প্রতিশোধ

0
41

রাজু,বাপ আমার,মায়ের এই কথাটা রাখ্ বাবা। আজ তোর আঠারো বছর বয়স হল, কি শুভ একটা দিন,কত বছর ধরে এই দিনের অপেক্ষা করে অাছি, অাজ থেকে সব ভয় ঝেড়ে ফেলে তুই রক্ত দেওয়া আরম্ভ কর।
একবার দিয়ে দেখ্, এত শান্তি লাগবে যে নিজেই চার মাস পরপর দৌড়াবি রক্ত দিতে।”

রাজুর বিরক্তির সীমা থাকে না। কিছু বিষয় নিয়ে মায়ের জোরাজুরি রাজুর একদম পছন্দ না। যেমন এই ব্লাড ডোনেশন। ভয়ে এখন মামা-খালা-চাচা-ফুপু-কাজিনদের অনেকে মায়ের সামনে পড়তে চায় না। রাজু-শুভর বন্ধু-বান্ধব, এমনকি বাসার স্যাররাও। দু’একটা মামুলী কথার পরেই ভাঙা রেকর্ড বাজতে শুরু করবে_রক্ত দেওয়ার ফজিলত, রক্ত কেন দেওয়া উচিৎ, না দেওয়াটা কত অন্যায় ইত্যাদি। উপসংহারটা ভয়ংকর,”তাহলে তোমার নামটা
আমার লিষ্টে তুলে ফেলি? দরকার পড়লে ডাকবো,
তখন না করতে পারবে না।ভয় পেলে বলবে,আমি পাশে থাকবো।”

কারোর রক্ত লাগবে এমন সংবাদ পেলেই মায়ের তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। লিষ্ট ধরে ফোন করা আর কাকুতি-মিনতি। মা বেশির ভাগ সময় নেগেটিভ উত্তর ই
শোনে_

– আজ সম্ভব না, অফিস থেকে বের হতে দেবেনা, আগামীকাল তো আরও সম্ভব না। ইস্, গতকাল হলে দিতে পারতাম।

– আমার খুব জ্বর।

-আজ বাড়িতে অনেক ঝামেলা।

-কাল একটা কঠিন পরীক্ষা আছে।

মা ফোন করে,কাকুতি-মিনতি করে, তারপর ফ্যাকাশে মুখে ফোনটা রেখে দেয়। বারবার একই ঘটনা। রাজুর এমন রাগ হয়!মায়ের কি আত্মসম্মান বোধ বলে কিছু নেই? সারা দুনিয়ার লোকের রক্ত যোগাড়ের দায় কি মায়ের একার?

গত ছয় বছর ধরে রাজু একই কথা শুনে আসছে,”আমার রাজু ওর আঠারোতম জন্মদিন থেকে ব্লাড দেওয়া শুরু করবে,ইনশাআল্লাহ।”

আজ সেই আঠারোতম জন্মদিন।

“চল্ বাপ, গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে চারজন অনেকখানি পুড়ে গেছে। মেলা রক্ত দরকার।”

“মেলা রক্তের জন্য মেলা মানুষ আছে,মা।”
“তাদের মধ্যে তুইওতো একজন,বাপ। সবাই যদি বলিস, আমি কেন,আরেকজনতো আছে, তাহলে ব্লাড যোগাড় হবে কি করে? প্রেগন্যান্ট মহিলা, ক্যান্সারের রুগী, অপারেশন,অ্যাক্সিডেন্ট,থ্যালাসেমিয়া,আরো কত শত কারণে প্রতিদিন কি পরিমাণ রক্ত দরকার হয় জানিস? রক্তের অভাবে প্রতিদিন কত মানুষ মরে তার হিসাব আছে?”

