কালো মেঘ বয়ে আনল মনের অন্তরিক্ষে। জন্মলগ্ন থেকেই তার আত্মসম্মানবোধ সুবিশাল ভূধরে মতো। তবুও কষ্টটাকে গায়ে মাখল না সে। সাময়িক বিষণ্ণতাটাকে ঠোঁটের কোণের এক টুকরো শ্লেষাত্মক হাসিতে উড়িয়ে দিল। হাসিটা যেন তার বিগত জীবনের সকল দুঃখ কষ্ট সব উহ্য করে রেখেছে। অতিথি পাখির মতোন ক্বচিৎ তা এসে ভর করে আর সে হাসির ফুঁৎকার উড়িয়ে দেয়। অবশ্য, এধরণের কথা তাকে কমবেশি শুনতে হয় বিধায় অনেকটা গা সওয়া হয়ে গেছে। আদতে মন বলে যে কিছু একটা তার মাঝে এখনো বিদ্যমান তা সে বিশ্বাস করতে চায় না। কখনো নিজেকে পাথরে গড়া মূর্তি বলে ভ্রম হয় তার।
হাজার হোক সে মুসাফির। কিম্ভুত মুসাফির। জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়ানো আর যাবতীয় অসংগতির অসাধ্য সাধন করাই তার মূল কাজ। মানুষের মন সে পড়ে ফেলতে পারে নিমিষেই। মেয়েটি যে জ্বরের ঘোরে আগডুম-বাগডুম বকা শুরু করেছে সেটা তার কাছে পরিষ্কার। তথাপি কেন জানি এখানে তার আর মন টিকছে না। অজানা অবিদিত কারণে মনকে শুধু উড়ু-উড়ু করছে৷ মিনিট দুয়েক পর অস্বস্তি কাটিয়ে সে মুখ খুলল। সেই কূট কথাটার ওর আর কোনো কথোপকথন তার কানে আসেনি। কিন্তু এখন আত্মস্থ হয়ে বুঝতে পারল ইশতিয়াক সাহেব দস্তুরমতো রেগে গেছেন মেয়ের ওপর৷
— আংকেল!ইট্স ওকে। আমি চলে যাচ্ছি। আপনি ওনাকে কিছু বলবেন না। ওনি অসুস্থ। আমারই ভুল ছিল। প্লিজ ওনাকে কিছু বলবেন না৷ ইট্স মাই রিকুয়েষ্ট!
বলে আবিদ উত্তরের অপেক্ষামাত্র না করে খাটের কোণ থেকে ব্যাগটা কাঁধে চড়িয়ে ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল৷
ইশতিয়াক সাহেব হতাশাভরে দুইহাত উঁচিয়ে থমথমে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-‘এবার খুশি?’
উরবি অভিভূত হয়ে নিষ্পলক লম্বা লোকটার চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। বাবার কথায় সে একি অবস্থানে অবিচল থেকে মিনমিন করে বলল,
-‘লোকটা চলে গেল কেন?
ইশতিয়াক সাহেব ফোঁস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে বলল,
-‘ তোমার কাণ্ডকীর্তিতে সে থাকবে বলে ভেবেছ? দেখো তো খাবারগুলো পর্যন্ত ছুঁলো না।’
উরবি চটক খেল। বাবা রাগ না করলে সচরাচর তাকে ‘তুমি ‘সম্মোধন করে না। অতএব যে করেই হোক, লোকটাকে ফেরানো আবশ্যক। দিন দুই বাবার মান-ভারি মুখটা দেখার চেয়ে ঐ অসভ্য মিনসেটাকে নিজের ঘরে থাকতে দেওয়া ঢের ভালো। ভাবতে না ভাবতেই আর কালক্ষেপণ না করে একদাপটে রুমের বাইরে গেল সে। বেগার্ত পায়ে দ্রুত বাড়ির পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে, পাক্কা এক মিনিট দৌড়ে, খসখস পাতা মাড়িয়ে,শেয়াল কুকুরের গ্রীবার পানি শুকিয়ে অবশেষে সামনের গেটের সামনে এসে দাঁড়াল সে। মধ্যিখানে একটা পাকা আম কুঁড়ানোর সময়টা ছাড়া অন্যসময়ে যথেষ্ট বেগবান ছিল। সে বেশ জানে এই নিশীথনিবিড় নিরালোকে লোকটা এতো তাড়াতাড়ি বাড়ির গেটের নাগাল পাবে না। হলোও তাই। উরবি আরো কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকার পর লম্বা লোকটা এলো।
-‘এতক্ষণ লাগে আসতে? পিছন থেকে কেউ ডাকে কি না দেখছিলেন তাই না?
