হৃদয়ের টান
পর্ব ০৯
কলমে The Story Haven
হাতে ধরা চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে আমার চোখের কোণ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আড়তদার করিম ভাই আমার কাঁধে একটা শক্ত হাত রাখলেন। “কী হইছে সায়ন ভাই? কোনো খারাপ খবর?”
”না করিম ভাই, খারাপ না। এক অহংকারী মায়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক দাদীর হেরে যাওয়ার খবর,” আমি চোখের জল মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসলাম।
মা সরাসরি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেননি, নিজের অহংকারের দেওয়ালটা নিজে ভাঙতে পারেননি; তাই বাবার রেখে যাওয়া ট্রাস্ট ফান্ডের চাবিকাঠি আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। এই টাকাটা আমার সন্তানদের অধিকার, আমার বাবার ভালোবাসা। আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না। করিম ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা চলে গেলাম ব্যাংকে। আইনি সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে দুপুরের মধ্যেই বাবার সেই ফান্ড সচল করলাম। এখন আর সায়ন রহমান কোনো অসহায় রিফিউজি নয়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, মিথিলা আর রিয়াদের চক্রান্তের জবাব দেওয়ার মতো অ*স্ত্র এখন আমার হাতে।
ব্যাংক থেকে বের হয়েই আমি সোজা চলে গেলাম একটা বড় সিকিউরিটি এজেন্সিতে। রিয়াদের শেষ হু*মকিটা আমার কানে তখনো বাজছিল। মিথিলা যে কতটা নিচে নামতে পারে, তা আমার জানা আছে। আমার অনুপস্থিতিতে মারিয়া আর বাচ্চাদের সুরক্ষার জন্য আমি দুজন পেশাদার বডিগার্ড ভাড়া করলাম এবং তাদের আমার নতুন ভাড়া নেওয়া ঘরের আশেপাশে কড়া নজরদারিতে রাখলাম।
সব গুছিয়ে যখন বিকেলের দিকে এক বুক স্বস্তি নিয়ে ঘরের দিকে ফিরছি, ঠিক তখনই আমার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে মায়ের সেই বিশ্বস্ত পিএ—রহমান সাহেবের নাম।
ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে রহমান সাহেবের হন্তদন্ত গলা ভেসে এল, “সায়ন ভাই! আপনি যেখানেই আছেন, দ্রুত আপনার বাসায় যান! বড় আপা (রাবেয়া চৌধুরী) আপনাকে টাকা পাঠিয়েছেন এটা মিথিলা কোনোভাবে টের পেয়ে গেছে। ও চরম খেপে গেছে। রিয়াদকে নিয়ে ও কোনো বড় ধরনের অঘটন ঘটানোর জন্য লোক পাঠিয়েছে। আমি ল্যান্ডলাইনে ওদের ফিসফিসানি শুনে ফেলেছি। ওরা আজ বিকেলেই মারিয়া ভাবীর ওপর…”
”কী!” আমার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল, গায়ের র**ক্ত মাথায় চড়ে গেল।, ওরা কোন দিকে গেছে?”
”ওরা একটা সিলভার কালারের মাইক্রোবাস নিয়ে বস্তির ওই নতুন ঘরের দিকে রওনা দিয়েছে। আপনি দ্রুত যান, সায়ন ভাই!”
ফোনটা কেটে গেল। আমার চারপাশের পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আমি কোনো রিকশা বা গাড়ির তোয়াক্কা না করে পাগ*লের মতো দৌড়াতে শুরু করলাম। বুক ফেটে যাচ্ছিল, ফুসফুস ছিঁড়ে আসছিল বাতাসে, কিন্তু আমার মাথায় তখন কেবল মারিয়া আর আমার দুটো ফুটফুটে বাচ্চার মুখ।
এদিকে আমাদের সেই নতুন সেমি-পাকা ঘরের সামনে তখন একটা থমথমে পরিবেশ। মারিয়া ঘরের ভেতরে বাচ্চাদের বিকালের নাস্তা খাওয়াচ্ছিল। আচমকাই ঘরের বাইরে একটা চাকার কর্কশ আওয়াজ হলো।
একটি সিলভার রঙের নোয়া গাড়ি এসে থামল গলির মুখে। গাড়ি থেকে নামল রিয়াদ আর তার সাথে তিন-চারজন সশস্ত্র লোক। তাদের হাতে ধা*রালো অ**স্ত্র আর লাঠি। রিয়াদ ইশারা করতেই লোকগুলো ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
”ভেতরে কে আছে? বের হ!” একজন গু**ন্ডা লা**থি মা**রল কাঠের দরজায়।
মারিয়া চমকে উঠল। বাচ্চা দুটো ভ*য়ে মারিয়াকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। মারিয়া বুঝতে পারল, বিপদ আবার দোরগোড়ায়। কিন্তু চার বছর একা লড়াই করা মারিয়া আজ আর আগের মতো কেবল কাঁদার মেয়ে নয়। সে বাচ্চাদের খাটের নিচে লুকিয়ে পড়তে বলল, “বাবা তোমরা একদম চুপ করে থাকবে, একদম আওয়াজ করবে না।”
মারিয়া নিজে একটা ভারী কাঠের পিঁড়ি হাতে তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
ঠিক তখনই গু*ন্ডারা দরজাটা ভে**ঙে ভেতরে ঢুকতে যাবে, অমনি পেছন থেকে বজ্রপাতের মতো একটা আওয়াজ এল, “খবরদার! এক পা-ও যদি সামনে বাড়িয়েছ, জ্যান্ত পুঁ*তে ফেলব!”
