ডুমুরের ফুল ৬.

0
726
ডুমুরের ফুল ৬.
ডুমুরের ফুল ৬.

ডুমুরের ফুল
৬.
হেমলতা ফোন রেখে দিয়ে আবার পড়ায় মন দিলো। ১২ টায় গোসল করে জোহরের নামাজ পড়ে নিলো।
মিসেস জয়নব বিবির আজকাল শরীর টা ভালো না। এই পর্যন্ত ছোটখাটো রোগ ছাড়া তেমন কোনো রোগ হয়নি। মৃতা মেয়ের কথা খুব মনে পড়ে তার।
মনোজও আজকাল তেমন একটা আসতে পারেনা মেয়েকে দেখতে। তার দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী হেমলতার সাথে যোগাযোগ করাটা পছন্দ করেনা। ঝগড়া ঝাটি করে দুই কন্যা এক ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যায়।
মিসেস জয়নব বিছানায় আধ শোয়া অবস্থায় গল্পের বই পড়ছিলেন। হেমলতা নানীর রুমের সামনে এসে দাঁড়াতে রুমের ভেতর থেকে মিসস জয়নব ডাকলেন
– আয়, ভিতরে আয়!
হেমলতা নানীর বিছানার কাছে চেয়ার টেনে বসলো। তারপর বলল
– নানী
– হুম বল
– দুপুর ৩ টায় একটু বাইরে কাজ আছে।
– স্যারদের কাছে তো পড়া শেষ? তাহলে বাইরে ক্যান যাবি?
– পরীক্ষা বেশিদিন নাই। পরীক্ষার পর সবাই কোচিং করতে ঢাকা চলে যাবে। দেখা না হইতেও পারে। তাই আর কী আজকে দেখা করতে চাচ্ছিলাম।
– ওহ। যাবি তো যা। কিন্তু সন্ধ্যার আগে বাসায় ফিরে আসবি।
– আচ্ছা।
– টাকা আছে? নাকি লাগবে?
– যা আছে তাতে হবেনা।
মিসেস জয়নব তার বালিশের নিচ থেকে ছোট্ট ব্যাগ বের করলেন।চকচকা ৫০০ টাকার নোট হাতে দিয়ে বলল
– আরো লাগবে?
– নাহ। এতেই হবে।
– যাওয়ার সময় দেখা করে যাস।
– হুম।
– আর শোন। এখানে খাবি নাকি ফ্রেন্ডদের সাথে?
– ফ্রেন্ডদের সাথে।
কথাটা বলেই হেমলতা নিজের রুমের দিকে এগোলো।
সত্যি তো জাদিদ তো খাওয়ার কথা কিছু বলেনি! টাকা তো আমার কাছে আছেই।
হেমলতার ছোটবেলা থেকেই টাকা জমানোর অভ্যাস। তার নিজের কাছে যা আছে তাতে হয়ে যাবে কোনো রেস্টুরেন্টের খাবার বিল।
অনেক কষ্টে একটা রিক্সা পেয়েছে হেমলতা তাও চড়া ভাড়ায়। হাতের ঘড়িতে সময় দেখে নিলো হেমলতা
-২.৪৫ বাজে।
বায়তুল আমান থেকে র‍্যাফেলস বেশ দূরে।হাজী শরিয়তউল্লাহ বাজার, র‍্যাফেলস, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের ফরিদপুর শাখা,ওয়ালটন এর কাস্টমার কেয়ার, টেলিটক এর অফিস আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ অফিস এখানে এক সাথে জড়সড় হয়ে আছে।
র‍্যাফেলস এর সামনে রিক্সা এসে থামলো। ভাড়া দিয়ে একটু এগিয়ে র‍্যাফেলস এর মেইন গেটের সামনে দাঁড়ালো। ২.৫৭ বাজে কিন্তু জাদিদ এখনো আসেনি।
হেমলতা কী করবে বুঝতে পারছিলো না। জাদিদকে ফোন করলো। রিসিভ হলো
– কই তুমি?
– এইতো মাত্র ১ মিনিট।
হেমলতা কিছু বলার আগেই ফোন কেটে গেলো।
জাদিদের বাসায় পানি ছিলো না। ট্যাংকিতে কী যেন সমস্যা হয়েছে। পানি সাপ্লাই হচ্ছেনা। মিস্ত্রী এনেছিলো কিন্তু কোনো কাজতো হয়নাই উল্টো বিগড়ে দিয়েছে। শেষে বাধ্য হয়ে জুবিলী ট্যাংকের পুকুরে গোসল করেছে। কিছু আধোয়া কাপড় চোপড় নেয়ার ছিলো। সবকিছু করতে গিয়ে তার একটু লেট হয়ে গেলো।
জাদিদের মনে হচ্ছিলো যদি ও আলোর বেগে ছুটতে পারতো? তাহলে ন্যানোসেকেন্ড সময় লাগতো পৌঁছাতে।
রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া দিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দেখলো হেমলতা দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা এমন কেন? একটু সাজগোছ তো করতে পারে? এই বয়সের মেয়েরা কতো সুন্দর ভাবে সেজে থাকে।অন্তত চোখে কাজল তো দিতে পারে। আর কোনোদিন খোলা চুলে এই মেয়েকে দেখলাম না। সবসময় বেণী