আবিদ থতমত খেয়ে গেল এইমাত্র জ্বরের ঘোরে আবোলতাবোল বকা মেয়েটাকে ফটকের সামনে দেখে। বাতাসে উড়ে এলো নাকি মেয়েটা? নাহ্! ভূতপ্রেত কোনোভাবেই হতে পারে না। একটু আগে যা ঘটেছে তাতে ওসব আধ্যাত্মিক বিষয়ের উপর বিশ্বাসের খোলসটা খসে পড়ে চূর্ণ হয়ে গেছে একেবারে।
ফটকের মুখে রঙিন শেডের আলোতে আবিদ লক্ষ্য করল দরদরিয়ে ঘামছে মেয়েটা। মাথার চুলের রুমকূপ হতে নিদাঘ চুইয়ে কপাল হয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। দৌড়ানোর ফলে হৃৎপিণ্ডটা ধকধক করে লাফানোর সত্ত্বেও জোরপূর্বক নির্বিকার দাঁড়িয়ে আছে সে। আবিদ একবার পেছনের ফেলে আসা পথে আরেকবার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বিস্ময় নিয়ে বলল,
-‘আপনি এতো তাড়াতাড়ি এখানে কীভাবে এলেন?’
উরবি হাতের হরিদ্রাভ পাকা আমটা শূন্যে ছুঁড়ে পুনরায় মুষ্টিবদ্ধ করে বেপরোয়াভাবে বলল,
-‘ও,আপনাকে তো বলাই হয়নি যে আমার ডানা আছে। আমি রাতের বেলা পরীদের সঙ্গে খেলি। আকাশে উড়ে বেড়াই।’
আবিদ ক্লান্তভাবে বলল,
– ‘বেশ, এখন রাত হয়েছে। ওদের সাথে খেলুন। আসি।’
বলে পা বাড়াতেই উরবি তিড়িংবিড়িং করে দুই লাফে আবিদের পথ রোধ করল দুই হাত দু’দিকে প্রসারিত করে। ক্যাটক্যাট করে বলল,
– ঘরের মধ্যে একটা গ্যাঞ্জাম পাকিয়ে আপনি চলে যাচ্ছেন?
আবিদ অন্যদিকে ফিরে অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,
-‘হ্যাঁ স্যরি বলেছি তো! পায়ে ধরে মাফ চাইতে হবে বুঝি?’
আশেপাশে দেখতে বাঁধা দেওয়ার নিমিত্তে উরবি ছেলেটার মাথার সাথে তাল মিলিয়ে নিজের মাথাও ঘুরালো। বলল,
-‘নাহ চাইতে হবে না, আপনি এদিকওদিক কী দেখছেন বলুন তো!’
-‘দেখছি… রাতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় কি না কোথাও!
-‘ঠাঁই নাহয় কোথাও একটা হয়ে যাবে। কিন্তু আমার কী হবে বলুন তো!’ করুণ গলায় বলল উরবি।
-‘আপনার আবার কী হল?’
– ‘আপনি চলে এসেছেন বলে বাবা রাগ করেছে আমার সাথে।’
-‘তো আমি কী করব?’
