1.2 C
New York City
Friday, January 24, 2020
Home Blog

ডুমুরের ফুল ১৭.

0

ডুমুরের ফুল ১৭.

হেমলতা আমতা আমতা করে বললো
– মোবাইল কবে পাবো তার কোনো ঠিক নেই। আ…. আমি এতক্ষণ অপেক্ষা কীভাবে করবো?
– তোমার এক ভুলে সারাজীবনের জন্য কথা বলা বন্ধ হবে।
– নানী কিছুই বুঝতে পারবেনা। বলবো, তুমি আমার ফ্রেন্ড।
– হেম শুনো, আমাদের কথাবার্তা কেউ শুনলে বিশ্বাস করবে আমরা ফ্রেন্ড?
জাদিদ হাসতে হাসতে বললো।
– হ্যাঁ সেটা তো ভেবে দেখিনি।
– শুনো হেম।
– হুম বলো।
– তোমার প্রতি ভালোলাগা বেড়েই যাচ্ছে। যতবারই ভাবছি ততবারই। মানে সমানুপাতিক সম্পর্ক। তোমাকে নিয়ে ভাবনাকে যদি V ধরি আর আর ভালোলাগাটাকে V… এরে এক হয়ে গেলো। ভাবনাকে T এবং ভালোলাগাকে L ধরি তাহলে,
L সমানুপাতিক T^3
বুঝতে পারতেছো? ভাবনার কিউবের সমানুপাতিক ভালোলাগা।
সমানুপাতিক আর সমান কিন্তু হেম এক না। সমানুপাতিক উঠিয়ে সমান দিতে গেলে ধ্রুবক আনতে হয়।

হেমলতা কী বলবে বুঝতে পারছেনা। এদিকে কীসের সাথে কী মিশাচ্ছে জাদিদ। এখন না থামালে জাদিদ আরো জটিল দিকে এগিয়ে যাবে। এমনিতেই ফিজিক্স তার মাথায় ঢোকে না। তারপর জাদিদ…..
এদিকে জাদিদ তার মতো ব্যাখ্যা করেই যাচ্ছে।
হেমলতা নরম স্বরে বললো
– জাদিদ।
– তুমি বুঝতে পারতেছো না?
– তুমি পাগল হয়ে গেলা নাকি?
– মনে হচ্ছে তাই হয়ে যাবো।
– বাসায় পৌঁছে প্রথমে ফ্রেশ হয়ে নিবা। তারপর পেট ভরে খেয়ে ঘুম দিবা।
– কী বলো? জিনিসপত্র না গুছিয়ে ঘুমাবো কীভাবে?
– জিনিসপত্র গুছানো যাবে আগে ঘুম।
– আমার কিছুই ভালো লাগছেনা হেম। ইচ্ছা করছে ফরিদপুরে ব্যাক করি।
– প্রথম দিকে খারাপ লাগবে। আস্তে আস্তে অভ্যাস হয়ে গেলে ফরিদপুরে আসতে ইচ্ছা করবেনা।
– ফরিদপুরে আমার আসতেই হবে। ১ দিনের জন্যও হলেও আসতে হবে।
– এখন রাখি।
– হুম। একটা কাজ করতে পারবে?
– বলো।
– মোবাইলটা আজকে রাতে তোমার কাছে রেখো।
– আচ্ছা চেষ্টা করবো। রাখি বাই।
জাদিদের ইচ্ছে করছে চুমু দিতে কিন্তু পাশের আন্টি কান পেতে বসে আছেন। এমনিতেই এতক্ষণ যা বলেছে তাতেই আন্টির চেহারা দেখার মতো। উনি কি চাচ্ছে তার মেয়ের সাথে আমার সেটিং করায় দিতে? তাহলে তো চুমু দেয়া মৌলিক অধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাদিদ মোবাইল ঠোঁটের কাছে নিয়ে জোরে শব্দ করে চুমু দিয়ে বললো
– দূরে চলে যাচ্ছি তাই বোনাস।
হেমলতার পুরো শরীর ঘিনঘিন করতে শুরু করেছে। হেমলতা রেগে বললো
– এসব না করলে কী হয়?
– আমার কষ্ট হয়।
জাদিদ হাসতে হাসতে বললো
– আচ্ছা রাখি।
ফোন কেটে দিয়ে মোবাইল পকেটে রেখে দিলো। আড়চোখে আন্টিকে একবার দেখে নিলো জাদিদ।
মহিলার চেহারা ভাবলেশহীন। হয়তোবা অতিরিক্ত শক খেয়েছে।

নাদিয়া ভাতের লোকমা মুখে পুড়ে দিয়ে বললেন
– হেমলতাকে বিয়ে দিয়ে দেন, খালাম্মা। আপনার টেনশন কমবে।
মিসেস জয়নাব অবাক হয়ে বললেন
– ও এখনো ছোটো আর আমি চাই ওর পড়াশোনা শেষ হোক।
– আজকালকার যে অবস্থা। ক্লাস সিক্স সেভেনের মেয়েরাও প্রেম করে।
– হেমলতা অমন না। আর এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে ওকে দিবোনা।
– ভালোর জন্য বললাম। এখন আপনার ইচ্ছা।
মিসেস জয়নাব আর কথা বাড়ালেন না।

মিম্মা ফেসবুকে গ্রুপ চ্যাটিং – এ জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। গ্রুপ চ্যাটিং এ টপার স্টুডেন্ট এড আছে। আর এরা এখানে কতোটা মজা করে কথা বলে, এড নাহলে জানা যায়না।
ম্যাসেজ পড়তে পড়তে একটা ম্যাসেজে চোখ আটকে গেলো। আটকানোর কারণ জাদিদ শব্দটা। জয়ী লিখেছে
– জাদিদ কইরে, তোরা কেউ জানিস?
জুবায়ের রিপ্লাই দিলো
– জাদিদ ঢাকার পথে।
– গ্রুপে একটু আড্ডা দিলেও তো পারে।
– দেখা গেলো বাসেও পড়াশোনা করছে। হাসির ইমো।
জয়ী আর জুবায়েরের মধ্যে এখন কথা হচ্ছে। মিম্মা ওদের মধ্যে একটা ম্যাসেজ দিল
– কে কে ঢাকায় কোচিং করতে যাবি?
অনেকেই রিপ্লাই দিলো। কিন্তু যুথির কোনো খোঁজ নেই। অনলাইনে আছে, ম্যাসেজ ও সিন করেছে কিন্তু রিপ্লাই নাই।
অবশ্য মেধাবীদের একটু মুড থাকবেই। তাহলে জাদিদের নেই কেনো? জাদিদ তো ওদের চেয়েও বেশি মেধাবী।
জাদিদের মতো ছেলে কীভাবে হেমলতাকে পছন্দ করলো? হেমলতা ভালো মেয়ে কিন্তু ওর টাইপের না। জাদিদ কি ওর সাথে মজা করছে?
মিম্মার কেনো যেন মনে হচ্ছে কিছু একটা ঝামেলা তো আছেই।

জাদিদ বাসায় পৌঁছালো সন্ধ্যায়। বাসায় যাওয়ার আগে রাতের খাবার আর ৫ লিটারের পানির বোতল, কোক, বিস্কুট কিনে নিলো। হেমলতার আদেশ পালনের জন্য প্রথমে গোসল করে নিলো। গোসল ছাড়া কোনোভাবেই ফ্রেশ হওয়া সম্ভব না।
গোসল সেরে পুরো ফ্ল্যাটটা ভালোভাবে দেখে নিলো জাদিদ। একটা মাস্টার বেডরুম, একটা নরমাল বেডরুম , একটা ছোট্ট ডাইনিং বা ড্র‍য়িং রুম যেকোনো একটা বললেই হয়। কারণ একটাই রুম আছে লম্বাটে টাইপের। ছোট রান্নাঘর আর মিনি বারান্দা। অর্থাৎ নতুন বিবাহিত দের জন্য পারফেক্ট ফ্ল্যাট বলা চলে।
জাদিদের বাবা প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র দিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন ফ্ল্যাট। জাদিদের মনে হলো, তার বাবা ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করেছেন। যেন ফ্ল্যাট সাজাতে ছেলেকে সময় ব্যয় না করতে হয়।
খাটের ওপর চাদর বিছানো দেখেই বোঝা যাচ্ছে, বিকালের দিকেই বিছানো হয়েছে। সবকিছুতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হয়েছে।
তবে জাদিদের জন্য ভালোই হয়েছে। তার একা থাকতে ভালোলাগে। ম্যাসে থাকলে একসাথে অনেক জন। নিজস্বতাই থাকতোনা। জুবায়ের, রিফাত, হোসেন আর কামরুল মিলে ছোটো বাসা ভাড়া নিয়েছে। ওরা অবশ্য জাদিদকেও বলেছিলো ওদের সাথে থাকতে কিন্তু জাদিদের কোনো ইন্টারেস্ট নাই দেখে। ওরা আর কিছুই বলেনি।
ভুনা খিচুড়ি আর ডিম ভাজা – আহ্! খাবার দেখে জাদিদের মনে পড়লো তার প্রচুর খিদে পেয়েছে।
এতোটা খিদে যে কীভাবে খেলো নিজেই বুঝতে পারলোনা।
খাওয়া শেষ করে হেমলতার আদেশ অনুযায়ী বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লো। ঘুম না আসলেও তাকে ঘুমাতে হবে। হেমলতার আদেশ বলে কথা।
হেমলতার সাথে কথা বললে ঘুমটা তাড়াতাড়ি আসতো কিন্তু তার মোবাইল আংকেলের কাছে।
দাদীর কথা মনে পড়লো জাদিদের। বৃদ্ধা রুক্ষ মেজাজের হলেও মাঝেমধ্যে ভালো ব্যবহার করতেন। যদিও নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। কিন্তু দাদী তো।
এখন তো বিস্বাদ খাবার খেতে খেতে জিহবার স্বাদ কোরক বাদ করে ফেলতে হবে।
ভাবতে ভাবতেই জাদিদ গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো।

হেমলতা তোতলাতে তোতলাতে নানীকে বললো
– তোমার মোবাইল টা আমার কাছে আজকে থাকুক৷
মিসেস জয়নাব পান মুখে দিয়ে বললো
– আচ্ছা রাখিস। তোর শরীর কেমন?
– এখন ভালো। তুমি চিন্তা কম কম করবা। – একটা কথা বলি। তুই নাদিয়ার সামনে খুব একটা যাবিনা।
– কেনো?
– ও ঘটক হতে চাচ্ছে।
– উনি ঘটক হলে আমার কী?
– আরে গাধী তোকে বিয়ে দেয়ার কথা বলেছে আমার কাছে।
– এতো তাড়াতাড়ি?
– আমি না করেছি। কিন্তু নাদিয়া বললো আজকালকার মেয়েরা নাকি অল্পবয়স থেকে প্রেম করে। আমি বলে দিলাম, আমার হেমলতা অমন না।
হেমলতা অবাক হয়ে নানীর দিকে তাকিয়ে রইলো। কী বলবে সে ভাবতেই পারছেনা!

চলবে……!

© Maria Kabir

” লেখিকা মারিয়া কবির এর সকল লেখা দ্রুত পেতে অবশ্যই এ্যাড হোন তার ফেসবুক পেইজ ‘Maria Kabir – মারিয়া কবির’(এখানে পেইজ লিংক) এর সাথে।
২০২০ বই মেলায় প্রকাশ পেতে যাচ্ছে মারিয়া কবির এর প্রথম উপন্যাস ‘যেখানে সীমান্ত তোমার আমার’।
মারিয়া কবির এর নতুন সব গল্প উপন্যাস পেতে আমাদের।সাথেই থাকুন ধন্যবাদ।

অনুরাগ শেষ পর্ব

অনুরাগ
শেষ পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

কলারের থেকে হাত দুটো ছাড়িয়ে নিয়ে পুলক পকেট থেকে ফোন বের করে একটা ভিডিও প্লে করে দিলো।ভিডিও তে সেই মেয়েটি স্বীকারোক্তি দিচ্ছে।মেয়েটি কাঁদছে আর কথাগুলো বলছে।আর তার পাশেই ওই সর্দারনী।মাথায় ঘোমটা টেনে মাথা নিচু করে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে সেও স্বীকারোক্তি দিচ্ছে।
বোঝাই যাচ্ছে বেঢপ মার দেওয়া হয়েছে তাদের।শ্রুতি বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছে না।কাকে বিশ্বাস করবে সে? মন তো চাইছে পুলককে বিশ্বাস করতে।কিন্তু পুলক যদি নিরাপরাধ হয়ে থাকে তাহলে এই তিন বছরের মধ্যে কেনো ওকে জানালোনা? ও কিছু ভাবতে পারছেনা।

-‘ বোকা পেয়েছিস? তুই যে ওদের মারধোর করে স্বীকারোক্তি নিয়েছিস তা তো বোঝাই যাচ্ছে।’
-‘ ওয়েল।তাহলে প্রত্যক্ষদর্শী নিয়ে আসি।’ ঠান্ডা গলায় বললো পুলক।

পুলকের ফোন পেয়ে রিয়া আর ধ্রুব এসে হাজির হলো ওদের মাঝে।তারপর ধ্রুব বলতে শুরু করলো,-‘ এতকিছু তো পুলক একা করতে পারে নি।ওকে সাহায্য করেছি আমরা।ও তো মরেই যাচ্ছিলো শ্রুতি ওর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার পর।কতভাবে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে! তারপর ওর থেকে সবটা শুনে আমি আর রিয়া উদ্যোগ নিলাম সত্যিটা কী আর এর পেছনে আসল ঘটনাটা কী তা জানার জন্য।কিন্তু পুলক এতটায় ডিপ্রেশনে ভুগছিলো ওকে আগে সুস্থ করার প্রয়োজন বোধ করলাম।মাস ছয়েকের মধ্যে ওকে নিয়ে স্কটল্যান্ড চলে এলাম।আমার আর আমার বাবার সাথে ওকে শেয়ারে নিয়ে নিলাম আমাদের ব্যবসায়ে।শুধু ওকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর জন্য।তার ভেতর রিয়াকে শ্রুতির ব্যাপারে সব খোঁজ নিতে বললাম।পুলক অস্থির হয়ে থাকতো ওর খবর জানার জন্য।আস্তে আস্তে ডিসিশন নিলো ও আর কোনোদিনও শ্রুতির সামনে আসবেনা।ওকে বলবে না ও নির্দোষ।কিন্তু আমি বললাম,-‘ তোর জানা উচিত ওই মেয়েটা কেনো মিথ্যে বলেছিলো।শ্রুতির কাছে নিরাপরাধ সাজার জন্য নয়।সত্যটা জানা তোর প্রয়োজন।’ তার মধ্যেই রিয়া খবর জানালো ঈশাণ শ্রুতিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে।ব্যাপারটা আমার কাছে খটকা লাগলেও পুলক নিশ্চিত হয়ে গেলো যে ওই ঘটনার সাথে ঈশাণ জড়িত কোনোভাবে।দেশে ফিরে এলাম ওকে নিয়ে।বহুকষ্টে ওই মেয়েটাকে খুঁজে বের করলাম। মেয়েটির সন্ধান পাওয়ার জন্য সর্দারনীকে কম ধোলাই খেতে হয়নি।আর যখন মেয়েটাকে খুঁজে পেলাম তখন তো সবটা রেকর্ড করেই রেখেছি।এরপরই পুলক আমি আর রিয়া প্ল্যান করলাম ইভেন্টের।নতুন করে আগমন ঘটালাম পুলকের। পুলক আমার ছোটবেলার বন্ধু।ওকে আমি চিনি ওর অতীতটা আমি জানি।তাই আমি বিশ্বাস রেখেছিলাম যে পুলক কখনো শ্রুতিকে ছাড়া পৃথিবীর সর্বত্তোম সর্বশ্রেষ্ঠা সুন্দরী মেয়ের দিকেও তাকাবেনা।আমি ওর বন্ধু হয়ে ওর প্রতি এমন বিশ্বাস রেখেছিলাম।আর শ্রুতি তুই ওর ভালোবাসার মানুষটা হয়ে ওর প্রতি বিশ্বাস রাখতে পারলিনা?মেরেই তো ফেলেছিলি ওকে।’

-‘ এই তোরা চুপ কর।সবগুলো গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসেছিস? নাটক করতে শিখে গেছিস না?’ চিৎকার করে বলছিলো ইশাণ।

হঠাৎ করেই ঈশাণের গালে শ্রুতির পাঁচ আঙুল বসে গেলো। ঈশাণ থম মেড়ে দাঁড়িয়ে রইলো ওর দিকে চেয়ে।

-‘ সবাই তোর শত্রু তাই না?সবাই তোর বিরুদ্ধে নাটক সাজিয়েছে তাই না? কেনো এমনটা করলি তুই? কীভাবে পারলি আমাদের সাজানো সংসার টা ভেঙ্গে দিতে? কী ক্ষতি করেছিলাম আমরা তোর? বল?’

আরো কয়েকটা থাপ্পর পড়ল ঈশাণের গালে।হঠাৎ করে ঈশাণ শ্রুতিকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো।তারপর হুংকার দিয়ে উঠল।

-‘ ক্ষতি তুই করিসনি।ক্ষতি করেছে ও।’ পুলকের দিকে তাকিয়ে বললো।

আবার বলতে শুরু করলো,-‘ পুলক আমাদের বন্ধুমহলে আসার আগেই আমি তোকে পছন্দ করতাম। ভালোবাসি কথাটা বলতে গিয়েও কখনো বলতে পারি নি। হঠাৎ করেই পুলক কোথা থেকে উড়ে এসে তোর মনে জায়গা করে নিলো।আমি বলতে গিয়েও কিছু বলতে পারলাম না। দেখলাম তুই অনেক হ্যাপি তোদের রিলেশনশিপে।আস্তে আস্তে তোদের থেকে দূরে সরে গেলাম।সহ্য হতোনা তোদের একসঙ্গে দেখলে।ভেতরটা পুড়ে জ্বলে যেতো।তোদের বিবাহবার্ষিকী তে তোকে ওইভাবে নতুন বউয়ের সাজে দেখে আমার সেই পুরোনো ঘা টা আবার তাজা হয়ে গেলো।তাও বহুকষ্টে নিজেকে সামলিয়েছি এই ভেবে তুই এখন অন্য কারো।তারপরও নিজেকে বেঁধে রাখতে পারি নি।তোকে আরো একবার দেখার লোভটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠতো। চলে এলাম অন্য একদিন তোর সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু সেদিন পুলকের ব্যবহার আর আমাকে দেখিয়ে তোর সঙ্গে পুলকের ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে খাওয়া আমাকে একরকম পাগল করে দিচ্ছিলো।ভেতরে ভেতরে পুলককে খুন করে ফেলার একটা ঝোঁক কাজ করছিলো।কিন্তু সেই ঝোঁকটাও সামলে উঠলাম।নিজেকে একদম নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করতে শুরু করলাম।ভুলে যেতে চাইলাম পুলকের সেদিনকার ব্যবহার। তারপর যেদিন তোর বাসায় এসে তোর কাছ থেকে পুলকের অবহেলার কথাগুলো জানলাম মনে মনে খুব খুশি হচ্ছিলাম। ভাবতে থাকলাম এভাবে যদি তোদের সম্পর্কটা নষ্ট হয়ে যায় তারপরই আমি তোকে আমার প্রতি কনভিন্স করার চেষ্টা করবো।আর রবিন যখন পুলকের ব্যাপারে ওই ঘটনাগুলো বললো প্রথমে আমার বিশ্বাস না হলেও আমি এতটায় খুশি হয়েছিলাম যে তখন আমি সব ভেবে নিলাম খুব বেশি সময় লাগবেনা তোদের সম্পর্কটা নষ্ট হতে।’

-‘ এরপরই তুই প্ল্যানগুলো করে ফেললি তাইনা?’ পুলক বললো।

-‘ তিনটা বছর নষ্ট করলি আমাদের জীবনের।কতোটুকু উপকার পেলি এগুলো করে?

কথাটা বলেই পুলক এসে ঈশাণের চোয়ালে একটা ঘুষি বসিয়ে দিলো।মার খেয়ে তাল সামলাতে না পেরে ঈশাণ টেবিলের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল।রেগে উঠে দাঁড়িয়ে স্যুটের ভেতর পকেট থেকে পুলিশের লাইসেন্সকৃত পিস্তল পুলকের দিকে তাক করে ধরে বললো, -‘ এতকিছু করে যখন উপকার পাইনি তাহলে তোকে খুনই করি।’

শ্রুতি,রিয়া আর ধ্রুব তিনজনই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে গেলো ভয়ে।পুলকের রাগ তখন আরো দ্বিগুণ হয়ে গেলো।পিস্তলকে তোয়াক্কা না করে ওর চোয়ালে আরো একটা ঘুষি মাড়ল।

-‘ আর কতো নিচে নামবি?আমাকে খুন করলে তুই নিজে এই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারবি?পুরো জীবনটায় তোর শেষ হয়ে যাবে।’

ঈশাণ টেবিলের ওপর হুমড়ি দিয়ে পরে রইলো।প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে ওর।এভাবে কারো ক্ষতি করে নিজে কোনোদিন সুখী হওয়া যায় না।আর ভালোবাসা এ তো ঈশ্বর কতৃক দান। এই জিনিস ঈশ্বর যাকে দিবেন শুধু সেই তার অধিকার পাবে। জোর করে তা বা মিথ্যা দিয়ে তা কোনোদিনও অর্জন করা সম্ভব না। কাঁদতে কাঁদতে সে উঠে দাঁড়ালো।কোনো দিকে না তাকিয়ে টলতে টলতে বেরিয়ে গেলো শ্রুতির বাড়ি থেকে।
_______________________

-‘ কিছু বলছোনা যে? ক্ষমা করবেনা আমাকে?’

-‘ তুমি কী অপরাধ করেছো যে তোমাকে ক্ষমা করবো?’

-‘ এতটা অনুরাগ চেঁপে রেখোনা আমার প্রতি।মারতে ইচ্ছা করলে মারো, হাত পা বেঁধে যেমন খুশি তেমন শাস্তি দাও। তবুও মুখ ফিরিয়ে থেকো না।’

-‘ কী চাইছো তুমি?’

-‘ তুমি বুঝতে পারছোনা?’

-‘ বোঝার ক্ষমতা আজ কাল খুব কম।’

-‘ নিয়ে যাবেনা আমাকে তোমার সঙ্গে?’

-‘ গিয়ে কী করবে?’

শ্রুতি এতসময় পুলকের পাশে বসে ওর বাহু জড়িয়ে ধরে কথা বলছিলো।হুট করে ওর পাশ থেকে উঠে এসে ওর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল।

-‘ আমাকে একা ফেলে চলে যাবে?আমার ভুলের শাস্তি আমাকে এভাবে দেবে?’

কান্নার বেগ বেড়ে গেছে শ্রুতির।পুলক ওর দিকে না তাকিয়ে বললো, -‘ ভুলের শাস্তি তুমি আর পেলে কই?পেলাম তো আমি।আর ভবীষ্যতে যাতে না পেতে হয় তাই…..’

-‘ তাই কী?’
পুলক নিশ্চুপ।
-‘ বলো তাই কী?

পুলক এবার ওর দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ শক্ত করে তেজী গলায় বললো,-‘ এরপর যদি কেউ আবার এমন কোনো নাটক তৈরি করে আমার বিরুদ্ধে তখনও যে তোমার বিশ্বাস নড়বড়ে থাকবে না আমার প্রতি তার কী গ্যারান্টি? আমি পারবোনা এত বার বার ধাক্কা খেতে।আমার এত্ত এনার্জি নাই ধাক্কা সামলানোর।’

-‘ দিবোনা তো আর।’ কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো শ্রুতি।পুলক ধমকে প্রশ্ন করলো, -‘ কী দিবা না?’

-‘ ধাক্কা।’

-‘ আমার জায়গায় থাকলে তুমি কী করতে বলো তো?’

-‘ অনেস্টলি বলি?’

পুলক দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে তাকিয়ে আছে।

-‘ আনলিমিটেড থাপ্পড় লাগাতাম তোমার গালে।’

-‘ ব্যাস! আর কিছুই না?’

-‘ বাজে স্ল্যাং ইউজ করতাম।’

-‘ এটুকুই?’

-‘ অবশ্যি আরো একটা কাজ করতাম।কিন্তু সেটা বলবোনা।’

-‘ আমি তো শুনতে চাইছি।’

-‘ বলা রিস্ক।’

-‘ রাত ন’টা বাজে।আমাকে যেতে হবে।কাল সন্ধ্যে ফ্লাইট। অনেক গোছগাছ বাকি আছে।’ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে বললো।

-‘ না প্লিজ!’

-‘ না প্লিজ কী? আমাকে যেতে হবে না? তোমার রং তামাশা দেখবো বসে?’

-‘ আরে বললাম তো আমাকে যা শাস্তি দেওয়ার দাও।যা খুশি বলো, যা খুশি করো।তাও আমাকে ছেড়ে যেওনা।’

-‘ আমার আইডিয়া নেই কী করে শাস্তি দেওয়া যায়।’

-‘ আমি তো কিছু আইডিয়া দিলাম।’

-‘ শেষ একটা আইডিয়া দাওনি।’

মুখটা কাচুমাচু করে বসে আছে শ্রুতি।কী করে এমন একটা শাস্তির কথা বলবে সেটাই ভাবছে।তবুও ও তো বলেছে ও অনেস্টলি বলবে।মুখটা নিচু করে বললো, -‘ তোমাকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য সত্যি সত্যি কারো সাথে…..’

-‘ কারো সাথে কী? থেমে গেলে কেনো?’

পুলক বেশ এনজয় করছে শ্রুতির অবস্থাখানা।কথাটা ওর মুখ থেকে বের করে তবেই এখান থেকে যাবে ও।বললো, -‘ বলবে নাকি আমি উঠবো?’

-‘ না।সত্যি কারো সাথে প্রেম করে তোমার সামনে এসে দেখাতাম।’

-‘ তোমার আইডিয়া গুলো আমার পছন্দ হয়েছে।তার জন্য তোমাকে আমার সঙ্গে নিবো।তবে আমি শুধু প্রেম করবোনা। বিয়েও করবো তোমাকে চরম শিক্ষা দেওয়ার জন্য।’

তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো, -‘ চলো এখন।’

-‘ বিয়ে করতে মানে? আমি কী বিয়ে করতাম?কখনোই না।’

-‘ আজকে কী করছিলে?’

-‘ এটা আমার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল।’

-‘ আর এটা আমার সঠিক সিদ্ধান্ত।’

-‘ আমার সামনে তুমি অন্য একটা মেয়ের সাথে…..’

-‘ শোবো, ঘুমাবো।’

-‘ যাবোনা।যাও তুমি।’ উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললো।

-‘ যেতে তোমাকে হবেই।আইডিয়া দিয়েছো শাস্তির।আর শাস্তি খাবে না? চলো……’

টানতে টানতে শ্রুতিকে নিয়ে চলে গেলো পুলক।হয়তো কিছু সময় বাদেই অনুরাগের পালা শেষ করে ভালোবাসার শাস্তির পালা শুরু হবে তাদের মাঝে।

_

অনুরাগ 11 পর্ব

অনুরাগ 11 পর্ব

লেখিকাঃ #Israt_Jahan

-‘ কী হয়েছে শ্রুতি?কোনো সমস্যা?’

দু চোখ বেয়ে পানির সঙ্গে আগুন ঝরছে শ্রুতির চোখে।ঈশাণের দিকে ভয়াবহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ও।ঈশাণ আবার ও প্রশ্ন করলো,-‘ কী হয়েছে? এভাবে দেখছিস কেনো? দেখি কাগজ টা দে তো আমার কাছে।’

শ্রুতির হাত থেকে কাগজটা নিয়ে ঈশাণ পড়তে আরম্ভ করলো।প্রথম অংশ পড়ে তেমন কিছুই মনে হলো না ওর কাছে।শেষের দিকে এসে যা পড়ল তা পড়ার পর ওর হাত কাঁপতে শুরু করলো।যে মেয়েটিকে পুলক ওর বোন ভেবে নিয়েসেছিল সে সত্যিই পুলকের বোন ছিল না ঠিকই। কিন্তু পুলকের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দিয়েছিল মেয়েটি তা সম্পূর্ণ সাজানো কথা ছিল।আর এই কথাগুলো শিখিয়ে দিয়েছিল ওই পতিতালয়ের সর্দারনী।কেনো এই কথাগুলো শিখিয়ে দিয়েছিল সেটাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে ওখানে।সবকিছু পড়ার পর ঈশাণ জোর গলায় বললো,-‘ শ্রুতি তুই ওর এসব কথা বিশ্বাস করছিস?ও তোকে যে এসব মিথ্যা বলছেনা তার প্রমাণ কী? ওর কাছে শোন যে কথাগুলো এখানে লিখা আর তা যে সত্যিই ওই মেয়েটির আর তার সর্দারনীর জবানবন্দী তার সত্যতা কী?’

শ্রুতি এবার সত্যিই দ্বিধায় পড়ল।সত্যিই তো! পুলক যে সবটাই সত্যি বলছে তার প্রমাণ কী?ও যদি সত্যিই বলে থাকে তাহলে এই তিনটা বছর ও কেনো শ্রুতির সামনে এলো না?এই কথাগুলো এই তিন বছরের মধ্যে কেনো ওকে বললো না?
শ্রুতি প্রশ্নচোখে পুলকের দিকে তাকাতে পুলক একটু একপেশে হাসল।তারপর বললো,

-‘ মেয়েটাকে আমি ঢাকা নিয়ে আসার পূর্বেই ঈশাণ নিজে ভালোভাবে যাচাই করে দেখেছে।আমি যে মেয়েটির সঙ্গে ঘোরাফেরা করেছি তার পরিচয় আসলে কী?এবং অবশেষে জানতেও পারলো আমি তাকে নিজের বোন ভেবে ওই পতিতাবৃত্তি থেকে তাকে মুক্তি দিয়ে নিজের বোনের পরিচয় দিতে যাচ্ছি।ঠিক তখনই ঈশাণ ওখানকার সর্দারনীর সাথে আলাপ করলো।পরিষ্কার হওয়ার জন্য জানতে চাইলো মেয়েটি সত্যিই আমার বোন কিনা।তখন সে তো আরো একটি সত্যি ঈশাণকে জানিয়ে দিলো যে সত্যটা আমি তখন জানতাম না।
আমার মামা আমার বোন কে যেখানে রেখে এসেছিল সেখান থেকে তারা কোথায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে যে ওকে বিক্রি করে দিয়েছে তাও তাদের মনে নেই।শুধুমাত্র নিজের চিকিৎসার টাকার জন্য মামা এমন একটা নাটক করেছিলো।
অন্য একটা মেয়েকে আমার বোন বানিয়ে দিলো।আর ওই সর্দারনীকে শিখিয়েও দিলো আমি খোঁজ নিতে এলে যেনো সে এটাই বলে ওই মেয়েটিই আমার বোন। সে তাই ই করলো।এতগুলো মিথ্যা কথা সে এই আশাতেই বলেছিলো সে জানতো আমি টাকার মায়া না করে আমার বোনকে এখান থেকে মুক্ত করে নিয়ে যাবো।আর এই ব্যাপারটা সে এমনি এমনি ঈশাণকে বলে দেয়নি।ঈশাণ তাকে আমার চেয়েও টাকার পরিমাণ বেশি দিয়ে কথাগুলো জেনেছে।আর তারপর ও আরো কিছু টাকা দিয়ে একটা কাহিনী সাজিয়ে ফেললো আমি ওই মেয়েকে ঢাকায় নিয়ে আসার আগেই। মেয়েটাকে শিখিয়ে দেওয়া হলো আমার বাসায় তাকে আনার পর সে যেনো বলে আমি তাকে বোনের পরিচয়ে নয় নিজের ভোগের বস্তু করে নিয়েসেছি।মেয়েটি তাই ই করলো।এবং শর্তমোতাবেক মেয়েটিকে ও আরো কিছু টাকা দিয়ে ঢাকার শহর থেকে ভাগিয়ে দিলো।’

-‘ এই একদম চুপ।একদম বাজে কথা বলবি না।এতদিন পর এসে একটা মিথ্যা কাহিনী বানিয়ে এনে কী সুন্দর সাজিয়ে সাজিয়ে বলছিস।আর ভাবছিস খুব সহজেই তা শ্রুতি বিশ্বাস করে নিবে।আর কতো ক্ষতি করতে চাইছিস মেয়েটার? আর কত অমানুষ হবি?’ ঈশাণ পুলকের কলার চেপে ধরে হুংকার দিয়ে বললো।

অনুরাগ পর্ব ১০

অনুরাগ
পর্ব ১০
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

-‘ কোথায় ঘাপটি মেরে ছিলি বল তো এই তিনটা বছর?’ (নিশাদ)
-‘ আমি কী আসামি নাকি যে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকবো?’

গ্লাসে ড্রিংক ঢেলে নিতে নিতে কথা বলছে পুলক।ওর দিকে কয়েক জোড়া চোখ বিস্ময় আর প্রশ্ন ভরা চোখে তাকিয়ে আছে। রিয়ার পাশে এসে বসলো পুলক।সবার দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে শ্রুতির দৃষ্টিকে লক্ষ্য করে বললো, ‘ কী সমস্যা?এভাবে তাকিয়ে দেখছো কেনো আমাকে? এ্যাম আই লুকিং আগলি?’

শেষ প্রশ্নটা রিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললো পুলক।রিয়া ভ্রু জোড়া উঁচু করে একটা হাসি দিয়ে বললো, ‘ নো।মোর দ্যান ড্যাস্যিং।’

শ্রুতি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলো।ঈশাণকে বললো, ‘ আমায় বাসায় ফিরতে হবে।আমি উঠছি।’
-‘ চল আমি তোকে নামিয়ে দিয়ে আসি।’
-‘ আরে আরে আজকে কে কখন ফিরবো তার ঠিক নেই। অনেক দিন বাদে সবাই একসাথে।কোনো উঠাউঠি নেই।আজ অনেক মজা হবে।’

ধ্রুবর কথার সঙ্গে পুলক একটা রহস্যভরা হাসি মেশালো। হাসিটা ঈশাণের চোখ এড়ালো না।এর মধ্যে অনেকেই পুলে নেমে পড়েছে।কেউ এখানে ডেট শুরু করে দিয়েছে, কেউ বা মিউজিকের তালে হেলছে-দুলছে।মোটামোটি যে যার মতো এনজয় করতে ব্যস্ত।শুধু একটা জায়গায় বসে আছে, পুলক,রিয়া, শ্রুতি,ঈশাণ,ধ্রুব,মেঘলা,তানিয়া,নিশাদ আর রবিন।রিয়া আর নিশাদ উঠে হাঁটতে হাঁটতে খানিকটা দূরে চলে গেলো।পুলক ড্রিংকের গ্লাস টা নিচে নামিয়ে রাখলো। হঠাৎ করেই চোখ পড়লো ঈশাণের হাতের দিকে।শ্রুতির হাঁটুর কিছুটা উপরে ওর হাতটা।শ্রুতি ও বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে ওর হাতটা গ্রহণ করে বসে আছে।একটা গম্ভীর নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো পুলকের মাঝ থেকে।কিন্তু ওদের দুজনকেই খুব অপ্রস্তুত লাগছে।

-‘ তো?’

পুলকের আওয়াজ পেয়ে চমকে তাকালো শ্রুতি।চোখে মুখে উচ্ছন্ন ভরা হাসি মেখে আছে পুলকের।মনে হচ্ছে খুব চিন্তামুক্ত আর হাস্যজ্জল মানুষ একটা।তিন বছর আগে তার জীবনে যে কোনো একটা অপ্রিয় ঘটনা ঘটে গেছে সেটা তাকে দেখে মনেই হচ্ছেনা।চোখের পলক পড়ছে না শ্রুতির।এদিকে পুলকও চেয়ে আছে তার প্রাণখোলা হাসি মুখে মেখে নিয়ে।ঈশাণ শুধু তাকিয়ে দেখছে ওদের দৃষ্টি বিনিময়।এক মিনিট, দু মিনিট পার হয়ে যাচ্ছে শ্রুতি হাজারো প্রশ্নভরা চোখে তাকিয়ে দেখছে ওকে।ঈশাণ হঠাৎ করে একটু কেশে উঠল।ভাবনাগ্রস্ত শ্রুতি হুঁশে এলো তখন।পুলক খানিকটা হেসে ফেলল।

-‘ হাসছিস যে?’
-‘ হুম? আমাকে বলছিস?’

