অপূর্নতা

0
607
আজ বিকেলে পূর্ণতা কে দেখতে এসেছে ছেলেপক্ষ । ছেলেদের বাড়ির ঢাকাতেই, ছেলেটার ডায়মন্ডের দোকান আছে ! ছেলে দেখতেও ভালো , সবই ঠিক আছে তাই পূর্ণতার বাবা এই ছেলের সাথেই পূর্ণতার বিয়ে ঠিক করে ফেলে ! এটাই পূর্ণতার বিয়ের প্রথম সম্বন্ধ নয় , এর আগে ওদের বাড়িতে একটা সম্বন্ধ এসেছিল আর সেই সম্বন্ধের পাত্র আমি নিজেই ! আমি আর পূর্ণতা ছোটকাল থেকে একে অপরকে ভালবাসি ও শ্রদ্ধা করি ! কিছুদিন আগে আমাদের এই সম্পর্কের ব্যাপারে আমাদের পরিবার জেনে যায় ! আমার পরিবার আমাদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছে কিন্তু পূর্ণতার পরিবার আমাদের সম্পর্ক মেনে নেয়নি ! বাবা গিয়েছিল আমাদের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে কিন্তু পূর্ণতার বাবা আমাদের এই সম্পর্ক মেনে নিতে একদমই নারাজ ! আমি ভেবেছিলাম পূর্ণতা বাবা আজ না হয় কাল আমাদের সম্পর্ক মেনে নিবে কারণ আমি যতটা না পূর্ণতা কে ভালোবাসি তার চেয়ে অনেক বেশি পূর্ণত আমাকে ভালবাসে ! পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে হলেও পূর্ণতার বাবা এই বিয়েতে রাজি হবেন ! কিন্তু না হঠাৎ করে পূর্ণতার বাবা অপূর্ণতা বিয়ে ঠিক করে ফেললেন! পূর্ণতার কলেজ যাওয়া বন্ধ করে দিলেন ,বাড়ি থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিলেন ! পূর্ণতার সাথে আমার যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে !
পূর্ণতা তার খালার বাসায় যাওয়ার কথা বলে আমার সাথে দেখা করতে এসেছে ! পূর্ণতা আমায় বলছে -যে করেই হোক এই যে আমাদের আটকাতে হবে ! তোমাকে ছাড়া আমি অন্য কারো কথা চিন্তা করতে পারিনা ? পূর্ণতা এটা বলেই আমার বুকে মুখ গুঁজে কান্না করতে শুরু করল ! আমি আমার বুকে ওকে কান্না করার জন্য ছেড়ে দিলাম ! ওকে বাঁধা দিলাম না , কান্না করার পর হয়তো মনটা হালকা হবে ওর ! আমি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললাম – আচ্ছা পূর্ণতা আমরা কি আইনের সহযোগিতা নিতে পারি না ? আমার এ কথা শুনে পূর্ণতার কান্না বন্ধ হয়ে গেল ! আমি বললাম তুমি এখন সাবালিকা হয়েছ তোমার মতামত ছাড়া এই বিয়ে বেআইনি ! আমরা চাইলে পুলিশ আমাদের সহযোগিতা করবে ! পূর্ণত আমার কথায় সায় দিল ! পূর্ণতা বলল – আমার এখন যেতে হবে দেরি হলে বাবা আবারো অশান্তি শুরু করবে ! বাধন আমি যখন তোমার কথা বাবার কাছে বললাম বাবা আমায় সেদিন অনেক মেরেছিল ! বাবা এর আগে কোনদিন আমার গায়ে হাত তোলে নি ভাইয়া ও সেদিন আমাকে অনেক মেরেছে ঘরে বন্দি করে রেখেছিল সেদিন ! আমি কিছু বললাম না শুধু বললাম ঠিক আছে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যাও !