– ‘তো, আপনি এখন যাবেন আমার সঙ্গে।’
– ‘আপনি বাসায় যান,আমি যাব না আর।’
– ‘চলুন না প্লিজ! আসলে আমি স্যরি,জ্বরের ঘোরে প্লাস রাগে উল্টাপাল্টা বকেছি।’
বাবার মান রাখতে উরবি মুখে এই অনুনয়-বিনয় করল ঠিক, কিন্তু মনে মনে এই আগন্তুকের অজ্ঞাত চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে লাগল সে। নিরুপায় আবিদ নেতানো গলায় বলল,
– ‘ঠিক আছে, চলুন।’
অকস্মাৎ মেয়েটির মতির পরিবর্তন আবিদের কাছে মাছের মার পুত্র শোকের মতো মনে হলেও মনের একাংশ ঠিকই বিশ্বাস করে নিল এই ক্ষীণাঙ্গীর মনো-ব্যসন।
———————————-

এখানে কিছুটা পরিচয় পর্ব সেরে নেওয়া যেতে পারে। যদিও গল্পের ভবঘুরের পরিচয় পাঠকসমাজ গল্পে গল্পেই পেয়ে যাবেন। কিন্তু অপরপক্ষের কিছু সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত পাঠকসমাজের না জানলেই নয়! উরবির জন্ম এই গ্রামেই। গ্রাম বলাও ঠিক হবে না অবশ্য। সঠিক গ্রাম বলতে যা বোঝায়, তা এখন বাংলাদেশে খুবই সীমিত। অতীতের সব গ্রামগুলোতে এখন শহুরে আধুনিকতার কলুষিত ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। তারই অবিচ্ছিন্নতায় এই গ্রামেও ঝাপটা দিয়েছে শহুরে ভারী বাতাস। যদিচ, ইশতিয়াক কন্যা উরবির জন্মকালে এই গ্রাম অজপাড়াই ছিল। ইশতিয়াক সাহেব চাকরি করতো সুদূর ঢাকায়। মাসে মাসে দুইদিনের জন্য মেয়ে-বউ কে দেখাও দিয়ে যেতো। উরবির দাদা যখন দাদীর কাছে অগস্ত্য যাত্রা করলেন তখন বাড়িটা একপ্রকার খালি হয়ে গেল। শুধুমাত্র মা-মেয়ের বাড়িটাতে থাকা রীতিমতো কঠিন নয় দুরূহ হয়ে পড়ল। এমন অবস্থায় অগত্যা ইশতিয়াক সাহেব সস্ত্রীক মেয়েকে নিয়ে ইট-পাথর,ধূলিকীর্ণ,কোলাহলের শহর ঢাকায় পাড়ি জমায়। সেসময়ে উরবির বয়স ছিল মাত্র সাত। মেয়ের পড়াশোনা, স্ত্রীর ঘরকন্না আর স্বামীর কর্মব্যস্ততার মাঝে ভালোভাবেই চলল সব। কিন্তু ঠিক পাঁচ বছর পর হঠাৎ ইশতিয়াক সাহেবের স্ত্রী এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। বারো বছর বয়সেই মা হারা হয় উরবি। জীবন নিয়ে তার অতো ধারণা না থাকলেও সে ঠিকই বুঝতে পেরেছিল তার মায়ের শরীরে আর আত্মা প্রত্যাবর্তন করবে না কস্মিনকালেও। এরপর মাতৃহীন মেয়েকে চাকরিজীবী বাবা কোনোমতে আগলে রেখে আজকের চব্বিশ বছরে পদার্পণ করালো এবং মেয়ের ইচ্ছেমতোই পুনরায় গ্রামে ফিরে এলো। এর আগে যদিও দুই ঈদ বাদে গ্রামে আসার সুযোগ মিলতো না। এবার মেয়ের জেদের কাছে হার না মেয়েও উপায়ন্তর ছিল না। সেই থেকে গত ছ মাস ধরে এই ঘিঞ্জি গাছপালায় ঢাকা তেতলা বাড়িতে অবস্থান করছে তারা। ঢাকায় দীর্ঘবাসের সত্ত্বেও উরবির সঙ্গে মামাদের সম্পর্ক ছিল বেশ পাকাপোক্ত। সেই রেশ ধরেই ছোট