পুলকের এমন উদাসীন ভাবটা নেওয়া ঈশাণের অসহ্যবোধ লাগলো খুব।চোখ মুখ শক্ত করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো ওর থেকে।পুলক বললো, ‘ বিয়েতে কী ইনভাইটেশন পাচ্ছি?’
-‘ লজ্জা করছে না তোর?কোন মুখে এই প্রশ্নগুলো করছিস?’
-‘ অ…! লজ্জা পাওয়ার মতো কিছু বলেছি বোধহয়? এই ধ্রুব আমার প্রশ্নটা কী লজ্জা পাওয়ার মতো ছিল?’
-‘ আমি কী বলবো ভাই!’
-‘ তোরা বিয়ে করছিস এটা একটা ভালো কথা।আমি সেখানে দাওয়াত পাচ্ছি কিনা সেটা জানতে চাওয়া কী আমার অপরাধ?’
-‘ এতদিন কই ছিলি?’
-‘ স্কটল্যান্ড।’
-‘ মেয়েটাকে নিয়ে ওখানে পাড়ি জমিয়েছিস?’

রবিনের প্রশ্নে পুলকের পায়ের রক্ত মাথায় উঠে আসার মতো অবস্থা।কিন্তু না, ও এখন এই মুহূর্তে কোনো সিনক্রিয়েট করবে না।রবিনের প্রশ্ন শুনে শ্রুতি চেয়ে আছে পুলকের দিকে।অবশ্যই পুলক কী উত্তর দেয় তা শোনার আশায়।ওর বুকের ভেতরটা যে তোলপার হয়ে যাচ্ছে।পারছেনা এভাবে চুপচাপ ওর সামনে বসে থাকতে। ইচ্ছে করছে ওর কলারটা চেঁপে ধরে ওর দু’গালে বিরতিহীন চড় বসাতে।জানতে ইচ্ছা করছে এমনটা কেনো করলো ওর সাথে।শ্রুতির চোখে চোখ পরতেই পুলক দেখতে পেলো শ্রুতির চোখের আগুন।শুধু একটু হাসলো।তারপর উঠে চলে গেলো পুল সাইডে অন্যসব ফ্রেন্ডদের মাঝে।প্রশ্নটা এড়িয়ে গেলো পুলক।কিন্তু শ্রুতি যে খুব আগ্রহ নিয়ে বসে ছিল উত্তরটা শোনার আশায়।মনে মনে ভেবেই নিলো আজ ও সবকিছু পুলকের থেকে জেনে তারপর এখান থেকে যাবে।

-‘ শ্রুতি! চল আমরা ফিরি।’
-‘ না।’

অনেকটা গম্ভীর হয়ে বললো শ্রুতি।

-‘ একটু আগেই না বললি বাসায় ফিরবি?’
-‘ এখন যেতে ইচ্ছে করছে না।’

উঠে চলে এলো ঈশাণের পাশ থেকে।দূরে দাঁড়িয়ে শুধু পুলককে লক্ষ্য করছে শ্রুতি।কী সুন্দর না দেখাচ্ছে আজ পুলককে। শ্যামলা বর্ণ ছিলো গায়ের রং টা।তিন বছর পর দেখে মনে হচ্ছে গায়ের রং টা আরো পরিষ্কার হয়েছে।চশমার ফ্রেমটাও চেইঞ্জ করেছে,চুলগুলো স্টাইলিশ ব্রাশ করা।দু একটা চুল লম্বা হয়ে পরে আছে কপালে ওপর।রেড টি শার্টের ওপর ব্ল্যাক স্যুট। হাতা কনুই অবদি গুছিয়ে রাখা।এত পরিবর্তন! কে বলবে দেখে এই মানুষটার জীবনে কিছু ঘটে গেছে যা একটা মানুষের জীবন শেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।এত ভালো থাকতে দেখে পুলকের প্রতি শ্রুতির ঘৃণাবোধ টা আরো বেড়ে গেলো।ও দেখতে চেয়েছিল পুলক যেদিন ওর সামনে আসবে সেদিন ওর চেহারা হবে অপরাধবোধ আর অনুশুচোনার আগুনে দগ্ধ হয়ে যাওয়া একটা মানুষের চেহারা।আজ ওর সামনে এসেছে ঠিকই তবে যা ভেবে রেখেছিল একদম তার বিপরীত কিছু হয়ে ওর সামনে এসেছে।পুলক কানে ফোন নিয়ে পুল সাইড থেকে একটু দূরে সরে এলো একটু ফাঁকা জায়গাতে।শ্রুতি সেখানে দ্রুত হেঁটে গেলো।ও অপেক্ষাতে ছিল কখন ফাঁকা স্পেসে পাবে পুলককে।

-‘ হ্যাঁ প্রজেক্টটা আমিই কমপ্লিট করবো সমস্যা নেই।এ মাসের সাতাশ তারিখেই আমি ব্যাক করছি।টেনশান নিতে হবে না আপনাকে।’

কথার মধ্যেই দেখল শ্রুতি ওর দিকে এগিয়ে আসছে।অনেকটা কাছে চলে এসেছে ওর।ফোনের ওপাশের ব্যক্তিকে বিদায় জানিয়ে ফোনটা পকেটে ভরে নিলো।ওর দিকে তাকিয়ে সুন্দর একটা প্রাণখোলা মুচকি হাসি দিলো।

-‘ হ্যালো।’

শ্রুতি নিশ্চুপ হয়ে গম্ভীর চোখে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।চোখ দুটো উপচে পানি নেমে আসবে আসবে ভাব।পুলক বললো,
-‘ কী দেখছো এভাবে?’
-‘ একজন প্রতারক কে।’
-‘ কে প্রতারক এখানে?’
-‘ নামটা কী শুনতে ইচ্ছা করছে আমার মুখ থেকে?’
-‘ হ্যাঁ।’
-‘ কতোটা পাথর হৃদয়ের মানুষ হলে কেউ এত বড় অপরাধ করার পর ও….’
-‘ চুপ।’

ঠোঁটের ওপর অনামিকা আঙুল রেখে চোখে মুখে কঠোরতা এনে বললো পুলক।

-‘ এখনো যে আমার সামনে তুমি এভাবে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পারছো সেটাই তোমার কপাল।ধৈর্য ধরে বসে আছি শুধু।’
-‘ কী বোঝাতে চাইছো তুমি?’
-‘ কিছুনা।এখন বলো তো এঙ্গেজমেন্টের দিন ইনভাইটেশান পাচ্ছি কিনা?’
-‘ খুব শখ আসার?’
-‘ খুব।’
-‘ ঠিক আছে।চলে এসো।’
-‘ কী চায় তোমার আমার থেকে?’
-‘ অবাকের চূড়ান্ত পর্যায়ে আমি।’
-‘ ওমা অবাক হওয়ার কী হলো?কিছু চায়না তোমার?ডিভোর্স? এটাও চায়না?’

আর পারলোনা আটকে রাখতে।অশ্রুর বাঁধ ভেঙ্গে পড়লো দু চোখ থেকে।আরো বেশি কান্না পাচ্ছে পুলকের এক্সপ্রেশন গুলো দেখে।শ্রুতি কান্না করলে পুলক সেই কান্না ভেজা চোখে আর মুখে হাজারো চুমুর প্লাবন বইয়ে দিতো।আজ সেই পুলক ওর কান্না দেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কেমন একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসছে। এ কেমন পুলক?এই পুলককেই কী শ্রুতি সবটা উজার করে ভালোবেসেছিলো?এত বড় স্বার্থবাদী একটা প্রতারককে বিশ্বাস করে নিজের বাড়ি ছেড়েছিল?পুলক আজ শ্রুতির চোখের পানি নিয়ে যে খেলাটা খেলল তা শ্রুতি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ভুলবেনা। ওর কাছে এগিয়ে এসে গাল থেকে এক ফোটা পানি অনামিকা আঙুলের ডগার ওপর তুলে নিলো পুলক।তারপর বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে সেটা ঝেড়ে ফেলল।টিস্যু পেপাড় দিয়ে সেই আঙুল দুটোও মুছে নিলো।সবশেষে শ্রুতির পাশ কাটিয়ে চলে গেলো।মরে যেতে ইচ্ছে করছে শ্রুতির।এর থেকে তো সারাজীবনে দেখা না হলেও ভালো হতো।তক্ষণি শ্রুতি ছুটে চলে আসে হোটেলের বাহিরে।আর সে দেখতে চাই না এই বিশ্বাসঘাতক,প্রতারক মানুষটাকে।
_____________________

তিন বছর আগের সবকিছুকে দুঃস্বপ্ন ভেবে সামনের জীবনে এগিয়ে যাবে শ্রুতি।এমন কিছু ভেবেই সে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে।ভাববে না সে আর ওই প্রতারকের কথা।

-‘ কিরে আজকের দিনে অনন্ত এভাবে মুখটা কালো করে রাখিস না।এমনিতেই তোদের নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই।তারউপর মুখটা এভাবে কালো করে রাখলে আরো বেশি বলার সুযোগ পাবে সবাই।’

মেঘলার কথাগুলো কানে আসতেই শ্রুতি ভাবলো, -‘ সত্যিই তো! কেনো আমি মনমরা হয়ে থাকবো? আমার তো আজ থেকে জীবনের নতুন একটা অধ্যায় শুরু হতে চলেছে।আমি আজ থাকবো সবার থেকে খুশি হয়ে।’

কথাগুলো ভেবে নিজেকে একদম স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো শ্রুতি।আজকে ঈশাণের সঙ্গে শ্রুতির এঙ্গেজমেন্ট।শ্রুতির বাড়িতেই পার্টিটা এ্যারেঞ্জ করা হয়েছে।শ্রুতি আর ঈশাণের আশপাশ দিয়ে ওদের সকল বন্ধু-বান্ধব গিজগিজ করছে। কেউ ই আসতে বাকি নেই।শুধু একজন বাদে।সে তো নিজে যেচে এসে দাওয়াতটা নিয়েছিল।আসবে কী সে? সবার সাথে হেসে হেসে গল্প করছে ঠিকই।কিন্তু মনের মধ্যে সেই মানুষটার ভাবনাও ভাবছে শ্রুতি।সবশেষে এঙ্গেজমেন্টটা হয়েই গেলো। প্রত্যেকেই খুব খুশি।কিন্তু খুশি হতে পারছে না শ্রুতি।এত ঘেন্নার পরও ইচ্ছা ছিল ওই মানুষটা আসবে এখানে, একটাবার দেখবে তাকে।কিন্তু কই?সে তো এলোনা।আর আসবেই বা কোন মুখ নিয়ে।আত্মসম্মানবোধ না থাকলে ঠিকই আসতো। নিচে গার্ডেন সাইডে বসে শ্রুতি আর ঈশাণ সব ফ্রেন্ডদের সঙ্গো আড্ডাই ব্যস্ত ছিলো।এরই মাঝে পুলক এসে উপস্থিত হলো।

-‘ আড্ডা তো বেশ জমেছে।আমি কী জয়েন করতে পারি?’

সবাই ফিরে তাকালো ওর দিকে।বাহ্ বেশ তো লাগছে আজ দেখতে পুলককে।পুলকের পরনে আজ শ্রুতির দেওয়া শেষ উপহারের হোয়াইট স্যুট এন্ড প্যান্ট।তার সঙ্গে স্যুটের নিচে হালকা পিংক কালার একটা শার্ট।পকেটে দু’হাত পুরে ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি বজায় রেখে দাঁড়িয়ে আছে সে।নজরটা রয়েছে শ্রুতির দিকে।শ্রুতিও আজ হোয়াইট আর পিংক কালার মিক্সড একটা ল্যাহেঙ্গা পরেছে।যার জন্যই সবাই একবার শ্রুতিকে দেখছে আবার পুলককে দেখছে।পুলকের আগমন সবাইকে অবাক করে দিয়েছে শুধু ধ্রুব ছাড়া।সে এসে ওকে বললো,
-‘ আমি তো ভাবলাম তুই বোধহয় রুমে বসে কাঁদছিস আর টিসু পেপাড়ে চোখ মুছছিস।’
-‘ কী যে ভাবিস না আমাকে তোরা!’
-‘ তুই এখানে?’

ঈশাণ রাগে গম গমে ভাব নিয়ে প্রশ্নটা করলো পুলককে।ভদ্রতা বজায় রেখে পুলক উত্তর দিলো,-‘ তোর হবু বউয়ের কাছ থেকে সেদিন ইনভাইটেশান পেলাম।অবশ্য আমিই যেচে পড়ে নিয়েছিলাম।খুশি হোস নি বুঝি?’

শ্রুতির নজর মাটির দিকে।সে না পারছে পুলকের দিকে তাকাকে আর না পারছে ওর সঙ্গে কথা বলতে।চোখ ফেটে ভেতরে সব কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে।এতটা কষ্ট তো ওর হওয়া উচিত না।পুলক তো বেশ আছে।তাহলে ও কেনো এত কষ্ট পাবে?

-‘ আমি এসেছি তার কারণটা তুই না বুঝলেও তোর বউ বুঝে গেছে।’

পুলকের কথায় শ্রুতি এতক্ষণে টের পেলো।পুলক এসেছে ওকে ডিভোর্স পেপাড় টা দিতে।কাগজে কলমে সারাজীবনের জন্য আজই ওদের বিচ্ছেদ ঘটবে।পারবে কী শ্রুতি ওই কাগজে একটা সই করে সারাজীবনের জন্য ওকে ত্যাগ করতে?হুহ্ মনের বিচ্ছেদটা তো কবেই ঘটে গেছে।তাহলে কাগজে কলমে বিচ্ছেদটা মেনে নিতে আর সমস্যা কোথায়?নিজেকে সামলে একদম স্বাভাবিক করে উঠে এলো পুলকের সামনে।

-‘ কই? কাগজটা দাও।’

পুলক কাগজটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।শ্রুতির চোখের দিকে তাকিয়ে কাগজ ওর দিকে এগিয়ে ধরলো।
_________________

বাগানের ভেতরটায় যেখানে নিরিবিলি বসার জন্য একটা ছোট টেবিল আর দুটো চেয়ার সেখানে গেল ওরা দুজন।সাথো এলো ঈশাণও।কাগজটা হাতে নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে শ্রুতি যখন সই করতে গেলো তখন পুলক বললো,-‘ অন্ততপক্ষে একবার চোখটা বুলিয়ে নাও।পড়ে দেখো কাগজে কী লেখা আছে।এত তাড়া কিসের?বিয়েটা তো আর আটকে দিচ্ছি না।’

ঈশাণ এগিয়ে এসে বললো,-‘ শ্রুতি কাগজটা দে তো দেখি।’
-‘ ডিভোর্সটা আমার আর তোর শ্রুতির হচ্ছে।তোর ভূমিকা এখানে না থাকলেও চলবে।স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাক।’

ঈশাণ ক্রুদ্ধ চোখে চেয়ে আছে পুলকের দিকে।পুলকের চাহনি ও ঠিক একই রকম।শ্রুতি কাগজটা হাতে নিয়ে যখন পড়তে শুরু করলো তখন পুলক আবার বললো,-‘ চেয়ারটাতে বসো তারপর পড়ো।’

শ্রুতি একটু সময় ওর দিকে চেয়ে থেকে চেয়ারে বসল।তারপর পড়তে আরম্ভ করলো।শুরুর দিকে আইনীভাবে কাগজে যা লেখা থাকে সেগুলোই লেখা।তারপর নিচে নামতে নামতে যে লিখাগুলো ছিল তা পড়তে পড়তে শ্রুতির গলা শুকিয়ে আসছিলো।মনে হচ্ছিল ওর পায়ের নিচের জমিন কেঁপে উঠছে বার বার।এর জন্যই বোধহয় পুলক ওকে বসে পড়তে বলেছে।

_

অনুরাগ ৯ম পর্ব

অনুরাগ
৯ম পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

 

-‘ বিয়েটা কেনো করছিস না বল তো?ঈশাণ কিন্তু সত্যি খুবই পছন্দ করে তোকে।আর সেটা ভার্সিটি টাইম থেকেই।ও এখনো তোর জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে।আর তুই অপেক্ষা করে আছিস ওই বেঈমানের জন্য?’

শ্রুতি নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে।এই তিনটা বছর শ্রুতি কীভাবে কাটালো তা নিজেরও অজানা।এর মাঝে অনেকবার মনে হয়েছে যে পুলকের সাথে একটাবার কথা বলা উচিত।কিন্তু রাগ অনুরাগ তাকে আটকে ধরে রেখেছিলো।আর যখন সেই রাগ অনুরাগকে ভুলে গিয়ে পুলকের খোঁজ নিতে গেলো তখন আর পুলককের অস্তিত্ব পাওয়া গেলো না।সবাই বলছে পুলক হয়তো সেই বাবলী মেয়েটার সঙ্গে দূরে কোথাও সংসার পেতেছে কিংবা অন্য কাউকে নিয়ে।কিন্তু শ্রুতির মনে হচ্ছে পুলক ভালো নেই।

-‘ শ্রুতি?কথা বলছিস না কেনো?

মেঘলার ডাকে শান্ত চোখে ওর দিকে ফিরে তাকালো।

-‘ তোর কী মনে হয় পুলক সত্যিই কাউকে….?’
-‘ শ্রুতি!’
-‘ প্লিজ বল না?’
-‘ আমি জানিনা কিছুই।ওর ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে নামা প্লিজ।ও যদি কোনো অপরাধ করে না থাকে তাহলে তোর সাথে কেনো আর যোগাযোগ করলোনা বল।ও তোকে একসময় এমনিতেই ছেড়ে চলে যেতো।কিন্তু তার আগেই তো…..’

মেঘলার কথার মাঝে ওর ফোন বেজে উঠলো।ফোনে কথা বলা শেষে শ্রুতিকে বললো, ‘ঈশাণ আসছে এখানে।তোর ফোন রিসিভ হচ্ছেনা বলে আমাকে ফোন করেছে।’

-‘ ও এখানে এসে কী করবে?’
-‘ কী করবে আবার?কফি খাবে আমাদের সঙ্গে।শোন আজ সবকিছু তোদের মাঝে ক্লিয়ার করে নে।ঈশাণ সত্যি তোকে ভালোবাসে রে।ও তোকে অনেক ভালো রাখবে।’

সেদিনের কথার পর শ্রুতি আর ঈশাণ কে ফিরিয়ে দিতে পারে নি।ঈশাণের ওর মুখ থেকে হ্যাঁ শব্দটি না শোনা পর্যন্ত জায়গা থেকে এক চুল পরিমাণ ও নড়েনি।শ্রুতির হাতটা ধরে বসেই ছিল শুধুমাত্র ওর মুখ থেকে হ্যাঁ শব্দটি শোনার জন্য।অবশেষে শ্রুতি আর ফিরিয়ে দিতে পারে নি ওকে।সেদিন রাতেই ঈশাণ ওর বাবা-মা কে নিয়ে শ্রুতির বাড়িতে যায় শ্রুতিকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিতে।ঈশাণের মতো ছেলের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার মতো ইচ্ছা কোনো বাবা-মায়ের ই নেই।শ্রুতির বাবা-মা ও পারে নি।সবশেষে রিসেন্ট মান্থেই ওদের এঙ্গেজমেন্টের ডেট ফিক্সড করেছে তারা।
.
.
.
-‘ আচ্ছা তোরা এ্যারেঞ্জমেন্ট কর। ওকে নিয়ে আসার দায়িত্ব আমার।ওকে রাখছি।’
-‘ ঈশাণ আমি কোথাও যাবোনা। প্লিজ আমাকে জোড় করিস না।’
-‘ কেনো যেতে চাইছিস না তুই?আচ্ছা তুই কী আমাকে মেনে নিতে পারছিস না এখনো?’
-‘ তেমন কোনো বিষয় না।আমার ভালো লাগছে না।’
-‘ ভালো লাগাতে হবে শ্রুতি।২-৩ বছর আগেও আমরা সব ফ্রেন্ডরা এমন কতো ইভেন্ট তৈরি করেছি।কতো এনজয় করেছি সেইসব ইভেন্টগুলো।তাহলে আজ কেনো করবি না?এভাবে লাইফটাকে থামিয়ে রাখার কোনো মানেই হয়না।’

শ্রুতি ঈশাণ কে কী করে বোঝাবে যে এমন ধরনের ইভেন্টে জয়েন করা মানেই পুলকের স্মৃতিগুলো ওকে চারপাশ থেকে ঘিরে রাখে।সেইসব ইভেন্টগুলোর মূল ইভেন্ট প্ল্যানার ছিল যে পুলক।সেই সময়গুলোতে দুজন কতো মিষ্টি মধুর সময় কাটিয়েছে ওরা।আর আজ এখন সেই ইভেন্টে সবাই থাকবে শুধু থাকবে না পুলক।

-‘ তুই নিশ্চই পুলকের কথা মনে করে ইভেন্টে যেতে চাইছিস না?’
-‘ (নিশ্চুপ)’
-‘ যদি এটাই তোর না যাওয়ার মূল কারণ হয় তাহলে আমি তোকে বাধ্য করবো ইভেন্টে জয়েন করতে।কারণ আমি চাই না তুই ওই প্রতারকের স্মৃতি মাথায় রেখে সব আনন্দ খুশি থেকে নিজেকে দূরে রাখবি।এখন তুই কী চাস বল?আমি তোকে বাধ্য করবো আমার সঙ্গে যেতে নাকি তুই নিজেই যাবি?’

অগত্যা শ্রুতি পুলকের সঙ্গে একটি হোটেলে গেলো ওদের ফ্রেন্ডদের গেট টুগেদার পার্টিতে।সেখানে তানিয়া,মেঘলা,নিশাদ,রবিন ছাড়াও ভার্সিটির আরো কিছু ফ্রেন্ড এসেছে।পার্টিটা হচ্ছে হোটেলের মধ্যে সুইমিং প্লেসের সাইডে।চারপাশ অসম্ভব আলো আর মিউজিকের জোরালো শব্দে শ্রুতির মাথা ধরে আসছে।সবাই ইতোমধ্যে শ্রুতি আর ঈশাণের বাগদানের কথা জেনে গেছে।খুব ইয়ারকি মজা করছে সবাই ওদের সঙ্গে।এর মধ্যে ওদের একটি ফ্রেন্ড ধ্রুব এসে ঈশাণকে বললো, ‘ সেই তো ওকে ভাগিয়েই নিলি।তো পুলকের সঙ্গে বিয়েটা হওয়ার আগেই ভাগিয়ে নিতি।বিয়ের পরে কেনো দোস্ত?’
-‘ ভাগিয়ে নিয়েছি এটা কেমন কথা ধ্রুব?কথা সংযত হয়ে বল।’
-‘ অদ্ভুত!রেগে যাচ্ছিস কেনো?কথাটা কী শুধু আমি একা বলছি? এখানে যারা উপস্থিত সবাই একই কথা বলছে।’
-‘ সবাই বলছে মানে?সবাই কী বলছে?’
-‘ আচ্ছা থাক বাদ দে।যা বলেছি তো বলেছি।ওসব কথা থাক। এসেছি এনজয় করতে।ভাগাভাগি প্রসঙ্গ থাক।চল ওদের কাছে যাই।’
-‘ দাঁড়া শ্রুতিকে ডাকি।’
-‘ আরে ও তো আছে মেঘলাদের সঙ্গে।তুই আয় আমার সাথে।’

হাতে সফ্ট ড্রিংকসের গ্লাস নিয়ে দাঁড়িয়ে ঈশাণ সবার সঙ্গে কথা বলছে।কথার এক পর্যায়ে ঈশাণ জানতে চাইলো আজকের ইভেন্টের মূল প্ল্যানার কে?শুভ নামের একটি ফ্রেন্ড বললো, ‘ কেনো তুই জানিস না?’
-‘ না তো।কে?’
-‘ কী যে বলিস।এতকাল ধরে ইভেন্টগুলো কে তৈরি করে? সেই ই করেছে।’

ঈশাণ কিছুটা গম্ভীর হয়ে গেলো শুভ’র কথা শুনে।চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।বললো, ‘কার কথা বলছিস।ভালো করে বল।’
-‘ থাক আর জানতে হবে না।একটু পর নিজের চোখেই দেখে নিস।’

-‘ এই শ্রুতি তোদের কী আকদটা হয়ে গেছে?’
-‘ আরে না।এ মাসের ছাব্বিশ তারিখে এঙ্গেজমেন্ট।তারপরই বিয়ের ডেট ফিক্সড হবে।’
-‘ আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?কিছু মনে করবি না তো?’
-‘ রিয়া তুই কী জিজ্ঞেস করতে পারিস তা আমি জানি। না, আমার আর ওর ডিভোর্সটা এখনো হয়নি।ও কোথায় আছে আমি নিজেও জানিনা।’
-‘ তাহলে ডিভোর্স ছাড়া……’

রিয়ার কথা শেষ হওয়ার আগেই ইভেন্ট প্ল্যানার এসে উপস্থিত। সবাই তার সঙ্গে জাপ্পি নিতে ব্যস্ত।

-‘ এবারের ইভেন্ট প্ল্যানার কে?’
-‘ গিয়ে দেখে আয় কে।’

রিয়ার মুখের দিকে চেয়ে দেখলো শ্রুতি।রিয়া ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।রিয়ার থেকে চোখ ফেরাতেই ঈশাণের দিকে চোখ পড়লো শ্রুতির।কেমন বিষণ্নতার ছাপ চেহারায় দেখতে পাচ্ছে ও।

-‘ চল দেখা করে আসি ওর সাথে।অনেকদিন বাদে দেখা হচ্ছে।’

রিয়ার সাথে এগিয়ে গেলো সকলের মাঝে সেই ইভেন্ট প্ল্যানারের সাথে দেখা করতে।বুকের ভেতরটা কেমন যেনো ছটফট করছে।মানুষটা কে হতে পারে এটা ভেবেই বড্ড অস্থির লাগছে শ্রুতির।শ্রুতির পাশে এসে দাঁড়ালো ঈশাণ।সে নিজেও এক্সাইটেড মানুষটা কে হতে পারে তাকে দেখার জন্য।

_

অনুরাগ ৮ম পর্ব

অনুরাগ
৮ম পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

-‘আমি কী তোমার বাসায় যাচ্ছি?’
-‘হ্যাঁ।’
-‘সত্যি?’
-‘মিথ্যা হবে কেনো?’
-‘আমি কী আজ থেকে তোমার সঙ্গেই থাকবো?’
-‘অবশ্যই।আমার সঙ্গে থাকবেনা তো কার সঙ্গে থাকবে তুমি?’
-‘ওখানে আর আমাকে ফিরে যেতে হবেনা? ওরা যদি আমাকে কখনো নিতে আসে আবার?’
-‘আর আসবেনা ওরা বাবু।তুমি এত চিন্তা করছো কেনো?এখন তো আমি আছি তোমার সঙ্গে তাইনা?’

গাড়িতে বসে পুলক বাবলীর সঙ্গে কথা বলতে বলতে বাড়িতে পৌঁছে গেলো।বাবলী ছোট বাচ্চাদের মতো পুলকের বাহু জড়িয়ে ধরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।শ্রুতি কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দরজা খুলে ওদের দুজনকে একসাথে দেখে না চাইতেও চমকে গেলো।
পুলকের ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।আর বাবলী মেয়েটা খুব ভীত চোখে তাকিয়ে দেখছে শ্রুতিকে।
শ্রুতি দরজার মুখের সামনে থেকে সরে দাঁড়াতে ওরা ভেতরে ঢুকলো।ড্রয়িংরুমে তানিয়া,মেঘলা, ঈশাণ,রবিন,নিশাদ সবাই বসে আছে।সবারই মুখের ভাবটা গম্ভীর।পুলকের সঙ্গে ছবিতে দেখা ওই মেয়েটিকে দেখে সবাই বেশ চমকে উঠলো। কেউ কিছু বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছেনা।শুধু তাকিয়ে দেখছে দুজনকে।

-‘বাহ্ তোরা সবাই আছিস দেখছি।ভালোই হয়েছে।সবটা সবার সামনেই পরিষ্কার হবে।’
রবিন বললো, ‘ও কে পুলক?’
-‘ও বাবলী।’
-‘সেটা তো ওর নামের পরিচয়।’

শ্রুতি শান্ত ভঙ্গীতেই বললো পুলককে।পুলক বললো, ‘ও আমার ছোট বোন শ্রুতি।আমার একমাত্র ছোট বোন।যাকে আমি সেই এগারো বয়স হারিয়েছিলাম।’

পুলকের উত্তরে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেলো।শ্রুতিও একদম চুপ হয়ে গেলো।ওরা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে শুধু।ঈশাণ হঠাৎ এর মধ্যে খিক করে হেসে উঠল।বললো, ‘কারো কোনো কমেন্ট আছে?’

সবাই নিশ্চুপ।এ্যাটেনশন এখন সবার ঈশাণের দিকে।পুলকও চেয়ে আছে ওর দিকে।কী বলতে চাই তা শোনার আশায়।ঈশাণ উঠে এসে পুলকের সামনে দাঁড়াল পকেটে হাত গুজে।বললো, ‘এত লো ক্লাসেস বুদ্ধি পাস কই?’

-‘তোর সমস্যা কোথায় বল তো ঈশাণ?’
-‘এটা তো আমি জিজ্ঞেস করবো আমি?কেনার সময় কী বোন বলে কিনেছিস?’
-‘ঈশাণ….!’

চিৎকার করে উঠলো পুলক।ঈশাণ আবারো বললো, ‘কিনেই তো এনেছিস।মিথ্যে বলেছি কী?রবিন স্বাক্ষী আছে এখানে।আর সব থেকে বড় স্বাক্ষী ওখানকার সর্দারনী।ফোন দিই?কী বলিস?তুই দিবি নাকি আমি দিবো?’

ঈশাণ পুলককে সর্দারনীর নাম্বারটা দেখিয়ে কল করলো তাকে।কলটা স্পীকার করে সবাইকে শুনালো পুলক কীভাবে কত দামে বাবলীকে ওখান থেকে কিনে নিয়েসেছে।আর সব থেকে বড় যে কথাটা সেটা হলো সর্দারনী জানিয়েছে বাবলীকে পুলক বিয়ে করবে বলে সে ওকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়ে কিনে এনেছে।কোন বোন পরিচয়ে আনেনি এখানে।শ্রুতি ধপ করে ফ্লোরে বসে পরলো।মেঘলা,তানিয়া ওকে দ্রুত গিয়ে ধরে বসল।পুলক ঈশাণের কাছ থেকে ফোনটা কেড়ে নিয়ে সর্দারনীকে বললো, ‘এই কী বলছেন আপনি?এসব কী বলছেন?বাবলীকে আমি বিয়ে করবো বলে…..।ছিঃ ও আমার বোন।আমি কত কষ্টে ওর সন্ধান পেয়েছি আপনি জানেন।হ্যালো হ্যালো…..?’

ওপাশ থেকে ফোনটা কেটে গিয়েছে।পুলক ঘুরে তাকিয়ে দেখলো শ্রুতি মেঘলার বুকে মাথা রেখে ফ্লোরে পাথরের মতো বসে আছে।তাকে খুবই অস্বাভাবিক লাগছে।ওর কাছে গিয়ে পুলক বললো, ‘তুমি আমাকে বিশ্বাস করছোনা,হ্যাঁ? এই শ্রুতি?তোমার বিশ্বাস হচ্ছেনা আমার কথা? বাবলী আমার বোন।ছোট থাকতে আমার মামা একদিন রাতে ঘুমের মধ্যে ওকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিলো আমার কাছ থেকে।ও তখন খুব ছোট ছিলো।আমি ওকে কোথাও খুঁজে পাইনি।সপ্তাহ খানেক আগে আমার সেই মামা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকার জন্য।আমাকে জানায় সে ক্যান্সারে আক্রান্ত।এডিক্টেড ছিলো খুব সে।আমি তাকে টাকা দিতে রাজি না হলে সে আমাকে বাবলীর কথা জানায় বাবলীকে সে কোথায় চুরি করে রেখে এসেছিলো।আমি খোঁজ নিয়ে জানতে পারি বাবলী এখন টাঙ্গাইল।আর আমি সেদিনই তোমাকে অফিসের কাজের কথা জানিয়ে টাঙ্গাইল যাই ওকে ফিরিয়ে আনতে।আমি……’

-‘থাম ভাই।অনেক তো বললি।এবার তোর বাবলীকে কিছু বলতে দে।’

পুলক থম মেড়ে দাঁড়িয়ে আছে।শ্রুতিকে কিছু বলবে তখনই ঈশাণ ধমকে বাবলীকে জিজ্ঞেস করলো, ‘এই মেয়ে তোর সাথে পুলকের পরিচয় কী করে?তোর সাথে ওর সম্পর্ক কিসের?’

এরকম আরো নানারকম প্রশ্ন করলো ঈশাণ বাবলীকে।বাবলীর উত্তর যা ছিল তা শোনার পর পুলক আর এক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনি। শ্রুতি ওর মুখটা অবদি তাকিয়ে দেখেনি।শ্রুতি বাসা থেকে বেরিয়ে এসেছে মেঘলা আর তানিয়ার সাথে।বাবলী কী করে বলতে পারলো পুলক তার দেহ ভোগের জন্য বাড়িতে নিয়েসেছে পতিতালয় থেকে?নিজের বোন হলে এমন কথা সে কখনো বলতে পারতোনা।এসব ভেবে পুলকের মাথা এলোমেলো হয়ে গেছে একদম।এর মধ্যে কখন যে শ্রুতি মেঘলা আর তানিয়ার সাথে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে পুলক তা লক্ষ্যও করেনি।একে একে বাসাটা পুরো খালি হয়ে গেছে।পুলক মেঝেতে বসে আছে।

-‘জীবন টা আবারও আমার সঙ্গে লুকোচুরি খেললো।’

এটায় ছিলো পুলকের শেষ কথা।এরপর প্রায় তিন বছর কেটে যায়।পুলকের কোনো সন্ধান মিলেনি।শ্রুতি যখন নিজের বাড়িতে ফিরে যায় তার কিছুদিনের মাথায় ওর ফ্যামিলি শ্রুতিকে বাধ্য করে পুলককে ডিভোর্স লেটার পাঠাতে। পুলকের ঠিকানাতে ডিভোর্স লেটার পৌঁছালেও পুলককে আর পাওয়া যায় না।তার আগে পুলক বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছিলো শ্রুতির সঙ্গে যোগাযোগ করতে।কিন্তু পারেনি আর তার এক সপ্তাহ পর থেকেই পুলক হারিয়ে গেছে কোথাও।কেউ ই তার কোনো সন্ধান দিতে পারেনি।

_

অনুরাগ ৭ম অংশ

অনুরাগ
৭ম অংশ

লেখিকাঃ #Israt_Jahan

-‘ তোর সাহস কতখানি তুই আমাকে থ্রেট করছিস?অবশ্য এমন একটা বাজে কাজ করার মতো সাহস যে দেখাতে পারে তার তো…..।তুই বেরো আমার বাসা থেকে।যাহ্ বেরো……বেরো।’

একরকম ঘাড় ধাক্কা দিয়েই বের করে দিলো ঈষাণকে পুলক।শ্রুতি বেলকোনির এক কোণে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।চোখের পানিতে গাল চিকচিক করছে তার।আবছা আলোতেই পুলক দেখতে পাচ্ছে শ্রুতি আর শ্রুতির ভেজা গাল।তখন ঈষাণের সাথে অমন ক্লোজড হয়ে বসে থাকতে দেখে ক্ষণিকের জন্য মাথা খুব গরম হয়ে গিয়েছিল।নিজের রাগকে কন্ট্রোল করতে পারেনি তখন।ওইভাবে শ্রুতিকে আঘাত করা পুলকের একদমই উচিত হয়নি।সম্পর্কের এতগুলো বছরে এভাবে হুট করেই শ্রুতিকে অবিশ্বাস করাটা পুলকের কাছে খুব অন্যায় বলে মনে হচ্ছে।তবুও মনকে মানাতে পারছেনা সে।

-‘ কেনো এমনটা করলে?’