ও বাসায় যাবার 1 ঘন্টা পরে পূর্ণতার এক বন্ধু আমায় ফোন করে জানালো পূর্ণতার যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে সে ছেলে পূর্ণতা দের বাসায় এসেছে ! এটা শোনার পর আমি উত্তেজিত হয়ে পরলাম মাথায় কুবুদ্ধি চাপল পরিকল্পনা করতে লাগলাম সে ছেলে কে আজকে মারধোর করব ! আমার বন্ধুদের জানালাম বিষয়টা তারাও রাজি ! যেমন চিন্তা তেমন কাজ । সে ছেলে পূর্ণতা দের বাসার গলি পার হওয়া মাত্র আমি তার শার্টের কলার খপ করে ধরে হেচকা টান দিয়ে দশ-বারোটা কষিয়ে চড় বসিয়ে দিলাম ! আমার চর দেওয়া থামতে সে বলে উঠলো কে আপনার আমাকে মারছেন কেন ? এটা বলার সাথে সাথে আরও 4-5 টা চড় বসিয়ে দিলাম তার গালে , আর বললাম এই গলিতে আবার দেখলে তোকে মেরে ফেলে দেবো , আজকে তোকে ছাড় দিলাম ! কথাটা যেন মনে থাকে !ঐদিন বিকেলবেলা আমার বন্ধুদের নিয়ে আমি চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম ! ভাবছিলাম পূর্ণতার বিয়ে তো এবার প্রায় ভেঙেই গিয়েছে ! যে মার দিয়েছে সে হয়তো এগলিতে আসার কথা চিন্তা করলেই ভয় পাবে বিয়ে তো অনেক পরে কথা!
হঠাৎ আমার ফোনে কল আসলো পূর্ণতার পাশের বাড়ির বান্ধবীর কল করেছে ! ফোন ধরতেই সে ফোপাতে ফোপাতে বলতে লাগলো বাঁধন ভাই সর্বনাশ হয়ে গেছে ! পূর্ণতার বাবা আজি পূর্ণ থাকে বিয়ে দেবে বলে পূর্ণতা কে ঘরে আটকে রেখেছে ! অনেক মারধর করেছিল , পূর্ণতা অনেক চেঁচামেচি করছিল দরজা খুলে দেওয়ার জন্য কিন্তু কেউ তার রুমের দরজা খুলে দেয়নি ! কিছুক্ষণ পর পূর্ণতাকে সাজানোর জন্য পার্লার থেকে লোক এসেছিল কিন্তু পূর্ণতা ভিতর থেকে দরজা লাগিয়ে দিয়েছে তাকে অনেক ডাকাডাকি করছে কিন্তু কোন সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না ! বাঁধন ভাই আমার খুব ভয় হচ্ছে এরইমধ্যে ওপাশ থেকে কে যেন চিৎকার করে বলছে পূর্ণতা ফাঁসি দিয়েছে ! কথাটা শোনার পর আমার হৃদস্পন্দন যেন হঠাৎ থমকে গেল হাত পা অবশ হয়ে আসছে চিৎকার করতে চাইছে কিন্তু চিৎকার করতে পারছিনা ! আমি পূর্ণতার কাছে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াতেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লাম !পরক্ষণেই নিজেকে আবিষ্কার করলাম হসপিটালের স্ট্রেচারে ফিনাইল এর তীব্র গন্ধ আমার নাকে লাগছিল ! পরক্ষণেই আমি লক্ষ্য করলাম কিছু মুখোশধারী লোক আমার চারপাশে ঘোরাফেরা করছে ! আমার বুকের উপর একটা সূর্য জ্বলজ্বল করছে ! সেই সূর্যের মধ্যে আমার পূর্ণতার হাসিমাখা মুখ ভেসে উঠেছে , এখন আর ফিনাইলের গন্ধ পাচ্ছি না এখন শিউলি ফুলের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ আমার নাকে লাগছে ! পূর্ণতা শিউলি ফুল খুব পছন্দ করত ! আমার বুকের উপর সূর্য কেমন যেন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে একটা সময় প্রায় অন্ধকার হয়ে গেল কিন্তু আমার পূর্ণতার হাসিমাখা উজ্জ্বল মুখ এখনো আমি দেখতে পাচ্ছি ! এরইমধ্যে মুখোশধারীর লোক গুলো বলাবলি করছে শ্বাস পড়ে যাচ্ছে তাড়াতাড়ি রেডি করো ! পরক্ষণেই আমার শরীর বেশ কয়েকবার লাফিয়ে উঠলো ! আমার বুকের উপর সূর্যটা আবার জলে উঠল ! উপলব্ধি করলাম পূর্ণতা আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে , পূর্ণতার শরীর থেকে শিউলি ফুলের ঝাঁজালো ঘ্রাণ পাচ্ছি সে ঘ্রাণ যেন তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে ! মুখোশ ধারী লোক গুলো আবারও বলছে শ্বাস পড়ে যাচ্ছে ! লেখক : বরসাত রাহমান তুষার