রাজু তার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। যার রোগী, মাথা ব্যথাটা তার। সে যেখান থেকে পারে, রক্ত যোগাড় করে আনুক।

“এক ফোঁটা ব্যথা পাবি না, লক্ষী বাপ আমার। আমার কত স্বপ্ন,তুই আর শুভ নিয়ম করে রক্ত দিবি, বিপদে-আপদে মানুষের পাশে দাঁড়াবি,আপন-পর বিচার করবি না। চল্ বাবা,চল্।”

বাহ্! কি চমৎকার স্বপ্ন।

বাবা রাজনের পক্ষ নেয়।

“ও দিতে চাচ্ছে না, তুমি এত প্রেসার দিচ্ছ কেন?”
“আমি মা, কথা না শুনলে আমি প্রেসার দিতেই পারি।”
“না,পারো না। রক্ত দেওয়া না দেওয়া ব্যক্তির একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। জোরাজুরির ব্যাপার না।”

“ব্লাড ডোনেশন ব্যক্তিগত বিষয় না, এটা সামাজিক দায়বদ্ধতা। রক্তের অভাবে মানুষ মরবে আর সুস্থ মানুষগুলো সামান্য একটু ব্যথার ভয়ে অথবা আলসেমির জন্য রক্ত দিতে যাবে না,তা হয়না। আমার ছেলেদের আমি স্বার্থপর হতে দিব না কিছুতেই।”

মা সারাদিন সুপার গ্লুর মতো সেঁটে রইলো আর বারবার অনুরোধ করতে লাগল। রাজু কোন ভাবে রাজী হলনা। একেতো সূঁচের ভয়, তার উপরে মায়ের সব ব্যাপারে বেশি বেশি জ্ঞানদান, গায়ে পড়ে অন্যের উপকার… এগুলো কে ছোট বেলা থেকেই বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে রাজনের। বাসায় কাজ করতে আসা মেয়েগুলোকে মা তো পড়াতোই, আবার রাজু আর শুভকেও বলতো দিনে অন্ততঃ আধা ঘণ্টা করে ওদের পড়াতে। রাজুর মাঝে মধ্যে মনে হয়,মায়ের মধ্যে একটা লোক দেখানো টেন্ডেন্সি আছে,আবার মনে হয়,মা নিজেকে এক্সেপশনাল মনে করে, সাধারণ মানুষ থেকে উঁচু লেভেলের,”দেখো,আমি কত বড় একজন সমাজ সেবিকা।” আর এগুলো চিন্তা করে কেমন যেন একটু বিতৃষ্ণাও আসে মাঝে মাঝে মায়ের উপরে।

ছেলের জন্মদিন উপলক্ষে বাবা বরাবরের মতো চাইনিজে গেট টুগেদার করে, অনেক আত্মীয়-স্বজন, রাজু-শুভর বন্ধুরা আসে। এবারের জন্ম দিনে আরও জৌলুস। আঠারোতম জন্মদিন।

ঐ রাতে মা’কে জীবনে প্রথম কাঁদতে দেখে রাজু। নির্জন অন্ধকার বসার ঘরে, নিঃশব্দে। রাজু একটা কাজে হঠাৎ ড্রইংরুমে এসে লাইট জ্বালিয়ে এই দৃশ্য দেখে ফেলে। ওর মায়া হয়না, বরং বিরক্তি লাগে সামান্য কারণে কান্নার ফোয়ারা দেখে। অাজ জন্মদিনের প্রোগ্রামে মা খুব চুপচাপ ছিল।

কয়েক মাস পর। ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা শেষ। বুয়েটের জন্য কোচিং শুরু। ক্লাস শেষে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে রাজু আড্ডা দিচ্ছিল। এই সময়ে নিজেদের গাড়িটাকে গলিতে ঢুকতে দেখলো রাজু।

ডিজগাস্টিং। এই বয়সে রাজু কিছুতেই গাড়িতে চড়ে
কোচিং বা বন্ধুদের বাড়ি আসা-যাওয়া করতে পারবে না। হয় হেঁটে নইলে বাসে। নন্দদুলাল উপাধি পাওয়ার ইচ্ছা নেই তার। কিন্তু মা মাঝেমধ্যেই গাড়ি পাঠিয়ে দেয়, নিষেধ শোনে না।

বন্ধুরা সবে গাড়ি দেখে হাসতে শুরু করেছে, নামলেন ছোট চাচা আর চাচী। কি ব্যাপার?

চাচী এসে রাজনের হাত ধরলেন,”ভাল আছিস বেটা?”

“কি হয়েছে চাচী?”