পুলকের প্রশ্নে শ্রুতি চোখের পানি মুছে চোখ মুখ শক্ত করে ওর দিকে এগিয়ে এলো।

-‘ আমাকে করছো এই প্রশ্ন?প্রশ্নটা তো আমার করার কথা ছিলো তাইনা?’

পুলক খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছে কিছু একটা হয়েছে।শ্রুতি যদি অন্যায় কিছু করে থাকে তাহলে ওর চোখে মুখে কঠোরতা নয় আতংক থাকার কথা।কিন্তু না তাকে খুবই আপসেট লাগছে।ওপর থেকেই বোঝা যাচ্ছে ভেঙ্গে চুড়ে পরেছে সে।ব্যাপারটা আগে জানা প্রয়োজন পুলকের।

-‘ কী করেছি আমি বলো তো?কী হয়েছে তোমার?’
-‘ আমার মুখ থেকেই শুনতে চাইছো?’
-‘ প্লিজ আমি এভাবে তোমাকে দেখতে পারছিনা।’
-‘ তাই?’
-‘ তখন তুমি কী বললে আমাকে?আমি তোমার সতীন আনছি।নারী পিপাসু আমি।এগুলো কী ভাষা ছিলো শ্রুতি?এমনো কথা তোমার থেকে আমাকে কখনো কোনোদিন শুনতে হবে……।’
-‘ কী করেছি আমি বলো?’

শ্রুতি কিছুক্ষণ পুলকের মুখের দিকে চেয়ে থেকে রুমে চলে গেলো।পুলকও ওর পিছু পিছু রুমে এলো।বিছানার ওপর থেকে ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে ফটো গুলো পুলকের সামনে মেলে ধরলো শ্রুতি।ফটোগুলো দেখে চোখদুটো বন্ধ করে হতাশার ভঙ্গীতে মুখ ঘুরিয়ে নিলো পুলক। অনেক সময় ধরে শ্রুতি পুলকের মুখের দিকে চেয়ে আছে কিছু শোনার আশায়।ও শুনতে চায় পুলক বলুক, ‘ তুমি যা ভেবেছো সব ভুল সব মিথ্যা।’ কিন্তু পুলক এমন কিছুই বললোনা। কিছুক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকলো।গলা থেকে টাই টা খুলে নিচে ফেলে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো সে।শ্রুতির ইচ্ছা করছে চিৎকার করে কাঁদতে।হেঁটে হেঁটে বেলকোনিতে চলে গেলো সে।
————————————————–

মাথাটা প্রচন্ড ভার হয়ে আছে শ্রুতির।কেমন যেনো চোখ মেলে তাকাতেও কষ্ট হচ্ছে।মাথাটা চেঁপে ধরে উঠে বসে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকালো সে।সকাল ১০ বেজে ৩৫ মিনিট।

-‘ অনেক দিন পর এতো বেলা অবদি ঘুম হলো।’

পুলকের কথা শুনে ফিরে তাকালো শ্রুতি ওর দিকে।হাতে দু কাপ কফি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। খুব খোশ মেজাজে আছে বলে মনে হচ্ছে শ্রুতির কাছে।ব্ল্যাক টি শার্ট আর হাফ কোয়ার্টার প্যান্ট সাথে ভেজা চুল গুলো কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পরে আছে।খুবই স্বচ্ছ লাগছে তাকে দেখতে।
ওর এতো অতী স্বাভাবিক ভাব দেখে শ্রুতির নিজেকে আরো বেশি এলোমেলো লাগছে।

-‘ আমি তো রাতে বেলকোনিতে ছিলাম।’
-‘আমি তো আপনাকে বিছানাতে নিয়েলাম।’

কফি হাতে শ্রুতির পাশে এসে বসল।শ্রুতি ফোলা চোখে একটু বিস্ময় চোখে তাকিয়ে দেখছে পুলককে।হাতে কফির মগটা ধরিয়ে দিয়ে শ্রুতিকে বললো, ‘ ভেবেছিলাম কোলে তুলে নিয়ে আসার সময় আপনি সিনক্রিয়েট করবেন।কিন্তু ম্যাডাম তো একদম ঘুমে কাদা ছিলেন।যখন বিছানাতে শুইয়ে দিলাম একদম গলা টেনে ধরে সারারাত গলা জড়িয়ে বেঘোরে ঘুমালেন।’

একটু আবেগমাখা কন্ঠে পুলক আবারো বললো, ‘ পারবেনা তো আমাকে ছেড়ে থাকতে।তাহলে খামোখা এই দূরে থাকার ব্যার্থ চেষ্টা কেনো?’
-‘ কী চাইছো বলো তো তুমি?কী চাইছো?সবকিছু স্বাভাবিক রেখে আমার সামনে তাকে নিয়ে সংসার করতে?কীভাবে পারছো তুমি এমন জিনিস ভাবতে?’

বড্ড তেজী গলায় কথাগুলো বললো শ্রুতি।পুলক শুধু শূণ্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ওর দিকে।শ্রুতি ওর এমন ব্যবহার কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। পুলকের দিকে আর তাকিয়ে থাকতে পারলোনা। চোখের পলক নামিয়ে মাথা নিচু করে আবার কেঁদে ফেললো।ও পারবেনা এভাবে থাকতে। মরেই যাবে ও পুলককে ছাড়া।পুলক শ্রুতির মাথাটা নিজের কাঁধের ওপর টেনে নিলো।শ্রুতি মাথা উঠিয়ে নিতে চাইলে পুলক জোর করেই ধরে রাখলো ওকে।

-‘ ছাড়ো।’
-‘ না।’
-‘ উফ্ আমার অসহ্য লাগছে খুব।ছাড়ো।’
-‘ আমি সারাদিন তোমাকে এভাবে ধরে রাখলেও তোমার যে অসহ্য লাগবেনা তা আমি জানি। তোমাকে জানতে হবে, শুনতে হবে আমার সব কথা। কে বা কারা এমন একটা ব্যাপারকে ভুলভাবে তুলে ধরেছে তোমার সামনে তা আমি শুনবোনা। কারণ সেই তথ্য আমি নিজেই অনুসন্ধান করবো।কিন্তু তুমি যে ব্যাপারটাকে ঘিরে একটা বিশ্রি ঘটনা তৈরি করে নিয়েছো নিজের মনে সেটা আমায় ক্লিয়ার করতে হবে তোমার কাছে। তবে শুধু মুখে বলে নয়।স্ব-চোক্ষে দেখিয়ে ক্লিয়ার করবো সবকিছু।একটু ওয়েট করো।’
__

অনুরাগ ৬ষ্ঠ পর্ব

অনুরাগ
৬ষ্ঠ পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

ঈশাণ শ্রুতির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে দেখল পুলকের সঙ্গে একটি মেয়ের বেশ কিছু ছবি।একটা ছবিতে দেখা যাচ্ছে পুলক ওই মেয়েটাকে আইসক্রিম খাইয়ে দিচ্ছে, মেয়েটাও ওকে আইসক্রিম খাইয়ে দিচ্ছে আবার ওর নাকেও জড়িয়ে দিচ্ছে।দুজন মিলে শপিং করে বের হচ্ছে,রিক্সায় ঘুরছে।ছবিগুলো দেখে ঈশাণ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।তারপর শ্রুতিকে বলল,
-‘ রবিনকে ফোন কর।’

শ্রুতির শরীর থরথর করে কাঁপছে তখন। মাথাটাও কেমন ঘুরছে মনে হচ্ছে ওর কাছে।আজকে শ্রুতির পুলকের বলা ওই কথাটা মনে পরছে,
-‘ জীবনের সব থেকে বড় খুশিটা ফিরে পেয়েছি।’

তাহলে কী এটাই ছিল ওর জীবনের সব থেকে বড় খুশি?হ্যাঁ ছবিতে পুলককে খুব খুশি দেখাচ্ছে।এই খুশির জন্যই হয়তো ও এতদিন অপেক্ষা করেছে।এমনটাই মনে হচ্ছে ছবিগুলো দেখে।শ্রুতি আর নিজেকে সামলাতে পারলোনা।মাথা ঘুরে নিচে পরে গেল।ঈশাণ দ্রুত ধরে ওকে কোলে তুলে বিছানায় নিয়ে এল।চোখ মুখে পানি ছিটানোর পর ওর জ্ঞান ফিরলে ঈশাণের বুকে মাথা রেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল শ্রুতি।ঈশাণ তখন ধমকে বলল,
-‘ ছবিটার মেয়েটা কে তুই কী জানিস? না জেনেই এরকম পাগলের মত কান্নাকাটি করছিস কেন?ওর তো কোনো রিলেটিভ…..’

শ্রুতি ঈশাণের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-‘ ওর কোনো রিলেটিভ নেই ঈশাণ ওর কোনো রিলেটিভ নেই।’
-‘ তুই কান্না থামা।আগে রবিনকে ফোন কর।ও মেসেজ করেছে তুই ওই মেয়েটাকে চিনিস কিনা?’

কোনরকমে নিজেকে সামলে শ্রুতি রবিনকে ফোন করল।

-‘ হ্যালো শ্রুতি?’
-‘ তুই এই ছবিগুলো কোথায় পেয়েছিস?’
-‘ এই ছবিগুলো আমি নিজে তুলেছি। গতকাল আমি টাঙ্গাইল এসেছি মামার বাড়িতে।তারপর বিকালে আমি মামার সাথে শহরে ঢুকতেই পুলককে একটা দোকানের সামনে দেখলাম।ওকে দেখে ছুটে ওর কাছে যাব তখন দেখি ওর পাশে ওই মেয়েটা।তারপর ওরা ওখান থেকে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকল।আমিও গেলাম সেখানে।ওরা পাশাপাশি বসে যেভাবে গল্প করছিল আর খাচ্ছিল এভাবে আমি বাইরে কখনো তোর সাথে বসেও করতে দেখিনি।ব্যাপারটা তখনই আমার কাছে বেশ খটকা লাগল।তাই আমি ছবিগুলো তুলে ফেলি।ভেবেছিলাম ওই সময়ই তোকে ফোন দিব।পরে ভাবলাম আগে আমি নিজে ক্লিয়ার হই।পুরোটা বিকাল ও ওই মেয়েটাকে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছে।আর সন্ধ্যার সময় ওই মেয়েটাকে নিয়ে এমন একটা জায়গায় ঢুকল যে তখন আমি মাথা ঠান্ডা করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলাম না।’

শ্রুতি কাঁপা কন্ঠে প্রশ্ন করল, ‘ কোথায় ঢুকেছিল ওরা?’

রবিন একটু চুপ থেকে নিচুস্বরে বলল, ‘ নিষিদ্ধ পল্লিতে।’

শ্রুতি তখন একদমই চুপ।রবিন আবার বলতে শুরু করল,
-‘ আমি পিছু পিছু মামাকে নিয়ে ওখানে ঢুকলাম।তারপর দেখলাম মেয়েটাকে নিয়ে ওই পল্লির সর্দারনীর বিল্ডিং এ ঢুকতে।মিনিমাম দু ঘন্টা পর পুলক বেশ মন ভার করে বেরিয়ে এল ওখান থেকে।আমি ভাবলাম তখনই ওর সাথে গিয়ে কথা বলব।কিন্তু মামা বারণ করল।ওর পিছে পিছে তখন ওই সর্দারনী বেরিয়ে এসেছে।ওকে বলল,
‘ কাল রাতেই তুমি ওকে এসে নিয়ে যেতে পারবে।কিন্তু আজকে নয়।কথা দিচ্ছি ওর কাছে আজকে রাতে আর কেউ আসবে না।তুমি নিশ্চিন্তে ফিরতে পারো।’

-‘ আমার হাত পা নিশপিশ করছিল তখন। কোনোরকমে নিজেকে সামলে চলে এসেছি আমি।তারপর মনে হল ব্যাপারটা তোকে জানানো উচিত।’
-‘ অনেক বড় উপকার করেছিস।তুই কোথায় এখন?’
-‘ আমি এখনো মামার বাড়িতে।কাল ঢাকা ফিরব।’
-‘ কাল রাতে আমাদের বাসায় আসিস।’
-‘ পুলক বাড়িতে ফিরেনি?’
-‘ না।কাল আসবে।’
-‘ আচ্ছা তুই নিজেকে সামলা।ওর থেকে আগে পরিষ্কার ভাবে জানতে চাইবি মেয়েটা কে ছিল?’
-‘ হুম।রাখছি।’

ফোনটা হাত থেকে নিচে পরে গেল। শ্রুতির চোখ থেকে ঝরঝর করে পানি পরছে।এখন ওর কী করা উচিত,কীভাবে নিজেকে সামলানো উচিত ও কিচ্ছু বুঝতে পারছেনা।ওর কী এগুলো বিশ্বাস করা উচিত নাকি উচিত না ওর মাথায় কিছুই কাজ করছেনা।ঈশাণ বার বার জিজ্ঞেস করছে,”কী বলল রবিন?” সেই প্রশ্নেরও উত্তরও দিচ্ছেনা শ্রুতি।বিছানা থেকে উঠে দৌড়ে ডাইনিং এ চলে গেল।তারপর টেবিল থেকে ছুড়িটা নিয়ে হাতে আঘাত করতে গেলে ঈশাণ ছুটে এসে জোড় করে ওর হাত থেকে ছুড়িটা নিয়ে নিচে ফেলে দিল।টানতে টানতে ওকে বেডরুমে নিয়ে বসাল।

-‘ কী করছিলি তুই?নিজেকে কেন মারতে চাইছিস?তুই কোনো অপরাধ করিসনি তাহলে তুই কেন সাজা পাবি?আমাকে খুলে বল রবিন কী বলল?আর ওই মেয়েটি কে ছিল?’

শ্রুতি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-‘ আমার পুলক একটা বেশ্যার প্রেমে পরেছে ঈশাণ।’

শ্রুতিকে সামলাতে খুব কষ্ট হচ্ছে ঈশাণের।এভাবে ওকে একা ফেলে গেলে নির্ঘাত কোনো একটা অঘটন ঘটিয়ে বসবে।বাধ্য হয়ে ঈশাণকে থেকে যেতে হচ্ছে শ্রুতির কাছে।শ্রুতিকে জড়িয়ে ধরে বসে আছে ঈশাণ।আর শ্রুতি ঈশাণের কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে যাচ্ছে।কাঁদার এক পর্যায়ে শ্রুতি ঈশাণের কাঁধে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরে।ঈশাণ তখন ঘড়িতে দেখল রাত ১১:৩০ টা বাজে।এখন শ্রুতিকে শুইয়ে দিয়ে চলে যাওয়া যায়।কিন্তু তারপরেই মনে হল ঘুম ভেঙে যদি আবার কিছু করার চেষ্টা করে।তাই ঈশাণ সিদ্ধান্ত নিলো আজকের রাতটা এখানেই থেকে যাবে।ব্যাপারটা খারাপ দেখালেও কিছু করার নেই এখন।রাত দুটোর সময় পুলক বেশ হাসিখুশিভাবে বাসায় ফিরে এল।অনেক কিছু কিনে এনেছে পুলক শ্রুতির জন্য।আজকে অবশ্য আসার কথা ছিলনা পুলকের।এটাই বলেছিল শ্রুতিকে। কিন্তু ওকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য না বলেই চলে এল।রুমে ঢুকে দেখল ডাইনিং রুমের লাইট জ্বলছে।নিজেদের রুমের ও লাইট জ্বলছে।শ্রুতি কী এখনো জেগে আছে?রুমে ঢুকেই পুলক একটা ধাক্কা খেল।স্বপ্নেও কখনো কল্পনা করেনি শ্রুতিকে ও এইভাবে ঈশাণের সঙ্গে দেখবে।হাতের প্যাকেটগুলো ফ্লোরে ছুড়ে মাড়ল।তার শব্দ শুনেই ওদের ঘুম ভেঙ্গে গেল।পুলকের চোখে তখন আগুন জ্বলছে।শ্রুতিও একটু ঘৃণাভরা আর বিস্ময় চোখে তাকিয়ে দেখছে পুলককে।তারপরই খেয়াল হলো ও ঈশাণের কাঁধে মাথা রেখে বসে আছে। দ্রুত সোজা হয়ে বসল শ্রুতি।ঈশাণের দৃষ্টি তখন স্বাভাবিক।এই মুহূর্তে কার কী বলা উচিত কিছুই ভেবে পাচ্ছেনা কেউ। পুলক হঠাৎ ঈশাণের দিকে তেড়ে আসে ওর কলার চেঁপে ধরে দাঁড় করিয়ে বলল,
-‘ জানুয়ারের বাচ্চা তোর রুচিতে একটুও বাঁধলোনা রে?আমার ঘরে বসেই তুই আমার বউয়ের সঙ্গে রাত কাটাচ্ছিস? এভাবেই দাম দিলি বন্ধুত্বের?’
-‘ পুলক কলাড় ছেড়ে কথা বল।কিছু না জেনে না শুনে আগেই কোনো ব্লেম দিবিনা।’

পুলক ওর কলাড় চেঁপে ধরে ঠেলতে ঠেলতে দেয়ালের সঙ্গে মিশিয়ে বলল,
-‘ কী জানাবি তুই?রাত দুটোর সময় তোরা কাঁধে মাথা রাখা রাখি করে ঘুমিয়ে আমাকে কী জানাতে চাস?’

শ্রুতি চোখদুটো চোখে মুখে রাগ নিয়ে পুলকের পিছে দাঁড়িয়ে চিল্লিয়ে বলল,
-‘ নিজের নোংরা মনের সাথে সবার মনের তুলনা করবেনা তুমি।ঈশাণকে ছাড়ো।ছাড়ো ওকে।’

শ্রুতির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওর গালে কষে একটা চড় মাড়ল পুলক।শ্রুতির ঠোঁট কেটে একটু রক্ত গড়িয়ে পরল।

-‘ লজ্জা লাগছেনা গলা উঁচু করে কথা বলতে?নোংরামি করে এখনো এত জোড় আসছে কোথার থেকে?নাকি ধরা পরে গেছো বলে আর কোনো লুকোচুরি রাখছোনা?এখন নিশ্চই বলবে তুমি আমাকে তালাক দিয়ে ওর সঙ্গে ঘর বাঁধতে চাও?এমন সিদ্ধান্ত নিলে আমাকে খুন করে তবেই মুক্তি পাবে আমার থেকে।কী ভেবেছো?আমাকে বলবে আর আমি তোমাদের সেই সুযোগ দিয়ে দিব?’
-‘ ছিঃ লজ্জা তো তোমার করা উচিত। আমাকে ঠঁকিয়ে যাচ্ছো দিনের পর দিন। এই ঘরে আমার সতীন এনে সংসার করার চিন্তা করছো?এতটা নারী পিপাসু তুমি?একজনকে রেখে তোমার মন জুড়াবেনা।আর আমাকে বলছো আমি নোংরামি করছি।আজকে ও না থাকলে আমার মৃতদেহ দেখতে পেতে এই ঘরে। ঈশাণ তুই যা। আমি চাইনা তুই আর অপমানিত হ।কাল ওদের সবাইকে নিয়ে চলে আসিস।যা হবে সকলের সামনে হবে।সবাই জানবে এই মানুষটা একটা মুখোশধারী শয়তান।সবাই ওকে ফেরেশতা ভাবতো না?সবাই জানবে ও কীভাবে আমার সঙ্গে ধোঁকাবাজি খেলা খেলছে।’

ঈশাণ পুলকের সামনে এসে ওকে থ্রেট করে বলল,
-‘ ওর যদি কোনো ক্ষতি হয় একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া তোকে কেউ আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবেনা।’

__

অনুরাগ ৫ম পর্ব

অনুরাগ
৫ম পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

 

শ্রুতি বেশ চমকে উঠে তাকাল পুলকের দিকে।আর ঈষাণ অনেকটা ঘাঁবড়ে গেল পুলকের এই ব্যাপারটাতে।গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে পুলক ঈষাণের দিকে। শ্রুতির বাহু চেঁপে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে।তারপর আচমকা ঈষাণের পেটে ঘুষি দিয়ে বলল,
-‘ এই শালা তুই আমার বউয়ের হাত ধরে কী করছিলি রে? ‘

শ্রুতি বুঝতে পারল যে পুলক ব্যাপারটা সিরিয়াসলি নেয়নি।তখন শ্রুতি ওর কনুই দিয়ে পুলকের পেটে গুতা দিয়ে বলল,
-‘ তুমি যে কী ভয়ানক কাজ করো আজকাল!এভাবে কেউ টেনে ধরে?ফাজিল ছেলে।ফ্রেশও তো হওনি।যাও ফ্রেশ হয়ে এসো।আমি তোমাদের ডিনার রেডি করছি।’
-‘ আরে না।আগে দু কাপ কফি পাঠাও। আজ আমি আর ঈষাণ একটু আড্ডা দিই।’
-‘ মাত্রই তো খেলাম আমরা কফি।আবার?’
-‘ তোমরা দুজন খেয়েছো।আমি তো আর খাইনি।তোমাকে আর খেতে হবেনা।তুমি বরং আমাদের দুজনের জন্য পাঠাও।’
-‘ আচ্ছা ঠিকআছে।বসো নিয়ে আসছি।’

ঈষাণ মুখটা শুকনো করে বলল,
-‘ নারে… আমাকে এগারোটার আগে ফিরতে হবে।আজ আর গল্প নয়।অন্য কোনোদিন আসব।’
-‘ অন্য কোনোদিন?তার মানে বর্তমান একটু ফ্রি সময় পাচ্ছিস তাই তো?আরে কাল তো তোদের সাথে কথাই হয়নি ঠিকমত।একটু বস তারপর না হয় ডিনার করে চলে যাস।’
-‘ এই ঈষাণ বস না?আমার কফিটা কিন্তু মন্দ না সেটা নিশ্চই খেয়ে বুঝেছিস। তাই আর এক মগ যে খাওয়া অসাধ্যকর এমনটা কিন্তু নয়।’

ঈষাণ শুকনো মুখের একটা মুচকি হাসি দিল মাত্র।সেটা দেখে পুলক বলল,
-‘ থাক জোড় করে বেচারাকে কফি গেলানোর কোনো মানে হয়না।ও যে এত ব্যস্ততার মাঝে এটুকু সময় বের করে আমার বাসায় আসতে পেরেছে এতেই আমার ভালো লেগেছে।চল ডিনার করে যাবি।’
-‘ হুম চল।’

ডিনার শেষ করেই ঈষাণ আর এক সেকেন্ডও বসেনি।বিষয়টা দেখে শ্রুতি বেশ অবাক হলো।
**************
-‘ আজ এত জলদি জলদি শুয়ে পড়লে যে?’
-‘ খুব ক্লান্ত গো।তাড়াতাড়ি এসো তো।ঘুম আসছেনা তোমাকে ছাড়া।’

পুলকের কথা শুনে মুচকি হেসে দিল শ্রুতি।চুলটা বিনুনি করে পুলকের পাশে এসে শুয়ে পরল।পুলক বলল,
-‘ তুমি বসে আগে আমার চুলগুলো নেড়েচেড়ে দাও।আমি তোমার কোলের ওপর মাথা রেখে শুবো।’

শ্রুতি সেটাই করল।পুলক ওর কোমড় জড়িয়ে ধরে ওর কোলের ওপর মাথা রেখে বুকে ভর দিয়ে শুয়ে আছে।আর শ্রুতি ওর চুলগুলো নেড়েচেড়ে দিচ্ছে।

-‘ ঘুমিয়ে পরলে? ‘
-‘ উহু।চোখ বন্ধ করে আছি।তবে না ঘুমানো পর্যন্ত তুমি শুবেনা। ‘
-‘ এই তখন খেয়াল করেছিলে ঈষাণকে? ডিনার করে আর একটা মুহূর্তও বসলোনা।কিরকম তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে গেল। ‘

শ্রুতির কথা শুনে পুলক চোখ খুলল। কিছুক্ষন চুপ থেকে বলল,
-‘ পুলিশ মানুষ।কোন আসামির কথা মনে পরেছে তাই তাড়াহুড়া করে বেরিয়ে গেছে। ‘
-‘ হুম।হয়তোবা। ‘

পুলক খুব ভালো করেই জানে ঈষাণ কেন ওভাবে চলে গেল।ঈষাণের সামনে যখন পুলক শ্রুতিকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে তখন ঈষাণের মুখটা একদম শুকিয়ে যায়।পুলকের ব্যবহারটা শ্রুতির কাছে ওইসময় স্বাভাবিক মনে হলেও ঈষাণ ঠিকই বুঝতে পেরেছে পুলকের চোখের চাহনি দেখে।তাই ওর আর ইচ্ছা করেনি পুলকের সামনে থাকতে। তারপর খেতে বসে যখন পুলক শ্রুতিকে টেনে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে বলছিল,
-‘ আজ আর আমি হাত দিয়ে খেতে পারবোনা।তোমাকে খাইয়ে দিতে হবে এভাবে আমার কোলে বসেই।’
এই দৃশ্যগুলো দেখে ঈষাণের ভাত হজম করতে প্রচন্ড কষ্ট হচ্ছিল।তাই খাওয়া শেষ করে আর এক সেকেন্ডও বসেনি।এর সবটাই পুলক ইচ্ছে করে করেছে।আর ঈষাণ নিজেও তা বুঝতে পেরেছে।পুলক হঠাৎ শ্রুতির দিকে তাকিয়ে বলল,
-‘ এই তুমি আজ হোয়াইটটা পরেছো কেন? ‘
-‘ তো কী হয়েছে?একটা পরলেই হলো। ‘
-‘ না একটা পরলেই হলোনা।তুমি আজকে ব্ল্যাকটা পরবে।যাও এটা খুলে ব্ল্যাকটা পরে এসো।’
-‘ কী অদ্ভুত!নাইটি তো নাইটিই।সেটা ব্ল্যাক আর হোয়াইট কী? ‘
-‘ উফ তুমি কী যাবে নাকি আমি গিয়ে নিয়ে আসব? ‘
-‘ আমি নিজেই যাচ্ছি।আচ্ছা নাছোড়বান্দা তুমি। ‘

নাইটি চেইঞ্জ করে পুলকের সামনে এসে দাঁড়াতেই পুলক হ্যাঁচকা টানে ওর বুকের মধ্যে নিয়ে নিলো শ্রুতিকে।তারপর চেঁপে ধরে শ্রুতির ঠোঁটে চুমু খেয়ে বসল।

-‘ তুমি যে কত বড় লুচু…. ‘
-‘ লুচুর মত কী করলাম তোমার সাথে? ‘
-‘ আমি বুঝিনি কিজন্য তুমি এটা পরতে বলেছো? ‘
-‘ বলো কিজন্য পরতে বলেছি? ‘
-‘ এটা যে খুব শর্ট।হাঁটুর উপরে উঠে থাকে একদম। ‘

শ্রুতিকে বুকের ওপর নিয়ে শুয়ে পরে বলল,
-‘ এখন আর হাঁটুর ওপরেও থাকবেনা।ওয়েট…..’

এমনকরেই সুখে দিনগুলো পার করছিল ওরা।ছোট্ট সংসারে দুটি মানুষের মধ্যে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিলনা। ওদের দুজনের ভালোবাসা নিজেদের কাছে সবসময় কম মনে হতো।পুলক ভাবত শ্রুতির তুলোনায় পুলক হয়তো ওকে কম ভালোবাসে।আর শ্রুতি ভাবত পুলক ওকে বেশি ভালোবাসে নিজের ভালোবাসার তুলনায়।পরিবারের অমতে বিয়ে করেছিল বলে শ্রুতির বড় বোন ইতি ওকে অভিশাপ দিয়েই বলেছিল, ‘যে ভালোবাসার জন্য নিজের পরিবার ত্যাগ করলি সেই ভালোবাসায় একদিন তোর কাছে বিষ মনে হবে।সেই বিষ সহ্য করতে না পেরে ফিরে আসতে হবে আব্বা আম্মার পায়ের কাছে।’
এই কথাগুলো যখন পুলক শুনেছিল তখন শ্রুতিকে সে বলেছিল, ‘আমার ভালোবাসা যদি কোনোদিন সত্যি বিষে পরিণত হয় তাহলে আর কিছু ভাববেনা শেষ করে দেবে আমাকে।’ কথাগুলো তখন শ্রুতির কাছে আবেগী মনে হলেও পুলক যে কথাগুলো অনেক কষ্ট পেয়ে মন থেকেই বলেছে তার প্রমাণ শ্রুতি তার কিছুদিন পরই পেয়ে গিয়েছিল।পুলক যত ব্যাংক ব্যালেন্স তৈরি করেছে তার চাকরি জীবনে তার সবটায় শ্রুতির নামে ট্রান্সফার করে দিয়েছে।আর ভবিষ্যতেও যা হবে তার সবটাই শ্রুতি পাবে।যদিও তা শ্রুতির বাবার বাড়ির সম্পত্তির তুলনায় কম। তবুও শ্রুতি অনেক অবাক হয়েছিল।রেগে গিয়ে পুলককে বলেছিল,
-‘ ব্যাংক ব্যালেন্স প্রপাটি এইসব হাবিজাবি দিয়ে তুমি ভালোবাসার প্রমাণ দিচ্ছো? এগুলোর জন্য আমি তোমাকে বিয়ে করেছি? ‘

পুলক সেদিন শ্রুতিকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে বলেছিল,
-‘ সবটাই যদি আবেগ দিয়ে বিচার করা যেত তাহলে তোমার আমার সম্পর্কটাও তোমার বাবা-মা আবেগ দিয়ে বিচার করে আমাদের মেনে নিতো।তারা আমাকে কেন মেনে নেয়নি সেটা তো তুমি জানোই।শুধুমাত্র আমার সামর্থ্যের জন্য। তাই ভালোবাসাতে যেমন আবেগটাও খুব জরুরি তেমন ভালোবাসাকে আর নিজের ভালোবাসার মানুষটাকে নিয়ে সমাজের বুকে মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য এই টাকা পয়সাটাও জরুরি।তুমি যতই সবার সামনে নিজেকে সুখি প্রমাণ করো তবুও তারা জানতে চাইবেই আমি তোমাকে কী দিয়েছি?তোমার দেনমোহর কত দিয়েছি? বিবাহবার্ষিকীতে আমি তোমাকে কী উপহার দিয়েছি তাছাড়াও আমি ইনকাম করে তোমাকে কতটুকু কী খরচ দিই আরো নানানরকম কথা জিজ্ঞেস করবে তোমাকে।তখন যদি তুমি বলো শুধু ভালোবাসা দিলেই হবে তখন সেটা তোমার কাছে মিষ্টি শোনালেও ওদের কাছে তেঁতো লাগবে।আড়ালে তোমাকে নিয়ে তোমার স্বামীকে নিয়ে ওর কানাকানি করবে অপমানজনক কথা বলবে।তখন তুমি ভেতরে ভেতরে কতটা কষ্ট পাবে তোমার আইডিয়া নেই।আর এমন কিছু জায়গা থেকেই শত ভালোবসার মাঝে দুজনের মধ্যে ছোট খাটো বিষয় নিয়ে ঝামেলার সৃষ্টি হয়।’
-‘ তার মানে তুমি বলতে চাইছো আমি এগুলো নিয়ে তোমার সাথে ঝামেলা করব?’
-‘ নারে বাবা আমি কী সেটা বলেছি? এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে আপনাআপনিই নিজেদের মধ্যে ঝুট ঝামেলা তৈরি হয়ে যায়।এসব পরিস্থিতির মাঝে না পরলে তুমি বুঝতে পারবেনা আমি তোমাকে কেন এগুলো বলছি।আর আমাদের বিয়েটা তো বাকিসবার মত স্বাভাবিকভাবে হয়নি।তাই এমন বিয়েতে মেয়েদের বাবার বাড়িতে বন্ধুবান্ধবদের কাছে নানানরকম কথা শুনতে হয়। তুমি কিছুটা শুনেওছো।আর যাতে এমন কিছু না শুনতে হয় তার জন্য এই ব্যবস্থা। তুমি যেমন চাইবেনা তোমার স্বামীকে কেউ ছোট করে কথা বলুক তেমন আমিও চাইনা আমার বউটাকে কেউ অপমান করুক।’

এতকিছুর পর এই মানুষটার ভালোবাসা যে কখনো বিষ হতে পারেনা শ্রুতি তা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে।এর মাঝে হঠাৎ শ্রুতি খুব অসুস্থ হয়ে পরে।প্রচুর পরিমাণে ব্লিডিং শুরু হয় ওর।সেটা দেখে শ্রুতি চিৎকার করে কান্না শুরু করে।পুলক ওকে দ্রুত হসপিটালাইজড করে জানতে পারে শ্রুতি কনসিভ করেছিল কিন্তু বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেছে।পরে জানতে পারল শ্রুতির জড়ায়ুতে সমস্যা হয়েছে।মাসখানেকের মত ওদের ফিজিকালি এটাচ্ড হওয়া যাবেনা। বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে যাওয়াতে শ্রুতি খুব উদাস হয়ে পরে।ওর খালি বারবার মনে হচ্ছে ওর বাবা-মায়ের দেওয়া অভিশাপ গায়ে লেগেছে হয়তো।মেন্টালি সিক হয়ে পরছে দিন দিন শ্রুতি।এদিকে পুলকটাও আজকাল খুব কম সময় দিচ্ছে শ্রুতিকে। যতটুকু সময় ওর পাশে থাকে ততটুকু সময় খুব কেয়ার করে ওকে।কিন্তু আজকাল আগের মত আর পুলক বাইরে থাকলে তেমন কথা বলেনা ফোনে। আবার বাড়িতেও ফিরে রাত বারোটা একটার সময়।মাঝে মাঝে রাতে খাওয়া দাওয়া না করেই এসে ঘুমিয়ে পরে। আবার খুব সকালে উঠে বেরিয়ে যায়। পুলকের এমন পরিবর্তনটা শ্রুতি ঠিক মেনে নিতে পারছিলোনা।দেখতে দেখতে প্রায় এভাবেই দুটো মাস কেটে যায়। শ্রুতির চেহারাও দিন দিন ভেঙে পরছিল। পুলকটাও আজকাল শ্রুতিকে সেই আগের মত হূরপরীও বলে ডাকেনা।ও সুস্থ হওয়ার পর পুলক নিজে থেকে কখনোই শ্রুতির সঙ্গে মিলিত হওয়ার চেষ্টা করেনা।যার জন্য শ্রুতিও কখনো ওর কাছে যেচে পরে যায়না।কিন্তু মনের মধ্যে তোলপার হয়ে যায় ওর।একদিন সকালে খেতে বসে পুলক শ্রুতিকে বলে,
-‘ তুমি বাসায় একা থাকতে পারবে তো? ‘
-‘ একা থাকতে হবে কেন?তুমি কী কোথাও যাবে? ‘
-‘ হুম।অফিসের কাজে দুদিনের জন্য একটু ঢাকার বাইরে যেতে হবে।’
-‘ ও কোথায় যাবে?’
-‘ টাঙ্গাইল।তোমার যদি অসুবিধা হয় তো মেঘলাকে এসে থাকতে বলি তোমার সঙ্গে দুদিনের জন্য।’
-‘ খারাপ লাগলে আমি নিজেই বলব।তুমি কী আজই যাবে?’
-‘ হ্যাঁ।অফিস করেই চলে যাব।বাসায় আর আসব না।’
-‘ আচ্ছা সাবধানে যেও।পৌঁছে ফোন দিও একটু।’