মামিটাও থাকে এই বাড়িতে। ছোট মামা থাকে বিদেশে। মামির ছেলেপেলে হয় না সুদীর্ঘ আটবছর। বিষম কষ্টের মাঝেও তার মুখে সবসময় হাসিটা লেপটে থাকে অহর্নিশ। মাঝেমধ্যে মামার উপর বিস্তর ক্রোধ ভর করে উরবির। মানুষটা এতোটা নির্দয় কেন কেজানে। ঘরে টুকটুকে লক্ষ্মী বউ রেখে বিদেশে কি এমন কার্য উদ্ধার করে সে ভেবে কূল পায় না। বছর-বছর দেশে না এসে একেবারে দেশে রয়ে গেলেই তো হয়! ভুরি-ভুরি টাকা নিয়ে কবরে তো আর যেতে পারে না! এলোমেলো বিক্ষিপ্ত সব ভাবনা উরবির।

গ্রীষ্মের গুমোট সকাল। জ্বরের উত্তাপ কমে রাতেই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে উরবি। গরমের দিনের এমন স্তব্ধ পরিবেশে জানালার সদ্য রাঙায়িত লোহার শিকের ফাঁক গলে এক কমনীয় শীতল বাতাস নাকেমুখে ঝাপটা দিল উরবির। সঙ্গে সঙ্গে চোখদুটো যন্ত্রের মতো খুলে গেল তার। চোখমুখ রগড়ে, আড়মোড়া ভেঙে ধীরে ধীরে দুর্বল শরীরের জানালার পাশে এসে দাঁড়াল সে। গ্রীষ্মের এই বাতাস যেন নৈস্বর্গিক। আচমকা এসে সমস্ত শরীর-মনে ভালোলাগার পরশ মাখিয়ে যায়। অসুস্থতা তাকে কাবু করতে পারে না কোনোসময়। তার ভেতরর দুরন্ত মনটা সবসময় তার শরীরকে দিকবিদিকে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। বাতাসটা থেমে গেছে। একটু পর হয়তো আবার ছুটে আসবে হুহু করে।
হুট করে তার গতরাতের কথা মনে পড়ে গেল। ঐ লম্বা,সুদর্শন,একইসঙ্গে ভীমদর্শন লোকটার ছবি চোখের তারায় ভাসতেই মনটা অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেল তার। লোকটাকে তার মোটেই পছন্দ হয়নি। কেমন জংগী টাইপ চুল-মুল নিয়ে বসে আছে। কথাবার্তায় অবিনয়ী, কাঠখোট্টা আর ডেম কেয়ার ভাব। যেন এই এলাকার সবাই তাকে ঘরে থাকতে দেওয়ার জন্য ওঁৎ পেতে বসে আছে। সে কি জানে এখানে থাকতে না দিলে রাস্তার পাশে পাগলের মতোন পড়ে থাকত সে! বদখত কোথাকার! মনে মনে অশ্রাব্য সব গালাগালিতে আবিদকে ভাসিয়ে দিল উরবি। অনেক ভেবে বাল্যবন্ধু তথা চাচাতো বোন নিরুকে ফোন করল সে। মেয়েটা প্রতিদিন সকালে তার কাছে পড়া বুঝে নিতে আসে। আজ উরবি অসুস্থ শুনেই হয়তো আসেনি। একা পড়ছে। নিরু সম্পর্কে চাচাতো বোন হয়। নিরুর দাদা আর উরবির দাদা আপন ভাই,এই যা! বয়সে নিরু এক বছরের ছোট। ছোট হলেও দেখতে-শুনতে নিরু যথেষ্ট পরিপুষ্ট। ছোটভাইয়ের পড়াশোনার সুবিধার্থে বাজারের দিকে ভাড়া বাসায় থাকে তারা। দুবার রিং পড়তেই ফোন রিসিভ হল। উরবি ঝাঁজালো গলায় বলল
-‘ তুই তো স্বার্থপর রে নিরু।’
-‘কেন রে কী করলাম আবার?’
-‘ কী করছিস? প্রতিদিন ধেই ধেই করে আমার কাছে পড়তে চলে আসিস। আজকে অসুস্থ বলে আসিসনি,ভালো কথা। একটু খোঁজখবর তো নেয়া যায় বেঁচে আছি কি মরে গেছি!’
