Tuesday, June 9, 2026







হৃদয়ের টান পর্ব-৭+৮

হৃদয়ের টান
​পর্ব ০৭
​কলমে The Story Haven

​রাবেয়া ভিলার সেই বিশাল লোহার গেটটা আজ আমার কাছে কোনো চেনা চত্বর নয়, বরং একটা হিং*স্র প*শুর হাঁ করা মুখের মতো মনে হচ্ছিল। দারোয়ানটা প্রথমে আমার ধুলোবালি মাখানো জামাকাপড় আর উষ্কখুষ্ক চুল দেখে পথ আটকাতে চেয়েছিল, কিন্তু আমার চোখের ভেতরের জ্বলন্ত আগুন দেখে সে আর সাহস করেনি। গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকে লিভিং রুমের ভারী পর্দাটা সরাতেই আমি থমকে গেলাম।
​আমি ভেবেছিলাম ভেতরে কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি বা মা*রধরের শব্দ পাব। কিন্তু না, চারপাশ অদ্ভুত রকমের শান্ত। ঝাড়বাতির আলোয় পুরো ড্রয়িংরুমটা ঝলমল করছে। আর সেই দামি সোফায় বসে আছে মারিয়া। তার দুই পাশে আমার দুটো সন্তান ভ*য়ে জড়োসড়ো হয়ে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরে আছে। মারিয়ার চোখ দুটো লাল, গালে অশ্রুর দাগ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
​তার ঠিক সামনে রাজকীয় ভঙ্গিতে সোফায় বসে আছেন আমার মা রাবেয়া চৌধুরী। আর পাশে কুৎসিত এক বিজয়ের হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিথিলা ও তার ভাই রিয়াদ।
​”মা!” আমি প্রায় চিৎকার করে মারিয়া আর বাচ্চাদের দিকে এগিয়ে যেতে নিলাম।
​”খবরদার সায়ন! এক কদমও আর সামনে বাড়াবে না!” মায়ের সেই চেনা গম্ভীর, হাড়-হিম করা কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল।
​আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমার চোখ দিয়ে তখন র*ক্তবর্ণ আগুন ঝরছে। “মা, এই নোংরামির মানে কী? তুমি রিয়াদ আর মিথিলাকে দিয়ে আমার স্ত্রী আর সন্তানদের অপহ*রণ করিয়ে এনেছ? তোমার অহংকার এতটা নিচে নেমে গেছে?”
​আমার কথা শুনে মা সোফা থেকে ধীরে ধীরে উঠলেন। তার মুখে কোনো অপ*রাধবোধ নেই, বরং এক ধরণের শীতল চতুরতা খেলা করছে। তিনি মারিয়ার দিকে এক নজর তাকিয়ে আমার দিকে ফিরলেন।
​”অপকর্ম তো তুই করেছিস সায়ন। চৌধুরী বংশের র**ক্তকে তুই একটা নোংরা বস্তির ডাস্টবিনে ফেলে রেখেছিস! আমার যেমনই রাগ থাকুক, এই রাবেয়া চৌধুরী এতটাও নিচে নামেনি যে নিজের বংশের র**ক্ত রাস্তায় রাস্তায় না খেয়ে ম*রবে,” মা চড়া গলায় বললেন।
​মায়ের মুখে ‘বংশের র*ক্ত’ শব্দটা শুনে আমি কিছুটা অবাক হলাম। মিথিলা এবার একটু এগিয়ে এসে বলল, “আন্টি একদম ঠিক বলেছেন সায়ন। তোমার ওপর আমাদের রাগ থাকতে পারে, কিন্তু এই নিষ্পাপ বাচ্চা দুটোর কোনো দোষ নেই। ওরা তোমার র*ক্ত।”
​আমি মারিয়ার দিকে তাকালাম। মারিয়া পাথরের মূর্তির মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। মা এবার মারিয়ার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার হাত থেকে একটা চাবির গোছা আর একটা ব্যাংক চেকবই মারিয়ার সামনের কাঁচের টেবিলে রাখলেন।
