পরী পর্ব ৭..

0
496

পরী পর্ব ৭..

গভীর রাতে হঠাৎ এক ভ্যাঁপসা গরমে আমার ঘুম ভেঙে যায়। চারপাশে অসহনীয় গরম। ছটফট করতে করতে গিয়ে জানালা খুলে দিই। আমার রুমের জানালার ওপারে ধারেকাছে কোনো গাছই নেই। কোনো বাতাসই আসছে না। গরমের অত্যাচারে লাইট অন করে বসে রইলাম। রুমে এই মুহূর্তে চারিদিকে কেমন এক ধরনের সুগন্ধ ছড়িয়ে আছে। উপরের হাতপাখার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললাম, ‘ইশ! ওইদিনের ন্যায় এখনও যদি হাতপাখাগুলো এখানে বাতাস করত?’
আমাকে অবাক করিয়ে দিয়ে একটু পর থেকে তুমুল বাতাস বইতে শুরু করল। এতক্ষণের গরম ভাব নিমিষেই উধাও হয়ে গেছে। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ওই হাতপাখাগুলোই বাতাস করছে। অদ্ভুত! গরম লাগলে ওইগুলো স্বয়ংক্রিয় কী করে হয়? এর পেছনে কোনো একটি রহস্য তো আছেই। যাইহোক, এখন আরামে ঘুমানো যাবে। ভাবান্তে লাইট অফ করে শুয়ে পড়লাম। চোখ বন্ধ করার পর বোধ হলো, আমার পাশে কে যেন শ্বাস নিচ্ছে। আমি কান খাঁড়া করে রাখলাম। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, হ্যাঁ, এটা কারো নিশ্বাস ফেলার মতো মৃদু আওয়াজ। আমার শরীরে মৃদুভাবে কম্পন শুরু হলো। কারণ একটু আগেও রুমে আমি ব্যতীত অন্য কেউ ছিল না। আত্মার কথা ভেবে গা ছমছম করতে লাগল। নিজেকে বাঁচাতে আমি ঘুমানোর ভান করে রইলাম। একটু পর কেন যেন মনে হলো, আমার কপালে কে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় আমি ভয়ে কাতর স্বরে বলে উঠলাম, ‘কে এখানে?’ ধড়মড় করে উঠে বসলাম। লাইট জ্বালিয়ে দেওয়ার পর কাউকেই দেখলাম না। অদ্ভুত ব্যাপার! আমি স্পষ্ট মনে করতে পারছি, কারো নিশ্বাস ফেলার মতো আওয়াজ পেয়েছিলাম। আর একটু আগে আমার কপালে কারো হাত বুলানো অনুভব করলাম। এসব হচ্ছেটা কী? না, এসব আমার ভ্রম হতে পারে না। তবে এই রুমে কি ওই আত্মাটি আছে? যদি থাকে, তবে আমার কোনো ক্ষতি করছে না কেন?
অদৃশ্য শক্তির নিকট প্রশ্ন করলাম, ‘কে আপনি? সামনে আসছেন না কেন? আমার ভাইয়াকে তো মারার চেষ্টা করেছিলেন। আমার কেন কিছু করছেন না?’ একাধারে বলে নিশ্বাস ফেললাম।
কোনো সাড়াশব্দ নেই। হঠাৎ ভাইয়ার কথা মনে পড়ল, অন্য রুমে শুয়েছে। আমার মতো অবস্থা ওর হচ্ছে না তো? অথবা গতবারের মতো কিছু হচ্ছে না তো? ভাবতে ভাবতে দৌড়ে ভাইয়ার রুমে গেলাম। না, ভাইয়া দিব্যি ভালোভাবে ঘুমাচ্ছে। ওর রুমে কোনো গরম বাতাস নেই এবং সেই সুগন্ধটাও নেই। তবে শুধু আমার রুমেই কেন?
ভাইয়ার রুমের দরজা বন্ধ করে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। একনজর নিচের হলের দিকে দৃষ্টিপাত করি। এখানের দ্বিতীয় তলা থেকে ওই তালাবন্ধ রুমটি দেখা যাচ্ছে। আমি অবিরাম ওইদিকে তাকিয়ে রইলাম। ভাবতে লাগলাম, ওই রুমটির রহস্য কী? এই বাড়িটিরই বা রহস্য কী? এখানে একটি আত্মা থাকার সত্ত্বেও আমরা এতদিন কীভাবে বেঁচে আছি?