-‘ মামিকে ফোন দিছিলাম তুই নাকি ঘুমোচ্ছিস তাই আসিনাই। রাগ করিস কেন?’
-‘ হু জানি। তোমার কত পোড়ে আমার জন্য। আসবি না আর পড়তে। এলাকায় আর স্যার খুঁজে পাস না? ওদের কাছে পড় গিয়ে যা।’
-‘ভালো স্যার নেই বলেই তো তোর কাছে গেলাম।’
-‘হুমম, মুফতে সবকিছু ভালো লাগে সবার৷’
নিরু থমকে গেল। বড় একটা নিশ্বাস ফেলে শীতল অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— ‘ঠিক আছে। মাসে কত করে দিতে হবে তোকে?আমি বাবাকে জানাব।’

উরবির মাথায় বাড়ি পড়ল এতক্ষণ পরে। হিতাহিতজ্ঞান ফিরে পেয়ে জিভ কেটে কপালে হাত ঠেকায় সে। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে একসময় ক্ষীণ স্বরে বলল,
– ‘এই লক্ষ্মীটি রাগ করছিস তুই? আমিতো রেগে বলেছি। দেখ্তো কাল থেকে জ্বরে মরে যাচ্ছি,তুই একটা ফোনও করলি না। আমার রাগ হতেই পারে, না?’
নিরু কোনো কথা বলল না।নিশ্চুপ বোনের কথা শুনতে লাগল। কোনো উত্তর না পেয়ে উরবি পুনরায় দুঃখী গলায় বলল,
– ‘আচ্ছা, তুই এখন চলে আয়। বাড়িতে একটা মিনসে জংলী লোক এসে হাজির হইছে। ওকে খেদাতে হবে এখান থেকে।’
নিরু বোধহয় গম্ভীরতাটা বজায় রাখতে বিন্দুমাত্র কৌতুহল দেখাল না সেই তথাকথিত জংলীটার ব্যাপারে। জানতে চাইল না কিছুই। কেবল নিরুদ্বিগ্ন হয়ে কথঞ্চিৎ “ওকে আসছি” বলে ফোনটা রেখে দিল সে।
উরবি ঠিক বুঝতে পারল নিরু কষ্ট পেয়েছে। এই এক অনিরুদ্ধ সমস্যা তার।দিগজ্ঞান হারিয়ে রেগেমেগে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করে এবং পরবর্তীতে ভুল বুঝতে পেরে নিজেই মাথা খুঁড়ে মরে। নিরু আসতে হদ্দমুদ্দ আধাঘন্টা লাগবে। এই সময়টাতে সে প্রাতঃকৃত্য সেরে নিল খুব তাড়াতাড়ি। বাড়ির পেছনের পুকুরে ডুব দিয়ে গোসল করে এলো। গায়ে গলাল টিশার্ট আর ঢিলেঢালা প্ল্যাজু। সবশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বেশ কেতাদুরস্ত মনে হলো তার। ঠিক সেসময় ছোটপদে বাবা এসে ঘরে ঢুকল। বসল বিছানায়। মেয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে খুঁত বের করার চেষ্টা করতে করতে বলল,
– ‘মেয়েদের ঘরে অনুমতি নিয়ে ঢুকতে হয় জানো না বাবা?’
বাবা পিঠের নিচে বালিশ ঠেকিয়ে আয়েশ করে বসে বলল,
– ‘নাহ, জানি না। তুই দিনদিন ফাজিল হয়ে যাচ্ছিস উরবি।’
– ‘হুমম,মা থাকলে বলতো,মেয়েটাতে তুমিই লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলছো। এবার বুঝো ঠ্যালা।’
– ‘কাজ হবে না। মায়ের কথা মনে করিয়ে আমাকে দুর্বল করা যাবে না,বুঝলি? মনসুরকে কী করেছিস তুই?’