।তাও ভালো বাচ্চাদের মতো দুটো বেণী করে না। একটাই করে। আর এতো কালো চুল কীভাবে হয়?
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে জাদিদ হেমলতার দিকে এগিয়ে আসলো।
হেমলতা জাদিদের দিকে তাকিয়ে দেখে অবাক। হাতে এতো বড় ব্যাগ কেন? আর স্যুট ব্লেজার এগুলা কেন পড়ছে?
হেমলতা কৌতূহল চেপে না রাখতে পেরে জাদিদকে প্রশ্ন করেই বসলো
– হাতে এতো বড় ব্যাগ কেন?
জাদিদ বুঝতে পেরেছে যে হেমলতা অবাক হয়েছে তার এই ব্যাগ আর পোশাকে। একটু চমকে দেয়া যাক।
দুষ্ট হাসি মুখে এনে বলল
– ব্যাগে আমার সব জামা কাপড় আর তোমার জন্য কিছু জামা কাপড় কিনে এনেছি।
– বুঝলাম তুমি কোথাও যাচ্ছো তাই তোমার কাপড় চোপড় কিন্তু আমার জন্য কেন জামা কাপড় এনেছো।
– হেমলতা একটু শান্ত হও। আমার কথা শুনো। আমি একা যাচ্ছি না। তুমিও সাথে যাচ্ছো। আর তোমাকে তো জামা কাপড় আনার কথা বলা যায় না। তাহলে তো তুমি আসবাই না।
– মানে কি?
হেমলতার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু কপাল ঘামছিলো। এই ছেলে বলে কি?
– মানে হচ্ছে যে হোটেলের ভিতরে কাজী সাহেব আর উকিল সাহেব বসে আছেন। তুমি শুধু ৩ বার কবুল বলবা। তারপর হোটেলে রুম বুকিং দেয়া আছে। তোমার আমার ফুলসজ্জা রাত…..
জাদিদ আর বলতে পারলো না। হেমলতা ওর কথার মাঝে কথা বলে উঠলো
– তুমি তো ভারি খারাপ ছেলে। ফ্রেন্ড ফ্রেন্ড বইলা এখন বিয়ে করার কথা বলছো?
– আরে আমি তো ভালো প্রস্তাব দিয়েছি। শুনো এমন উকিল এনেছি যে বান কি মুনের ক্ষমতাও হবে না আমাদের ডিভোর্স করানোর।
হেমলতা কী বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না। এখান থেকে পালানো দরকার।
হেমলতা পিছন ঘুরে হাঁটতে শুরু করলো। জাদিদ হাত টেনে ধরে বলল
– আরে কই যাও।
– হাত ছাড়ো।
– আরে আমি তো মজা করছিলাম।
হেমলতা ভাবলো জাদিদ এখন মিথ্যা কথা বলছে। তাই ভাবলো তার এখান থেকে যেভাবে হোক পালাতে হবে।
– না মানে আমার তো শরীর ভালো লাগছে না তাই বাসায় যেতে হবে।
এই কথা শুনে জাদিদ হাসতে শুরু করলো। তারপর কোনো মতে হাসি চেপে বলল
– পাগল মেয়ে। আমি সত্যি মজা করেছি। তবে তোমার মতো মেয়েকে বউ হিসেবে পেলে জীবন রংগিলা হয়ে যাবে।
এখানে আসার উদ্দেশ্য ভিন্ন আর অতি সৎ উদ্দেশ্য ।
হেমলতা বিশ্বাস করতে পারছিলো না।
জাদিদ এক হাতে ব্যাগ আরেক হাতে হেমলতাকে টেনে নিয়ে র‍্যাফেলস এর ভিতরে ঢুকলো। হেমলতা বিশ্বাসও করতে পারছিলো না আবার অবিশ্বাসও করতে পারছিলো না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে যেতে হচ্ছে।
রিসিপশনে একজন মধ্যবয়সী নারী বসে ছিলেন। জাদিদ হেমলতাকে একটু দূরে দাড় করিয়ে রেখে রিসিপশনে গেলো।
হেমলতা দূর থেকে খেয়লা করলো জাদিদ হেসে হেসে কী কী যেন বলছে।
জাদিদকে হেমলতার দিকে আসতে দেখে হেমলতা চোখ অন্যদিকে সরিয়ে নিলো।
তারপর জাদিদ হেমলতার হাত ধরে টেনে লিফটের দিকে নিয়ে গেলো।
হেমলতার অসস্তি লাগছিলো জাদিদের হাত ধরাতে।
– জাদিদ আমার হাত ছাড়ো।
– না। তুমি পিছন থেকে পলাবা।
– সত্যি আমি পলাবো না। বিশ্বাস করো।
– আরে হাত ধরলে কী এমন হয়। আর চুপ করো তো। বেশি কথা বলো।
তারপর মুচকি হেসে বলল
– হেম! আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারো।
জাদিদের চোখের দিকে তাকিয়ে হেমলতা কিছু না বলেই জাদিদের সাথে হাঁটতে শুরু করলো।
৩ তলাতে লিফট থামলো।
হেমলতা খেয়াল করলো এটা তো আবাসিক।
কিছু না বলেই জাদিদের পিছুপিছু চলতে শুরু করলো।
তারপর একটা রুমের সামনে এসে ওরা দাঁড়ালো।
জাদিদ কলিং বেল চাপলো। সাথে সাথেই দরজা খুলে গেলো।