​”মারিয়া…” মায়ের গলার স্বর এবার আচমকা নরম শোনাল, যা বি*ষের চেয়েও ভ*য়ঙ্কর। “যতই হোক, তুমি আমার নাতনিদের মা। চার বছর তুমি অনেক কষ্ট করেছ, আমি তার ক্ষতিপূরণ দিতে চাই। ঢাকার বাইরে, চট্টগ্রামে আমার একটা আলিশান ফ্ল্যাট আছে। এই চাবিটা সেই ফ্ল্যাটের। আর এই চেকবইয়ে একটা মোটা অঙ্কের টাকা সাইন করা আছে, যা দিয়ে তোমার বাকি জীবন রাজকীয়ভাবে কেটে যাবে। আমার নাতনিদের খাওয়া-পরা, নামী স্কুলে পড়াশোনা—সব দায়িত্ব আজ থেকে আমার।”
​আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মা মারিয়াকে লোভ দেখাচ্ছেন? মারিয়াকে টাকা আর ফ্ল্যাট দিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চান?
​”মা! তুমি আবার খেলা শুরু করেছ?” আমি চিৎকার করে উঠলাম।
​মা আমার দিকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। তারপর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে তার আসল বিষাক্ত চালটা চাললেন, “তবে একটা শর্ত আছে মারিয়া। আমার দেওয়া এই রাজকীয় জীবন, এই টাকা আর ফ্ল্যাট তুমি তখনই পাবে, যখন তুমি সায়নের জীবন থেকে চিরতরে সরে যাবে। তোমাকে এই শহর ছাড়তে হবে একা, সায়নকে ছাড়া। তুমি চার বছর পর তার কাছে , ফিরেছ কেবল টাকার লোভে। সায়নের চোখের সামনে তার এই সস্তা ভালোবাসার আসল রূপটা আমি দেখতে চাই। ও জানুক, টাকার ওপরে এই পৃথিবীতে কিচ্ছু নেই!”
​রুমের ভেতর এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। মিথিলা আর রিয়াদের মুখে এক পি*শাচের মতো হাসি। তারা খুব ভালো করেই জানে, চার বছরের অনাহার আর কষ্টের পর এই লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া যেকোনো সাধারণ মানুষের জন্য অসম্ভব।

​আমার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। আমি মারিয়ার দিকে তাকালাম। আমার চোখ দুটো তখন এক চরম আকুতি নিয়ে মারিয়াকে দেখছে। মারিয়া কি পারবে এই চার বছরের কষ্টের অবসান ঘটাতে মায়ের এই টাকার পাহাড়ের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিতে? ও যদি রাজি হয়ে যায়, আমি তো ওকে দোষ দিতে পারব না। ও তো সন্তানদের সুখে রাখতেই তা করবে। আমার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছিল।
​মারিয়া ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে টেবিলের ওপর রাখা সেই দামি চাবির গোছা আর চেকবইটার দিকে তাকাল। তার হাত দুটো কাঁপছিল। সে হাত বাড়িয়ে চেকবই আর চাবিটা নিজের হাতে তুলে নিল।
​মায়ের মুখে এক পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। মিথিলা ফিসফিস করে রিয়াদকে বলল, “দেখেছিস? টাকার কাছে সবাই গোলাম!”
​আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। আমার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তবে কি আজ আমার ভালোবাসার পরাজয় ঘটল? মারিয়াও কি আমাকে টাকার জন্য ত্যাগ করল?