শেষের কথাটা শুনে পুলক শ্রুতির দিকে তাকাল।ওর হাতের ওপর হাতটা রেখে একটা মুচকি হাসি দিল।আজকাল খুব কম সময় দিচ্ছে শ্রুতিকে সে সেটা পুলকের আজ খেয়াল হলো।আজ সারাটা রাত শ্রুতি বেলকোনিতে বসে কেঁদে পার করেছে।তার কাছে যেন আর কিছুই ভালো লাগছেনা।দম বন্ধ লাগছে এই ঘরের পরিবেশটাকে।আগে তো এমন কখনো লাগেনি।পুলকটা এভাবে পাল্টে যাবে সেটাও কখনো ভাবেনি শ্রুতি। পরেরদিন রাত নয়টার সময় ঈষাণ এসে হাজির হলো।বিস্ময় চোখে তাকিয়ে শ্রুতিকে দেখে ঈষাণ প্রশ্ন করল,
-‘ এটা কে? ‘
-‘ কেমন আছিস? ‘
-‘ আমি যে খুব ভালো আছি তা আমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে।তোর শরীরের কী অবস্থা এটা?ওয়েট লস করছিস নিশ্চই? তাই বলে এরকম শুকনা কাঠির মত শরীর বানানোর কোনো মানেই হয়না শ্রুতি।চেহানার কী অবস্থা দেখেছিস?পুলক কিছু বলেনা তোকে? ‘
-‘ এই তুই এত কথা একসাথে বলিস কীভাবে রে?আয় বস আগে। ‘
-‘ সিরিয়াসলি তোকে দেখে আমার একটুও ভালো লাগছেনা।কী হয়েছে বল তো? চোখ মুখ একদম শুকিয়ে গেছে।মনে হয় কতকাল খাসনা ঘুমাসনা। ‘
-‘ আরে এমনিতেই।বয়স হচ্ছে তো।
চিরকালই কী একইরকম থাকব? ‘
-‘ একটা থাপ্পর খাবা।তুমি আমাকে বয়স দেখাচ্ছো।আমাকে বল কী হয়েছে?শরীর ঠিক আছে তোর? ‘
-‘ হুম একদম ঠিক আছি।তো এতদিন পর মনে পরলো আমাদের কথা? ‘
-‘ আমাদের কথা না শুধুমাত্র তোর কথা। পুলককে তো আজকাল ফোন করলেও পাওয়া যায়না।তোর কথা আর জিজ্ঞেস করবো কীভাবে?তাই তোকে দেখতে চলে এলাম।আজ নিশ্চই ওর এমন সময় বাইরে থাকার কথা নয়।আজ তো ফ্রাই ডে। ‘
-‘ অফিসের কাজে টাঙ্গাইল গেছে।আজ ফেরার কথা ছিল।কাল ফিরবে।একা মানুষ তাই আর তেমন কিছু রান্না করিনি।বল কী খাবি? ‘
-‘ এই থাম তো আসলেই শুধু খাওয়া খাওয়া।আমি তোর দিকে তাকাতে পারছিনা। ‘
-‘ তোকে তাকাতে হবেনা।তুই বস আমি আসছি। ‘

শ্রুতি উঠে রান্নাঘরে চলে গেল।তখনই শ্রুতির ফোনটা বেজে উঠল।পুলক ফোন করেছে।ঈষাণ ডাকতে গিয়েও শ্রুতিকে ডাকলনা।তার বদলে ফোনটা সাইলেন্ট উল্টে রাখল।এর মধ্যে মিনিমাম চারবার ফোন করেছে পুলক।শ্রুতি এসে ঈষাণের হাতে কফির মগ ধরিয়ে দিয়ে বলল,
-‘ তো বল বিয়ে কবে করছিস? ‘
-‘ চল্লিশ পার হোক তারপর ভেবে দেখব। ‘
-‘ এসব পাগলামী বাদ দিয়ে জলদি একটা বিয়ে টিয়ে কর। ‘

ঈষাণ শ্রুতির কথার উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে বসল ওকে।
-‘ তুই ভালো নেই তাইনা? ‘
-‘ কী শুরু করেছিস বল তো আসার পর থেকে। ‘
-‘ তুই কিছু হাইড রাখতে চাইছিস।আচ্ছা বলতে না চাইলে থাক।জোড় করবনা। আমি তাহলে উঠি।পুলকের সাথে তো আর দেখা হলোনা। ‘
-‘ উঠবি মানে?ডিনার করে তারপর যাবি। ‘
-‘ ফরমালিটিস পালন না করলেও চলবে। আসি, নিজের খেয়াল রাখিস। ‘

ঈশাণ যাওয়ার জন্য বসা থেকে উঠে দাঁড়ালে শ্রুতি বলল,
-‘ তোর সাথে আমি ফরমালিটি করব কেন?আমার সাথে কী তোর ফরমালিটির সম্পর্ক?বসে যা না। ‘

ঈশাণের নিজেরও যেতে ইচ্ছা করছিল না।খুব মায়া লাগছে শ্রুতির মুখটা দেখে ওর।শ্রুতির পাশে গিয়ে বসল ঈশাণ।

-‘ মনে তো হচ্ছেনা ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া করিস।আমারও খিদে পেয়েছে চল তো খেয়ে নিই। ‘

এক চিলতে হাসি দিয়ে শ্রুতি ডিনার রেডি করতে চলে গেল।দুজনে একসঙ্গে বসে খাবার শেষ করে আবার গল্প জুড়ে বসল।গল্পে গল্পে শ্রুতি ওর সংসার জীবনে নানারকম গল্পও করল।আজকাল পুলকের পরিবর্তনের বিষয়টাও শ্রুতি ঈশাণকে জানাল।

-‘ পুলককে যতদূর জানি সেই হিসাবে ওর এমন পরিবর্তনের কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছিনা।ওর কাছের বন্ধু বলতে তো জানি আমরা পাঁচজনই।আর অফিস কলিগদের সাথে তো এত ভালো সম্পর্ক কারো সাথে আছে বলে মনে হয়না।কারণ ও সবসময় কম মিশুক ছিল মানুষের সাথে।আর সবসময় নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সবসময় সচেষ্ট।তাহলে আড্ডাবাজি নিয়ে মেতে থাকার কোনো কোনো কারণ দেখছিনা আমি।তুই ওর সঙ্গে এই বিষয়ে ক্লিয়ার করে কথা বল। ‘
-‘ ইচ্ছে করেনা রে। ‘
-‘ শ্রুতি তোর সমস্যা কী বল তো।তুই একটু বেশিই চাপা।এত চাপা স্বভাব নিয়ে পুরুষ মানুষের মন জুগিয়ে চলা খুবই কষ্টকর।তোকে তো শক্ত থাকা উচিত। তোদের সম্পর্ক নিয়ে অনেকেই এখনো কানাঘুষা করে।সেখানে পুলকের এমন পরিবর্তন দেখা দিলে তোর বাবা-মাও বলা বাদ রাখবেনা।তারা আরো সুযোগ পাবে এটা নিয়ে। ‘

ওদের কথার মাঝেই শ্রুতির মেসেঞ্জারে মেসেজ আসার শব্দ পেল শ্রুতি।ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল পুলক বেশ কয়েকবার ফোন করেছিল।অনেকটা খুশি হয়ে কল করতে গেল কিন্তু হোমস্ক্রিণে রবিনের কনভার্সেশন দেখে আগে সেখানে ঢুকল। কিছুক্ষণ পরই শ্রুতির চোখ থেকে টুপ টুপ করে পানি পরতে থাকল।স্তব্ধ হয়ে বসে আছে শ্রুতি।

-‘ কী হয়েছে শ্রুতি?কাঁদছিস কেন? ‘
‘(নিশ্চুপ)’
-‘ কী হয়েছে বলবি তো? ‘

শ্রুতি নিশ্চুপ হয়ে ফোনের স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে আছে।চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসছে ওর রবিনের মেসেজগুলো দেখে।

 

অনুরাগ ৪র্থ পর্ব

অনুরাগ
৪র্থ পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

শ্রুতিঃ আমি তখন বললাম আমি আমার ভ্যালেন্টাইন গিফ্ট পেয়ে গেছি আমার কলিজাটা। ও আমায় তখন বলল, ‘ যা এটা কী কোনো গিফ্ট হতে পারে?এটা তো আমার জীবনের একটা মহামূল্যবান উপহার। আচ্ছা তোমার তো আগরা যাওয়ার খুব শখ।এ বছর বসন্তঋতুতে আমরা দীর্ঘসময়ের জন্য ভ্রমণে বের হবো।ধরো দার্জিলিং আর আগরা দুটো জায়গাতেই আমরা ঘুরে আসব।আর বেঁচে থাকলে পরের বছর তোমার পৃথিবীর ভূস্বর্গতে নিয়ে যাব কাশ্মীরে। ‘

তানিয়াঃ ওয়াও সো এক্সেলেন্ট গিফ্ট দোস্ত।

শ্রুতিঃ মোটেও না তানিয়া।কারণ আগে আমাকে ওর এবিলিটির দিকে নজর দিতে হবে।ও চাকরিতে জয়েন করেছে মাত্র দু বছর হলো।আমি এখনি ওকে ফিন্যান্সিয়াল ভাবে এত চাঁপ দিতে চাইনা।আমি তো ওর ওই খুশিটাকে গিফ্ট হিসেবে চেয়েছি।

মেঘলাঃ ওর ওই খুশিটা কী আমাদের বল।

শ্রুতিঃ জানিনা এখনো।বললো পরে জানাবে।

বেলা দুপুরের সময় শ্রুতি লাঞ্চ শেষ করে পুলক কে কয়েকবার ফোন করল।কিন্তু ওপাশ থেকে ফোনটা আর রিসিভ হলোনা।মনটা একটু খারাপ হয়ে গেল শ্রুতির।পুলক শত ব্যস্ততার মাঝেও শ্রুতির সঙ্গে ফোনে কথা বলতে না পারলেও টেক্সট করে কথা বলে।তবু শ্রুতির ফোন কখনো ইগনোর করেনা। কিন্ত এখন তো অফিসে লাঞ্চের সময়। এখন তো ওর কোনোভাবেই বিজি থাকার কথা নয়।এতকিছু ভাবনার মাঝে শ্রুতি নিজের মনকে এটা বলে বুঝ দিলো হয়তো ফোনের কাছে নেই কিংবা সত্যি খুব বিজি বলেই ফোনটা রিসিভ করছেনা।ব্যস্ততা শেষ হলেই পুলক ওকে ফোন দিবে।এটা ভেবে বিছানায় শুয়ে অপেক্ষা করতে করতে কখন যেন ঘুমিয়ে গেল শ্রুতি।ঘুম ভাঙলো সন্ধ্যার সময়। নিজের ঘুম দেখে শ্রুতি নিজেই অবাক। ও কখনোই এতসময় অবদি ঘুমায়না তাও আবার দিনের বেলাতে।বিছানা ছাড়তেই পুলকের ফোনের কথা মনে পড়ল।দ্রুত ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল পুলকের কোন ফোন কলস আসেনি।একটু অবাক হলো শ্রুতি।সেই সাথে চিন্তাও হতে লাগল। কোনো সমস্যাই পরলো কিনা কে জানে। সঙ্গে সঙ্গে আবার ফোন করলো পুলককে। এবার ফোনটা কেটে দিয়ে পুলক টেক্সট করলো,
‘ Byasto achi my heart. ‘ মেসেজটা পেয়ে অনেকটা স্বস্তি পেল শ্রুতি।রাতের রান্না চাঁপিয়েছে চুলায় এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠল।গ্যাস অফ করে দরজা খুলতেই ঈষাণকে দেখল শ্রুতি।

-‘ আরে বাবা আজ কাল সূর্য কোনদিকে উঠছে এস.পি সাহেব। ‘
-‘ এই তুই আমাকে আমার নাম ধরে ডাকবি।এইসব প্রফেশোনাল নাম ধরে ডাকবিনা একদম। ‘
-‘ ভয় করে তো। ‘
-‘ ভয় তোর পিঠের ওপর দিবো।আগে ঢুকতে দে। ‘
-‘ ও স্যরি স্যরি।ভেতরে আসুন মি.ঈষাণ রাজ। ‘

ঈষাণ ভেতরে এসেই ঠাস করে সোফায় বসে পরল।তারপর বলল, ‘ ফ্যানটা একটু ছেড়ে দে কষ্ট করে। ‘

শ্রুতি ফ্যান ছেড়ে দিয়ে ঈষাণের মুখোমুখি বসল।

-‘ এত পরিমাণ ব্যস্ত যিনি যে টয়লেটে আরাম করেও পাঁচটা মিনিট বসতে পারেনা।আর সেই ব্যক্তিই আজ আমার সামনে বসে ফ্যানের বাতাস খাচ্ছে। আমি কী সত্যি দেখছি? ‘

ঈষাণ ধুম করে শ্রুতির পাশে বসে ওর হাতে জোড়ে একটা চিমটি কাটল।

-‘ উহ্ কীরে তুই।এভাবে চিমটি কাটলি কেন?দেখেছিস কী করলি? ‘
-‘ কই দেখি কী করলাম? ‘
-‘ থাক আর দেখতে হবেনা। ‘
-‘ বিশ্বাস করছিলিনা বলেই তো চিমটি কাটলাম। ‘
-‘ বল কী খাবি? ‘
-‘ কী খাওয়াবি? ‘
-‘ যা খেতে চাস।রান্না করছিলাম।কী খেতে চাস বল এক্ষণি রান্না করে দেব। ‘
-‘ রান্না খাবার নয়। ‘
-‘ তাহলে কী কোল্ড ড্রিংকস? ‘
-‘ না রেডিমেড। ‘

শ্রুতি হেসে দিয়ে বলল, ‘ রেডিমেড কী জিনিস আবার? ‘
-‘ আছে।খাওয়াতে পারবি তো? ‘
-‘ বলেই দ্যাখ।সামর্থ্যে কুলালে অবশ্যই খাওয়াবো। ‘
‘ সামর্থ্য না?তাহলে থাক বাদ দে। ওটা তোর আর সামর্থ্যে কুলাবেনা। ‘
-‘ এতটা গরীব ভাবিস না। ‘
-‘ তাই?তাহলে একটা চুমু খাওয়া। ‘

বলেই ঠোঁট টিপে হাসছে ঈষাণ।আর শ্রুতির মুখটা তখন দেখার মত ছিল।বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে আছে ঈষাণের দিকে।তারপর ঈষাণ হো হো করে হেসে ফেলল।সেটা দেখে শ্রুতি ওর গায়ে চাপড় দিয়ে বলল, ‘ তোকে না আমি সাত দিনের রিমান্ডে নিব।শয়তনা একটা।এখনো এত মজা করতে পারিস তুই কীভাবে কে জানে? ‘
-‘ আমি তো এমনই ছিলাম তাইনা? ‘
-‘ বুঝেছি তোর এখন কী প্রয়োজন। ‘

ঈষাণ হাসি থামিয়ে মুখটা মলিন করে জিজ্ঞেস করল, ‘ সত্যি বুঝেছিস? ‘
-‘ হুম।দাঁড়া কালই আন্টিকে ফোন করব। ‘
-‘ আরে এর মধ্যে আবার আন্টি কেন? ‘
-‘ বিয়ে টিয়ে দেওয়ার বিষয়ে তো কথা বলতে হবে।না হলে তো তুই খুব তাড়াতাড়িই পাগল হয়ে যাবি। ‘
-‘ ঠিকই বলেছিস। তোকে আজকাল দেখলে সত্যি পাগল পাগল লাগে।ভালোই ছিলাম এতদিন তোকে না দেখে। ‘

শ্রুতি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ মানে? ‘

ঈষাণ নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলল, ‘ মানে তোর মত একটু কিউট বউ দরকার আমার।পুলক শালা তো ঝোপ বুঝে কোপটা মাড়ল।আমাদের বন্ধুমহলে একরকম সবার ক্রাশ ছিলি যে তুই। ‘
-‘ আচ্ছা তুই বস আমি তোর জন্য কফি করে নিয়ে আসি।টিভিটা চালিয়ে দিচ্ছি টিভি দ্যাখ বসে।রান্না বন্ধ করে এসেছি তো।আমি ততক্ষণে রান্নাটা করে আসি।রাতের খাবার খেয়ে যেতে হবে কিন্তু তোকে। ‘
-‘ হুম।পুলক কখন ফিরবে? ‘
-‘ এক দেড় ঘন্টার মধ্যে চলে আসবে। ‘
-‘ অনেক দেরী তো। ‘
-‘ তো কী হয়েছে?ডিনার না করে তোকে যেতে দিচ্ছিনা।’
-‘ তাহলে চল তোর রান্নাতে হেল্প করি। ‘
-‘ আরে না।তুই বসে টিভি দ্যাখ আমি চট করে রান্নাটা সেড়ে আসছি। ‘
-‘ কথা বলিসনা তো।চল। ‘



-‘ ইলিশ মাছের দোপেয়াজা রাইট? ‘
-‘ হুম।ওর ভীষণ পছন্দের খাবার। ‘
-‘ আমারও খুব পছন্দ এটা। ‘
-‘ পোলাও আর তার সঙ্গে ইলিশের দোপেয়াজা পেলে ঈদের চাঁদ দেখার মত খুশিতে লাফিয়ে উঠে। ‘

রান্না শেষে ডাইনিং এ বসে শ্রুতি আর ঈষাণ গল্প করছে।এর মধ্যে পাঁচবার ফোন করেছে পুলক শ্রুতির ফোনে।কিন্তু শ্রুতি ফোনটা বেডরুমে রেখে চলে এসেছে।

-‘ এই শ্রুতি তোদের বেডরুমটা কিন্তু আমার খুব পছন্দ হয়েছে। ‘
-‘ আমার আসার আগেই ও আমার থেকে শুনে শুনে নিজেই বেডরুমটা সাজিয়েছে। আর সবথেকে বেশি সুন্দর আমাদের বেলকোনিটা।ওটাও ও নিজেই সাজিয়েছে। ‘
-‘ আমাকেও তো সাজিয়ে রাখতে হবে আমার বউয়ের জন্য।চল তো তোদের বেলকোনিটা দেখে আসি।”
“আয়। ‘

ঈষাণ ওদের বেডরুমটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। বেডরুমে দেখার মত সব থেকে আকষর্ণীয় জিনিস হলো পুলক আর শ্রুতির ছবিগুলো।সেগুলোই দেখছিল ঈষাণ। তারপর বেলকোনিতে গিয়ে দাঁড়াল ওরা।

-‘ আচ্ছা বেলকোনিটার সৌন্দর্যটা কী আমি এখনো বুঝতে পারলাম না। ‘
-‘ দেখবি সৌন্দর্যটা? ‘
-‘ দেখব বলেই তো এলাম। ‘
-‘ ওয়েট। ‘

বেলকোনির গ্রিলে সাদা পর্দাটা টেনে দিল শ্রুতি।তারপর রুমে গিয়ে রুমের লাইট অফ করে নীল ড্রিম লাইটটা জ্বালিয়ে দিল।অন্য একটা সুইচ অন করতেই সারা বেলকোনি বিভিন্ন রঙের মৃদু আলোতে ভরে গেল।ঈষাণ ওপরে তাকিয়ে দেখল বেলকোনির ছাদ জুড়ে বিভিন্ন রঙের ছোট ছোট কালারফুল প্রজাপতি জ্বলছে।অন্ধকার ঘরে এই প্রজাপতিগুলো খুব সুন্দরভাবে জ্বলে ওঠে। এখন সত্যিই বেলকোনিটাকে স্বপ্নেররাজ্য বলে মনে হচ্ছে ঈষাণের কাছে।সেখানে দাঁড়িয়ে দুজন গল্প করছে। গল্প করতে করতে কখন যে ঘড়ির কাটাতে রাত দশটা বেজে গেল শ্রুতির তা খেয়ালই নেই।পুলক বাসায় ফিরে কলিংবেল চাঁপার আগেই দেখল দরজা ভেজিয়ে রাখা।দরজা লক করে ড্রয়িংরুমে ঢুকে দেখল সোফার ওপর একটা ফোন। যেটা শ্রুতির নয়।সোজা বেডরুমে ঢুকে গেল।বেডরুমের লাইট অফ শুধু ড্রিম লাইট জ্বলছে।আর বেলকোনি থেকে শ্রুতি আর একজন পুরুষের কথা আর হাসির শব্দ আসছে।ব্যাগটা বিছানার ওপে রেখে বেলকোনিতে চলে গেল পুলক। শ্রুতির হাতের তালুতে ঈষাণ আঙুল দিয়ে কী যেন লিখছে আর কথা বলছে। আর শ্রুতি সেটা দেখে হাসছে।পুলক বেলকোনিতে এসে দাঁড়িয়েছে সেটা ওদের কারোরই খেয়াল হলোনা।ঈষাণ শ্রুতির হাত নিয়ে নাড়াচাড়া করছে তার মধ্যেই পুলক এক ঝটকায় শ্রুতিকে টেনে নিয়েলো নিজের কাছে।

 

অনুরাগ ৩য় পর্ব

অনুরাগ
৩য় পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

সিঁড়ি ভেঙে ওঠার সময় শ্রুতি বার বার কথা বলার চেষ্টা করছে পুলকের সঙ্গে। মুখটা বেঁধে রাখার জন্য মুখের শব্দটা কেমন যেন গোঙানির শব্দের মত শোনাচ্ছে।
পুলক ধমক দিয়ে বলল,
-‘ এই চুপ এত কথা কিসের? একদম নিচে ফেলে দিব কিন্তু।এমনিতেই জানটা বেরিয়ে আসার উপক্রম।দিন দিন খেয়ে আটার বস্তা হচ্ছে।বাপরে বাপ মিনিমাম পঞ্চান্ন কেজি তো হবেই।শরীরের অনেক মেদ জমে গেছে না?এর জন্য স্বামীকে স্বামী বলে গ্রাহ্য করতে ইচ্ছে করেনা।আজকেই মেদ একদম কমিয়ে দিব। ‘

পুলকের কথাগুলো শুনে শ্রুতি একদম চুপ করে গেল।বুকটা ফেঁটে কান্না আসছে ওর। পুলক এত বাজে ব্যবহার ওর সঙ্গে করতে পারছে?ও না হয় একটু রাগ দেখিয়ে তুই তুকারি একটু গালাগাল দিয়েছে।তাই বলে পুলক ওর সঙ্গে এত নোংরা ব্যবহার করবে।এমন ব্যবহার সহ্য করার থেকেই ওর মরে যাওয়াই ভালো।ছাদে উঠে চিলেকোঁঠার ঘরে চলে এল পুলক।তারপর শ্রুতি কে কাঁধ থেকে নামিয়ে বিছানায় বসিয়ে দিল।দুজনেই প্রচন্ড ঘেমে গেছে। চিলেকোঁঠার জানালাটা খুলে দিল আগে। চাঁদের আলোর জন্য ঘরের অর্ধেকটাই আলোকিত লাগছে। তারপর ফ্যানটা ছেড়ে রুমের লাইট অফ করে দিয়ে ছাদের মাঝে গিয়ে দাঁড়াল।চাঁদনিরাত তাই বিছানাতে বসেই শ্রুতি পুলককে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে।বাহিরে কিছুটা ঝিরিঝিরি বাতাসও বইছে।কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে পুলক ঘরে ঢুকল।শ্রুতি বিস্ময় চোখে তাকিয়ে আছে পুলকের দিকে।দরজাটা বন্ধ করে পুলক শ্রুতির সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলল, ‘ তো তুমি রেডি? ‘

শ্রুতি মুখের ভঙ্গিতে বোঝাচ্ছে, ‘ কিসের জন্য রেডি হবো? ‘

পুলক বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, ‘ কী বলো?বুঝিনা তো। ‘

চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে শ্রুতি পুলকের দিকে।অবশ্য সেটা পুলক ঠিক বুঝতে পারছেনা।

-‘ ওউ স্যরি।ওয়েট। ‘

তারপর মুখের বাঁধনটা খুলে দিয়ে পুলক বলল, ‘ এবার বলো। ‘

শ্রুতি মুখের বাঁধন খোলার সাথে সাথে জোড়ে জোড়ে শ্বাস নিতে থাকল।সেটা দেখে পুলক বলল, ‘ সিড়ি ভেঙে কাঁধে করে নিয়েলাম আমি। আর হাঁপাচ্ছো তুমি?সে যাই হোক তুমি রেডি তো? ‘

ঝাঁঝালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল শ্রুতি, ‘কিসের জন্য?মরার জন্য? ‘
-‘ না। ‘
-‘ এই তুমি কী করতে চাইছো বলো তো?”
-‘ রেপ করব। ‘
-‘ কীহ্? ‘
-‘ হুম।হাত পা বেঁধে জোড় করে ধর্ষণ করে দেখোনি টিভিতে?আমিও তাই করব। তারপর উঁচু করে ছাদ থেকে ফেলে দিব। ‘

কথাগুলো শেষ করে পুলক পাঞ্জাবীটা খুলে ফেলল।সেটা দেখে শ্রুতি চিল্লিয়ে বলল, ‘ দেখো তুমি কিন্তু বেশি বেশি করছো। আমার হাত পা খুলে দাও বলছি। ‘

কে শোনে কার কথা।পাঞ্জাবীটা খুলেই শ্রুতিকে একরকম ধাক্কা দিয়েই বিছানায় শুইয়ে দিল।শ্রুতির হাত দুটো সামনের দিক করেই বেঁধে রেখেছিল পুলক।বাঁধা হাতের ফাঁকা দিয়ে শ্রুতির উপর উঠে এল।তখন শ্রুতির বাঁধা হাতদুটো পুলকের ঘাড়ের ওপর পড়ল।মনে হচ্ছে পুলকের ঘাড় দুহাত দিয়ে জড়িয়ে রেখেছে।পুলক জিজ্ঞেস করল, ‘ গরম লাগছে খুব? ‘

ইনোসেন্ট মুখ করে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁবোধক উত্তর দিল শ্রুতি।

-‘ বলবে তো সেটা। ‘

পুলক শ্রুতির হাতের ফাঁক বেরিয়ে এসে শাড়ির আঁচলটা টেনে খুলে ফেলল ওর গা থেকে।তারপর ওকে বলল, -‘ দু’মিনিট সময় দিচ্ছি শাড়িটা খোলার জন্য।কোথায় কী ব্রুজ না সেফটিপিন লাগিয়েছো।সেগুলো তাড়াতাড়ি খুলো। আমি খুললে কিন্তু টেনে টুনে ছিড়ে ফেলব। ‘

শ্রুতি রাগ দেখিয়ে আর উঠলোনা।
ওভাবেই শুয়ে থাকল।পুলক ওকে টেনে উঠিয়ে দাঁড় করিয়ে শাড়ি খুলতে শুরু করল।শ্রুতি একদম তাজ্জব বনে গেল পুলকের কান্ড দেখে।এত ভদ্র ছেলেটা এই এক রাতের ভিতর এত অসভ্য হয়ে গেল কী করে?

-‘ তুমি কী পাগল হয়ে গেলে?ছিড়ে যাবে তো শাড়ি। ‘
-‘ ছিড়ুক। ‘
-‘ রেপিস্টদের মত করছো কেন? ‘
-‘ আমি এই মুহূর্তে একজন প্রফেশোনাল রেপিস্ট।শুনেছো তুমি?’

শাড়িটা খুলে নিচে ফেলে দিল।তারপর শ্রুতির কোমড় টেনে ধরে একদম কাছে নিয়ে এল।শ্রুতি কিছু বলতে গেলে পুলক ও ঠোঁটের ওপর আঙুল রেখে বলল,
-‘ অনেকক্ষণ ধৈর্য রেখেছি।আর পারছিনা রাখতে। ‘
-‘ কিসের ধৈর্য্য? ‘

কথার জবাব না দিয়ে শ্রুতির লাল ঠোঁটজোড়া একদম টেনে নিল ওর ঠোঁটজোড়ার মাঝে।কতসময় ধরে যে শ্রুতির ঠোঁটজোড়া চেঁপে রেখেছিল তা ঠিক খেয়াল নেই পুলকের।ঠোঁটজোড়াকে নিজের ঠোঁটের মাঝ থেকে মুক্তি দেওয়ার পর শ্রুতিকে বলল, ‘ এটার জন্য।সেই এক ঘন্টা আগে থেকে নিজেকে কন্ট্রোল রেখেছি। ‘

শ্রুতি দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল, ‘ তাই? ‘
-‘ হুম। ‘
-‘ হয়ে গেছে? ‘
-‘ না এখনো বাকি। ‘
-‘ তাহলে শুরু করো। ‘
-‘ আল্লাহ্! এই মেয়ে কী যেচে পড়ে… ‘
-‘ খাল্লাস হতে এসেছি। ‘

পুলকের গলা জড়িয়ে ধরে বলল শ্রুতি। পুলক ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি রেখে বলল, ‘ আজ তো তুই সত্যিই শ্যাষ। ‘




তানিয়াঃ হা হা হা…কী দুর্দান্ত একটা ঘটনা।উহ্ আমি হাসতে হাসতেই একদম শ্যাষ।

মেঘলাঃ ইশ আমাদের এই ইনোসেন্ট পুলকটা এত্ত রোমান্টিক সেটাই তো বিশ্বাস হচ্ছেনা।তোদের বিয়ের পর ভেবেছিলাম যে গাঁধাটাকে রোমান্স শেখাতে গিয়ে তুই বুড়িই হয়ে যাবি।

তানিয়াঃ আর এটাও মজা করে বলেছিলাম যে শেষমেশ দেখা গেল পুলকটাই না প্রেগনেন্ট হয়ে যায়।

শ্রুতিঃ এই শয়তানের ডিম চুপ কর।আমি গতকাল রাতে ওর ব্যবহারে কতটা অবাক হয়েছিলাম জানিস?আর ভয়টাও পেয়েছিলাম খুব।

মেঘলাঃ তো ভ্যালেন্টাইন আর বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষ্যে কী গিফ্ট পেলি?

শ্রুতিঃ বিবাহবার্ষিকীর গিফ্টটা সিক্রেট আপাতত।ওটা কিছুদিন পর জানাবো তোদের।আর ভ্যালেন্টাইনের গিফ্টটার কথা আমি সারাজীবনেও ভুলব না।

তানিয়াঃ এই কী গিফ্ট রে? বল না।

মেঘলাঃ হুম,তুমি তো শুধু পারো কম্পেয়ার করতে।তোমার রবিনের থেকে বড় বা দামী কোনো গিফ্ট দিলো কিনা।

তানিয়াঃ মেঘলা তুই কিন্তু….

শ্রুতিঃ জানিনা এই গিফ্টটা বড় বা দামী কোনো গিফ্টের সঙ্গে কম্পেয়ার করা যাবে কিনা।ইভেন আমি কম্পেয়ার করতেও চাইনা।ছোটবেলা থেকে যে ছেলেটা বাবা-মা আপনমানুষ গুলো ছাড়া একা একাই বড় হয়েছে জীবন যুদ্ধে একাই সংগ্রাম করে এতদূর এসেছে।সেই মানুষটার জীবনে আমি একটু সুখের আভাস দিতে চেয়েছি সবসময়।বিয়ের পর ভেবেছিলাম আমার বাবা-মা’র আদর,স্নেহ আর ভালোবাসা পেয়ে নিজের বাবা-মায়ের ভালোবাসার ঘাটতি পূরণ হবে।কিন্তু বিধাতা সেই কপাল বোধহয় ওর রাখেনি। কিন্তু এই বিষয় নিয়ে ওর একটুও আক্ষেপ নেই যে ও ওর শ্বশ্বুড়বাড়ি আদর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত।আমি কখনো মন খারাপ করে থাকলে ও কেমন যেন ভয় পেয়ে যেত।ভাবত আমি যদি আমার বাবা-মা কে ছেড়ে না থাকতে পারলে ওকে ছেড়ে যদি চলে যাই?তার জন্য কখনো ইমোশোনাল হয়েও আমাকে বলেনি, ‘ শ্রুতি প্লিজ আমাকে ছেড়ে কখনো চলে যেয়োনা। ‘ তার পরিবর্তে সবসময় আমার সামনে শক্ত মনের মানুষ হয়ে চলাফেরা করত।আর আমার মাথায় হাত রেখে বলত, ‘ এই বাচ্চাটা খুব মন খারাপ করছে বাবা-মায়ের জন্য?তাহলে যাও বাবা-মায়ের কাছ থেকে ঘুরে এসো।যেদিন ইচ্ছা হয় সেদিন আমার কাছে এসো।আমি এগুলো নিয়ে কখনোই অভিযোগ করবোনা।’

তানিয়াঃ তুই যে তোর বাবা-মায়ের কাছে কখনো ফিরে গেলে তারা যে তোকে কোনোদিনও ওর কাছে ফিরে আসতে দিতোনা সেটা কী ও বুঝতোনা?

শ্রুতিঃ বুঝতো।আর বুঝেও এই কথাগুলো বলতো শুধু আমার ভালো থাকার জন্য। নিজের ভালো থাকার জন্য ও কখনো অন্য কারোর ভালো থাকা বা সুখকে কেড়ে নিতে পারেনা।কথাগুলো হাসিমুখে বললেও ওর চোখে যে কী পরিমাণ ভয় থাকত আমাকে হারিয়ে ফেলার সেটা কেবল আমিই দেখেছি।জানিস আমাদের মাঝে এত ভালোবাসা থাকার পরেও আমি ওকে মাঝে মাঝেই রাতে বেলকোনিতে বসে কাঁদতে দেখেছি।আর তারপর আমার কাছে এসে ঘুমের মধ্যে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে কেঁদে বলত,
‘ এই হৃদপিন্ডটা কে আমার বুক থেকে ছিনিয়ে নিওনা মাবূদ।আমি আর সইতে পারবোনা।
একজনকে আমার থেকে চিরতরের জন্য কেড়ে নিয়েছো।আমি চুপচাপ সয়ে গেছি।কিন্তু ও আমার থেকে দূরে চলে গেলে আমি অন্ধকারে তলিয়ে যাব। ‘
এই কথাগুলো শোনার পর আমার বুকের বা পাশটাতে কী পরিমাণ ধাক্কা লাগে তা তোদের বোঝাতে পারবোনা।

তানিয়াঃ তার মানে তুই ওর জীবনে আসার আগে ও আরো একজনকে ভালোবাসতো?

শ্রুতিঃ হ্যাঁ।

মেঘলাঃ কিন্তু এমন কারো কথা তো আমরা কখনো শুনিনি।আর ভার্সিটিতে ওকে অনেক মেয়েই পছন্দ করতো।কিন্তু সম্পর্কের ব্যাপারটাতে এগিয়েছিল শুধুমাত্র তোর সঙ্গেই।আর তার একটামাত্র কারণ ছিল শুধু তোর গান।

তানিয়াঃ তুই এরপর জানতে চাসনি যে সে কে ছিল?

শ্রুতিঃ না।কেন জানতে চাইব?ও আমাকে যখন নিজে থেকে কিছু বলতে চাইছেনা তখন আমি কেন ওকে অযথা ফোর্স করব।ও তো কখনোই কোনোকিছুতে আমাকে ফোর্স করেনা।আর সব থেকে বড় কথা যদি এমন কেউ থেকেও থাকে ওর জীবনে সেটা ওর অতীত।আর আমি ওর বর্তমান।এমন তো না ও আমাকে ঠঁকিয়ে যাচ্ছে।আর যে ছিল সে ওর জীবন থেকে চিরতরের জন্য চলে গেছে।

মেঘলাঃ হুম বুঝলাম।জানিস তো শ্রুতি, মাঝে মাঝে তোদের দুজনের এত বোঝাপড়া এত বিশ্বাস,ভরসা আর ভালোবাসা দেখলে বড্ড হিংসে হয় আমার।তোরা দুজন দুজনের কাছে কতোটা পরিষ্কার।খুব সুখে থাকরে তোরা।

তানিয়াঃ কিন্তু তোর গিফ্টটা কী ছিল? সেটা তো বললিনা।

শ্রুতিঃ অনেকদিন পর ওর পুরোনো খুশিটা।
তানিয়াঃ মানে?