হাসিহাসি মুখে একজন ৪০-৪৫ বছরের নারী দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। প্রচুর ফরশা, মাথা ভরা কালো লালচে চুল। এই বয়সেও তার চেহারায় মাধুর্য টা হারিয়ে যায়নি।
হেমলতা অবাক চোখে দেখছিলো যে মহিলার পরনে হালকা বাদামী রঙের গাউন। গায়ের রঙের সাথে পুরোপুরিভাবে মিশে গেছে। এক গাল হেসে জাদিদকে বলল
– my son ভিতরে এসো!
জাদিদ এখনো হেমলতার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলো।
হেমলতার দিকে তাকিয়ে বলল
– হেই বনলতা তুমি দাঁড়িয়ে আছো কেন? এসো ভিতরে এসো।
জাদিদ হেমলতার হাত ধরে টেনে রুমে ঢুকার সময় বলল
– মা! বনলতা না হেমলতা ওর নাম।
হেমলতা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মহিলার দিকে। সত্যি তো দুজনের চেহারা হুবহু এক।
জাদিদ হেমলতাকে বলল
– আরে বসো।
রুম টা বেশ বড়। এক কোণায় জানালার ধারে বেড। আর দক্ষিণের দেয়ালের সাথে মাঝারি আকারের সোফাসেট বসানো। হেমলতা ছোট সোফায় বসলো। জাদিদের মা হেমলতার থুঁতনি ধরে বলল
– মাশাআল্লাহ। নামের সাথে চেহারার মিল আছে বটে।
জাদিদ ওর মাকে বলল
– মা খিদে পেয়েছে। খাবো। আজকে তুমি খাইয়ে দিবে। সেই কবে খেয়েছিলাম মনেও নেই।
– একটু বোস বাবা। এই রুমের সাথে কিচেন আছে। আমি তোদের জন্য নিজ হাতে রান্না করেছি।
আমি টেবিলে খাবার সাজিয়ে ডাকছি তোদের।
– আচ্ছা।
হেমলতা কিছুই বুঝতে পারছিলো না। হতভম্ব অবস্থায় বসে ছিলো।
জাদিদ হেমলতার অবস্থা বুঝতে পারছে। তাই সে বলল
– আমার মা। গ্রীসে থাকেন।
– তোমার বাবা?
– আচ্ছা তোমাকে তো আমার ফ্যামিলি সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি?
– নাহ।
– আমি যখন ক্লাস ৫ এ পড়ি তখন মা – বাবার ডিভোর্স হয়ে যায়। রাগের মাথায় মা গ্রীসে চলে যান। আমাকে তার কাছে নেয়ার জন্য অনেক কাঠ কয়লা পুড়িয়েছেন কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। মাকে শেষ বার দেখেছিলাম যখন ক্লাস ৮ এ পড়ি।
তাছাড়া তো ভিডিও কলে কথা হয়।
কথাগুলো বলে জাদিদ একটু হাসতে চাইলো কিন্তু তা আর ঠিক হাসি বলা যায় না।
হেমলতা বুঝতে পারছিলো তার সামনে বসে থাকা ছেলেটার মাঝে চাপা কষ্ট জমে আছে। যা সে কখনো প্রকাশ করেনা।

চলবে…..!

#Maria_kabir