চাচা বলেন,”তেমন কিছু না। তোর মা সামান্য অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। খুবই মাইনর। ”

“আমার মা কোথায়?চাচী,আমার মা কোথায়?”
“ছি,ছি,তুই এমন বাচ্চাদের মতো করছিস কেন?বললাম তো, মাইনর অ্যাক্সিডেন্ট। গাড়ি তে ওঠ্।
বাবারা,তোমাদের কারো ব্লাড গ্রুপ কি এবি নেগেটিভ?”

উদ্বিগ্ন বন্ধুরা মাথা নাড়ায়। রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে আজ আন্টিকে তারা নিশ্চয়ই রক্ত দিত।

মাইনর অ্যাক্সিডেন্টে ব্লাড লাগবে? রাজন দুই হাতে মুখ ঢাকে।

হাসপাতালে এত আত্মীয়-বন্ধু-পরিচিত। তারপরও রাজুর মনে হচ্ছে কোথাও কেউ নেই। বাবা উদভ্রান্তের মতো আচরণ করছেন। শুভ বাচ্চাদের মতো চিৎকার করে কাঁদছে। মামা-চাচারা ছুটাছুটি করছেন। কম করে হলেও এই মুহূর্তে পনেরো ব্যাগ ব্লাড লাগবে। পেশেন্টের কন্ডিশন খুব খারাপ। বাস একেবারে থেঁতলে দিয়েছে যাত্রী আর রিক্সাওয়ালাকে।

নিজেদের মধ্যে কারোর এই গ্রুপের রক্ত নেই। সন্ধানী, কোয়ান্টাম,বাঁধন সব জায়গায় বারবার খোঁজ নেয়া হচ্ছে, এক ব্যাগ রক্ত মোটে পাওয়া গেছে।

শুভ চিৎকার করে ওঠে,”মা যে এত মানুষকে রক্ত দিয়েছে,তারা এখন কোথায়?”
খালা কাঁদতে কাঁদতে বলল,”তোদের মা কি সুস্থ মানুষ কে ব্লাড দিত? আগুনে পোড়া রুগী, কিডনি ডায়ালাইসিসের রুগী, থ্যালাসেমিয়ার রুগী এদের দিত। এদের কি সাধ্য আছে তোর মা’কে রক্ত দেয়ার?সাধ্য থাকলে ঠিক ওরা ছুটে আসতো।”

“পেশেন্টের অবস্থা খুব খারাপ। প্লিজ, তাড়াতাড়ি ব্লাড ম্যানেজ করুন।”

“স্যার,আমার মা’কে একটু দেখব।”
“এখন না বাবা।”

ছোট মামা এক লোককে ধরে এনেছে। দূর সম্পর্কের
আত্মীয়। একই ব্লাড গ্রুপ। লোকটা কিছুতেই দেবেনা। রাজুর ইচ্ছা হল ঘুঁষি মেরে লোকটার মুখের মানচিত্র পাল্টে দিতে। ভীতুর ডিম।

লোকটার ব্লাড নেওয়া গেল না। হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আছে,হিমোগ্লোবিনও কম।

রাজু ডুকরে উঠলো,”পৃথিবীতে এত মানুষ, আর আমার মায়ের জন্য কোথাও একবিন্দু রক্ত নেই।”

আরও দুই ব্যাগ ম্যানেজ হল। কিন্তু এখনও অনেক ব্যাগ দরকার। একেতো খুব রেয়ার গ্রুপ, আর যেসব
ডোনারদের সন্ধান পাওয়া গেল,তাদের কেউ নাকি বিদেশে, কারো নাকি খুব রক্তশূন্যতা, কেউ গর্ভবতী।

মা অনেক আগেই শকে চলে গেছে। রাজুর মায়ের অশ্রুভেজা চোখের কথা মনে পড়ল, মায়ের আশাভঙ্গের কথা মনে পড়ল, কারোর বিপদে মায়ের পাগলের মত ছোটাছুটি মনে পড়ল।

রাজুর মনে হল, তার মা খুব বুদ্ধিমত্তা আর বিচক্ষণতার সাথে তাদের সবার উপরে প্রতিশোধ
নিয়েছে। এর চেয়ে বড় শাস্তি হতে পারে না সন্তানের জীবনে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here