শ্রুতিঃ কাল রাতে ও আমাকে বলল, ‘ অনেকদিন পর আমার জীবনের একটা পুরোরো খুশি ফিরে পেতে চলেছি। ‘

 

অনুরাগ ২য় পর্ব

অনুরাগ
২য় পর্ব
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

 

” বলনা কি এমন হয়?
যদি আর একটু চায় হৃদয়।
বলনা কি এমন হয়?
যদি হই আমি স্বপ্নময়।
নাহয় পেলাম সে স্বপ্নকে তোর দু-চোখের নীল তারায়।
নাহয় পেলাম সে সুখ ছোঁয়া হিম বাতাসের আশকারায়। বলনা কি করি হায়?
যদি স্বপ্নরাই তোকে চায়।
বলনা কি করা যায়?
যদি আনমনেই মন হারায়। ”

ঘুমটা জেঁকে বসার আগেই মোহকর কন্ঠসুর শুনে শ্রুতি ঘুম ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বসল।গানের কন্ঠটা আসছে বেলকোনি থেকে।গানটা খুব মনযোগ দিয়ে শুনতে শুনতে শ্রুতি খাটের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে চোখ বন্ধ করে নিল।ও জানে এই মোহকর সুর শুধুমাত্র একজনেরই। এই সুরকে ভালোবেসেই তো পুলককে কাছে টেনে নিয়েছিল সে।

” ঘুম জাগা চিলেকোঠায়,
মন ভেজা অমানিশায়,
মান করে,কখনও ভান করে তোকে আপন করে হারাতে চায়।
স্বপ্নরা উড়ে পালায়,
আনকোরা খেয়ালে হায়,
দূর থেকে,হৃদয় পুর থেকে অচেনা সুর থেকে কি করে পাই?
মন চাইছে ভীষণ,হারাতে………
তোর মন নজরে আড়াতে,
নাহয় থাক পড়ে খেয়ালে,
অভিমান গুলো গোপনে।
নাহয় পুরনো আশারা আজ ছোট্ট এই জীবনে।
বলনা কি হবে তাই?
যদি আর একটু কাছে পাই।
বলনা কি হবে তাই?
যদি দূর থেকেই হাত বাড়াই। ”

পুলকের সুরে সুর মিলিয়ে নিজেও দু লাইন গেয়ে উঠল শ্রুতি।
” হুম… স্বপ্নরা কেন আজ ঘড় ছাড়া? হুম… তুই হীনা কেন দিন আনমনা? ”

শ্রুতি সুর ছেড়ে দিতে তাল হারানোর আগেই পুলক আবার গেয়ে উঠল,
” নাহয় কাটালি এক জীবন,
কিছু ছন্নছাড়া ঢঙে,
নাহয় রাঙ্গালি স্বপ্ন তোর,
ওই রংধনুর সাত রঙে।
বলনা কি আসে যায়?
যদি আর একটু পাশে পাই।
বলনা কি ক্ষতি হয়?
যদি একটু বুঝিস আমায়। ”

দুজনের মোহকর কন্ঠ একত্র হয়ে মনের মাঝে যত মেঘের ঘনঘটা সৃষ্টি হয়েছিল শ্রুতি’র, সবটা নিমিষের মধ্যে ভ্যানিশ হয়ে গেল। এই মানুষটার গানের কন্ঠস্বর আর সুরগুলো এত পাগল করা কেন?যত বড় অন্যায় করুকনা সে।এমনভাবে যদি শ্রুতি’র সামনে কিছুসময় পার করে দেয় গান গেয়ে তাহলে শ্রুতি পুরো পৃথিবীকে ভুলে গিয়ে পুলকের বুকে ঝাঁপিয়ে পরবে। আর পুলকটাও সেটা খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে।এই কন্ঠে সারাজীবন গান শুনেও পার করে দিতে পারবে সারাটা সময়। এর জন্যই তো এই ছন্নছাড়া মানুষটিকে নিজের জীবনের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছে শ্রুতি সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে।আর কী থাকা যায় মুখ ঘুরিয়ে?বেলকোনির গ্রিলের সঙ্গে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে চোখদুটো বন্ধ করে গানটা গাইছিল পুলক।শ্রুতি যে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে সেটা পুলক বুঝেও চোখদুটো খুলছেনা।শ্রুতি নিজেই কথা বলল।

-‘ তখন রুম থেকে বেরিয়ে গেলে কেন? ‘
(পুলক নিশ্চুপ)

পুলক কোনো কথা বলছেনা দেখে শ্রুতি’র খুব অভিমান হলো।এভাবে পালাক্রমে দুজন রেগে থাকলে ভালোবাসাটা কখন হবে?এটা ভেবেই অথৈ আবার রেগে গেল। আর কিছু না বলে পুলকের গলা চেঁপে ধরতে গেলে পুলক চোখ খুলে শ্রুতি’র হাতদুটো ধরে নিজের কাঁধের দুপাশে রাখল।তারপর ওর কোমড় জড়িয়ে ধরে একদম কাছে টেনে নিয়েলো ওকে।দাঁত কিটকিট করে শ্রুতি বলল, ‘ ভাবটা তো কম শিখোনি।এতসময় কথা বলছিলেনা কেন? ‘
-‘ ভাব নিচ্ছিলাম।সবসময় তো তুমিও একশোতে একশো ভাব নিয়ে চলো।তাই আজ আমিও একটু দেখালাম “ভাব”। ‘
-‘ বদমাইশ পোলা।ভাব নেওয়ার রাইট অনলি আমার।তুই কেন নিবি?তাও আবার আমার কাছে নিবি?পাঁজি,বজ্জাত, শয়তান,খারাপ ছাড় আমাকে।আমার এখানে আসাই ভুল হয়ে গেছে।আমার কাছে ভাব নিতে আসে।কত বড় সাহস? ‘

পুলক আরো শক্ত করে চেঁপে ধরে বলল, ‘ এই ছুকড়ি তুই সবসময় আমাকে তুই তুকারি করে গালাগাল দিস কেন রে,হুম? আমি তোর বয়সে কত বড় জানিস? ‘
-‘ মাত্র আড়াই বছর। ‘
-‘ আড়াই বছর কম মনে হল তোর কাছে না?আ…ড়াই বছর আগে আমি দুনিয়াতে এসেছি।তখন তুই কই ছিলি তার কোনো খবরই নেই।আড়াই বছরের ছোট হয়ে তুই আমাকে গালাগাল দিস আবার তুই তুকারি করিস।আজ তোকে আমি শিক্ষা দিয়েই ছাড়ব। ‘
-‘ ওই ব্যাটা কী করবি তুই আমাকে?তার আগে আমি তোকে দুটো ঘুষি মেরে তোর নাক ভোঁতা করে দিব। ‘

বলা শেষ হতেই পুলকের নাকে শ্রুতি ঘুষি লাগাতে গেল।পুলক তখন ওর হাতটা ধরে বলল, ‘ স্বামীর নাক ফাটাতে আসছিস তুই?আজ তো তুই পুরো খাল্লাস। ‘

শ্রুতি কে কাঁধে তুলে রুমে নিয়ে চলে এল পুলক।তারপর ঠাস করে বিছানায় ফেলে দিল।

শ্রুতিঃ উহ্ঃ অসভ্য বেয়াদব ছেলে।তুই আমাকে এভাবে ফেলে দিলি কেন?
পুলকঃ আবার?আবার গালাগালি দিয়ে কথা বলছিস?তোকে তো আমি….

কথা শেষ না করে আলমারি থেকে তিনটা ওড়না বের করে নিয়ে শ্রুতি’র হাত পা বাঁধতে শুরু করে দিল।শ্রুতি চিৎকার করে বলল, ‘ এই তুমি কী করছো এগুলো? ‘

কথার জবাব দিল না পুলক।ওকে চেঁপে ধরে হাত পা বেঁধে চলেছে।শ্রুতি ভয় পেয়ে গেল।পুলক প্রচন্ড রেগে গেছে হয়তো।এতটা বেশি করা উচিত হয়নি ওর।নিজের দোষে এখন ওকে উত্তম মধ্যম না খেতে হয়।শ্রুতি কাঁদো কাঁদো কন্ঠে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘ এই শোনোনা তুমি আমার হাত পা বাঁধছো কেন?হাত পা বেঁধে মারবে নাকি তুমি? কথা বলোনা কেন?সো স্যরি আমার কলিজাটা।আর কখনো এমন ছোটলোকদের মত ব্যবহার করবোনা। ‘
-‘ কলিজাটা?কলিজাতে বার বার লাথি মারার সময় মনে ছিলনা? ‘
-‘ আচ্ছা ভুল হয়ে গেছে তো।হাত পা বাঁধছো কেন?আমি কিন্তু চিৎকার করে ওদের ডাকব। ‘
-‘ মাইক এনে দিই?না হলে তো কানে যাবেনা ওদের।এমন সময় চিৎকার করলে ওরা কেন তোর আব্বাজানও দরজার কাছে আসবেনা। ‘
-‘ আচ্ছা তুমি আমাকে মারতে চাইলে মারো।তাই বলে হাত পা বেঁধে কেন? ‘
(পুলক নিশ্চুপ)
-‘ আরে আমার ভাই হাত পা বাঁধছিস কেন রে? ‘
-‘ ছাদ থেকে ফেলে দিব হাত পা বেঁধে। বুঝেছিস?যে বউ স্বামীকে তুই তুকারি করে গালাগাল দেয় সেই বউকে আজ চরম শিক্ষা দিব।তারপর সকাল হলে সবাই যখন তোকে রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে পড়ে থাকতে দেখে আমাকে জিজ্ঞেস করবে এমনটা কী করে হল?তখন বলব আমার বউ আস্ত একটা গালিবাজ ছিল। তার জন্য ওকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে শাস্তি দিয়েছি। ‘

কথাটা বলেই শ্রুতি’র মুখটা বেঁধে দিয়ে ওকে আবার কাঁধে তুলে নিয়ে ছাদের দিকে রওনা হল।শ্রুতি ভয়ে ঘেমে একদম চুপসে গেছে।পুলক রেগে গেলে যে কতটা সাংঘাতিক হয় তা তো একবার দেখেছিল যখন ওদের মাঝে প্রেম ছিল।রেগে গেলে ছেলেটা একদম হিতাহিত জ্ঞানবোধ হারিয়ে ফেলে।

 

অনুরাগ (১ম অংশ)

অনুরাগ (১ম অংশ)
লেখিকাঃ #Israt_Jahan

ঘড়িতে রাত ১১ টা বেজে ১৫ মিনিট। বিছানার মাঝ বরাবর বধু বেশে বসে আছে শ্রুতি।কখন যে পুলক বাসায় ফিরবে আর কখন যে শ্রুতি কে দ্বিতীয়বারের মত বধু সাজে দেখে চমকে উঠবে সেই অপেক্ষাতে বসে প্রহর গুণছে মেয়েটা।আজ তাদের প্রথম বিবাহ বার্ষিকী।বিয়ের আগে থেকেই শ্রুতি ভেবে রেখেছিল প্রতি বছর ঠিক এই দিনে নতুন বউ সেজে বাসরঘর সাজিয়ে পুলককে সে চমকে দেবে।আর পুলক মুগ্ধ নয়নে তার প্রেয়সীর মুখটা দেখবে।আর তারপর ঠিক প্রথম বাসররাতে পুলক ওকে যেভাবে কাছে টেনে নিয়ে খুব খুব ভালোবেসেছিল আজও ঠিক সেইভাবেই ওর কাছে আসবে।উফ! ভাবতেই শ্রুতি লজ্জায় কেঁপে উঠছে।বিছানা থেকে নেমে দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলো দেখছে।সেন্টমার্টিনে তোলা ছবিগুলো, যখন ওরা বিয়ের পর মধুচন্দ্রিমাতে গিয়েছিল তখনকার ছবি। আরো কিছু ছবি রয়েছে যেগুলো ওদের ভার্সিটি পড়াকালীন দুজন চুটিয়ে প্রেম করত সেই সময়কার ছবি।একটা ছবিতে শ্রুতি ক্যাম্পাসের মাঠে বসে মনযোগ দিয়ে একটা বই পড়ছে আর পুলক পলকহীন ভাবে ওকে দেখছে।পাশ থেকে নিশাদ ফোন থেকে টুপ করে ছবিটা ক্লিক করে ফেলে।আজকে নতুন করে শ্রুতি ওদের সাজানো রুমটা ঘুরে ঘুরে দেখছে। সারা রুমে নীল দ্যুতি ছড়িয়ে একটা অন্যরকম পরিবেশ তৈরি করেছে।শ্রুতির খুব আনন্দ হচ্ছে।মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষটা ওই।সাদা চাদরের ওপর লাল গোলাপের পাপড়িগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।ইচ্ছা করছে এখনই পুলকটাকে কান ধরে টেনে নিয়ে আসতে। আজ এত সময় নিচ্ছে কেন বাসায় ফিরতে কে জানে?তারউপর আজ চাঁদনিরাত।এমন রাতে আর কতক্ষণ একা বসে থাকা যায়?ছেলেটা যে কী পরিমাণ জ্বালায় আজ কাল!রুমে এলে প্রথমে জোড়ে দুটো ঘুষি দিবে পুলকের পেটে।
তারপর জড়িয়ে ধরে ওর কানে কানে বলবে,
-‘ শুভ বিবাহবার্ষিকী পুলক সাহেব।শুভ হোক তোমার আর তোমার বউ এর বিবাহিত জীবন। ‘
এসব ভাবনার মাঝে দরজায় নক পড়ল। হঠাৎ দরজার নক শুনে শ্রুতি চমকে উঠল।হার্টবিট ওঠানামা করতে শুরু করেছে ওর।ধুকধুকানি শব্দটা নিজের কানেই শুনতে পাচ্ছে মনে হচ্ছে।এত লজ্জা লাগছে কেন?সেই প্রথমবারের মত অনুভূতিটা।মৃদু ঘাম সৃষ্টি হয়েছে শ্রুতি’র নাকে আর কপালে।ধুত্! অনেক নাটক হয়েছে।গিয়ে তো দরজাটা খুলতে হবে। নতুন বউ সেজেছে বলে তো সে আর নতুন বউ নয়।তবু সে লজ্জাটাকে আড়াল করতেই পারছেনা।দ্রুত পায়ে হেঁটে ঠোঁটের কোণে চাপা হাসি রেখে দরজাটা খুলল শ্রুতি।

ঈষাণঃ শুভ বিবাহবার্ষিকী ম্যাম।

হাসিমাখা মুখে ঈষাণ ফুলের তোড়াটা এগিয়ে দিল শ্রুতি’র দিকে।তোড়াটা হাত থেকে নিয়ে শ্রুতি বলল,
-‘ বাব্বাহ্ তাহলে আপনি শেষ পর্যন্ত এসেছেন এস.পি সাহেব? ‘
-‘ নাহ্ আসিনি তো।আমার ভূত এসেছে। ‘
-‘ আচ্ছা ড্রয়িংরুমে গিয়ে বস আমি আসছি।তানিয়া,নিশাদ,রবিন,মেঘলা ওরা সবাই সোফাতেই ঘুমিয়েছে নাকি? ‘
-‘ না আড্ডা চলছে এখনো।আমি তো ভাবলাম পুলক বোধহয় রুমেই আছে। আর এতক্ষণে আপনাদের….। ‘
-‘ এই যাহ্ কিসব বলিস!যা আমি আসছি। ‘

ঈষাণ চলে যেতে গিয়েও থেমে গেল।
তারপর বলল,
-‘ একবার রুমে ঢুকতেও দিলিনা? ‘
-‘ ওহ্ স্যরি ভাই।আয় আয় ভেতরে আয়। ‘
-‘ মাই গড!এত চমৎকার করে সাজিয়েছিস রুমটা।ইচ্ছে তো করছে বাসরটা আমিই সেড়ে যাই। ‘
-‘ এই কী যে বলিস না তুই।তোর মুখে কিছুই আটকায়না।বদের হাড্ডি আছিস এখনো। ‘

ঘোর লাগানো চোখে তাকিয়ে আছে ঈষাণ শ্রুতি’র পানে।ধীর পায়ে হেঁটে এসে শ্রুতি’র সামনে দাঁড়াল।তারপর বলল,
-‘ খুব সুখে আছিস তাইনা? ‘
-‘ হ্যাঁ রে খুব।জানিসই তো পাগলটা কী পরিমাণ ভালোবাসে আমায়। ‘
-‘ বাই দ্যা ওয়ে।দানুণ লাগছে তোকে। ‘
-‘ থ্যাংক ইউ মহাশয়। ‘
-‘ আয়…ড্রয়িংরুমে আছি। ‘
————————
মেঘলাঃ কী ব্যাপার বল তো?রাত বারোটা বাজতে চলল প্রায়।আমরা কত প্ল্যান করেছিলাম পুলক কে সারপ্রাইজ দেওয়ার।ব্যাটার এখনো আসার নাম গন্ধ নেই?
শ্রুতিঃ বুঝতে পারছিনা।এমন তো কখনো করেনা ও।

পুলকের নাম্বার ডায়াল করছে শ্রুতি আর কথাগুলো বলছে।

ঈষাণঃ পেলি?
শ্রুতিঃ না।রিসিভ করছেনা তো ফোন।

নিশাদ গর্জনরত কন্ঠে শ্রুতিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-‘ ধ্যাত্তেরিকা।মেয়ে মানুষগুলো এমন ন্যাকা স্টাইলের কেন?টেনশানের ঝুড়ি খুলে বসেছিস একদম।প্রাইভেট কোম্পানির জব। কাজের চাঁপ বেশি থাকলে দেরী হতেই পারে।আর তাছাড়া ঢাকার রাস্তা তো আর তোর বেডরুমের ফ্লোর না। ‘

মেঘলা নিশাদের গায়ে চাপড় দিয়ে বলল,
-‘ এই বাজে বকিস না তো।টেনশান হওয়ারই বিষয় এটা।যেহেতু ও এমন লেট করে বাসায় কখনোই ফিরেনা।আর ওদিকে তানিয়া আর রবিনকে দ্যাখ।যেন প্রেম করার জন্য ডেকে আনা হয়েছে ওদের। দুজনে এক সাইডে বসে সেই তখন থেকে গুজুর গুজুর করে চলেছে। ‘

শ্রুতির কারো কথাই কানে ঢুকছেনা। এক নাগাড়ে কল করে যাচ্ছে পুলকের ফোনে।

ঈষাণঃ শ্রুতি?
শ্রুতিঃ হ্যাঁ বল।
ঈষাণঃ তাহলে আমি উঠি।আমার ডিউটি আছে বারোটার পর থেকে।পুলক আসলে বলিস আমার কথা।আর মন খারাপ করিস না হয়তো জরুরি কোনো কাজে আটকে পরেছে।চলে আসবে এক্ষণি।
মেঘলাঃ থেকে যা না আজ আমাদের সাথে।রাতে আমরা পাঁচজন আমাদের ঘরোয়া পার্টি ইনজয় করব।আর ওরা বাসরঘর।
শ্রুতিঃ হ্যাঁ।আজকে রাতে এখানেই থেকে যা।আর ডিনারও তো করলিনা।

শ্রুতি কথাটা কেবল বলার প্রয়োজন তাই বলল।ওর ধ্যান তো রয়েছে হাতের ফোনটার ভিতর।পুলকের জন্য বড্ড চিন্তা হচ্ছে ওর।ঈষাণ এক নজরে তাকিয়ে দেখছে শ্রুতি কে।কী মিষ্টিই না লাগছে মেয়েটা কে আজ।ঈষাণ নিজেই চোখ সরাতে পারছেনা।পুলক আজ তাহলে কী করবে?

মেঘলাঃ কীরে থাকবি তো?

মেঘলার ডাকে ঈষাণ স্তম্ভিত থেকে বেরিয়ে এল।বলল,
-‘ শ্রুতি যখন বলেছে।তখন তো থাকাই যায়। ‘
-‘ ওয়াও গ্রেট।আমরা আজ অন্নেক মজা করব সারারাত।তোকে তো ফ্রি পাওয়া বর্তমান সো টাফ। ‘

রাত ১ টা ২০ মিনিটে পুলক বাসায় ফিরল।ঈষাণ তখন ডাইনিং এ পানি খেতে এসেছে।পুলক ঈষাণকে দেখে থেমে গেল।

ঈষাণঃ কীরে এই তোর আসার সময় হলো?
পুলকঃ তুই?
ঈষাণঃ কেন?আসা কী অন্যায়?
পুলকঃ আরে না না।অন্যায় কেন হবে? হঠাৎ করে দেখলাম তো।কেমন আছিস বল?আর কী মনে করে এই গরীবের বাসায় পা রাখলি তাও আবার এত রাতে?

ঈষাণ পুলকের কাছে এগিয়ে এসে ঘড়ি দেখে বলল,
-‘ এক ঘন্টা বিশ মিনিট আগে তোর আর শ্রুতি’র প্রথম বিবাহ বার্ষিকী পার হলো।শুভ বিবাহবার্ষিকী। ‘
-‘ ওহ্ স্যরি দোস্ত।এক্সট্রিমলি স্যরি।আমার আসলে খেয়াল ছিলনা।রাতে খেয়েছিস তো?রবিন নিশাদ ওরা সবাই এসেছে না? ‘

ঈষাণ পুলকের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর ভাবে বলল,
-‘ হুম।সবাই এসেছে। ‘
-‘ চল ওদের সাথে দেখা করে আসি।অনেক অপেক্ষা করতে হলো তোদের।স্যরি রে। ‘

পুলক সবার সাথে দেখা করার জন্য সামনে এগোতেই ঈষাণ পুলকের বাহু ধরে বাঁধ সাধল।তারপর ওর সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
-‘ এই মুহূর্তে আমাদের অপেক্ষার থেকে শ্রুতি’র অপেক্ষার দামটা বেশি।আর স্যরিটাও ওকেই আগে বলা উচিত।ওদের সাথে সকালে দেখা করলেও চলবে। ‘

পুলক শুধু মাথা নাড়াল।ঈষাণ আবার বলল,
-‘ তোকে কেমন যেন এলোমেলো লাগছে। তুই কী আজকাল স্মোক করছিস নাকি? ‘
-‘ স্মোক?কই না তো। ‘

ঈষাণ ওর কাঁধ হাত রেখে ঠোঁটের বাঁকা হাসিটা দিল।পুলক আজ কাল শুধু স্মোক না মাঝে মধ্যে কলিগদের সঙ্গে ড্রিংকস ও করে সেটা ঈষাণ ভালো করেই জানে। রুমে ঢুকে পুলক শ্রুতি কে দেখতে পেলোনা।নিশ্চই বেলকোনিতে বেতের চেয়ারটাতে বসে ওর জন্য অপেক্ষা করছে আর না হয় ঝিমুচ্ছে।পুলকের শরীরটা বড্ড ক্লান্ত।রুমে ঢুকে নীল আভা দেখে মনে হচ্ছে এখনি বিছানার ওপর ঠাস করে শুয়ে পড়তে।বাসরঘরের সাজসোজ্জার দিকে ওর একদমই কোনো মনযোগ নেই। কিন্তু শ্রুতি যে খুব আশা করে বসে আছে ওর ফেরার অপেক্ষাতে।একটু সময় না দিলে মেয়েটা খুব কষ্ট পাবে।ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে শ্রুতি’র দেওয়া সাদা পাঞ্জাবী টা পরে বেলকোনিতে চলে গেল। চাঁদের আলোতে শ্রুতি কে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে পুলক।বেতের চেয়ারটাতে হেলান দিয়ে ঘাড়টা কাঁত করে ঘুমিয়ে আছে। বিয়ের শাড়িটা পড়েছে আজ।এই শাড়িটাতে শ্রুতি কে একদম হূরপরী লাগে পুলকের কাছে। সাদা জমিনে লাল পার আর লাল পারের ভিতর গোল্ডেন সুতার কাজ।পুরো শাড়িটার ভিতর গোল্ডেন সুতার হালকা কাজ।আর সেই সাথে শ্রুতি’র ব্রিডাল সাজটাও চোখ ধাঁধানোর মত।গলায় সাদা পাথরের একটি নেকলেস আর কানেও সাদা পাথরের বড়দুল। ডায়মোন্ডের মাঝারি নোসপিনটাও চিক চিক করছে হালকা আলোতে।চুলটা সুন্দর করে খোপা করা।ঠোঁটে লাল খয়েড়ি মিক্সড লিপস্টিকটাও খুব আকর্ষণীয়।পুরো সাজটাই অস্থির করা একদম।শ্রুতি’র লাল ঠোঁটদুটো যেন পুলকের শরীরের ক্লান্তি একদম দূর করে দিয়েছে। সেই সাথে চোখের ঘুমও কেড়ে নিয়েছে।পাশ থেকে বেতের অন্য একটি চেয়ার টেনে নিয়ে শ্রুতি’র কাছে গিয়ে বসল। খুঁটে খুঁটে বউটার সাজ দেখছে।সত্যিই খুব সারপ্রাইজড হয়েছে পুলক।বিয়ের পর থেকে শ্রুতি’র সৌন্দর্য যেন দিন দিন উপচে পড়ছে।ইশ!কত অপেক্ষাটা না করালো মেয়েটাকে আজ।আরো আগে আসা উচিত ছিল তার।মনে মনে নিজেকেই গালাগাল দিচ্ছে সে।ঠোঁটদুটোর দিকে নজর পরতেই ঠোঁটে ঠোঁটে কথা বলতে ইচ্ছা করল ওর।শ্রুতি’র ঠোঁটজোড়ার খুব কাছাকাছি পুলকের ঠোঁটজড়া।শ্রুতির থুতনিতে আর ঠোঁটের ওপর পুলকের ঘন ঘন নিঃশ্বাস পরছে।দুজনের ঠোঁট মিলিত হওয়ার আগেই শ্রুতি নড়েচড়ে বসল।লাল চোখে তাকিয়ে আছে পুলকের দিকে শ্রুতি।
একগাল হেসে পুলক বলল,
-‘ শুভ বিবাহবার্ষিকী আমার হূরপরী। ‘

ছোট্ট করে পুলকের নাক বরাবর ঘুষি লাগাল শ্রুতি।

পুলকঃ আআহ্….।এটাই কী ছিল আমার সারপ্রাইজ গিফ্ট?

শ্রুতি আরো একদফা রেগে গিয়ে বলল,
-‘ এতক্ষণেও তোর চোখে পড়েনি আমার সারপ্রাইজটা? ‘
-‘ এই এটা কী হচ্ছে?আবার তুই তুকারি করছো কেন? ‘
-‘ হ্যাঁ তুই তুই তুই।তোর বাপ দাদা চৌদ্দ গুষ্টিকে আমি তুই তুকারি করব। ‘
-‘ ছিঃ ছিঃ। আমাকে তুই তুকারি করো আমি মেনে নিব তাই বলে আমার বাপ দাদা কে না প্লিজ। ‘
-‘ হাজার বার করব।কোথায় ছিলি তুই এত রাত?তোর ওই নাবিলা ম্যামের কাছে?ওই মহিলা কী তোকে…..। ‘
-‘ এই একদম বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু। তুমি সবসময় ঝগড়ার মাঝে আমার বাপ দাদা আমার অফিস কলিগ এদের কে টেনে আনতে পারোনা। ‘
-‘ কোনো কিছুই টেনে আনবোনা আর। যা দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে। ‘
-‘ এমনভাবে বলতে পারলে?সত্যি চলে যাবো কিন্তু।”
-‘ আসার কী প্রয়োজন ছিল? ‘
-‘ আচ্ছা আজকে না হয় একটু লেট হয়েছে।অন্যান্য দিন তো আমি ১০ টা থেকে ১১ টার মাঝে চলে আসি,না? ‘
-‘ হ্যাঁ।বেছে বেছে আজকে রাতেই তোকে দেরী করে ফিরতে হল।বেশ করেছিস খুবই মহৎ কাজ করেছিস।এখন আমার চোখের সামনে থেকে চলে যা।একদম সহ্য হচ্ছেনা তোকে আমার। ‘

পুলক গম্ভীরস্বরে বলল, ‘ একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না? ‘

শ্রুতি আর কোনো জবাব না দিয়ে উঠে রুমে চলে গেল।তারপর খুব শব্দ করে ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ করে দিল।মেজাজ খুব বিগড়ে গেছে আজ।কী এমন কাজ পরে গিয়েছিল যে নিজের বিবাহবার্ষিকীর কথা পর্যন্ত মনে ছিলনা ওর।রাগে সারা শরীর কাঁপছে শ্রুতি’র।পুলক বুঝতে পেরেছে শ্রুতি এখন ওয়াশরুমে বসে কান্না করছে।ডেকেও কোনো লাভ নেই।মেয়েটার মাঝে ভালোবাসার কমতি না থাকলেও রাগের পরিমাণটাও অসীম।পুলক রুম থেকে বেরিয়ে গেল।পনের মিনিট পর চোখ মুখ লাল করে শ্রুতি ওয়াশরুম থেকে বের হল।রুমে ঢুকে যখন দেখল পুলক নেই মেজাজ তখন আরো গরম হয়ে গেল। কোনো কিছু চেইঞ্জ না করেই বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।এপাশ ওপাশ করেই চলেছে।মাথা গরম থাকলে তো ঘুমও চোখে নামতে ভয় পায়।শ্রুতি ভাবছে এই বুঝি পুলক রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ওকে জড়িয়ে ধরে আদর করে মান ভাঙাবে।কিন্তু না ওর তো আসার কোনো খবরই নেই।বিছানা থেকে উঠে কড়া ডোজের একটু ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে দিল।কারণ যতক্ষণ অবদি ঘুম না আসবে ততক্ষন অবদি ভেতরে ভেতরে জ্বলতে থাকবে।কিছুক্ষণের ভেতর ঘুমের ভাবটা প্রায় চলে এসেছে।ঘুমে চোখের ঝাঁপি দুটো নেমে গেছে।ঠিক তখনই কেউ একজন শ্রুতি’র রুমে এসে দাঁড়াল।
শ্রুতি’র চোখের সামনে হাত নেড়ে দেখল ঘুমিয়ে পরেছে কিনা।

 

সকালে ঘুম ভাঙলো নিচ তলার ভার্জিন ফ্যামিলির চিল্লাচিল্লি শোনে।

0

সকালে ঘুম ভাঙলো নিচ তলার ভার্জিন ফ্যামিলির চিল্লাচিল্লি শোনে। ঘড়ির দিতে তাকিয়ে দেখি ১১.৫৫। হঠাৎ করে ভার্জিন ফ্যামিলিতে এতো চিল্লাচিল্লি হওয়ার কারণ খুঁজতে কম্বল মুড়ি দিয়ে রুম থেকে বের হলাম। প্রচুর শীত চিল্লাচিল্লি না শোনা গেলে উঠতামে-ই না। খাওয়া দাওয়া বন্ধ। বুয়া চলে গেছে শীতের ছুটি কাঁটাতে।
.
রুম থেকে বের হতে-ই দেখা হলো ইমদাদ চাচার সাথে। কঠিন রকমের একজন সমালোচক। বাসার পাঁচ তলায় থাকে। সমালোচনা তার একমাত্র পেশা পুত্রগণ বিশাল বিশাল চাকরি করে। বিএনপির অন্ধ ভক্ত। কিভাবে ছেলেদের এতো বড় বড় চাকরি হলো এটা ভাববার বিষয়! চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম চাচা ভার্জিন ফ্যামিলিতে এতো চিল্লাচিল্লি ক্যান?
.
আর বইলো না বাবা। তাদের একটা মেয়ে আছে না। দেখতে ছেলেদের মতো। বার্সিটিতে পড়ে। বাসায় না থেকে হোস্টেলে থাকে। মেয়েটি নাকি কার সাথে পালিয়ে গেছে। খারাপের ঘরে তো খারাপে-ই হয়। নষ্ট একটা পরিবার।
.
আচ্ছা চাচা যান। তার সাথে বেশিক্ষণ কথা বললে আমার পাশের ভার বেশি হয়ে যাবে। তিন তলায় গিয়ে দেখা হলো। বেকার আশিক ভাইয়ের সাথে। বেকার থাকার কারণে সাত বছর প্রেম করা প্রেমিকা এখন বিসিএস ক্যাডারের ঘরে।
.
আশিক ভাই ভার্জিন ফ্যামিলিতে এতো চিল্লাচিল্লি ক্যান?
.
তাদের মেয়ের নাকি কি হয়েছে। কিচ্ছু বলছে না শুধু চিল্লাচ্ছে। আমি তেমন কিছু জিজ্ঞেস করি নাই।
.
আশিক ভাইকে বেশি বিরক্ত করলাম না। সালাম দিয়ে নিচে নামা শুরু করলাম। দু তলায় এসে দেখা হলো। ফেসবুক সেলিব্রেটির সাথে।
.
ভাই ভার্জিন ফ্যামিতে কি হয়েছে জানেন?
.
আরে না। কিন্তু তাদের চিল্লাচিল্লি শুনে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে দিছি। পোস্ট পুরাই হিট। কি! কি লিখলা পোস্টে?
.
লিখলাম;
বাসার নিচ তলার একটি মেয়ে আমাকে প্রপোজ করেছিল। কিন্তু আমি রিজেক্ট করে দিছি। ফ্যামিলিতে এখন পুরোদমে শোক চলছে।
.
এতটুকুই?
.
আরে না ফ্যানদের বিশ্বাস করাতে গিয়ে লাইভেও গেছিলাম। দুই মিনিটের লাইভ। দুই হাজার লাইক পড়ছে। কমেন্টের বন্যা। আর ভিউ হয়েছে চারহাজার। আমি তো ভাই পুরাই হিট ভাই। রাতে সাথে লইয়ো বিরিয়ানি খাওয়াবো তোমাদের। এখন আমি যায়। আরেকটা পোস্ট দিতে হবে।
.
কলিং বেলে চাপ দিলাম। দুই তিনটা দেয়ার পর দরজা খুলল। পুরো শোক চলছে ঘরে। মানুষ মারা গেলেও এতো কান্নাকাটি হয় না। আমার কাছে ভার্জিন ফ্যামিলির কিছু অজানা নয়। আন্টি আমাকে দেখে-ই জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। সর্বনাশ হয়ে গেছে আহাদি। সর্বনাশ হয়ে গেছে!
.
কি হয়েছে আন্টি? খুলে বলুন আমার কাছে।
.
খুলে আর কি বলব বাবা। সবকিছু শেষ আমার।
.
আন্টি প্যাঁচাল মাইরেন না। আগে ঘটনা বলুন।
.
আমার ছোট মেয়েটি তো আমাদের ফ্যামিলির নাক কেঁটে দিল।
.
কোথায় আন্টি? আমি তো দেখছি আপনাদের নাক ঠিকে-ই আছে।
.
মজা নিও না তো আহাদি। এটা মজা নেয়ার সময় না।
.
আমি মজা নিচ্ছি না আন্টি। আপনি এখনও সমস্যাই বলেন নি।
.
শীত আমার পাপহীন মেয়েটির ভার্জিনিটি নষ্ট করে দিয়েছে।
.
শীত কিভাবে ভার্জিনিটি নষ্ট করে! অদ্ভুত কথা বললেন না! এটা কিভাবে সম্ভব?
.
সম্ভব বাবা, এ পৃথিবীতে সব-ই সম্ভব। মেয়েটি গতকাল তার এখন বন্ধুর বাসায় গেছিল। তখন প্রচণ্ড শীত এবং গভীর রাত হওয়াতে সে আর হোস্টেলে আসে নি। তার বন্ধুর বাসায় থেকে যায়। সকালে উঠে সে ফোন দিল যে গতকাল রাতে প্রচণ্ড শীত হওয়াতে হোস্টেলে ফিরে নি। এই বলে সে ফোন কেঁটে দেয়।
.
ভার্জিনিটি নষ্ট হয়ে গেছে এটা কি আপনার মেয়ে বলেছে?
.
না বাবা।
.
তাহলে?
.
আমি সিরিয়ালে দেখছি শীতে ফ্রেন্ডের বাড়িতে রাত কাঁটালে ভার্জিনিটি নষ্ট হয়ে যায়।
.
ইস! এই মহিলাকে নিয়ে তো পড়লাম ঝামেলায়। তার কান্না কিভাবে বন্ধ করা যায়! আন্টি শোনেন। যে মহিলারা সিরিয়াল বিশ্বাস করে। তাদের চেহারা নাকি কালো হয়ে যায়। মৃত্যুর সময় ভয়ংকর দেখায়।
.
কোথায় পাইছো বাবা?
.
পাইছি না আন্টি। আমি নিজ চোখে দেখেছি।
.
কোথায়?
.
তামিল একটি সিরিয়ালে।( জানি আন্টি তামিল জীবনেও বুঝবে না )। চেহারা নিয়ে এমন কথা বলতে দেরী হলো। কিন্তু তিনি থামতে দেরী করেন নি। একদম চুপ হয়ে গেল।

লেখা: Md Ferdous Ahadi

মনোযোগ দিয়ে শোনেন তো মা ,এই ওষুধ টা দিনে ৪ বার খাবেন!৬ ঘন্টা পর পর!