মনের ভেতর এভাবে প্রশ্ন করতে করতে রুমে চলে এলাম। বসে এক গ্লাস পানি খেয়ে আবার চিন্তায় ডুবে পড়লাম। এমন সময় কে যেন ঘন কণ্ঠে বলে উঠল, ‘আবির, ঘুমিয়ে পড়ো। আমি তোমাদের কিছুই করব না। বিশ্বাস করো।’
সাথে সাথে চারিদিকে তাকাতে লাগলাম। কিন্তু কিছুই দেখছি না। আওয়াজটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেছে। এবং গলার সেই স্বর আমার খুব পরিচিত লেগেছে। আমি কি নিজেরই গলার স্বর শুনেছি? এবার আমি কিছু বললাম না। এটিই হয়তো সেই আত্মা, যে ভাইয়াকে মারতে চেয়েছিল। কিন্তু এখন এরূপ কথা কেন বলেছে? আর আমাকে চিনলই বা কীভাবে? এটি একটি ছেলের কণ্ঠ। হোক না হোক, এই বাড়ির সাথে আত্মাটির কোনো সম্পর্ক আছে। আমার জানতেই হবে এর পেছনের রহস্য। ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা বেঁধে এলো। ঘুমে তলিয়ে পড়লাম। সকাল হতেই মনে হলো, কে যেন আমাকে বিছানা থেকে টানছে।
‘কে? কই, কই? কী হয়েছে?’ বলে ধড়মড় করে উঠে বসলাম। পাশে দেখি ভাইয়া বসে আছে আমার হাত ধরে। আমাকে হাঁপাতে দেখে সে বলল, ‘কী হলো? এটা আমি। এতো চিৎকার করছিস কেন? খারাপ স্বপ্ন দেখেছিস নাকি?’
‘ইয়ে মানে হ্যাঁ,’ ইতস্ততভাবে বললাম, ‘ওরকমই কিছু।’
‘দেখ ঘড়িতে কয়টা বাজে। বের হবি না?’
ভাইয়ার কথায় ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম এগারোটা বেজেছে। ‘একি! আমি এতক্ষণ ঘুমিয়েছি?’, বিড়বিড় করে বললাম, ‘রাতে যা ঘটেছিল না -এতো দেরি তো হওয়ারই কথা!’
‘আবির, কিছু বলেছিস?’
‘না- না তো। তুই বাইরে যা। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’
‘তাড়াতাড়ি আয়। আর হ্যাঁ, “তোমার” সাবিলাও এসেছে।’ চোখ টিপল সে। শয়তানী হাসি হাসতে হাসতে চলে গেল।
ওহ্, এখন থেকে শুরু হয়েছে সাবিলাকে নিয়ে আমার সাথে ওর মজা করা, যেমনটা ওর সাথে নাদিয়া ভাবীকে নিয়ে করেছিলাম। মনে পড়ে যাচ্ছে সেই দিনগুলোর কথা। নাদিয়ার সাথে কলেজ চলাকালীন সময়ে দেখা হয়েছিল। আমাদের বন্ধুত্ব হতে বেশি দেরি লাগেনি। ওকে আমি বোনের মতো করে ভালোবাসতাম। নাদিয়াও উল্টো আমাকে ভাই-ভাই করত। একদিন ওর সাথে ভাইয়ার দেখা হয়। এরপর নাদিয়ার মনে ভাইয়াকে নিয়ে পছন্দের ব্যাপারে ওর ভঙ্গিমা বুঝে ওদের সেটিং করিয়ে দিয়েছিলাম। নাদিয়াকে নিয়ে ভাইয়ার সাথে কত মজাই না করতাম, যেমনটা ও এখন আমার সাথে করছে। পুরনো এসব কথা ভাবতে ভাবতে ফ্রেশ হয়ে বাইরে এলাম। ইতঃপূর্বে সাবিলাও এসেছে, সোফায় বসে আছে। ওকে দেখে মনের ভেতর আবারও সেই ঠান্ডা হাওয়া বইতে শুরু করল। আমি নিচে গিয়ে নাস্তা করে ওদের সাথে সোফায় বসলাম।
‘আবির,’ সাবিলা বলে উঠল, ‘এতক্ষণ কেন ঘুমাচ্ছিলে? মনে নেই আমাদের আজ বাইরে যাওয়ার কথা ছিল?’
‘কালরাত..’, কথাটা শুরু করার আগেই হঠাৎ খেয়াল করলাম, সাবিলা যে সোফায় বসেছে, ওখানে ওর একটু পাশে ভাঁজ হয়ে নিচু হয়ে আছে। কেউ বসলে সোফায় যেমন ভাঁজ পড়ে ঠিক তেমনই ভাঁজ পড়েছে। আর সেই কালরাতের পরিচিত গন্ধটা আশেপাশে ভোঁ ভোঁ করছে। হোক না হোক, আত্মাটি এসে বসেছে।
‘হ্যাঁ, কালরাত? তারপর কী হয়েছে?’