​কিন্তু পরের মুহূর্তেই যা ঘটল, তার জন্য এই ড্রয়িংরুমের কেউ প্রস্তুত ছিল না।
​মারিয়া চাবির গোছা আর চেকবইটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে সোজা রাবেয়া চৌধুরীর মুখের সামনে ধরল। তারপর চরম ঘৃণাভরা এক টুকরো হাসি হেসে, চাবি আর চেকবইটা ড্রয়িংরুমের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দে চাবিটা ছিটকে পড়ল রাজকীয় কার্পেটের ওপর।
​”আপনার এই পাপের টাকা আর ক্ষমতার অহংকার আপনার কাছেই রাখুন, মিসেস চৌধুরী !” মারিয়ার গলার আওয়াজ এবার বজ্রের মতো শোনাল। “চার বছর আগে আপনি আপনার টাকা দিয়ে এই সায়নকে কিনতে পেরেছিলেন, কারণ তখন সে কাঁচা মাটির মতো নরম ছিল। কিন্তু আজ যে সায়ন আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, সে আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়েছে। সে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে মাথায় চটের বস্তা তুলতে পারে, কুলিগিরি করতে পারে। আপনার এই কোটি টাকার ফ্ল্যাটের চেয়ে ঘামে ভেজা ছেঁড়া শার্টের তলার বুকটা অনেক বেশি নিরাপদ!”
​মারিয়ার মুখে এই কথা শুনে রাবেয়া চৌধুরীর ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কালো হয়ে গেল। মিথিলা আর রিয়াদের মুখের হাসি যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল।
​মারিয়া আমার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক অপার্থিব গৌরব। সে আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার ধুলোমাখা, খসখসে হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
​”চলুন সায়ন। আমাদের সন্তানদের চৌধুরী বংশের র**ক্ত দিয়ে বড় করতে হবে না। ওরা একজন সৎ বাবার র**ক্ত দিয়ে বড় হবে। এই পাপের প্রাসাদে আমাদের আর এক মুহূর্তও থাকার প্রয়োজন নেই,” মারিয়া দৃঢ় গলায় বলল।
​আমার বুকটা আজ গর্বে দ্বিগুণ হয়ে গেল। আমি মারিয়ার হাতটা আরও শক্ত করে ধরলাম। দুই সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে আমরা যখন রাবেয়া ভিলার সদর দরজার দিকে পা বাড়ালাম, তখন পেছন থেকে রাবেয়া চৌধুরী রাগে অন্ধ হয়ে চিৎকার করে উঠলেন—
​”সায়ন! মারিয়া! মনে রাখিস, তোরা আমার অহংকারে আ*ঘাত করলি। এই শহর তোদের জন্য ন*রক বানিয়ে ছাড়ব আমি! তোরা বাঁচতে পারবি না!”
​কিন্তু আমরা আর পেছনে ফিরে তাকালাম না। আমরা ড্রয়িংরুম থেকে বের হয়ে এলাম। বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিন্তু আমাদের সামনে এক নতুন ভোরের আলো অপেক্ষা করছে।
​তবে রাবেয়া চৌধুরী আর মিথিলা কি এই অপ*মান এত সহজে মেনে নেবে? সায়নের নতুন লড়াইয়ে তারা এবার কী ভয়*ঙ্কর চাল চালবে?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান
​পর্ব ০৮
​কলমে The Story Haven

​রাবেয়া ভিলার সদর দরজা পেরিয়ে যখন আমরা বাইরের পিচঢালা রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম, তখন মাথার ওপর কৃষ্ণপক্ষের ম্লান চাঁদ। চারপাশ নিস্তব্ধ। দুই সন্তানকে দুই বাহুতে জড়িয়ে আমি হাঁটছিলাম, আর আমার পাশে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে হাঁটছিল মারিয়া। আজ আমাদের পকেটে টাকা নেই, থাকার মতো বড় বাড়ি নেই; কিন্তু বুকভরা যে শান্তি আছে, তা এই শহরের কোনো কোটিপতির সিন্দুকেও নেই।