0

মনোযোগ দিয়ে শোনেন তো মা ,এই ওষুধ টা দিনে ৪ বার খাবেন!৬ ঘন্টা পর পর!
ধরেন, সকাল ৬ টায় একটা খেলেন..ঠিক ৬ ঘন্টা পর ১২ টা বাজবে..তাইনা ?
১২ টার সময় একটা খাবেন!আবার যখন সন্ধ্যা ৬ টা বাজবে তখন একটা খাবেন..আর রাত ১২ টার সময় একটা খাবেন!
মানে হলো সারাদিনে যতবার ৬ টা আর ১২ টা বাজবে ততবার এই ওষুধ টা খাবেন!বুঝতে পেরেছেন??
রোগীনি হাসিমুখে উপর নিচে মাথা দুলিয়ে বললেন-বুঝছি গো মা!

আচ্ছা,এখন আপনি আমাকে বলেন তো মা..আপনি কি বুঝছেন?
রোগীনি বলা শুরু করলেন- এই ওষুধ টা দিনে ৪ বার খামু!৪ ঘন্টা পর পর…!
আমি দ্রুত ভুল সংশোধন করে দিলাম-না..না!৬ ঘন্টা পর পর খাবেন!
তিনি জিহ্বায় কামড় দিয়ে- ওহ্ ..হ হ!৬ ঘন্টা পর পর খামু!
তার বুঝায় ঘাটতি আছে বলে আমি তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম-বলেন তো কখন কখন খাবেন?

তিনি শুরু করলেন- ভোর সকালে একটা খামু..
উনাকে থামিয়ে বললাম-ভোর সকাল মানে কয়টা?
: ঐ যে ফজরের ‘নমায’ পইড়া …
আমি হতাশ হয়ে -ওরে মা রে.. টাইম কন!!
মাথা চুলকিয়ে লজ্জা লজ্জা মুখে বললেন- টাইম যেন কি কি আছিলো…….

আপনি মনোযোগ দিয়ে শুনেন নাই…!আচ্ছা আবার বলি -সকাল ৬ টায় খাবেন!এখন বলেন পরের টা কখন খাবেন?
তিনি একগাল হেসে – ঐ যে দুপুরে ‘নমায’ পইড়া খামু….!
হে আল্লাহ্…আমারে উঠায়ে নাও..!দু:খে ল্যাটা দিয়ে বসে কান্তে মন চাইতাছে..!
তবুও ধৈর্য্য রেখে বললাম- নামাযের আগেই খেতে হবে!সকাল ৬ টায় খেলে ১২ টায় খেতে হবে!
আচ্ছা মা বলেন তো-আপনি কি ঘড়ি দেখতে জানেন?
: হ গো মা..জানি!
তাহলে তো সমস্যা নাই!আপনি খালি মনে রাখবেন ৬ টা আর ১২ টা!!পারবেন না??
মায়াময় একটা হাসি দিয়ে বললেন- পারমু…!
খুব একটা ভরসা পেলাম না বলে আবার জিজ্ঞেস করলাম- তাহলে রাতের ওষুধ টা কখন খাবেন বলেন তো?
একদম ঝকঝকা উত্তর-শোয়ার আগ দিয়া খামু!
হাল ছেড়ে দিয়ে প্রশ্ন করলাম-আপনি কয়টায় ঘুমান ?
বললেন- শীতের রাত তো ..আগে আগেই শুইয়া পড়ি !
কাঁদো কাঁদো মুখে জানতে চাইলাম- টাইম বলেন!
: এই যে ধরেন ৮ টা ৯ টার মধ্যে!!

আমার অনুভূতি এখন জিরো..!পাত্তর হয়ে গেছি!শেষ চেষ্টা হিসাবে আবারো বললাম-কিন্তু মা আমি আপনারে কয়টায় সময় খেতে বলেছি??

সে শেষমেষ বিরক্ত হয়ে বলে উঠলেন- এত নিয়ম কানুন মানতে পারুম না!এত টাইম নিয়া বইয়া থাকলে আমার চলবো?আমার আর কোনো কাম নাই?
চিউ চিউ করে তবুও বললাম- মা রে..নিয়ম না মানলে আপনার ঘা তো শুকাবে না..!নিয়ম করেই খেতে হবে..!একটু বুঝার চেষ্টা করুন..!
তাহলে বলেন তো শেষ ওষুধ টা কখন খাবেন ..?
এখন রাগী রাগী গলায় তার উত্তর- ‘নমায’ পইড়া..খাইয়া..ঘুমানোর আগ দিয়া খায়া ঘুমামু……!!!

ডরাইছি…!আর কিছু জিগাইলে আমার কপালে নিশ্চিত শনি আছে……!

রোগিনীর মুখ দিয়া কোনভাবেই ১২ টা বের করতে না পারলেও আমার অলরেডি ১২ টা বেজে গেছে………😩!

আমিনার সংসার

0

সতেরো বছর বয়সে আমিনা’র বিয়ে হয়েছিলো ত্রিশ বছর বয়সী রুহুল আমীনের সাথে। বিয়ের এক মাস আগে তার মা মারা গেছে । আমিনা’র বাবা আমিনুল হকের রেলের চাকরী । সারা বছর ঘুরে বেড়াতে হয় । মা মরা মেয়েকে নিয়ে যে নিজের কাছে রাখবেন সেই উপায়ও নেই । তাই আর কোনো উপায় না দেখে বিয়ে দেয়াটাকেই তাঁর কাছে সঠিক আর সহজ সমাধান মনে হয়েছিলো ।

মা মারা যাওয়ার পরেও আমিনা’র এতোটা কষ্ট হয়নি যতোটা কষ্ট হয়েছে বাবাকে ছেড়ে চলে আসতে । তাই বিয়ের পর বিদায়ের সময় বাবা যখন মাথায় হাত রেখে আদর করে দিচ্ছিল, আমিনা’র শুধু মনে হচ্ছিল বাবা’র গলা জড়িয়ে ধরে বলে –

বাবা গো তোমার সাথে নিয়ে চলো না আমায় । আমার যে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে তোমাকে ছেড়ে যেতে । কিছুই বলতে পারেনি আমিনা । কান্নার দমকে গলা দিয়ে কোনো শব্দই বের হয়নি তার । বাবা’র হাত ছেড়ে স্বামীর হাত ধরে চলে এসেছিলো নতুন সংসারে ।

রুহুল আমীনের মা-বাবা থাকেন গ্রামের বাড়ি শরিয়তপুরে আর চাকরীর জন্য রুহুল আমীনকে থাকতে হয় ঢাকায় । বিয়ের পর আমিনা স্বামীর সাথে ঢাকায় চলে এলো । সংসার শুরু হলে একে একে দেবর, ননদ চলে এলো তাদের কাছে । দেবর আলম লেখাপড়া শেষ হয়ে যাওয়াতে চাকরীর খোঁজ করছে আর ননদ সায়মা এসে কলেজে ভর্তি হলো । এক কামরার সংসার আর এতোগুলো মানুষ ! সতেরো বছরের অন্য মেয়েরা যখন সাধ, আহ্লাদ আর আবদারে বাবা-মাকে ব্যস্ত রাখে সেখানে ছোট্ট আমিনা’র ঘাড়ে সংসারের ঘানি, হুম ঘানিই তো । আনাড়ি হাতে আমিনা সংসার সামলানোর চেষ্টা করে যায় । সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় থাকা নিয়ে । দেবর আলম রুহুল আমীনকে বলেছিলো –

কোনো সমস্যা নাই ভাইয়া, সায়মা মাটিতে বিছানা করে থাকবে আর আমি বারান্দায় ব্যবস্থা করে নেবো ।

দেবরের কথায় আমিনা লজ্জা পেয়েছিলো ভীষণ । ওরা মাটিতে ঘুমাবে আর সে স্বামীর সাথে বিছানায় শুয়ে থাকবে, এ কিছুতেই হয় না । সে আলমকে বলেছিলো –

ছোট ভাই আপনি ওনার সাথে খাটে ঘুমাবেন আর আমি সায়মা’র সাথে নিচে বিছানা করে থাকবো । কেউ আর কোনো কথা বলেনি এরপর । ওভাবেই থাকার ব্যবস্হা হয়েছিলো । রুহুল আমীনও যেন এই ব্যবস্থায় হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছিলো । ছোট ভাইবোনের সামনে বউ নিয়ে আয়েশ করে বিছানায় গড়াতে সে যেন মরমে মরে যাচ্ছিলো । তাতে আমিনা’র কোনো দুঃখ ছিলো না কিন্তু সায়মা যখন সকালবেলায় কলেজের জন্য রওনা দিতো আমিনা’র বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠতো । তারও খুব ইচ্ছে করতো সায়মার সাথে কলেজে যেতে । লেখাপড়ার তার এতো শখ, মেট্রিকে তার প্রথম বিভাগ ছিলো । মা বলেছিলো শহরের সেরা কলেজে ওকে ভর্তি করে দেবে কিন্তু মা মরে গিয়েই তো সব ওলটপালট হয়ে গেলো । একদিন রাতে খেতে বসে লজ্জার মাথা খেয়ে সে রুহুল আমীনকে বলেই ফেলেছিলো গোপন ইচ্ছেটা, কলেজে যেতে চায় সে । স্বামী জবাব দেয়ার আগেই দেবর হৈহৈ করে উঠেছিলো –

আরে ভাবী বলো কী ! বিয়ের পর আবার কিসের লেখাপড়া? মেয়ে মানুষের বিয়েটাই তো আসল । আর তুমি পড়তে গেলে সংসার সামলাবে কে?

আমিনা রুহুল আমীনের দিকে তাকাতেই দেখলো সে হাসি হাসি মুখ করে ভাত খেয়ে যাচ্ছে, হ্যাঁ না কিছুই বললো না । ছোট্ট আমিনা আর কথা এগোতে পারেনি । তার পড়ালেখার স্বপ্ন ওখানেই চিরতরে সমাধি হয়ে গেলো ।

এরমধ্যে আলমের চাকরী হলো বাটা কোম্পানিতে আর রুহুল আমীনও ভালো বেতনে নতুন চাকরী পেয়ে গেলো । এক রুমের বাড়ি ছেড়ে তারা এবার উঠে এলো তিন রুমের ফ্ল্যাটে ।

চাকরী পাওয়ার কিছুদিন পরই দেবর বিয়ে করলো । মেয়ের বাড়ি ঢাকাতেই । আলমের সাথে নাকি পড়ালেখা করেছে । দেবরের বউ হলেও তামান্না আমিনা’র চেয়ে বয়সে ঢের বড় । তাই সম্বন্ধে বড় হলেও তামান্না তার ওপর ছড়ি ঘুরায় সবসময় । তার ঘাড়ে পুরো সংসার ঠেলে দিয়ে তামান্না নির্ঝঞ্ঝাট থাকে, নিজের চাকরী নিয়ে ব্যস্ত থাকে । কোনো কিছু মন মতো না হলে বকাঝকা পর্যন্ত করে । তামান্নাকে দেখে আমিনা’র মাঝে মাঝে মন খারাপ হয় । তামান্নার মতো লেখাপড়া শেষ করতে পারলে সে-ও একদিন এমন চাকরী করতে পারতো । শিক্ষক হওয়ার খুব শখ ছিলো আমিনা’র । এ জীবনে এই সাধ আর মিটলো না তার ।

দিন গড়ায়, আমিনা’র কোল জুড়ে ওসমান আসে, বছর ঘুরতেই ফাতিমা । ছেলে-মেয়ে পেয়ে আমিনা সব দুঃখ ভুলে যায়, নতুন খেলায় মেতে ওঠে । এদিকে জা’র ঘরের বাচ্চা আসে, সৌরভ । জা’র ব্যবহার পাল্টে যায় । আমিনা’র কোলে সৌরভকে তুলে দিয়ে জা নিশ্চিন্তে চাকরীতে যায় আর সৌরভকে আমিনা নিজের বাচ্চার মতোই যত্ন করে বড় করতে থাকে ।

সংসারের খরচ নিয়ে আমিনা কখনোই কোনো কথা বলেনি তবে এটুকু বুঝতে পারে, এক বাড়িতে থাকলেও আলম আর তামান্না নিজেদের সবকিছু সুন্দর করে গুছিয়ে নিচ্ছে । রুহুল আমীন হাসিমুখে সব খরচ করে যায়, জমার খাতায় কিছু থাকে কি-না আমিনা জানে না । তার আসলে এইসব ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝামেলা করতে কখনো মন চায় না । সে তার বাচ্চাদের দিকে সবটুকু মনোযোগ দিয়ে সংসার সমলায় ।

বাচ্চারা বড় হলো একসময় । সংসারে মা’র অবস্থান দেখে ওসমান, ফাতিমা এখন খুব রাগ করে আমিনা’র সাথে । ওসমান প্রায়ই বলে –

মা তুমি সবকিছু এমন মুখ বুঁজে সহ্য করো কিভাবে ? এই সংসারটা তুমি আগলে রেখেছো অথচ কখনো কোনো কিছুতেই তোমার মতামত জানতে চাওয়া হয় না, কেন মা ?

আরে তাতে কী ? তোর বাবা, চাচা সবাই আছে না ? আমার মতামত লাগবে কেন? আমি কী তাদের মতো অতো ভালো বুঝি সবকিছু?

কেন বুঝবে না ? যখনই বাড়িতে ভালো কিছু আসে, চাচী প্রথমে পছন্দ করে তারপর যেটা থাকে সেটা তুমি নাও । এমন কেন হবে ? কখনো কোনো দাওয়াত, কোনো অনুষ্ঠান থাকলে চাচী ঠিক করবে কী হবে না হবে । তুমি কেন কিছু বলো না মা ?

তাতে সমস্যা কোথায় ? তোরা কী সব কথা নিয়ে পড়লি বল তো ?

ফাতিমা বললো –

আমাদের এইসব ভালো লাগে না মা । তোমাকে সবসময় সবকিছুতেই হেয় করা হয় । এবার ঈদে ফুপু যে তোমাদের দু’জনকে শাড়ি দিলো, চাচীর শাড়িটা কিন্তু অনেক দামী ছিলো আর তোমাকে দিলো একটা সস্তা শাড়ি । আমার মনে হয়েছিলো ফুপুর শাড়িটা তক্ষুনি ফিরিয়ে দেই ।

আচ্ছা আমি কী অফিসে যাই বল তো? আমার এতো দামী শাড়ি দিয়ে কী হবে ? বুবু তো অফিস করে, ওর তো ভালো কাপড়চোপড় লাগেই ।

বাবা’ও কখনো কিছু বলে না । চুপ করে থাকে সবসময় ।

সবাই কী সবকিছু পারে বল আর বড় হলে অনেক কিছুই মেনে নিতে হয় সংসারে ।

তুমি এমন সবসময় ওদের পক্ষ নিয়ে কথা বলবে না মা । তোমার অপমান আমাদের একদম সহ্য হয় না । এই যে সৌরভ সারাজীবন তোমার কাছে থেকে বড় হলো কিন্তু দেখেছো চাচীর কারণে সে-ও কেমন বেয়াদবের মতো কথা বলে তোমার সাথে ? সেদিন তো ইচ্ছে করছিলো টেনে একটা চড় বসিয়ে দিই গালে ।

ছি ফাতিমা, ও না তোর ছোট ভাই ? ছোট ভাইকে এভাবে কেউ বলে ! আমি কী তোদের এভাবে কথা বলা শিখিয়েছি ?

ফাতিমা, ওসমান দু’জনেই চুপ হয়ে যায় কিন্তু মনে মনে ভীষন কষ্ট পায় মা’র সাথে সবার এমন অসম আচরণ দেখে ।

আমিনাও লক্ষ্য করেছে বিষয়টা, ইদানিং সৌরভ কেমন ধমকে কথা বলে তার সাথে । সেদিন গুঁড়ো মাছ রান্না হয়েছিলো দেখে তার কী রাগ –

চাচী তুমি জানো না যে আমি এইসব হাবিজাবি খেতে পারি না । মাংস রাঁধনি কেন?

আজ এটা খেয়ে নে বাবা । বাড়িতে বাজার শেষ হয়ে গেছে । কাল মাংস রেঁধে দেবো ।

বাজার শেষ হয় কী করে ? তোমার আগে খেয়াল থাকে না? যত্তোসব । বলেই ভাতের থালা ধাক্কা দিয়ে উঠে চলে গিয়েছিলো ছেলেটা ।

আমিনা’র মন খারাপ হয়েছিলো কিন্তু মন খারাপটাকে মাথাচাড়া দিতে দেয়নি সে । সৌরভ তো তারও সন্তান, সে-ই তো বড় করলো ছেলেটাকে ।

ছেলে-মেয়েরা বড় হয়ে গেছে, তিন কামরার বাড়িতে আর আঁটে না । আমিনা দু’একবার বলেছে আরো বড় একটা বাড়ি ভাড়া নিতে । সবার যা ইনকাম তাতে এরচেয়ে বড় বাড়িতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যেই থাকতে পারে কিন্তু আলম আর তামান্না কিছুতেই রাজি হয় না বাড়ি পাল্টাতে । ওদের আপত্তির কারণ খুঁজে পায় না আমিনা । সৌরভ আর ওসমান এক রুমে থাকে আর ফাতিমাকে ছোট একটা খাট পেতে দিয়েছে তাদের রুমে । মাঝে মাঝে শ্বশুর শাশুড়ি আসেন গ্রাম থেকে তখন ঝামেলা হয়ে যায় সবচেয়ে বেশি । আব্বা তখন ওসমানের সাথে থাকে আর ফাতিমা’র সাথে মা ঘুমান তাদের বিছানায় । সে গিয়ে শোয় ফাতিমার খাটে । বেচারা রুহুল আমীনের হয়ে যায় সবচেয়ে জ্বালা । কখনো ড্রইংরুমের সোফায় তো কখনো ঘরের মেঝেতে তোশক পেতে ।

.

সৌরভ তার কাছে বড় হলেও তামান্না কেন জানি ছেলেকে একটু আড়াল করে রাখে তাদের কাছ থেকে । অফিস শেষে বাড়ি ফিরেই ছেলে নিয়ে শুরু হয়ে যায় তার তোড়জোড় । এটা কেন হয়েছে, ওটা কেন করেছো , সারাক্ষণ চাচী চাচী করো কেন? চাচী কী এসব বুঝবে না-কি? ওসমান তুমি ওর সাথে বেশি গল্প করো না, ওর পড়ায় ক্ষতি হবে, আরো সাতসতেরো তার চলতেই থাকে । সৌরভ এমনিতে খুব ওসমান ঘেঁষা কিন্তু তামান্না বাড়ি ফিরলে সে-ও ভাইবোনের থেকে দূরে সরে যায় । আমিনা মনে মনে হাসে তামান্নার কান্ড দেখে । তামান্না হয়তো ভাবে তার মতো কম শিক্ষিত মানুষের কাছে থাকলে ছেলে নষ্ট হয়ে যাবে অথচ এতো বছর তো সৌরভ তার কাছেই থাকলো ।

দিন দিন তামান্নার অভিযোগ বেড়েই চলছিলো সবকিছুর প্রতি । ওসমান বরাবর লেখাপড়ায় খুব ভালো । সৌরভ টেনেটুনে পাশ করে । এটা নিয়ে ওসমানের ওপর তামান্নার খুব রাগ । সারাক্ষণ এই বিষয়টা নিয়ে ছেলেকে কথা শোনায় । একদিন তো মাত্রাছাড়া বাড়াবাড়ি করে ফেললো তামান্না । ওসমানের রেজাল্ট ভালো হওয়াতে আমিনা ওর জন্য একটা ঘড়ি কিনেছিলো । ছেলেটার খুব ঘড়ির শখ । এরমধ্যে তামান্নার ব্যাগ থেকে দু’হাজার টাকা খোয়া গেলো । ওসমানের হাতে ঘড়ি দেখে কোনো চিন্তাভাবনা না করেই তামান্না বলে বসলো –

টাকাটা তাহলে তুমিই নিয়েছো ওসমান ? বললেই পারতে তোমার ঘড়ি দরকার । এভাবে চুরি করলে কেন ?

চাচী এটা মা কিনে দিয়েছে । আমি আপনার টাকা নিতে যাবো কেন ?

এই বাড়িতে তো বাইরের কেউ আসে না । নিলে তুমিই নিয়েছো । এখন আবার মা’র নাম দিয়ে চালিয়ে দিচ্ছো । আমিনা এশার নামাজ শেষ করে শুয়েছিলো । ফাতিমা এসে ঘটনা বলতেই তাড়াতাড়ি রুম থেকে বেরিয়ে এলো –

কী হয়েছে বুবু? ওসমান কী হয়েছে রে ?

মা দেখো চাচী বলছে আমি চাচীর ব্যাগ থেকে টাকা চুরি করেছি ।

আমিনা’র মাথায় যেন আগুন ধরে গেলো কথাটা শুনে –

এটা তুমি কী বললে বুবু ! আমার ছেলেকে তুমি চোর বানিয়ে দিলে? ওসমানকে তুমি চেনো না ?

টাকাটা তাহলে কোথায় যাবে বলো ? আমার ভাই যখন গতমাসে সৌরভকে সুইস ঘড়িটা গিফট করলো তখন থেকেই দেখছি ওসমান ঘুরেফিরে ঘড়িটা হাতে নিয়ে দেখে । টাকাটা ও-ই নিয়েছে ।

ঘড়িটা ধরেছে বলেই ওসমান চোর হয়ে গেলো ! বুবু অনেক সময় অনেক কিছু বলো তুমি । আমি কিছু গায়ে মাখি না কিন্তু আমার ছেলেকে এতো বড় কথা বললে কিন্তু আমি সহ্য করবো না ।

কথা কাটাকাটি যখন চরমে তখন সৌরভ সামনে এসে বললো –

মা সবকিছু নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি করো কেন বলো তো ? ভাইয়া কেন টাকা নেবে ? না জেনে কথা বলবে না একদম ।

তুমি আমার চেয়ে বেশি জানো ? একদম কথা বলবে না, চুপ থাকো ।

হ্যাঁ আমি বেশি জানি কারণ টাকাটা আমি নিয়েছি ।

তুমি নিয়েছো!

হ্যাঁ ভালোভাবে চেয়েছিলাম তখন দাওনি তাই ওভাবেই নিতে হয়েছে ।

তুমি মিথ্যা বলছো সৌরভ । ওসমানকে বাঁচাচ্ছো তুমি ।

সেদিন যে তোমাকে বললাম টাকা দাও । বন্ধুদের সাথে তিনশো ফিটে যাবো, কই টাকা তো দিলে না । দিলে একগাদা ঝাড়ি । তাই না বলেই নিতে হয়েছে । মা তুমি ভাইয়াকে এখনই সরি বলো ।

তামান্না আর কোনো কথা না বলে নিজের ঘরে চলে গিয়েছিলো ।

আমিনা সৌরভকে বকা দিয়ে বলেছিলো –

কাজটা খুব খারাপ করেছিস বাবা । না বলে কারো কোনো জিনিসে হাত দিবি না কখনো ।

তুমি জানো না চাচী , আমার বন্ধুদের সবার কাছে অনেক টাকা থাকে । শুধু আমার কাছেই কোনো টাকা থাকে না । মা টাকা না দিলে আমি এভাবেই নেবো ।

.

ক’দিন পরে হঠাৎ করে তামান্না বললো –

এখানে থাকলে না-কি সৌরভ ঠিকমতো মানুষ হবে না । বাড়ির পরিবেশ ভালো না , বন্ধুবান্ধব এসে হাসাহাসি করে সৌরভের একার কোনো রুম নেই বলে । তামান্নার কথায় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো আমিনা –

আচ্ছা বুবু বড় বাড়ি নিতে বললে তোমরাই তো বাধা দাও বারবার আর সৌরভ মানুষ হবে না বলছো কেন ! কী করেছে ও আর বাড়ির পরিবেশ ভালো না মানে কী?

দেখছো না দিন দিন কেমন অবাধ্য হয়ে উঠছে । লেখাপড়া তো মাথায় উঠেছে , তোমার ছেলে স্কুলে থাকতে সবসময় ক্লাসে ফার্স্ট হতো অথচ সৌরভ সবসময় ক্লাসের লাস্ট বয় । সারাদিন তো তোমাদের সাথেই থাকে । কি জানি কী শেখাও না শেখাও আমার ছেলেটাকে ।

আমি খারাপ কিছু শেখাই সৌরভকে ! ওকে তো তুমি পড়তে বসাও । ও কেন খারাপ করে এটা আমি কী করে বলবো ?

সারাক্ষণ তোমাদের সাথে থাকলে তো তোমাদের থেকেই শিখবে তাই না ? তাই ওর বেটার ফিউচারের জন্য এবার কিছু সিদ্ধান্ত আমাদের নিতেই হচ্ছে । ধানমন্ডির দিকে চলে যাবো ভাবছি । ওখানে বেশ কিছু ভালো কলেজ আছে । যাতায়াতেরও সুবিধা হবে ।

এমন হুট করে বছরের মাঝখানে ধানমন্ডি ? ওসমানের সমস্যা হবে না কিন্তু ফাতিমার জন্য সমস্যা হয়ে যাবে । ও কী ধানমন্ডি থেকে এখানে এসে কলেজ করতে পারবে ?

না না তুমি ভুল বুঝছো । তোমরা কেন যাবে ? ও আচ্ছা তোমাকে তো বলাই হয়নি । আলমকে কতোদিন বলেছি জানাতে অথচ তার নাকি মনেই থাকে না । এরকম ভাড়া বাড়িতে আর কতোদিন থাকবো বলো ? আমাদের তো একটা ভবিষ্যৎ আছে । আমরা আসলে অনেকদিন ধরেই ভাবছিলাম নিজেদের একটা ফ্ল্যাটের কথা । আমার অফিস থেকেও কাছে হয় আর আর বেশ সস্তায়ও পেয়ে গেলাম । সৌরভের এসএসসি পরীক্ষার তো আর অল্প কয়দিন বাকি । ধরো ঢাকা কলেজ বা সিটি কলেজে যদি চান্স পায়, বাড়ি থেকে একদম কাছে হবে ।

তোমরা আলাদা হয়ে যাচ্ছো বুবু !

সারাজীবন তো আর একসাথে থাকা সম্ভব না আর আমাদের জন্য তোমাদেরও তো কষ্ট করে থাকতে হয় । আমরা চলে গেলে এখানে দিব্যি তোমাদের হয়ে যাবে । আব্বা-মা আসলেও আর থাকার সমস্যা হবে না ।

আমিনা বলার মতো কোনো কথা খুঁজে পায় না । সে ধরেই নিয়েছিলো, এভাবেই কেটে যাবে জীবন । বাইশ বছরের অভ্যেস হঠাৎ করে পাল্টে যাবে ভাবতেই কেমন যেন লাগলো তার কাছে । বুবু কী সুন্দর করে বললো আলাদা হয়ে যাওয়ার কথা । কই তার মাথায় তো কোনোদিন আসেনি ভবিষ্যতের কথা । এই যে তার স্বামী সারাজীবন সংসারটা টেনে গেলো, কোনোদিন কোনো সঞ্চয়ই করলো না , মানুষটা ভীষণ কষ্ট পাবে আলাদা হওয়ার কথাটা শুনলে । রাতে রুহুল আমীন ফিরলে কথাটা জানালো আমিনা । রুহুল আমীন একবার একটু চমকে তাকালো তারপর সবসময়ের মতোই চুপ করে থাকলো । এমন কিছু শুনতে হবে এটা হয়তো সে ভাবেনি ।

যদিও তামান্না বলেছিলো কিন্তু আমিনা বুঝতেই পারেনি যে দশ দিনের মাথায় ওরা চলে যাবে ধানমন্ডিতে । তামান্না পুরোনো কোনো জিনিসই নিলো না । সব না-কি ব্রান্ডের জিনিস কেনা হয়েছে । নতুন ফ্ল্যাটে এইসব মান্ধাতার আমলের ফার্নিচার মানাবে না ।

ওরা চলে গেলে আমিনা ভীষণ কষ্ট পেলো । সৌরভের জন্য তার কষ্ট হয় খুব । বাচ্চাটা খেতে পছন্দ করতো । মাঝে মাঝে তার কাছ ঘেঁষে কতো আবদার করতো । এতো বছর একসাথে থাকা, এই বিচ্ছেদের কষ্ট কী এতো সহজে ভোলা যায় ?

রুহুল আমীন সেদিন নাস্তার টেবিলে আফসোস করে বললো –

সবাইকে গুছিয়ে দিতে যেয়ে নিজের ঘর শূন্যই রেখে দিলাম । তোমাকে তো কোনোদিন কিছু দিলাম না আমিনা ।

আমি তো কিছু চাইনি আপনার কাছে । আমার তো সবই আছে ।

তারপরও……

আমার কোনো অভিযোগ, কোনো মন খারাপ নেই । আমার ছেলেমেয়ে ভালো মতো মানুষ হলে আমি আর কিছু চাই না ।

তুমি অনেক বেশি সরল আমিনা । আমি দেখেছি তামান্না কতোবার তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে, অন্যায় করেছে কিন্তু তুমি উল্টো কোনো জবাব দাওনি ।

জবাব দেয়াটাই আসল কথা না । মনে রাখবেন, কারো মনে আঘাত দিয়ে কথা বললে এর ফল একদিন পেতেই হয় । আমি আমার নিজের কাছে পরিস্কার আছি । আমি কোনোদিন আমার দুই বাচ্চার থেকে সৌরভকে আলাদা করে দেখিনি । অথচ বুবু কী সুন্দর করে আমার দোষ দিয়ে দিলো । ওসমানকেও কেন যেন সহ্যই করতে পারতো না বুবু । যাকগে ওসব নিয়ে আমি মন খারাপ করিনি । তারা যদি দূরে গিয়ে ভালো থাকে, সৌরভ যদি ভালোভাবে মানুষ হয় সেটাই হবে আনন্দের ব্যাপার ।

.

ওসমান ঢাকা মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেলো । বাড়িতে যেন খুশির বন্যা বইছে । ছেলের এতো ভালো রেজাল্টের জন্য আমিনা ছোট করে ঘরোয়া ভাবে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ফেললো । লোকজন সবাই-ই এলো, এলো না শুধু আলম’রা কেউ । তামান্না ফোন করে বললো, তার ছোট বোনের সাথে মার্কেটে যেতে হবে । তার কথায় মনে হলো, ওসমানের এতো ভালো সংবাদে সে খুশি না ।

দিন দিন দুরত্ব বেড়েই চললো দুই পরিবারে । আলম মাসে দুমাসে একবার হয়তো আসে কিন্তু তামান্না একদিনও এলো না । দেবরের কাছে বাড়ির খবর পায় আমিনা । বউয়ের নামে আলমের শুধু অভিযোগ – একটা মাত্র ছেলে অথচ তাকেও ঠিকমতো মানুষ করতে পারছে না তামান্না । সৌরভের সাথে সারাক্ষণই খিচা খিঁচি লেগেই থাকে তামান্নার । পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে । সেদিন রাগের মাথায় আছড়ে টিভি ভেঙে ফেলেছে সৌরভ । আলম খুব টেনশনে আছে সৌরভকে নিয়ে । ভাবছে কোনো মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবে ।

আমিনা’র কষ্ট হয় কথাগুলো শুনে । মাত্র এক বছরে সৌরভ এতোটা পাল্টে গেছে ! বুবু তো ছেলের জন্য সব থেকে ভালোটা নিয়ে আসতো । ভালো কাপড়, ভালো টিচার, ভালো স্কুল । তাহলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেলো কেন ?

আমিনা আলমকে বলে পরের বার সৌরভকে সাথে করে নিয়ে আসতে । আলম জানায়, ছেলের এই বাড়িতে আসা নিষেধ করেছে তামান্না । এখানে এলে নাকি সৌরভ আরও বিগড়ে যাবে । আমিনা আর কিছু বলে না ।

.

পুরোনা কাগজপত্র, পত্রিকা সব জমা হয়ে ছিলো অনেকদিন ধরে । ফাতিমাকে নিয়ে সব এক জায়গায় জড়ো করলো আমিনা । কলিংবেলের শব্দ পেয়ে ফাতিমা উঠে গেলো দরজা খুলতে । কাগজপত্র থেকে মুখ তুলে আমিনা অবাক হলো একটু! তামান্না সামনে দাঁড়িয়ে আছে । তাড়াতাড়ি জিনিসপত্রগুলো একপাশে সরিয়ে উঠে দাঁড়ালো আমিনা –

বুবু তুমি! কেমন আছো?

ভালো ।

কতোদিন পরে এলে তুমি । সৌরভকে নিয়ে আসতে বুবু ।

সময় পাই না, খুব ব্যস্ত থাকতে হয় সবসময় । আমি একটা কাজে এসেছি ।

কী কাজ বুবু ?

ওসমান কোথায়?

ওসমান তো বন্ধুদের সাথে ঢাকার বাইরে গেছে ।

কবে আসবে ?

সাত তারিখে আসবে ওরা । কেন বুবু ?

ওসমানকে একটু দরকার ছিলো ।

কী দরকার? আমাকে বলো ।

ওসমানকে কয়দিন নিয়ে রাখবো আমার ওখানে ।

আচ্ছা ও ফিরে আসুক তারপর যেয়ে ক’দিন থাকবে তোমাদের ওখানে । কথাটা বললেও মনে মনে ভীষণ অবাক হয় আমিনা, হঠাৎ ওসমানকে নিতে চাইছে কেন বুবু !

তামান্না বললো –

ওহ আরো চারদিন! আমার যে খুব দরকার ওসমানকে ।

কেন বলো তো বুবু?

আর বলো না ছেলেটা এতোটা হাতের বাইরে চলে গেছে যে ওকে কোনোভাবেই বশে আনতে পারছি না ।

কে সৌরভ ? আবার কী করলো ?

তোমরা তো জানো ই সব । তোমার দেবরের কাছে তো শুনেছো সবই । এসএসসি পাশ করতে পারলো না, বললাম আবার পরীক্ষা দাও। না সে আর পরীক্ষা দেবে না । ব্যবসা করবে । টাকা নিতে শুরু করলো আমার কাছ থেকে । কী ব্যবসা জিজ্ঞেস করলেই বলতো, গুছিয়ে এনেছি । শুরু করলেই জানতে পারবে । গত এক বছর ধরে আড়াই লাখ টাকা নিয়েছে আমার থেকে । প্রথমে মোটর সাইকেল কিনলো । কিনেই পরের সপ্তায় এক্সিডেন্ট করে থানা পুলিশ করে আরো পঞ্চাশ হাজার খসালো । তারপর থেকে যে কী করে না করে আমি কিছুই জানি না । মাঝে মাঝে তো বাড়িতেও ফেরে না । আমি কিছু বুঝতে পারছি না । আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না । আমার ছেলেটা এমন কী করে হয়ে গেলো? আমার ছেলেটাকে বাঁচাও তোমরা ।

আমরা !

কার সাথে মিশতো না মিশতো এগুলো কখনো খোঁজ নেইনি আমি । টাকা চেয়েছে টাকা দিয়েছি । টাকা না দিলে জিনিসপত্র ভাঙচুর করতো । এখন শুনছি ও অবৈধ বিজনেসের,সাথে জড়িয়ে গেছে ।

অবৈধ বিজনেস ? সেটা আবার কী ?

কোন বড় ভাইয়ের কাছ থেকে মাল নিয়ে ডেলিভারি দিতো ।

কী মাল?