‘মানে.. কালরাত অনেক গরম লেগেছিল। ঘুমাতে দেরি হয়েছিল বিধায় সকালে ঘুম থেকে দেরিতে উঠেছি।’ কথাটা আপাতত কারো কাছেই প্রকাশ করা যাবে না।
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

‘হু’
‘আন্টি কি তোমাকে আমাদের সাথে যেতে অনুমতি দিয়েছেন?’
‘হ্যাঁ। এই প্রথমবারের মতো কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি। তাঁর কোনো আপত্তি হয়নি। মা তোমাদের বিশ্বাস করে বলে সঙ্কোচ না করেই হ্যাঁ করে দিয়েছেন।’
আমার সন্দেহ সঠিকই ছিল। তিনি টাকার জন্য নিজের মেয়েকে ছেড়ে দিতে পারলে সাবিলাকে কেন নয়? বললাম, ‘প্যাকিং করে এসেছ তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘আবির,’ ভাইয়া এসে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বলল, ‘গল্পগুজব এখন বাদ দে। আমরা রেডি আছি। তুই রেডি হয়ে আয়।’
সায় দিয়ে রুমের দিকে যেতে উদ্যত হই। পেছনে একবার তাকিয়ে দেখি, সোফায় সাবিলার পাশে এখন কোনো ভাঁজ নেই। এখন জায়গাটি সমান হয়ে আছে। তা দেখে একটু মুচকি হাসি হাসলাম। কারণ আমি এখন ওই আত্মার চালচলন সবই বুঝতে পারছি। সে যেখানে যায়, তার কাছ থেকে একটা সুগন্ধ বেরুয়। মাঝে মাঝে ও আশেপাশে থাকলে এক গরম ভ্যাঁপসা বাতাস বয়ে যায়।
আমি রেডি হওয়ার পর সবাই সবকিছু গুছিয়ে একত্র হই। ভাইয়া সজীবকে ফোন দিয়েছে। কারণ তাকে ভাইয়া আমাদের সাথে যাওয়ার কথা পেড়ে দেখেছে। এবং সে রাজি হয়ে গিয়েছে।
আমরা তাড়াহুড়ো করে বাড়ি থেকে বেরুলাম। ভাইয়া মূল দরজা বাঁধছে। সাবিলার দিকে নজর পড়ার পর দেখলাম, সে একনজরে ঘরের ভেতরের দিকে চেয়ে আছে। বাড়িটির প্রতি সাবিলার এতো টান কেন তা আমার আজও বুঝা হয়ে উঠল না। ভাইয়ার দরজা বাঁধা শেষ হলে আমরা রওনা দিলাম।
হাইওয়েতে যাওয়ার পর সজীবের সাথে করে আমরা গ্রামের উদ্দেশ্যে বাসে উঠে পড়ি। পাশের দোকান থেকে কয়েক প্যাকেট চিপস, চানাচুর আর বাদাম কিনে নিই অনেক দূরের পথ হওয়ায়। লাস্টের সিটে আমি আর সাবিলা বসি। ভাইয়া এবং সজীব আমাদের সামনের সিটে বসেছে। বাস ছেড়ে দিলে কিছুদূর যাওয়ার পর সজীব বলে উঠল, ‘আমি আমার গ্রাম পর্যন্ত আপনাদের নিয়ে যেতে পারব। কিন্তু আমি আমার বাড়িতে যেতে চাই না। প্রতিষ্টিত হয়েই পরিবারকে আমার মুখ দেখাতে চাই। গ্রামের শুরুতে আমার এক বন্ধুর বাসা আছে। ওকে বললে হয়তো আমাকে থাকতে দেবে। ওখানে একটি হোটেল আছে। তাতে আপনাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবো। আমি যে ভুলগুলো করেছি ওইগুলো শোধরানোর জন্যই আপনাদের সাথে যাচ্ছি। যদি আপনারা খালেককে পেয়ে যান, তবে তার মাধ্যমে খুনিকেও পেয়ে যাবেন।’
আমরা মনোযোগী শ্রোতার ন্যায় সজীবের কথাগুলো শুনে রইলাম। ছেলেটি যতটা ভালো, তার নিয়তও ততটাই ভালো।
‘তুমি একটা ভালো ছেলে।’ ভাইয়া বলল, ‘আমি তোমার সাহায্য করার যথার্থ চেষ্টা করব। আমাদের কেস সলভ হওয়ার পর তুমি আমাদের সাথে শহরে গেলে আমি তোমাকে ভালো একটি কলেজে এডমিট করিয়ে দেব। অনেক বড় বড় লোকের সাথে আমার পরিচিতি আছে।’
‘সত্যি?’, সজীব উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘স্যার, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আমি অপেক্ষা করব সে সময়ের।’
সাবিলা একদৃষ্টিতে জানালার বাইরের দিকে চেয়ে আছে। আমি ওর হাতে একটা চিপসের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললাম, ‘মন খারাপ?’