– ‘কোন মনসুর?’ আয়না থেকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল উরবি।’
বাবা জরুরি কিছু মনে করার ঢংয়ে কপালে তর্জনী ঠেকিয়ে বলল,
– ‘ঐযে—গ্রামে তো নামকরা একটাই মনসুর আছে। না চেনার ভং করছিস কেন?’
উরবি ঝুঁকে ছিল বাবার দিকে। উত্তর পেয়ে কপট চেনা গলা বলল,
– ‘ওহহ, ঐ আমাদের ভবিষ্যৎ মেম্বার?’
-‘ হ্যাঁ।’ জোরে নিচের দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে কঠিন দৃষ্টিতে তাকাল বাবা।
সেই দৃষ্টির সম্মুখে উরবি অবহেলাভরে ঘুরে দাঁড়াল। যথেষ্ট পরিপাটি চুলের উপর অকারণে চিরুনি চালন করতে করতে বলল,
– ‘সে আমার কাপড়চোপড় নিয়ে ফটর ফটর করছিল বেশি। আমি কেমন কাপড়চোপড় পড়বো সেটা আমার ব্যাপার সে কেন নাক গলাবে?’
– ‘তো?’
– ‘তো আবার কী?সাইকেল দিয়ে ঠেলে ফেলে দিছি খাদে। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য সফল হয়নি,জানো বাবা! ব্যাটা সেদিন বাজার থেকে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেছিল। এজন্য গ্রামের কেউ দেখতে পারেনাই৷ আরেকবার মিশনে নামতে হবে। এবার খালের পানিতে চোবাব। উরবিরে সে চেনেনাই৷ হু!’
ইশতিয়াক সাহেব চিন্তামগ্ন হয়ে কিছুক্ষণ তব্দা মেরে বসে রইলেন। মেয়েটা দিনকে দিন উৎসন্নে যাচ্ছে। কেউ একটু হেরফের করলেই তাকে ধরে ধরে শায়েস্তা করছে ইদানিং। গ্রামে আসার আগে এমন স্বভাব তার ছিল না। ঢাকা থাকাকালীন সে ছিল ভীষণ সপ্রতিভ এবং মেপে মেপে কথা বলার মানুষ। মেধাবীও কম ছিল না। ক্লাসের টপ পাঁচজনের মধ্যে তার অবস্থান থাকতোই। হঠাৎ মাথার ওপর কোন্ ভূত চেপেছে সে খবর অন্তর্যামী ভিন্ন কে জানে? অনার্স শেষ করে পড়াশোনার প্রতিও তার অনীহা জন্মে গেল। ইচ্ছে হলো, অনেক হয়েছে এবার সে গ্রামে চলে যাবে। যুক্তিসিদ্ধ কোনো কারণ দেখাতে না পারলেও বাবাও তাই শুনতে বাধ্য হয়েছিল। তার একটাই কথা,ঢাকায় তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।

ইশতিয়াক সাহেব চলে যাওয়ার পরপরই মুখ ভার করে ঘরে নিরু প্রবেশ করল। বিছানার ওপর হাতব্যাগটা রেখে ধীরে ধীরে বসল সে। গম্ভীরমুখে জিজ্ঞেস করল,
– ‘বল,কেন ডাকছিস?’
উরবি তার পাশে বসল। বলল,
– ‘মুখটা এমন বাংলা পাঁচের মতো করে রাখলে মুখ দিয়ে কথা বেরুবে আমার?’
নিরু স্মিতহাস্যে বলল,
– ‘আচ্ছা বল, কই তোর জংলী মিনসেটা?কোন্ জঙ্গল থেকে ধরে এনেছিস?’
-‘ এইতো গুড,এভাবে হাসবি। সে আছে পাশের ফ্ল্যাটে। চল দু’জন মিলে তাকে শায়েস্তা করে খেদাবো এখান থেকে।’
বলে নিরুর হাতটা ধরে একপ্রকার বাত্যার বেগে টেনে রুমের বাইরে নিয়ে গেল উরবি। এবার বোধহয় আর বেচারা মুসাফিরের নিস্তার নেই!

চলবে…

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share