ওর এক বন্ধুর কাছে শুনেছি, সৌরভ না-কি নেশার দ্রব্য সাপ্লাই দেয় কম বয়সী ছেলেপেলেদের কাছে ।

কী বলো তুমি এইসব ! আমার তো শুনেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে । হায় আল্লাহ কোন পথে যাচ্ছে বাচ্চাটা ।

তাই তো ওসমানকে দরকার এখন । ও ওসমানের কথা সবসময় শোনে । ওসমান পারবে ওকে ঠিক পথে আনতে । আমার এই উপকারটা করো ভাবি ।

ভাবি ! আমিনা খুব অবাক হয় তামান্নার মুখে ভাবি ডাক শুনে । আজকের আগে তামান্না তাকে কখনো সম্মান দিয়ে কথা বলেনি ।

ওসমান ফিরলেই চলে আসতে বলবে আমার ওখানে । আমি খোঁজ পেয়েছি, লালমাটিয়ায় কোন ট্যাটু হাসান থাকে । সেই মাস্তান ভদ্র ঘরের ছেলেদের দিয়ে এইসব করায় । এই পথ থেকে ফিরতে চাইলে নাকি নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করে । ওসমানকে বলবো ট্যাটু হাসানের একটা ব্যবস্থা করতে ।

এতোক্ষণ সবকিছু চুপচাপ শুনছিলো আমিনা । শেষের কথাটায় বিষম খেলো মনে । বুবু তার ছেলেকে মাস্তানের সাথে লড়তে বলছে । নিজের ছেলেকে বাঁচানোর জন্য তার ছেলেকে বিপদে ঠেলে দিচ্ছে? এতোক্ষণ মায়া লাগছিলো সৌরভের জন্য । আর সহ্য করতে পারলো না আমিনা –

বুবু আমি তোমার মতো এতো লেখাপড়া করতে পারিনি । সবকিছু বুঝি না তোমাদের মতো করে কিন্তু একটা ব্যাপার কী জানো বুবু, আমি মানুষকে মানুষ ভাবতে শিখেছি, সম্মান করতে শিখেছি । আমার মা সবসময় একটা কথা বলতো, কাউকে হিংসা করলে একদিন সেই হিংসার আগুনে নিজেকেই পুড়তে হয় । আরো একটা কথা বলতো, কথা দিয়ে সবসময় জিততে চেয়ো না । ভালোমন্দ বিচার করে নাও আগে কারণ একবার মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেলে সেটা আর ফেরানো যায় না । তাই বলতে হলে একটু রয়ে সয়ে বলো । বুবু তোমার কী মনে আছে তুমি এই সংসারে আসার পর থেকেই আমার কেমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে । তুমি মনে করতে আমি বুঝি না । আমি সব বুঝতাম বুবু কিন্তু ফিরে জবাব দিতে পারিনি । ঐ যে আমার মা’য়ের দেয়া শিক্ষা । তুমি সবসময় আমার ছেলেমেয়েদের হিংসা করেছো । ওসমান লেখাপড়ায় ভালো এটা তুমি কখনোই সহ্য করতে পারোনি । কোনোদিন আমার কোনো বাচ্চাকে কোলে নিয়েছো বুবু ? অথচ তোমার ছেলেকে আমি বুকে করে মানুষ করেছি । একটা কথা বলি বুবু, কিছু মনে করো না, এই যে আজকে সৌরভের বিপথে চলে যাওয়া এর পেছনে কিন্তু একমাত্র তুমি দায়ী । তুমি ছেলেকে হিংসা করতে শিখিয়েছো । চাওয়া মাত্র হাজার হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়েছো । ওসমান আর ফাতিমাকে দেখাতে চেয়েছো, দেখ তোদের বাপ মা এতো দামী জিনিস দিতে পারে না তোদের । ছোট থাকতে আমার ছেলেমেয়েদের মন খারাপ হয়েছে সেটা আমি বুঝেছি কিন্তু আমার বাচ্চাদের আমি শেখাতে পেরেছি সাধ্যের বাইরে কোনো কিছু আশা করা যাবে না । আমার বাচ্চারা কিন্তু এরপর আর কখনো কোনো আবদার করেনি । অথচ আমাদের নিচু দেখানোর জন্য ছেলের ন্যায় অন্যায় সবরকম আবদার তুমি মিটিয়েছো । মানুষকে বশ করা যায় না বুবু । মানুষ তো পশু না যে তাকে বশে আনতে হবে ।

তুমি এভাবে কথা বলছো আমার সাথে?

বলছি বুবু, বলতে বাধ্য করেছো তুমি । আজও দেখো তোমার ছেলের ভালোর জন্য তুমি আমার ছেলেকে বিপদে ঠেলে দেয়ার কথাটা অবলীলায় বলতে পারলে । আমার ছেলেকে বলছো টুটু হাসানকে শায়েস্তা করতে ।

ট্যাটু হাসান মা । ফাতিমা পাশ থেকে বললো ।

চুপ কর, যে মাস্তানই হোক আমার কী । বুবু আমি তোমার সাথে আর কোনো খারাপ কথা বলতে চাইছি না । দুপুরবেলায় এসেছো, না খেয়ে যেতে পারবে না । যদিও তোমার ঝকঝকে বাড়িতে আমাদের মতো মানুষের জায়গা হয় না কিন্তু তুমি চিন্তা করো না । তুমি আমার কাছে আমার আগের বুবু’ই আছো । আমি সব সহ্য করবো বুবু শুধু আমার স্বামী সন্তানকে নিয়ে এমন খারাপ কিছু কেউ চিন্তা করলে আমি কিছুতেই সহ্য করবো না । তখন আমি ভুলে যাবো আত্মীয়তার সম্পর্ক । আমি অনেক যত্ন করে আমার সংসারটা গুছিয়ে এনেছি । এলোমেলো করতে দেবো না কাউকে ।

তামান্না হাঁ করে শুনছিলো আমিনা’র কথাগুলো । এই গোবেচারা, গ্রাম্য অল্প শিক্ষিত আমিনা’র এতো জোর এলো কোত্থেকে ! ছেলেমেয়েকে সঠিকভাবে মানুষ করতে পারায় বোধহয় আমিনা’র গলায় এতো জোর আর তার ছেলে তো তার মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে দিনকে দিন । তার এতো অহংকার, এতো দম্ভ সব মাটিতে মিশে যাচ্ছে সৌরভের জন্য । সে ভেবেছিলো ওসমানকে দিয়ে যেভাবেই হোক সৌরভকে ফিরিয়ে আনবে । তাতে যদি ওসমানের একটু আধটু বিপদ হয় তাতে কী যায় আসে ? তামান্না বুঝতে পারছে এখানে আর সুবিধা করতে পারবে না । সরল আমিনা যে সময় হলে বাঘিনীর রাপ ধরতে পারে এটাও বুঝে গেছে সে । ব্যাগটা তুলে নিয়ে তামান্না বললো –

আমি চলি তাহলে ।

আমিনা বললো –

আবার এসো বুবু । ফাতিমা চাচী চলে গেলে দরজাটা লাগিয়ে দিয়ে এসে তাড়াতাড়ি সব গুছিয়ে ফেল আমার সাথে । আরো অনেক কাজ জমে আছে ।

নিপাসরকার

0

আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে সাহানা এক কাপড়ে ঘর ছেড়েছিল আমার জন্য। আমি তখন এক বেকার বোহেমিয়ান। তার দুই মাস আগেই আম্মা রাগ করে বাড়ি থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।

আম্মার কথা হলো চাকরি বাকরি ই যখন না করবি ঢাকা শহরে থেকে খালি খালি পয়সা নষ্ট ক্যান করবি? অন্তত বাড়ি এসে ব্যাবসা বাণিজ্য কিছু একটা করার চেষ্টা কর, না হলে বাকি জীবনটা কেমনে চলবে তোর? শেষ পর্যন্ত তো কোন কানা খোঁড়া মেয়েও তোকে বিয়ে করতে রাজি হবে না। ঐসব ছবি আঁকা দেখে কি আর পেটের ক্ষুধা মেটে?

সাহানা উচ্চ শিক্ষিতা, ওর গায়ের রং ময়লা মুখচ্ছবি ও তেমন একটা ভালো না, তবে আমার আঁকা ছবির গুণমুগ্ধ দর্শক, ভক্ত ও। সাহানার সাথে এক মায়ার বাঁধনে ধিরে ধিরে আমিও কেমন যেন জড়িয়ে যাই, তখন আর ওর চেহারা গায়ের রং নিয়ে আমার কোন সমস্যা হয় না। বর্ষার প্রথম কদম ফুল নিয়ে আমি সাহানার জন্য অপেক্ষা করি।

যাই হোক সাহানার সাথে বিয়ের পরে আমার সব ভাবনা চিন্তা অনেকটা দূর হয়েছে বলতে হবে। কারণ আম্মা একেবারে ভুল বলেননি, পেটের টান নিয়ে শিল্প সাহিত্যের চর্চাও চলে না। সাহানা চাকরি করতো, সংসারের হাল সেই ধরলো, আর আমি ছবি আঁকার। এই যে আমি এখন দেশের প্রথম সারির চিত্রশিল্পী এই যায়গায় সাহানার অবদান অনেক।

আমার বিয়ের সাড়ে তিন মাস পরে আম্মা ঢাকায় আসলেন। সাহানা তার খুব আদর যত্ন ও করলো, তবু আম্মার মন সারে না, আক্ষেপ, তার অমন রাজপুত্রের মতো ছেলের পাশে এমন কালো কুৎসিত বউ। আমি আম্মাকে বললাম আম্মা সাহানা কালো, রূপবতী না হলেও অনেক গুনী একটা মেয়ে আর মানুষের মনটাই আসল, আম্মাও আস্তে আস্তে আমার কথায় সায় দিলেন। তবে সমস্যা হলো সাহানাকে নিয়ে, আড়াল থেকে সে মা ছেলের কথা শুনে ফেলেছে, আমার উত্তর তার পছন্দ হয় নি।

তার মতে, আমার বলা উচিত ছিল আম্মা সাহানাকে আমি ভালোবাসি, তার বাইরের চেহারা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হয়েছে ঐ মূহুর্তে আমি ঐ কথাটা বললে আম্মা আরো রেগে যেতেন, অবশ্য আমি ভুল ও হতে পরি। মানুষের মনের গতিপ্রকৃতি বড়ো বিচিত্র, মেয়েদের ক্ষেত্রে এই বিচিত্রতার ধরন বোধহয় আরো কিছুটা সুক্ষ্ম। এদেরকে ঠিকঠাক চিনতে পারাটা বেশ কঠিন।

আমার জানা মতে একজনই তা পেরেছিলেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
তবে সেখানেও সমস্যা হচ্ছে তিনিও শুধু বিদেশি মেয়েদেরকেই চিনেছিলেন। নিজের ঘরের মেয়ে যেমন, মা, বউ, কন্যা এদেরকে ঠিকঠাক চিনে বুঝে উঠতে পারাটা অত্যন্ত দূরহ ব্যাপার। অবশ্য মেয়েদের কাছে বিষয়টার উল্টোটাও মনে হতে পারে।

মুখে তেমন কিছু না বললেও সাহানার মধ্যে ধিরে ধিরে আমি বেশ পরিবর্তন দেখেছি ঐ দিনের পর থেকে। তার কাছে আমার গুরুত্ব একটু একটু করে কমার শুরুটাও ঐখান থেকেই। পরে অবশ্য পরিস্থিতি সময়ের সাথে সাথে অনেকটা শীতল হয়েছে তবে বিয়ের পরে প্রথম সাড়ে তিন মাসের সাহানাকে আমি আজ পর্যন্ত খুঁজে পাই নি।

শাওনের জন্মের পরে, সাহানার জীবনের প্রায় পুরোটা জুড়েই বলাযায় তার ছেলে। ছেলের বিষয়ে কোন কিছুতেই নূন্যতম ছাড় দিতেও নারাজ সে। সেইখানেই ঘটেছে যত বিপত্তি।

আজ সাহানার জন্মদিন, কিন্তু গতকাল রাত থেকেই তার মেজাজ রিতিমত তিরিক্ষি হয়ে আছে। কারনটা বাতাসি। আমি অবশ্য ভাবছি কাঠগোলাপের খোঁজে বের হবো। সাহানার প্রিয় ফুল এক নম্বরে কদম দুই নম্বরে কাঠগোলাপ। এখন বর্ষাকাল না তাই কদম পাওয়া সম্ভব না, তাই কাঠগোলাপেই ভরসা।

তার আগে আমাকে একবার বাতাসির বাড়িতে যেতে হবে। বাতাসি শাওনের গার্লফ্রেন্ড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে শাওনের সাথেই। বাতাসির বাবা একটা সরকারি অফিসের দারোয়ান। শাওনের মোবাইলে যে ছবি পাওয়া গেছে সে অনুযায়ী বাতাসির দেখতে আহামরি সুন্দরী না হলেও অসুন্দর না।

কিন্তু একে তো দারোয়ানের মেয়ে তার ওপর নাম বাতাসি, নাম শুনলেই কেমন সুইপার কাজের বুয়া টাইপ লাগে, দেখতেও আহামরি তেমন কিছু না এমন মেয়েকে নিজের ছেলের বউ হিসেবে কিছুতেই মেনে নেবে না সাহানা পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে।
শাওনের ভার্সিটিতে শীতকালীন ছুটি চলছে এখন।

এখন ঘড়িতে দশটা পাঁচ বাজে আমি বাতাসিদের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লাম। বাতাসি দরজা খুলল, আমাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো সে, ভেতরে এসে বসতে বলল।

না আমি একটুও অবাক হয়নি। আজ থেকে পনের বছর আগে হলে হয়তো আমি অবাক হতাম। এখন মোবাইল ফেইসবুকের যুগে কোন দিন দেখেননি, বলতে গেলে একেবারে অপরিচিত মানুষও যদি রাস্তাঘাটে আপনাকে দেখে চিনে ফেলে সেখানেও অবাক হওয়ার তেমন কিছু নেই। সেই যায়গায় বাতাসির আমাকে চিনতে পারাটা খুব স্বাভাবিক।

বাতাসি আমার জন্য গাজর আর বুটের দুই ধরনের হালুয়া গরম গরম রুটি আর চা নিয়ে এলো। বাতাসির মা বেঁচে নেই। বাবা মেয়ের সংসার, রুটি, হালুয়া,চা সেই বানিয়েছে। এপর্যন্ত রুটি হালুয়ায় তাকে আমি একশো তে পঁচাশি দেব। তবে চায়ের জন্য একশো তে একশো পাবে সে।

তার চা খেয়ে, পুরান ঢাকার তাঁতি বাজারে গলির মোড়ে মালেক মিঞার চায়ের কথা মনে পরে গেল আমার এতো দিন পরে। পাশ করার পরে হলের সিট ছেড়ে দিতে হয়েছিল। আমি তখন কয়েক বছর তাঁতি বাজারে একটা মেসে থাকতাম। বিয়ের পরে নতুন ঢাকায় বাসা নিয়েছিলাম সাহানার অফিসের কাছাকাছি। তখন আর মালেক মিঞার চায়ের কথা মনে হয় নি আমার। বছর দশেক পরে একদিন মনে পরলো, খোঁজ নিলাম ততদিনে মালেক মিঞা অন্য ভুবনের বাসিন্দা।

তারপর বহুদিন সেই স্বাদ খুঁজেছি আমি, আজ পেলাম। বাতাসির বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাঠগোলাপ খুঁজে বাসায় ফিরতে ফিরতে তিনটা সাড়ে তিনটা বেজে গেছে । বসার ঘরে দেখলাম মা ছেলের তর্ক চলছে।
:পৃথিবী উল্টে গেলেও তোমার বউ হিসেবে ঐ দারোয়ানের মেয়েকে আমি মেনে নেব না, মানুষ তো একটা কিছু দেখে আগায়, হয় রূপ, গুন না টাকা পয়সা, পারিবারিক অবস্থান……
: মা বাতাসিকে আমি ভালোবাসি, তাই ওর বাহ্যিক বা পারিপার্শ্বিক কোন কিছু আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আমার হাতে ধবধবে সাদা কাঠগোলাপ, সাহানার রাগ এরিমধ্যে চরমে উঠে গেছে,কাঠগোলাপে কোন কাজ হবে কিনা জানিনা, আজ সাহানার জন্মদিন। তবে সেসব নিয়ে এই মুহূর্তে আমি ঠিক ভাবছি না, পঁচিশ বছর আগের কোন একটা দিন হঠাৎ আমার চোখের সামনে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠলো। শুধু দৃশ্যপট আলাদা, সত্যিই বড়ো বিচিত্র মানুষের মন।

বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে

0

‘বাবা আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে, তুই একটা কিছু কর, নইলে কিন্তু আমি বাঁচবো না আকাশ’ কথাগুলো বলে, কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো সাদিয়া।

আকাশ বললো, ‘আমার আর কি করার আছে, তোমার বাবা আমার সাথে তোমার বিয়ে দিতে নারাজ, তুমিও পালিয়ে যেতে রাজি না, এখন কল্পনায় তোমাকে নিয়ে নাচ-গান করা ছাড়া আমার আর কোনো গতি নাই সুন্দরী।’
সাদিয়া অভিমানি শুরে বললো, ‘ও তাইলে তোমার কিছুই করার নাই, বলার নাই-না?’

– করার নাই, বলার আছে।

– কি বলার আছে শুনি ,

– সুন্দরী, তোমার পিতা নিজের হাতে তোমাকে আমার হাতে তুলে না দিলেও, দরকার নাই।

– মানে!

– মানে হলো, আমি নিজেই তোমাকে আমার হাতে তুলে নেব সুন্দরী।

আকাশের এই কথায় সাদিয়া না হেসে থাকতে পারলো না। আকাশকে জড়িয়ে ধরে সাদিয়া বললো, ‘তোর এই দুষ্টুমি গুলো, আরও সক্ত করে আমাকে বেঁধে দিয়েছে তোর জীবনের সাথে, আমার আর কিছুই চাইনা পৃথিবীতে; যদি তুই পাশে থাকিস আজীবন।’

আকাশ বললো, ‘তুই পাশে এলেই তো অন্য জনকে বিদায় করতে পারি।’

– মানে ?

– মানে কোলবালিশ, ঐ প্রাণহীন কোলবালিশটাকে জড়িয়ে ধরে আর ঘুম আসেনা রে, তোর জন্য মনটা খালি বাকুম বাকুম করে।

সাদিয়া আকাশের নাক চেপে দিয়ে বললো, ‘আহ’হারে, দুঃখের আউ-আউ, ওসব কথা বাদ, এখন কি করবি তাই ভাব।

– কি আর করবো, আর একবার ‘মা’কে তোদের বাড়িতে সম্বন্ধের জন্য পাঠাবো।

– যদি বাবা রাজি না হয়।

– সমস্যা কী, মন্টু আছেনা।

– মানে, মন্টু কে ? কোথায় আবার মন্টু ?

– আছে আছে, সবসময় পকেটে নিয়াই ঘুরি, কখন আবার তোকে নিয়ে চম্পট দিতে হয়।

– ওহ, একটু বুঝিয়ে বলনা,

– ওরে পাগলী, মন্টু মানে টাকা, সবসময়ই পকেটে নিয়া ঘুরি, এইটা আমাগো পালিয়ে যাবার খাতে বরাদ্দ।

– কিন্তু, পালিয়ে গেলে তো……..

আকাশ একটানে সাদিয়াকে বুকে নিয়ে, কপালে ভালোবাসার পরশ মিশ্রিত একটা চুমু খেয়ে বললো, ‘সুন্দরী, পালিয়ে গেলে হয়তো তোমার বাবা প্রচণ্ড রাগ করবে; কিন্তু দু-বছর পরে যখন ফুটফুটে একটি শিশু লইয়া তোমার আব্বুর সামনে দাড়াইবা, তখন দেখবা নাতির সাথে আমাদেরকে’ও হাসিমুখে বরণ করিয়া লইবে; এত্তো বাংলা সিনেমা দ্যাখো, তার পরেও এইগুলা শিখানো লাগে ক্যান!’
সাদিয়া ভীষণ লজ্জা পেয়ে, নিজেকে আকাশের বাহু বন্ধন থেকে মুক্ত করে নিয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে বললো, ‘ছিঃ, কি লজ্জার কথা, কইতে সরম’ও লাগে’না একটু।’

– ও গড, যা হইতে পারবে, তা কইতে দোষ কি।

– চুপ করো তো, কি সব আবোল তাবোল বলছো।

– ক্যান, তুমি কি সিওর দিয়া কইতে পারো যে আমাদের গৃহ আলোকিত কইরা কয়েকটা বাচ্চা আসিবেনা।

– চুপ করো তো, বিয়ের খবর নাই, বাচ্চা নিয়ে টানাটানি।

– আরে, অগ্রিম প্ল্যান করতাছি, বিয়ের পরে যেন অত ভাবতে না হয়।

‘আমি গেলাম’ বলে সাদিয়া পা বাড়াতেই পেছন থেকে আকাশ ডেকে বললো, ‘এই-যে মিস, এদিকে আসো, তোমাকে দিয়া রাখি একটি কিস; বলা তো যায়না, তোমার পিতা যদি তোমাকে আবার অন্যের হাতে সম্প্রদান করিয়া ফ্যালে; তখন তো আফসোস করিয়া মরিতে হইবে।’
সাদিয়া মুচকি হেসে চলে গেল।

বিকেলে একটি চিঠি লিখিয়া, সন্ধ্যার পরে নিজে চিঠিটা লইয়া হাজির হইলো সাদিয়ার বাড়ির সামনে।
বাড়ির ভেতরের আবহাওয়া উপলব্ধি করার জন্যে, উঁকি মারছে আকাশ।
পেছন থেকে একটি হাত এসে আকাশের কাঁধ চেপে ধরলো।
‘ভুত ভুত’ বলে আকাশ চিৎকার করে উঠতেই, হাতের বাহক বললো, ‘এই হারামজাদা, আমি ভূত না, সাদিয়ার বাবা; তুই নিজেই তো ভূতের মতো আমার বাড়িতে চক্কর মারছিস।’

– আসলে বিষয় হইছে কী কাকা, এই পথে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মনে হইলো আপনার বাড়ির ভেতরে চোর ঢুকছে, তাই উকি মেরে শিওর হচ্ছিলাম।

– ও আচ্ছা, তোর কী মনে হয়, আমি ফিডার খাই, আমাকে যা বুঝাবি, আমি তাই বুঝবো।

– ছিঃ ছিঃ কাকা, আপনের কি আর ফিডার খাবার বয়স আছে, কয়দিন পরে মাইয়া বিয়ে দেবেন, ফিডার তো খাবে আপনার নাতি-পুতি।

– শোন, তোরে যেন আর কোনদিন আমার মেয়ের পিছে ঘুর-ঘুর করতে না দেহি, তাইলে কিন্তু সুর-সুর কইরা টাইনা, তুইলা ফালামু তোর পিঠের ছাল।

– কাকা, হবু আত্মীয়র সাথে কথা ক্যানো বলেন এতো ঝাল। সাদিয়া তো আর আপনার একার মাইয়া না, না-কী ?

– মানে ?

– ইয়ে মানে থুক্কু, মানে সে আপনার কন্যা হইলেও, কারো না কারো তো স্ত্রী’ও হইবে নাকি। সেই হিসেবে, পিতা হবার কারণে আপনার ৬০%অধিকার, বাকি ৪০% তো সাদিয়ার স্বামীর।

– বেত্তুমিজ তুই খারা, হিসাব তোর পিঠের উপরে করমু এখন।

সাদিয়ার বাবা লাঠি নিয়ে আকাশকে তাড়া করতেই; ৫০০ কি: মি: বেগে আকাশ দৌড়ে পালাতে লাগলো।

পরদিন সকালে সাদিয়া এসে দেখল; আকাশ পা টেনে টেনে হাটছে, আবার গামছা দিয়ে মুখ বাধা। সাদিয়া কাছে এসে বললো, ‘এ কী, পা টেনে টেনে হাটছিস যে।’

– ভাগ্য ভালো, সেই জন্যই এখনও পা দুইটা আছে, তোর বাপের দৌড়ানি খাইয়া, হঠাৎ গোবরে পা পিছলে কয়েকটা উল্টি হজম কইরা, অবশেষে আহত পা দুইটা নিয়া বাড়ি ফিরতে হইছে।

– গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে রাখছিশ ক্যানো তবে, দাঁত গুলো’ও আহত হইছে বুঝি।

– খুবই মজা নিচ্ছিশ তাইনা, যে হবু জামাইকে তার হবু শ্বশুর লাঠি নিয়া তাড়া করে; সেই জামাই মুখ দ্যাখায় ক্যামনে সমাজে। সেই জন্যই এই মুখ ঢাইকা রাখছি।

সাদিয়া মুখ চেপেধরে খিলখিল করে হাসছে। তাই দেখে আকাশ বললো, ‘কিরে মুখ চাইপা হাসছিস যে, সকালে দাত মাজিস নাই।’
সাদিয়া হাসতে হাসতে বললো, ‘তুই থাম তো, সারাক্ষণ শুধুই ফাইজলামি।’

– হুম, সেটা কী সাধে করি আমি। তোর মুখে ঐ হাসিটুকু দেখার জন্যই তো এত্তো কথা বলি আমি।

– সুধু হাসি’ই দেখবি, আর কিছু দেখবি না।

– ছিঃ-ছিঃ-ছিঃ, এইসব ন্যাকেট কথা বলো ক্যানো সাদিয়া।

– ন্যাকেট কথা মানে, আমি তো বলছি, কাছ থেকে আমার সুখ দুঃখ, এগুলো দেখবি না; খালি উল্লাপাল্টা চিন্তা। গালের উপরে দেবো একটা।

– কী, একখান চুম্মা ।

– না, একখান থাপ্পড়।

দুজনার কথা চলছে, এমন সময় সাদিয়ার বাবা এসে সাদিয়াকে বললো, ‘ওঠ, বাড়িতে চল সাদিয়া, বিকেলে তোর বিয়ে।’

‘ঘটনাটা তো, “ওঠ ছেরি তোর বিয়া” টাইপের হইয়া গ্যালো কাকা; এই খানে দুইটা নিষ্পাপ প্রেমিক হৃদয়ের মতামত তো আপনার জানা উচিত তাইনা।’ কথাগুলো বলে আকাশ একটু দূরে সরে গিয়ে দাড়ালো।

সাদিয়ার বাবা বললো, ‘এইখানে আমার মতামত’ই যথেষ্ট।’

– না, না, কাকা, স্বাধীন দেশে আপনি একাই ব্যাক্তিগত ভাবে স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহন করিবেন, এটা তো হইতে পারেনা।

– পাকা পাকা কথা বাদ দিয়ে, বাড়িতে গিয়ে তৈরী হ।

– ক্যানো কাকা, বিষ খেয়ে জীবনটা ঢিসমিস করার জন্য। মানে আত্মহত্তা করার জন্য ।

– বিকেলে সাদিয়ার কী একলার বিয়ে হবে গাধা।

– তো আমি কী সাদিয়ার বিয়েতে নাস্তা সেমাই পরিবেষণ করবো।

– না, কবুল বলে সাদিয়াকে বরণ করবি।

এই কথা শুনে, আকাশ দৌড়ে এসে সাদিয়ার বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে উঠে দাড়িয়ে বললো, ‘Thank u আব্বু, আপনার এই ঋণ, সোধ হবেনা কোনো দিন, প্রথমে আমি ভিড়মি খাইতে চেয়েও খাইনাই, আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো তাই।’

‘হইছে-হইছে’ বলে সাদিয়ার বাবা চলে গেলো। সাদিয়া আকাশকে বললো, ‘এইভাবে কথা বলতে লজ্জা করেনা?’

– লজ্জা কিসের সুন্দরী, প্রেম ভালোবাসার কথা তো পবিত্র।

– তাই বলে বাবার সামনে।

– হুম, বাবা, কাকা, হোক, আর মিশা সওদাগর হোক, ভালোবাসা জিনিষটা সবার ভেতরেই আছে।

– বুঝছি, বুঝছি।

– কী ?

– তুমি আসলেই মারাত্মক প্রেমিক।

গল্পঃ মারাত্মক প্রেমিক।

আবির হোসেন।

পতি পত্নী সমগ্র

0

সাধারণত নতুন বিয়ের পর প্রথম ১ মাস কেটে যায় আত্নীয়-স্বজনদের বাসায় দাওয়াত খেতে খেতে। আমাদের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম কিছু ঘটছে না। আজ দুপুরে আমার বড় ননাশের বাসায় দাওয়াত। সেই খুশিতে সকাল থেকে আমার বরমশাই অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটিয়ে চলেছেন। দুপুরে বড় আপার হাতের রান্না খাবেন বলে সকালে তিনি নাস্তা করেননি। তারপর আবার বারান্দা থেকে ফুলগাছের টবগুলো সরিয়ে ফেলেছেন হাঁটাহাঁটি করার জন্য। হাঁটাহাঁটি করলে নাকি ক্ষিদে বাড়বে। আর ক্ষিদে বাড়লে খাওয়াটাও তৃপ্তি করে খাওয়া হবে। সবসময় শুনে এনেছি, অতিরিক্ত ক্ষিদে পেটে ঠিকভাবে খাওয়া যায় না। কিন্তু তার ক্ষেত্রে দেখছি উল্টো কাহিনী। শুধু এ পর্যন্তই থেমে নেই, একটু পরপর বড় আপাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করছেন- কি কি আইটেম রান্না করছেন, রান্না কতদূর! অথচ তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে, তিনি এতটা ভোজনবিলাসী। ৫ ফিট ১০ ইঞ্চি উচ্চতার শরীরটাতে বাড়তি ভুঁড়ি চোখে পড়ে না। মাঝারি ধরনের স্বাস্থ্য। তবে তার খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। পরিমিত খাবেন কিন্তু আয়োজনটা ঠিকঠাক হওয়া চাই।

এদিকে আমি গোসল সেরে সময়মত রেডি হতে শুরু করে দিয়েছি অথচ বরমশাইয়ের এখনো গোসলই শেষ হয়নি। ৪০ মিনিটের উপরে হয়েছে তিনি গোসলে ঢুকেছেন। বাথরুমের ভেতর থেকে পানির আওয়াজের চেয়ে বেসুরো গলার গানের আওয়াজ বেশি আসছে। আজ কিসের এত রঙ লেগেছে মনে কে জানে! এর মধ্যে বড় আপা দু’বার কল করে তাড়া দিয়েছেন। শাড়ি গয়না পরে রেডি হয়ে বসে আছি, তখন তিনি মাত্র গোসল সেরে বের হয়েছেন। আমার দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিলেন। এত সুন্দর করে সেজেছি অথচ একবার ফিরেও তাকালেন না। মেজাজটা চূড়ান্ত পর্যায়ের খারাপ হয়ে আছে আমার। অবশ্য যার কপালে এমন বেরসিক,বেসুরো গলার প্রতিবেশীরূপী বর জুটে, তার মেজাজের কোনো ঠিকঠিকানা থাকবেনা এটাই স্বাভাবিক। সেই রাতে টিভি দেখতে দেখতে সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বলে শাস্তিস্বরূপ আজ অব্দি তাকে আমি “তুমি” করে বলিনি। কিন্তু এ নিয়ে তার কোনো মাথাব্যথাই নেই। একবার শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন- এখনো আমি “আপনি আপনি” করছি কেন। প্রতিউত্তরে আমি অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলেছিলাম- “এটা আপনার শাস্তি।” এরপর আমার মান ভাঙানো তো দূরের কথা, দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন পর্যন্ত করেননি। এমনকি শাস্তির কারণও জানতে চাননি।

ড্রেস চেঞ্জ করে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ব্রাশ করার আগে তিনি তার ব্লেজারটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,
– নাও, এটা পরো।
আমি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলাম,
– কেন?
– বাইরে কত ঠাণ্ডা দেখছো না?
মুহূর্তেই মেজাজের রুক্ষতাটা চলে গিয়ে মনটা খুশি ভরে গেল আমার। মানুষটাকে যতটা উদাসীন বা বেরসিক ভেবেছিলাম, ততটাও না আসলে। আমার দিকে তাহলে তার ভালোই খেয়াল থাকে, শুধু আমিই বুঝতে পারিনা। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি ফুটিয়ে ফ্যাশনের তোয়াক্কা না করে শাড়ির উপরই ব্লেজারটা পরে নিলাম।

বরমশাইয়ের আজকে বাইক চালানোর মুড নেই নাকি। তাই রিকশা করে যেতে হচ্ছে। রিকশায় উঠেই তিনি আমার কাছ থেকে ব্লেজারটা নিয়ে কি সুন্দর নিজে পরে নিলেন। আর আমি হা হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আমাকে এভাবে তাকিয়ে দেখতে দেখে তিনি নির্লিপ্ত ভঙ্গীতে বললেন,
– আসলে ব্লেজারটা তোমাকে দিয়েছিলাম গরম করার জন্য। এতক্ষণ তুমি পরে ছিলে তাই এখন আমি পরে আরাম পাচ্ছি। থ্যাংকস।

একবারও এটা ভেবে দেখলেন না, আমার কতটা ঠাণ্ডা লাগছে! জিজ্ঞেসও করলেন না, ব্যাগে করে শাল বা শীতের কাপড় কিছু এনেছি কিনা। দাঁতে দাঁত চেপে জেদ করে এভাবেই বসে রইলাম কিছুক্ষণ। বাইরে ঠাণ্ডা বাতাস। একসময় আর সইতে না পেরে সব ভুলে গিয়ে ব্যাগ থেকে শাল বের করে নিয়ে গায়ে জড়িয়ে নিলাম।

খাবার টেবিলে এত এত আইটেম দেখে খুশিতে বরমশাইয়ের চোখ দুটো মারবেলের মত হয়ে গেল। প্লেটে সাদা পোলাও তুলে নিতে নিতে তিনি বেশ উৎফুল্লের সাথে আমাকে বলতে লাগলেন,
– আরে প্রিয়তি, আপার রান্না সম্পর্কে তোমার কোনো আইডিয়াই নেই। যা রাঁধে না আপা! জাস্ট ওয়াও! একবার খেলে, বারবার খেতে ইচ্ছে করবে।
বড় আপা লাজুক ভঙ্গীতে ভাইকে থামালেন,
– চুপ কর্ তো! সবসময় বেশি বেশি বলিস। নে, খাওয়া শুরু কর্। প্রিয়তি লজ্জা পেও না কিন্তু। খাওয়ার মধ্যে কোনো লজ্জা পেতে নেই।

খাওয়া শুরু করার পর খেয়াল করলাম, খাওয়ার আগে বরমশাই যতটা উৎফুল্ল ছিলেন, এখন তার চেয়েও বেশি মিইয়ে গেছেন। প্লেটে আঙুল নাড়াচাড়া হচ্ছে বেশি, খাবার মুখে নেয়া কম হচ্ছে। ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারলাম না। রান্না তো ভালোই হয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ পর তিনি বড় আপাকে জিজ্ঞেস করলেন,
– আপা, বাজার কে করেছে আজকে?
– তোর দুলাভাই। সবসময় তো কাজের ছেলেটাকে দিয়ে বাজার করাই। আজ তোরা আসবি বলে তোর দুলাভাই নিজে গিয়ে বাজার করে এনেছে।
– ও।
আমি বললাম,
– কিন্তু দুলাভাই কখন আসবেন?
– চলে আসবেন। ফোন করে বললো, তোমাদের খেতে বসিয়ে দিতে। সে মাঝখানে এসে জয়েন করবে। অথচ দেখো, এখনো তার আসার নামগন্ধ নেই।

বাসায় ফিরে বরমশাই রেগেমেগে আগুন হয়ে নিজে নিজেই বিড়বিড় করতে লাগলেন,
– রান্না কত ভাল হয়েছিলো কিন্তু ভাল বাজারের অভাবে ঠিক করে খেতে পারলাম না। মাছ একটাও তাজা ছিল না শিওর আর মাংস তো ছিলোই না বলতে গেলে, সব হাড় ধরিয়ে দিয়েছে, তাও যদি চাবানো যেত। ধুর, এটা কিছু হল!