‘না, এই সময়টাকে উপভোগ করছি। আজ বছর কতক পর এভাবে ভ্রমণ করছি।’
‘তুমি জানো, ভ্রমণ আমারও অনেক প্রিয়। আমি এই একমাত্র ভ্রমণের কারণে আজও বিয়ে করিনি।’
‘তাই নাকি?’ সাবিলা হাসে। অনেক সুন্দর সেই হাসি।
‘আবির,’ সামনের দিক থেকে ভাইয়া বলল, ‘চিন্তা করিস না। তোকে সাবিলার মতোই একটি মেয়ের সাথে বিয়ে করিয়ে দেব, যে কিনা ভ্রমণ পছন্দ করে।’ হাসিতে ফেঁটে পড়ল বাকিরা।
আমি ওকে ভাল-মন্দ কিছুই বলার জন্য অগ্রসর হতে পারলাম না। এখান থেকে কথার ছলে আড্ডায় চলে গেলাম। ইতোমধ্যে সজীবকেও আমরা বন্ধু করে নিই।
অনেক মজা শেষে দুপুর দুইটায় বাসটি একটি নির্জন জায়গায় এসে থামে। পাশে একটি বড়সড় দোকান আছে। সব যাত্রীর সাথে আমরাও নামলাম। গিয়ে খাবার সেরে বাসে উঠে পড়ি। বাস আবার ছেড়ে দেয়। কালরাত পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চোখ খুললে আমি নিজেকে সাবিলার কাঁধে আবিষ্কার করলাম। কবে যে সাবিলার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লাম বুঝতেই পারিনি। সে আমার দিকেই চেয়ে আছে। অগত্যা নজর লুকালাম। এরপর আমাদের মাঝে আর কথা হয়নি।
বিকেলে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছালাম। গ্রামের পরিবেশ নিতান্তই নির্জীব। শুরুতেই সজীবের নির্দেশনায় হোটেলটিতে যাই। সেটি বাহির থেকে বন্ধ।
সজীব বলল, ‘দুঃখিত, আমি জানতাম না হোটেলটা বন্ধ হয়ে আছে। আজ কয়েকটি বছর পর গ্রামে এসেছি। এখন তোমাদের কোথায় বা নিয়ে যাব? সবাই চল, আমার বন্ধুর বাসায় যাই। এখান থেকে সামান্য দূরেই। এরপর উপায় বের করি।’
সজীবের নির্দেশনায় ওখানে পৌঁছলাম। তার বন্ধু কুঁড়েঘরে থাকে। বাড়ির পেছনে বড় একটি পুকুর। ওখানে এক রূপবতী মেয়ে ঘাটের শেওলাপড়া সিড়িতে দাঁড়িয়ে পানিতে পা ধুচ্ছে।
সজীবের বন্ধুর সাথে পরিচিত হওয়ার পর সে আমাদের ভেতরে ঢুকে বসতে বলল। সাবিলা আমার কাঁধের ব্যাগটা নিয়ে ভাইয়ার সাথে ভেতরে ঢুকে। আমি ঢোকার সময় খেয়াল করলাম, পুকুর ঘাটের মেয়েটি সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে পিছলা খেয়ে পানিতে পড়ে গেছে। পানিতে পড়ে সে হাবুডুবু খাচ্ছে। বোধ হয় সাঁতার জানে না। আমার যাওয়া উচিত ভেবে দৌড়ে পুকুরের পাড়ে গিয়ে পানিতে লাফ দিই। মেয়েটিকে অনেক কষ্টে পাড়ে তুলে আনলাম। এই ধরনের বাজে অভিজ্ঞতা জীবনে আরেকটিও হয়নি।
পাড়ে এসে মেয়েটি কিছুক্ষণ কেঁসে নিয়ে বলল, ‘আজকে আপনি যদি না থাকতেন, তবে আমি হয়তো বাঁচতামই না। ধন্যবাদ আমাকে বাঁচানোর জন্য।’
‘ধন্যবাদ বলে আমাকে ছোট করবেন না। আমি কেবল আমার নৈতিক দায়িত্ব আদায় করলাম।’
মেয়েই কেন? কোনো ছেলে হতে পারত। কথার মাঝে একজন বৃদ্ধলোক আমাদের দিকে তেড়ে এলেন।
‘মামনি,’ মেয়েটিকে উদ্দেশ্য করে বৃদ্ধ বললেন, ‘আপনি এইখানে কী করতেছেন? ওইদিকে সাজান বাবু আপনারে কখন থিক্যা খুঁজতেছে। আরে এ কী মামনি? আপনি ভিজ্যা গেছেন কেমন করি?’