রিয়াদ ঘুরে তাকাল। আমি ততক্ষণে সেখানে পৌঁছে গেছি। আমার সাথে আমার ভাড়া করা দুজন বিশালদেহের বডিগার্ড। রিয়াদ আমাকে দেখে কিছুটা ভড়কে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই তার অহংকার চাড়া দিয়ে উঠল। “সায়ন রহমান! তুই এসে গেছিস? ভালোই হলো। আজ তোর চোখের সামনেই তোর এই সংসার ছারখার করে দেব। ধর ওদের!”
রিয়াদের লোকগুলো আমাদের দিকে তেরে আসতেই আমার বডিগার্ডরা চি”তার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ওপর। শুরু হলো এক তুমুল মা*রামা*রি। যে গু*ন্ডাটি মারিয়ার ঘরের দরজায় লা*থি মে*রেছিল, আমি নিজে গিয়ে তার কলার চেপে ধরলাম। চার বছরের জমে থাকা সমস্ত ক্ষো*ভ, অপমা*নের প্রতিশোধ আজ আমার হাতের মুঠোয়। আমি তাকে দেওয়ালে চেপে ধরে একের পর এক পাঞ্চ করতে লাগলাম।
রিয়াদ পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দৌড়ে গাড়িতে উঠে পালাতে চাইল। কিন্তু সে গাড়ির দরজা খোলার আগেই দূর থেকে পুলিশের সাইরেনের আওয়াজ ভেসে এল। চারপাশ থেকে পুলিশ এসে কর্ডন করে ফেলল পুরো এলাকা।
রিয়াদ গাড়ি থেকে হাত তুলে নেমে এল, তার মুখ তখন ভয়ে ফ্যাকাসে। পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে রিয়াদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন।
আমি হাঁপাতে হাঁপাতে পুলিশের দিকে তাকালাম। ঠিক তখনই পুলিশের গাড়ির পেছন থেকে নেমে এলেন স্বয়ং রাবেয়া চৌধুরী। তার পেছনে রহমান সাহেব।
মাকে এখানে দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মা রিয়াদের দিকে তাকিয়ে তীব্র ঘৃণায় বললেন, “তোমাদের মতো নোংরা লোক আমার চৌধুরী বংশের আলো ধুয়ে মুছে দিতে চেয়েছিল? মিথিলা আর তোমাকে আমি এমন জেল খাটাব, যা এই শহরের মানুষ সারাজীবন মনে রাখবে।”
রিয়াদকে যখন পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, তখন মা ধীরে ধীরে আমাদের সেই ছোট ঘরটার দিকে এগিয়ে এলেন। ঘরের ভেতর থেকে মারিয়া ততক্ষণে বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বের হয়ে এসেছে।
মা মারিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার সেই চিরচেনা অহংকারের খোলসটা আজ সম্পূর্ণ খসে পড়েছে। তিনি মারিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু কিছু বলার ভাষা পাচ্ছিলেন না। তার চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল পড়ছে।
তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন মেঝের ধুলোবালির ওপরেই। দুই নাতনির দিকে তাকিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিলেন, “আমায় মাফ করে দিবি তোরা? তোদের এই বুড়ি দাদীকে তোরা মাফ করবি না?”
ছোট ছেলেটা মারিয়ার দিকে তাকাল, তারপর গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে রাবেয়া চৌধুরীর গলা জড়িয়ে ধরল। মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কয়েক বছরের অহংকার, কোটি টাকার দম্ভ আজ এক নাতনির নরম ছোঁয়ায় গলে জল হয়ে গেল।
মারিয়া আমার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন আনন্দের জল। আমি মারিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, ওর কাঁধে হাত রাখলাম।
ঝড় কেটে গেছে। মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে এক নতুন সূর্য। কিন্তু সায়নের এই ভাঙা ঘরে কি মা আবার ফিরে আসবেন? চৌধুরী বংশের এই নতুন অধ্যায় কোন দিকে মোড় নেবে?
আপনাদের কি মনে হয়?
(চলবে…)