রাতে ঘুমানোর আগে বরমশাই চিন্তিত হয়ে আমাকে বললেন,
– আসলে কি জানো প্রিয়তি? সংসারের সুখ যেমন গৃহিনীর রান্নার উপর নির্ভর করে, ঠিক তেমনি কর্তার বাজারের উপরও। রান্না যতোই ভাল হোক, বাজার ঠিকঠাক না হলে সেই রান্নার কোনো কদরই থাকবে না। আবার বাজার যতোই ভাল হোক, রান্না ঠিকঠাক না হলে সেই বাজারেরও কোনো কদর থাকবে না। তাই ভাবছি, আমি বাজার করা শিখবো। তুমি না সেদিন বলছিলে, তোমার বড় খালু খুব ভাল বাজার করতে পারেন?
আমি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম,
– তো?
– তো আবার কি! আমি তোমার বড় খালুর কাছ থেকেই বাজার করা শিখবো। আর তুমি রান্না জানো তো? না জানলে বলো, তোমাকেও রান্নার কোনো কোর্সে ভর্তি করিয়ে দেই।

সারাটারাত এই রান্না আর বাজার নিয়ে লেকচার শুনতে শুনতে পার হয়ে গেল। এসব শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই।

পরদিন সকাল সকাল সব কাজকর্ম ফেলে ঠিকই তিনি বড় খালার বাসায় চলে গেলেন খালুর কাছ থেকে বাজার শিখবেন বলে। বড় খালা ফোন করেছেন এখন। রিসিভ করে কি বলবো, আর বললেও বরমশাইয়ের পাগলামির বিশ্লেষণ কিভাবে বুঝাবো তা নিয়ে খুব চিন্তায় আছি আপাতত।

খুব বেশি ইগো আর পার্সোনালিটি দিয়ে ভালোবাসা হয় না …

0

খুব বেশি ইগো আর পার্সোনালিটি দিয়ে ভালোবাসা হয় না … ভালোবাসায় ইগোর আধিপত্য খাটালে তা টেকে না … সমস্ত ইগো বিসর্জন দিয়ে বেহায়া হয়ে গিয়ে মানুষটাকে সবটা দিয়ে ভালোবাসতে হয় !!
.
মানুষটা একটু কষ্ট দিয়ে ফেললে ইগো দেখিয়ে ছেড়ে না গিয়ে নত হয়ে ভালোবাসি বলে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখাটাই ভালোবাসা … তাই খুব বেশি ইগোটিস্ট মানুষদের প্রেম বেশিদিন টেকে না !!
.
খুব বেশি চালাক মানুষের সাথে সম্পর্ক টেকে না … ভালোবাসলে বোকাসোকা হতে হয় … অনেক বড় বড় দোষ দেখেও বোকার মতো না দেখার ভান করতে হয় … নাহলে প্রেম টেকানো মুশকিল !!
.
খুব বেশি ইগো, পার্সোনালিটি, ইমোশনলেস মানুষ দিয়ে ভালোবাসা হয় না … ভালোবাসলে তিতে বেহায়া হতে হয়, ছ্যাচড়া হতে হয়, নির্লজ্জের মতো বারবার ফিরে যেতে হয় কষ্ট দেয়া মানুষটার কাছে … আদারওয়াইজ, সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা মুশকিল !!
.
আমার ইমোশনাল মানুষজন একদম ভাল্লাগে না বলা খুব সহজ অথচ দিনশেষে কিন্তু তোমার ঐ ইমোশনাল একটা মানুষই লাগে … ইমোশনলেস, ড্যাম পার্সোনালিটি ওয়ালা একটা মানুষের সাথে সাময়িক সুখে থাকা গেলেও সারাটা জীবন কাটানো যায় না !!
.
এই দুনিয়াতে আজ অবধি কোনো ইগোওয়ালা, অতিরিক্ত চালাক এবং ইমোশনলেস মানুষের প্রেম টিকেনি আর কোনোদিন টিকবেও না !!

~ তানভীর

কৃষ্ণচূড়া

0

বউ আর বাচ্চাকে যে মানুষ এমন ভাবে ভালবাসতে পারে তা সাদাত ভাইকে না দেখলে আমি বুঝতাম না। অফিসে একটু পর পরই দেখতাম ভাবীকে ফোন দিচ্ছে। আমার বউ টা কি করে.. আমার বাবুটা কি করে….???

উফফ…বউয়ের সাথে মানুষ ফোনে এতো কথা বলে কেমনে? আমার খুব বিরক্ত লাগতো সাদাত ভাইকে।
উনাকে বিরক্ত লাগার আরো একটা কারন আছে, উনি ব্যাগে সবসময় কি জানি এক গাছের বাকল নিয়ে ঘুরতো,আর কিছুক্ষন পর পর সেই গাছের বাকলের গন্ধ নিত। অনেকে উনাকে পাগলও বলতো, সত্যি বলতে আমিও বলতাম।

আমি মাঝে মাঝে বলেই ফেলতাম, আচ্ছা সাদাত ভাই.. আপনি এমন কেন? কি সব ব্যাগে নিয়ে ঘুরেন? মানুষ যা তা বলে। আপনার গায়ে লাগে না? উনি মুচকি হেসে বলতো এসব তোমরা বুঝবা না।

আর প্রতি সপ্তাহে আমাকে নিয়ে শপিং এ যাবে উনার পিচ্চি বাবুটার জন্য চকোলেট এবং বউয়ের এর জন্য লিপিস্টিক, নেইলপলিশ এই টাইপ বিভিন্ন রকম মেয়েলি প্রোডাক্টস কেনার জন্য।

আমি আবারো বিরিক্ত হয়ে বলতাম,আচ্ছা ভাবীকেই তো নিয়ে আসতে পারেন। এগুলাও আপনাকে কিনতে হবে?? উনি মুচকি হেসে বলতো..আরে এসব তুমি বুঝবা না..আমি আসলেই বুঝতে চাইতাম না,আমার কাছে এসব খুবই আতলামী মনে হতো…

একদিন অফিস শেষ করে আমি আমার বাসায় ফিরছিলাম হঠাৎ মেইন রোডের পাশে একটা কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে ঠিক সাদাত ভাইয়ের মত একজনকে দেখতে পেলাম। কাছে যেতেই দেখি…আমাদের সাদাত ভাই হাউমাউ করে কাঁদছে। মানে কি…আমি উনাকে জড়িয়ে ধরলাম,আরে সাদাত ভাই, কি হইছে আপনার?? এখানে কি করেন? সাদাত ভাই আমাকে দেখেই বলা শুরু করলো….

হ্যা,এই তো সেই গাছ বুঝলা মামুন, এই গাছ টাতেই থেতলে গিয়েছিল আমার বাবুর মাথাটা। গাছটার গায়ে আমার তিথির রক্ত লেগেছিল অনেকদিন। ওর মৃত্যুর কয়েকদিন পর এসে আমি গাছটার কিছু বাকল উঠিয়ে নিয়ে যাই। গাছের সেই রক্তমাখা বাকল নাকের কাছে নিতেই আমার তিথির গায়ের গন্ধ আমি পাই..তোমরা যে আমাকে পাগল বলো.. আমি কিন্তু পাগল না, বুঝলা মামুন। আমাদের সিটি কর্পোরেশন টা না যাচ্ছে-তাই। গাছটাকে কি অবেহেলায় রাখছে দেখছো তুমি।

কি সব আবোল তাবোল বলছেন সাদাত ভাই, চলেন আপনাকে বাসায় দিয়ে আসি। হুম চলো চলো তোমার ভাবীও বাসায় একা।

আমি আসলে বুঝতে পারছিলাম না..কি হচ্ছে। উনার বাসায় ঢুকতেই, সাদাত ভাইয়ের মা দরজা খুলে দিলেন। আমি আমার পরিচয় দিলাম…

সাদাত কে কি তুমি কৃষ্ণচূড়ার সামনে পাইছো?
জি আন্টি…। কিন্তু আন্টি এতো রাতে ওই খানে…?

আন্টি আমাকে থামিয়ে বলা শুরু করলো…আমার ছেলে আর ছেলের বউ দুইটাই পাগল ছিলো। কথা নেই- বার্তা নেই রাত বিরাতে লং ড্রাইবে বের হয়ে যেত। অনেক মানা করছিলাম….নাতনিটাকে নিস না।কিন্ত কে শুনে কার কথা। ওদের বাবু তিথির ১ম জন্মদিন পালন করতে বের হয়েছিল। রোড এক্সিডেন্ট করলো সেই গাছটার নিচে। আমার নাতনীটাকে আর বাঁচানো গেল না…..আজ আমার নাতনীটার মৃত্যুবার্ষিকী.. বলেই উনি কাঁদতে লাগলেন…

আমি তবুও জানতে চাইলাম,আর আমাদের ভাবী…?
যাও পাশের রুমে গিয়ে দেখো..

আমি পাশের রুমে গিয়ে দেখি। হুইল চেয়ারে বসা সম্পূর্ণ প্যারালাইজড এক জন মহিলাকে সাদাত ভাই লিপিস্টিক দিয়ে দিচ্ছে…চোখে আইলাইনার করে দিচ্ছে…আমাকে দেখে সাদাত ভাই বলে, মামুন এই যে তোমার ভাবী। ও সাজতে খুব পছন্দ করে, আর আজকে তো আমার তিথির জন্মদিন। না সাজালে ও খুব রাগ করবে.. এবার বুঝলা তো কেন আমি এতো শপিং করি।

আমি আসসালামু আইলাইকুম ভাবী বলে চুপ করে রইলাম।

মামুন তুমি রাগ করো না, ও কিন্তু সব শুনতে পায়।ওই যে দেখো বড় করে নিঃশ্বাস ছাড়ছে। আরে মামুন তুমি দেখো নাই, অফিসে গেলে কতক্ষন পর পর আমি ফোন দেই ওকে…ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনলেই আমি বুঝে যাই ও কি বলে….

আমি সাদাত ভাই এবং ভাবীর দিকে তাকিয়ে আছি।সাদাত ভাই কি সুনিপুন ভাবে এক হাত দিয়ে ভাবীকে সাজিয়ে দিচ্ছে আর অন্যহাত দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছতে মুছতে বলতে লাগলো..তোমার ভাবীকে নিয়ে এখন বের হবো…

আমি বললাম, ভাই এত রাতে আবার কৃষ্ণচূড়ার সামনে না গেলে হয় না…সাদাত ভাই, মুচকি হেসে বললো,এসব তুমি বুঝবা না….

ষাট কেজি মাংস

0

‘রান্নাটা আমি নিজেই করেছি বাবা!’

ষাটোর্ধ বৃদ্ধের মুখে কথাটা শুনে আমার গলা দিয়ে খাবার নামা স্তিমিত হয়ে পড়ল। চোখ তুলে আরও একবার ভালো করে তার দিকে চাইলাম, কিন্তু অল্পস্বময়ের ব্যবধানেই চোখাচোখি হওয়ায় চোখজোড়া নামিয়ে নিতে হলো।

খতমে তারাবীহ পড়ানোর সুবাদে প্রতি রমজানেই বাসার বাইরে থাকতে হয়। এই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে রংপুর ক্যান্টনমেন্টের গা ঘেষে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট একটি গ্রাম-লাকীপাড়ায় থাকতে হয়েছিল। সেই এলাকার রেওয়াজ অনুযায়ী প্রতিবছর হাফেজ সাহেবগন তাদের খাওয়াদাওয়া এলাকার সাতাশ জন মানুষের বাসায় সম্পাদন করতেন। সে বছরও এই নিয়মের বাত্যয় ঘটল নাহ।

প্রতিদিনের ন্যায় সেদিনও তারাবীহ শেষে খাওয়াদাওয়া করতে গেলাম। বাড়ির অবস্থা দেখে বেশ বোঝা যায় যে, দীর্ঘদিন যত্ন নেওয়া হয়নি। দেয়ালের বিভিন্ন জায়গায় রঙ উঠে গেছে, কিছু কিছু জায়গায় ফাটল ধরেছে, মেঝের অবস্থাও খুব একটা ভালো ছিল না।

আমাদের বিছানার উপর বসতে দেওয়া হলো। বৃদ্ধ ব্যতিরেকে বাসায় আর কাউকে চোখে পড়ল না। খাবার থেকে শুরু করে পানি ও প্রয়োজনীয় যা যাবতীয় জিনিসপত্র সব তিনি একাই নিয়ে আসছিলেন। পরিবেশনও তিনিই করলেন। আমি ভাবলাম, হয়তো পর্দার কারণে বৃদ্ধা আমাদের সামনে আসছেন না। খাবারের আয়োজনও বেশ ভালো ছিল। পোলাও, মাংস, ডাল, মাছ সহ কয়েক প্রকারের সবজি। খাওয়ার একপর্যায়ে খাবারের প্রশংসা করতে গিয়ে আমি বললাম, “চাচীর রান্নার হাত তো বেশ ভালো!”

আমার প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে বৃদ্ধ উপরোল্লিখিত উত্তরটি দিলেন। বৃদ্ধের কথা শুনে আমার সহকর্মী হাফেজ সাহেব সহ ইমাম মুয়াজ্জিন সকলেই আশ্চর্য হয়ে গেলেন৷ তার রান্না করার কারণ জানতে চাইলাম। প্রত্যুত্তরে তিনি বললেন, ‘বাবা, তোমার চাচীর ডিউটি আছে এখন। তাই আমাকেই আয়োজন করতে হলো!’

বৃদ্ধের মুখে আরও শুনলাম, তিনি রংপুর সরকারি মেডিকেলে কাজ করেন এবং তার স্ত্রী প্রাইম মেডিকেল কলেজে কাজ করেন। একেকদিন একেক সময় ডিউটি পড়ায় তিনি নিজেই রান্না করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন৷ অথবা দেখা যায়, চাচা বাসায় আছেন অথচ চাচী সদ্য ডিউটি শেষ করে ক্লান্ত শরীর নিয়ে ফিরেই রান্নায় লেগে পড়লেন। তার করার মতো ঘরের তেমন কাজকর্ম নেই, তাই চাচীর কষ্টকে লাঘবের জন্য হলেও তিনি রান্নাটা শিখেছেন।

এই জীর্ণশীর্ণ যে ঘরটি নিয়ে তারা দিনাতিপাত করছেন, সেটা তাদের নিজের বাড়ি নয়। উত্তরবঙ্গের সবচেয়ে দুর্যোগকবলিত জেলা কুড়িগ্রাম শহরের অদূরেই বৃদ্ধের পিতৃনিবাস। গ্রামে তাদের সব আছে, শুধুমাত্র জীবিকার তাগিদেই শহরে পাড়ি জমানো, জীবিকার তাগিদেই গ্রামের প্রশস্ত ঘর ছেড়ে শহরের এই খুপড়িতে কালযাপন করা।

একপর্যায়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ছেলেমেয়ে নেই আপনার?’ প্রশ্নটা শোনামাত্র বৃদ্ধের চেহারা কালো হয়ে গেল। তার চেহারার পরিবর্তন লক্ষ্য করে প্রশ্নকর্তা হিসেবে আমি নিজেই কিছুটা বিব্রত হয়ে গেলাম। ইতোমধ্যে খাওয়া প্রায় শেষপর্যায়ে চলে এসেছে। এমতাবস্থায় কিছু বলার জন্য দ্বিতীয়বারের মতো মুখ খুললেন বৃদ্ধ।

‘একটামাত্র ছেলে আছে আমার। গ্রামে নিজের জমি ছিল কিছু৷ চাষাবাদ করে অনেক কষ্টে ছেলেকে লেখাপড়া শিখাইছি। এরপর জায়গাজমি বিক্রি করে ছেলেটাকে আর্মির চাকরী নিয়ে দেই। ছেলেটা চাকরী পাওয়ার পর আমাদের সকল কষ্ট ঘুচে যায়। প্রতি মাসে সে যে টাকা পাঠাত, সেই টাকা দিয়ে দিব্যি চলে যেত আমাদের। বছর দুয়েক বাদে ভালো ঘর দেখে ছেলেটাকে বিয়ে দিয়ে দেই।’

এতটুকু বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে থামলেন বৃদ্ধ। আমরা খাওয়া শেষ করে হাত মুছতে মুছতে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বৃদ্ধের কথা শুনছিলাম। বিরতির সময়টুকুতে বৃদ্ধ আমাদের জন্য পান-সুপারি নিয়ে আসলেন। এরপর আবার বলতে শুরু করলেন।

‘বিয়ের পর বছরখানেক ভালোই ছিল, কিন্তু এরপরই ছেলে আমার কেমন যেন বদলে যেতে শুরু করল। বউয়ের প্ররোচনায় নাকি অর্থের দাম্ভিকতায় তা উপরওয়ালাই ভালো জানেন। আগে যেখানে মাসের শুরুতেই টাকা পাঠাত, এখন সেখানে টাকা পাঠাতে পাঠাতে মাস প্রায় শেষ হয়ে আসে। ক্রমশ পাঠানো টাকার পরিমাণও হ্রাস পেতে শুরু করল। কারণ দেখাতো, আমরা বয়োবৃদ্ধ মানুষ- আমাদের এত টাকার কী প্রয়োজন! ছেলের কথায় সায় দিয়ে আমরাও হাসিমুখে মেনে নিলাম যে ঠিকই তো, আমাদের তো এত টাকার প্রয়োজন নেই!

আগে যতই ব্যস্ত বা ডিউটিতে থাকুক না কেন, প্রতিদিন রাতে ওর মায়ের সাথে, আমার সাথে কথা বলতই। এখন ধীরে ধীরে ফোন দেয়াও বন্ধ করে দেয়। সপ্তাহান্তে বা মাসে একবার ফোন দিত। সেটা যে একান্ত অনিচ্ছায়- তা তার কথাবার্তার ধরণ ও পরিধি দেখেই বেশ বোঝা যেত। সে বছর ইদেও বাড়িতে আসল না। ইদের সপ্তাহখানেক আগে ফোন করে জানাল, তার নাকি ইদে ছুটি নেই। পরে জানতে পারলাম সে তার শশুরবাড়িতে ইদ করতে গিয়েছে। আমি আর ওর মা সারাটাদিন ওর পথ চেয়ে বসে ছিলাম। ওর মা তো ইদের দিনেও কিছু মুখে তোলেনি।’

‘আচ্ছা, ওনার পোস্টিং এখন কোথায়?’ বৃদ্ধকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে প্রশ্নটি করলেন আমার সহকর্মী হাফেজ সাহেব।

‘খাগড়াছড়ি’ উত্তরটি দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন বৃদ্ধ। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ছলছল চোখ নিয়ে তিনি আবার শুরু করলেন তার জীবনের করুণ গল্প।

‘এরপর সে পুরোপুরিভাবে ফোন দেওয়া ও বাড়ি আসা বন্ধ করে দেয়। আমরা ফোন দিলেও ধরত না, বাড়ি আসতে বললে নানান অজুহাত দেখাত। আমরা দুজন তার জন্য নীরবে চোখের জল ফেলে যেতাম শুধু। এদিকে তার চাকরির জন্য জায়গাজমি সব বিক্রি করায় কালযাপন করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছিল। অনেক সময় অনাহারে কাটাতে হতো! বাধ্য হয়ে চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে রংপুর চলে আসি। তারপর অনেক কষ্ট করে দুজনে একটা কাজ যোগাড় করে নেই। এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালোই আছি আল্লাহর রহমতে।’

‘তারপর উনি আর কোনো খোঁজখবর নেননি?’ এতক্ষণ নীরব থাকা ইমাম সাহেব এবার মুখ খুললেন।

‘পরের বৎসর কুরবানি ইদে সে বাসায় না এসে আমাদের জন্য ষাট কেজি গরুর মাংস পাঠায় দেয়। ওর মা ও আমি একটা মাংসও ছুঁয়ে দেখিনি, সবগুলো মাংস বাড়ির পাশের পুকুরে ফেলে দিয়েছি। এত কষ্ট করে সন্তান মানুষ করেছি কি কয়েক টুকরো মাংস খাওয়ার জন্য? আমাদের প্রতি কি তার কোনো দায়িত্ব নেই? যে ছেলে আমাদের খোঁজখবর নেয় না, যে ছেলে কথা বলেনা আমাদের সাথে, যে ছেলে বাড়িতে আসার প্রয়োজন বোধ করে না, না খেয়ে মরে গেলেও তার পাঠানো খাবার মুখে তুলব না!’

এ পর্যন্ত বলেই বৃদ্ধ ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। তার এভাবে কান্না দেখে আমার চোখের কোণেও যে কখন জল এসে জমা হয়েছে, বুঝতেই পারিনি।

বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে। বৃদ্ধকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো ভাষা আমার জানা নেই। বৃদ্ধের চোখের দিকে তাকানোর সাহস নেই বলে নাকি নিজের চোখের জল লুকোতে আমি মাথা নিচু করে বের হয়ে আসলাম, তা আমার জানা নেই।

এরপর দীর্ঘদিন যাবত আমার কানে বৃদ্ধের সেই কথাটাই শুধু বেজেছে, ‘এত কষ্ট করে সন্তান মানুষ করেছি কি কয়েক টুকরো মাংস খাওয়ার জন্য?’

©খাদিমুল মুরছালীন রিয়াদ

মায়ের সাথে প্রথম দেখা

0

‘মায়ের সাথে প্রথম দেখা’ বাক্যটি পড়েই অনেকে হয়তো ভাবছেন এটা আবার কেমন কথা? জন্মের পর পরই তো মায়ের সাথে প্রতিটি সন্তানের প্রথম দেখা হয়। কিন্তু আমাদের ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। জন্মের পরও আবার দীর্ঘ সময় পার করে মায়ের সাথে প্রথম দেখা হয়েছে আমাদের।

বাবা আমাকে আর অনিককে বললেন, তোমাদের মা তোমাদের সাথে দেখা করতে চাচ্ছেন। তোমরা কি দেখা করতে চাও? আমি আর অনিক দু’জন দু’জনের দিকে তাকালাম। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি আর অনিক ফাইভে। মায়ের তেমন কোনো স্মৃতি আমাদের মস্তিষ্ক ভান্ডারে নাই। আমার তবু সামান্য কিছু যাও আছে অনিকের কিছু্ই নাই। সেজন্য অবশ্য তার দুঃখও নাই। সে বাবা অন্তপ্রাণ। তার জগৎটা বাবাকে ঘিরেই। কিন্তু মায়ের কথা ভুলতে পারি না আমি। ঝাপসা স্মৃতি তোলপাড় করে দেয় দৈনন্দিন বেঁচে থাকাকে। কেমন ছিল আমার মা? কি এমন ঝগড়া হয়েছে বাবার সাথে যে নাড়ীছেঁড়া দুটি সন্তানকে পর্যন্ত ছেড়ে যেতে হবে? হাজারটা প্রশ্নের আনাগোনা আমার ভেতরটাতে। অথচ মুখ ফুটে প্রশ্নগুলো কাউকে করার কোনো অবকাশ নেই। আমার মায়ের জন্য জমিয়ে রেখেছি আমি এক বুক অভিমান। মাঝে মাঝে তাকে খুব নির্মমও মনে হতো। আমাদেরকে ছেড়ে খুব ভাল আছে হয়তো, একথা ভেবে খুব রাগও হতো। ভাবতাম তিনি বোধ হয় আমাদের মা-ই নয়। কারণ মা তো এত নিষ্ঠুর নয়।

আমার বাবা তার ছোট্ট দুটি দুধের শিশুকে বাঁচানোর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করলেন। বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী আমাদেরকে মায়ের যে ভয়ঙ্কর রূপ দেখিয়েছে তাতে আর নিজের মায়ের প্রতিও আমাদের আর কোনো আকর্ষণ নেই। বরং আছে ভীতি। দ্বিতীয় মায়ের অত্যাচারে আমি আর অনিক অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে গেছি। আমাদের কোনো কিছু বলার বা চাওয়ার অনুভূতি হয় না। আমাদের কোনো সুন্দর স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছে করে না। সবকিছুতেই একটা সূক্ষ্ম যন্ত্রণাবোধ।

এত কিছুর পরও বাবার প্রতি রয়েছে আমাদের সীমাহীন ভালোবাসা। কারণ সেই ছোট্টবেলা থেকে আজ পর্যন্ত শুধু আমাদেরকে ভালোবেসেই বাবা মুখ বুজে হজম করে গেছেন অনেক কিছু। মাঝে মাঝে মনে হয় এই জীবনের সবকিছু ছাড়তে পারব শুধু বাবাকে ছাড়া। বাবাই আমাদের স্বপ্ন সুখের বেঁচে থাকা। তাইতো হঠাৎ করে নিজের মায়ের আগমন এবং দেখা করার আকুলতা আমাদেরকে খুব একটা স্পর্শ করছে না। কি জানি ‘মা’ শব্দটির গভীরতা, তীব্রতা, ব্যাপকতা বোঝার মতো ক্ষমতা বোধ হয় নষ্ট হয়ে গেছে আমাদের।

শেষ পর্যন্ত বাবা, মায়ের সাথে আমাদের দেখা করিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। বাবার দীর্ঘদিনের সহকর্মী মামুন চাচার স্ত্রী নাহার আন্টি আমার মায়ের কাজিন। আমাদেরকে ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে মা, মামুন চাচা আর নাহার আন্টি থেকেই আমাদের খোঁজ খবর নিতেন। মামুন চাচার সাথে আমি আর অনিক খুব অসহায়ভাবে রওনা হলাম।

সুন্দর একটা তিনতলা বাড়ি। মামুন চাচার নিজের বাড়ি। বাড়ির সামনে ছোট করে একটা লন জাতীয় জায়গা। তার আশেপাশে নানারকম গাছ-গাছালি। পাশে একটা ছোট্ট খাঁচায় দুইটা খরগোশ। অনিকের দিকে তাকাতেই দেখি ওর নজর পড়েছে খরগোশের প্রতি। দোতলার দরজা খোলাই ছিল। নাহার আন্টি ভেতর থেকে অনেকটা দৌড়েই এসেছে। কেমন আছে আমার বাবুগুলো দেখি তো বলে একদম বুকের কাছে নিয়ে কপালে চুমু খেলেন। নাহার আন্টি সব সময় এমন করেই ভালোবাসেন আমাদের। আমাদের বাসায় গেলেও জড়িয়ে আদর করেন।

হঠাৎ করে ভেতরের দিকের দরজায় চোখ পড়তে দেখি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। সবুজ রঙের একটা জামদানি ধাঁচের শাড়ি পরনে। ইন্ডিয়ান নায়িকা শ্রীদেবীর মতো মনে হচ্ছিল। এত সুন্দর! ছোটবেলা থেকে আমার মনে মায়ের যে একটা ঝাপসা ছবি ছিল সে ছবির সঙ্গে কোনো মিল নেই। নাহার আন্টি ডাকল, এই বকুল আপা দেখো কারা এসেছে।

কতদিন পর মায়ের সাথে দেখা। তিনি যখন আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন আমরা দু’ভাই বোন বুঝতেই পারছিলাম না আমরা কি করব? সম্ভবত তিনিও পারছিলেন না। সচরাচর নতুন মানুষ দেখলে যা করি সালাম দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি এখানেও তাই করলাম। কিন্তু সচরাচর অন্যপক্ষ থেকে যেমন হয় উত্তর দিয়ে বসতে বলে কিংবা কেমন আছ টাইপের প্রশ্ন করে। এখানে সেরকম কিছু হলো না। তিনি হঠাৎ করেই দ্রুত গতিতে ভেতরে চলে গেলেন। আমার কেন জানি মনে হলো তিনি নিজেকে হালকা করতে গেলেন। তার চোখ দুটি অসম্ভব ভারী মনে হচ্ছিল আমার কাছে।

আমরা দু’ভাই বোন খুব সংকোচ নিয়ে বসেছিলাম। নাহার আন্টি অতিথি আপ্যায়নের চূড়ান্ত ব্যবস্থা করলেন। আমরা যে এত গুরুত্বপূর্ণ অতিথি সেটা আমরা বুঝতে পারিনি। একটু পরে একজন সুদর্শন ভদ্রলোক এসে বসলেন আমাদের সামনে। নাহার আন্টি পরিচয় করিয়ে দিলেন। ইনি তোমাদের রেজা আঙ্কেল। দরজার পর্দা ফাঁক করে আরও দু’তিন জোড়া কৌতূহলী চোখ আমাদের দেখছিল। আমার কেন জানি নিজেকে খুব চিড়িয়া চিড়িয়া মনে হচ্ছিল।
আমি আর অনিক আমরা দু’জনেই মায়ের সাথে সহজ হতে পারছিলাম না। সম্ভবত মাও পারছিল না।

দুপুরের পরে মায়ের সাথে পাশাপাশি বসে টিভি দেখছিলাম। নাহার আন্টি, মামুন চাচা, রেজা আঙ্কেলও ছিল। কিছুক্ষণ পর তারা ঘুমানোর কথা বলে উঠে গেলেন। এমন সময় দুটি বাচ্চা এসে বলে, আম্মু তুমি ঘুমাবে না? তুমি গল্প না বললে আমরা ঘুমাব না। মা বললেন, এরা দু’জন তোমাদের আপু আর ভাইয়া। ওরা আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল, পপ কর্ন খাবো আম্মু। মা বোধ হয় ওদের জন্য পপ কর্ন আনতে ভেতরে যাচ্ছিলেন। ওরাও মায়ের আঁচল ধরে মায়ের সাথে সাথে গেল। ওদের দেখে নিজের মধ্যে কেমন যেন শূন্যতা, ঈর্ষা এবং কষ্ট অনুভব করছিলাম। আমাদের দু’ভাইবোনকে কেউ কোনোদিন দুপুরে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পড়িয়ে দেয়নি। মায়ের আঁচল ধরে কোনোদিন আমরা কোনো আবদার করতে পারিনি।
মায়ের ছেলে-মেয়ে দুটির নাম ইফতি এবং সেতু। রেজা আঙ্কেলের সাথে চেহারায় বেশি মিল। সে তুলনায় আমার আর অনিকের চেহারাটা মায়ের সাথে কিছুটা মিলে যায়।

সন্ধ্যার দিকে মামুন চাচা আমাদেরকে বাসায় পৌঁছে দেয়ার কথা বলতেই মা বলে উঠলেন, মামুন ভাই আজকের রাতটা থাকুক না আমার কাছে।
মামুন চাচা বললেন, না, বকুল আপা। রাহাত ভাই অপেক্ষায় আছেন। উনি তো নিশ্চিন্তে বসে নেই।

নাহার আন্টি, রেজা আঙ্কেলও চেয়েছেন যেন আজকের রাতটা আমরা থাকি। কিন্তু মামুন চাচা রাজী হলেন না। আর এতে করে আমাদেরও স্বস্তি লাগল। কারণ আমার বাবার ঐ অশান্তিপূর্ণ সংসার এই নীরবতা, নিস্তব্ধতাপূর্ণ কষ্টের চেয়ে অনেক ভালো। নাহার আন্টির চাপাচাপির কারণে রাতের খাবার খেয়ে আমরা চলে আসার সময় মা আমাদের টেক্সিতে তুলে দিতে নিচে নেমে এলেন। তার আগে অবশ্য আমাকে আর অনিককে র‌্যাপিং মোড়ানো দুটো প্যাকেট দিলেন। সাথে এক বক্স চকলেট।

আমরা টেক্সীতে উঠার সময় মা আমাদেরকে জড়িয়ে ধরলেন। মায়ের চোখ থেকে টপটপ করে গড়িয়ে পড়া পানিগুলো আমাদের গালে এসে পড়ছিল। আমরা মায়ের কাছ থেকে নিজেদেরকে ছাড়িয়ে নিতে যাওয়ার সময় মা আরও শক্ত করে আমাদের জড়িয়ে ধরলেন এবং হঠাৎ করে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলেন। রাতের নিরবতা ভেঙে গেল মায়ের চিৎকারের শব্দে। মৃত্যুশোক ভেবেই হয়তো আশেপাশের ফ্ল্যাটের লোকজন রাতের আঁধার দূর করে ঘরের আলো জ্বালালেন। রেজা আঙ্কেল মাকে উপরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। সিএনজির এমন শব্দের পরও মনে হচ্ছিল মায়ের চিৎকারের শব্দটা কানে লেগে আছে। আমাদের চোখের পানি মুছতে মুছতে খেয়াল করলাম মামুন চাচার চোখও ভেজা। মা হঠাৎ এভাবে সিনক্রিয়েট করবে এমন করে হয়তো কেউ ভাবেনি।

অনেকদিন পর গতকাল বাবা বললেন, ‘তোমাদের মা দেখা করতে চাচ্ছে’। এরপর একটা কার্ড দিলেন হাতে। হলমার্কের কার্ড। মা মামুন চাচাকে দিয়ে আমার আর অনিকের জন্য কার্ড, চকলেট, পেন্সিল বক্স, রংতুলির মতো সুন্দর সুন্দর গিফট পাঠাতো। এগুলো নিতে আমাদের খুবই অস্বস্তি লাগত। এবারের কার্ডটা নিয়ে আমি কিরণ চন্দ্র চৌধুরীর ‘ভারতের ইতিহাস কথা’ বইয়ের ভেতর ঢুকিয়ে রেখেছি। এখনো খুলিনি। আমি জানি ওতে কি লেখা আছে। মায়ের সাথে দেখা করে আর কষ্ট বাড়াতে চাচ্ছি না। সেই এক দেখার কষ্টটুকু আজও কাটিয়ে উঠতে পারিনি আমি। অনিক এখন ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে। মায়ের কোনো স্মৃতি নাকি ওর মনে পড়ে না। ও নিজেও অবশ্য মনে করতে চায় না। কিন্তু আমি যে ভুলতে পারি না আমার মায়ের মুখখানি।

মা র‌্যাপিং পেপারে মোড়ানো যে প্যাকেটটা দিয়েছিল সেখানে একটা ডায়েরি ছিল। সেই ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠায় লেখা ছিল- “আমি সেই মা যে মা তার সন্তানের বেড়ে ওঠার স্পন্দন দেখি না, শুনি না। আমার সন্তানদের ভালো মন্দ কোনো কিছুতেই আমার কোনো অংশগ্রহণ নেই। ওরা আমার কাছে দূরের আকাশের তারার মতো। হঠাৎ হঠাৎ করে জ্বলে ওঠে। আমার সন্তানরা বেড়ে ওঠে আমার কল্পনায়। তারপরও আশা, আমার সন্তানরা তাদের সব আনন্দের ঘটনা, কষ্টের ঘটনা লিখবে এই ডায়েরিতে। আর এই ডায়েরি একদিন পৌঁছাবে আমার কাছে। আমি জানব আমার সন্তানদের বেড়ে ওঠার গল্প, যদি ওরা আমাকে জানতে দেয়”।

মার জন্য মাঝে মাঝে আমার অনেক কষ্ট হয়। আমাদের ছাড়া ঐ নতুন জীবনে কি মা খুব সুখে আছে? অনেক সুখের মাঝেও তীব্র কষ্টের উপস্থিতির জন্য তো, মাকে কোথাও তাকাতে হয় না। নিজের কথা ভাবলেই তো মুহূর্তেই সব সুখ ম্লান হয়ে যায়। ঐ ডায়েরির কিছু পাতায় আমি লিখেছি কিছু কথা। যখন মার জন্য তীব্র ভালোবাসা অনুভব করেছি তখনই লিখেছি। আবার যখন তীব্র কষ্ট হতো, কেন আমাদের জীবনটা এমন হলো তখন ইচ্ছে করতো ডায়েরির পাতাগুলো কুটি কুটি করে ফেলি।

আমাদের একজন মা আছেন যিনি শুধু আমাদেরই মা নন। ইফতি এবং সেতুরও মা এবং দাবিটাও ওদের বেশি। আমাদের একজন বাবা আছেন যিনি শুধু আমাদেরই বাবা নন। আবীর এবং ইমরানের বাবা। এখানেও অধিকারটুকু ওদের বেশি। আমরা আছি দু’পক্ষের মাঝামাঝি একটা প্রাচীর হয়ে। কষ্টের পাহাড়। এক জীবনে চাইলেই হয়তো সবাই ভালো থাকতে পারে না। তারপরও মনে মনে তীব্র চাওয়া তুমি ভালো থেকো মা। আমাদের কোনো অভিযোগ নেই। কিন্তু অভিমানও যে নেই সে কথা দৃঢ়তার সাথে বলতে পারি না বলেই হয়তো প্রযুক্তির এত অবিশ্বাস্য উন্নতির পরও মা আমাদের কাছে কেবলই স্মৃতি।

#গল্প

MOST POPULAR

HOT NEWS