‘কী বলব কাকা?’, মেয়েটি বলল, ‘পুকুর ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে পিছলা খেয়েছি।’ আমার দিকে ইশারা করে বলল, ‘তিনি যদি না থাকতেন, তাহলে আমি ডুবেই যেতাম।’ আমাকে বলল সে, ‘আপনাকে এই গ্রামে নতুন মনে হচ্ছে। আমার সাথে বাসায় চলুন না।’
‘না থাক, এখানে আমি আমার বন্ধুদের সাথে এসেছি। ওদের সাথেই থাকব। আপনি বরং বাসায় চলে যান। এভাবে ভেজা কাপড় নিয়ে কতক্ষণই বা থাকবেন!’ আমিও বা কতক্ষণ থাকব?
‘তবু আপনি আমাকে বাঁচিয়েছেন। আজ আমাদের বাসায় রাতে আপনার দাওয়াত রইল। সাথে করে আপনার বন্ধুদেরও নিয়ে এলে খুশি হব। কাকাকে আমি পাঠাব আপনাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য। প্লিজ এটায় অমত দেবেন না।’
‘ঠিক আছে। যাব।’
মেয়েটি চলে গেল। আমি সজীবের বন্ধুর বাসায় ফিরে এসে কাপড় পাল্টে সবাইকে সবকিছু খুলে বলি। রাত হলে মেয়েটির কাকা আমাদের নিতে আসেন। আমরা সকলেই তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম। তিনি আমাদের মেয়েটির বাড়িতে নিয়ে গেলেন। বাড়িটি খুব বড়। কাকার কাছে শুনলাম, মেয়েটির বাবাই এই গ্রামের মাতব্বর ব্যক্তি। তাঁর কেবল একটি মেয়েই আছে। এবং এই মেয়েটির সব মনোকামনাই পূরণ করেন। তাদের ধনসম্পদ তো থাকারই কথা!
আমরা ভেতরে যাওয়ার পর দেখলাম আমাদের জন্য খাবারের বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। চারিদিকে দেখতে দেখতে একটু পর ধবধবে সাদা এক বৃদ্ধলোক আমাদের স্বাগতম জানাতে এলেন। তিনিই সাজান। তিনি আমাদের পরিতৃপ্ত করে খাবার খাওয়ালেন। খাওয়ার পর্ব শেষে সাজান সাহেব মেয়েটিকে নিয়ে এলেন এবং ধন্যবাদ জানাতে লাগলেন।
‘আব্বা,’ মেয়েটি তাঁকে বলল, ‘তাঁরা এই গ্রামে নতুন।’
‘আর আমরা থাকার মতো জায়গা পাচ্ছি না।’, হুট করেই সজীব বলে উঠল।
আমরা সবাই ওর দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে ওকে চুপ করালাম।
‘এইটাও কোনো কথা হলো?’, সাজান সাহেব বললেন, ‘বাবাজান, আপনেরা এইখানে যতদিন মন চায় থাইকতে পারেন।’
আমরা আর অজুহাত দেখানোর সুযোগ পেলাম না। যাক, থাকার ব্যবস্থাটা হলো। কাকা গিয়ে আমাদের ব্যাগগুলো নিয়ে এলেন। ওই মেয়েটি আমাদেরকে রুম দেখিয়ে দিতে উপরে নিয়ে এলো। সে আমার সাথে নিজ থেকেই কথা বলে যাচ্ছে, ‘আমি নাঈমা, এতদিন শহরে পড়াশোনা করেছি।’ বকবক করতে লাগল। সাবিলা আমাকে নাঈমার সঙ্গে দেখে আর কোনো কথা বলেনি। নিজ রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে।
নাঈমা আমাকে প্রসন্ন করার কোনো সুযোগই ছাড়ছে না। আমি অগত্যা তাকে এখানে আসার উদ্দেশ্য বুঝিয়ে দিয়ে নিজ রুমে ঘুমোতে চলে এলাম।
(চলবে…!)
লেখা: ফারিয়া কাউছার