গেইম

0
708

গেইম
© আবির খান

– ” মার ওকে মার। তুই পিছন দিয়ে যা আমি সামনে দিয়া অ্যাটাক করতাছি। আজ একটারেও ছাড়বো না। দোস্ত বাঁচা আমাকে বাঁচা গুলি লাগছে। ”

রিফাতের বন্ধু নাঈম ফোন চালাচ্ছে আর এভাবে চেচামেচি করছে। রিফাত বুঝতে পারছে না এসব কি হচ্ছে। রিফাত নাঈমকে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

– “দোস্ত কি করিস ফোনে? এভাবে চেচামেচি করছিস ক্যান? আর কাকেই বা মারতে বলছিস?”

নাঈম বেশ কিছুক্ষণ পর ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ উঠিয়ে বলে,

– ” আরে গেইম খেলি। এনেমি মানে শত্রু মারার গেইম। সেই মজা বুঝলি। আমরা বন্ধুরা মিল্লা অন্য দলের প্লেয়ারদের মারি। গোলাগুলি আরো কতকিছু। অনেক ধরনের বিদেশি বন্দুক দিয়ে শত্রুদের মারি গেইমে।”

রিফাত অবাক হয়ে বলল,

– “কি বলিস গেইমটাতো অনেক জোস মনে হচ্ছে। দে না আমি একটু খেলি প্লিজ।”

নাঈম রিফাতকে তাচ্ছিল্য করে বলে,

– “শা** নিজের ফোন দিয়ে খেল আমার কাছে চাবিনা। আমার একটু পর ওয়ার আছে। যাতো ডিস্টার্ব করবি না। নিজের আবার ফোনই নাই আইছে গেইম খেলতে। যাহ।”

নাঈমের কথাগুলো ৮ম শ্রেণিতে পড়া রিফাতের মনকে অনেক আঘাত করলো। তার ভিতরে একটা কঠিন জেদ কাজ করলো। রিফাত সোজা বাসায় গিয়ে দামী এন্ড্রয়েড ফোনের আবদার ধরলো। তাকে যেভাবে হোক তার বন্ধুকে দামী ফোন আর ওই গেইম খেলে নিচু করতে হবে। রিফাতের পরিবার মধ্যেবিত্ত হওয়ায় তার বাবা তাকে ফোন কিনে দিতে রাজি হয়না। বাবা-মার সাথে খারাপ আচরণ করেও যখন রিফাত ফোন পাইনি, তখন সে তার নিজ বাসায় চুরি করে তাও তার এক বন্ধুর বুদ্ধিতে। ১৪ হাজার টাকা চুরি করে রিফাত। এই টাকাটা রিফাতের মা রিফাতের ভবিষ্যতের জন্য জমাচ্ছিল। রিফাত এই টাকাটার কথা জানতো। তাই সে এই টাকাটাই চুরি করে। এরপর এই টাকা দিয়ে একটা ভালো এন্ড্রয়েড ফোন কিনে সেই মানুষ মারার গেইম নামায় রিফাত। শুরু করে বাবা-মার চোখ ফাঁকি দিয়ে আর পড়াশোনা ছেড়ে সেই মানুষ মারার গেইম খেলা। রাত ৩/৪ টা পর্যন্ত রিফাত সেই গেইম খেলে। যার জন্য সকালে ঘুম থেকে উঠে ১১ টায়। এমনকি স্কুল ফাঁকি দিয়েও এই গেইম খেলে রিফাত। বেশ কয়দিনেই রিফাত এই মানুষ মারার গেইমে পটু হয়ে যায়। বন্ধুমহলে বেশ নাম কামিয়ে ফেলে।

এরপর রিফাত চলে যায় সেই নাঈমের কাছে আর তাকে তাচ্ছিল্য করে বলে,” নাঈম, আজ তোদের অ্যাটাক করবো পারলে জিতে দেখাইস।” নাঈমও তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,”ওকে দেখা যাবে।”

এরপর সত্যিই রিফাত সেদিন নাঈমকে হারিয়ে দেয়। এবং খুব খারাপ ভাবেই হারায়। হারানোর পর নাঈমকে খুব অপমান করে রিফাত। রিফাতের অপমান নাঈম মেনে নিতে পারে না। তাই নাঈম বখাটে কিছু ছেলেদের দিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় রিফাতকে ধরে নিয়ে এমন মারা মারায় যে রিফাত সেই মার সহ্য করতে না পেরে মারা যায়। মানে রিফাতের গেইম ওভার।

এই হলো মানুষ মারার গেইম খেলার পরিনতি। সামান্য একটা গেইমের জন্য প্রথমে হিংসা তারপর জেদ, বাবা-মাকে কষ্ট, চুরি এবং প্রতিশোধের মতো মারাত্মক মারাত্মক খারাপ কাজ রিফাতকে করতে হলো। শুধু মাত্র একটি গেইমের জন্য। তাও কি গেইম, মানুষ মারার গেইম।

আমরা আমাদের আশেপাশে তাকিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবো, এই মানুষ মারার গেইম কতটা বিস্তার লাভ করেছে আমাদের মাঝে। ১৩/১৪ বছরের বাচ্চা ছেলে/মেয়েরা আজ এই মানুষ মারার গেইম খেলে তারা মানুষ মারা শিখছে। তারা বিদেশি অস্র সম্পর্কে জানছে এবং চিনছে। কিভাবে তা চালাতে হয় তাও শিখছে। যেখানে তাদের উচিৎ মন দিয়ে পড়াশোনা প্লাস বাবা-মার কথা শুনা। কিন্তু সেখানে তারা এই মানুষ মারার গেইম খেলে নিজের মধ্যে মানুষ মারাটাকে সহজ করে নিচ্ছে। এসব গেইমে বিপক্ষদলের প্লেয়ার মানে শত্রুদের মারার জন্য বুদ্ধি খাটিয়ে তারপর খেলতে হয়। এসব বুদ্ধিই শুধু একজনকে মারার জন্য। ভাবুনতো, এই বাচ্চা কাচ্চারা একদিন বড় হবে। তখন তাদের মাথায় শুধু এই গেইমের মতো মানুষ মারার বুদ্ধিই চলবে। কাউকে ভালো না লাগলে এই গেইম এর মতো প্লান করে তাকেও তারা শেষ করে ফেলবে। এসব গেইম আমাদের অনেক মজা দিলেও আমাদের প্রজন্মের মাথায় মানুষ মারাকে খুব সহজ করে দিচ্ছে। তার ব্রেন আর মনের মধ্যে মারাত্মক ভাবে খারাপ প্রভাব ফেলছে। যার পরিণামতো রিফাতের মাধ্যমেই দেখতে পাচ্ছেন।

তাই আমাদের সবার উচিৎ এখনই সচেতন হওয়া। এসব গেইম সম্পূর্ণ আমাদের ইসলামের বিরুদ্ধে। ইসলাম কোনো দিন মানুষ মারাকে সাপোর্ট করে না। সেটা আসল জীবনে হোক কিংবা গেইমে। আজকের আমাদের এই সচেতনতা ভবিষ্যতে এনে দিবে সুন্দর এক প্রজন্ম। ধন্যবাদ।

– সমাপ্ত।

© আবির খান।

– কোনো ভুল হলে মাফ করবেন।