​”মারিয়া, ভয় করছে না?” আমি আলতো করে ওর হাতটা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
​মারিয়া আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। সেই হাসিতে চার বছরের ক্লান্তি উবে গিয়ে এক অদ্ভুত মায়া খেলা করছিল। “যে একা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তীরে এসেছে সায়ন, সে ঝড়ের মেঘ দেখে ভ*য় পায় না। আর এখন তো আমার হাতটা ধরার জন্য আপনি আছেন।”
​আমি আর কিছু বলতে পারলাম না, শুধু ওর হাতটা আরও শক্ত করে ধরলাম। মাঝরাতের আগেই আমরা আমার সেই নতুন ভাড়া নেওয়া সেমি-পাকা ঘরটায় এসে পৌঁছালাম। ঘরটা ছোট, কিন্তু কাঠের শক্ত দরজাটা বন্ধ করতেই এক পরম নিরাপত্তার অনুভূতি আমাদের গ্রাস করল। বাচ্চাদের বিছানায় শুইয়ে দিতেই ওরা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি আর মারিয়া সারারাত জেগে রইলাম—নতুন এক ভোরের স্বপ্ন বুনে।
​এদিকে রাবেয়া ভিলার ভেতরের পরিবেশ তখন থমথমে, যেন যেকোনো মুহূর্তে একটা আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়বে। ড্রয়িংরুমের মেঝেতে এখনো পড়ে আছে মারিয়ার ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া চাবির গোছা আর চেকবই।
​রাবেয়া চৌধুরী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার ফর্সা মুখটা রাগে আর অপমা*নে থমথম করছে। ঠিক তখনই মিথিলা ড্রয়িংরুমে হিল জুতো খটখট করতে করতে ঢুকল। তার পেছনে তার ভাই রিয়াদ।
​মিথিলার চোখ-মুখ বি*ষাক্ত সা*পের মতো কুটিল হয়ে উঠেছে। সে সোজা রাবেয়া চৌধুরীর পিঠের পেছনে এসে দাঁড়াল।
​”আন্টি! আপনি ওই বস্তির মেয়েটার এত বড় অহংকার সহ্য করলেন?” মিথিলা দাঁতে দাঁত চেপে বলল। “যেখানে সায়ন আপনার পা ধরে ক্ষমা চাইবে, সেখানে ওই মেয়েটা আপনার মুখে টাকা ছুঁড়ে মে*রে চলে গেল! এর একটা বিহিত করতেই হবে।”
​রাবেয়া চৌধুরী কোনো জবাব দিলেন না, আগের মতোই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
​মিথিলা এবার আরও এক কদম এগিয়ে এসে গলার স্বর নিচু করে, চরম হিং*স্রতা মিশিয়ে বলল, “আন্টি, এই ঝামেলার গোড়াটাই কে*টে ফেলা দরকার। সায়নের ওই জেদ আর অহংকার শুধু ওই মারিয়া আর তার দুটো বাচ্চার জন্য। আমার এক পরিচিত লোক আছে… রাস্তায় কোনো অ্যা**ক্সিডেন্ট বা রাতে ওই বস্তির ঘরে আ*গুন লা*গিয়ে যদি মারিয়া আর বাচ্চা দুটোকে একবারে মে** রে ফেলা যায়, তবে সায়ন পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। তখন ও নিজে এসে আপনার পায়ে লুটিয়ে পড়বে। মারিয়া আর বাচ্চা দুটোকে পৃথিবী থেকে সরি*য়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান!”
​”শাট আপ, মিথিলা!”
​হঠাৎ রাবেয়া চৌধুরী এক সিংহীর মতো গ*র্জন করে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার সেই তীক্ষ্ণ চিৎকার আর চোখের চাউনি দেখে মিথিলা দু-কদম পিছিয়ে গেল। রিয়াদও ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়ল।
​”তুমি নিজের মুখে কী বললে, মিথিলা? ওই দুটো বাচ্চাকে মে**রে ফেলতে হবে?” রাবেয়া চৌধুরীর বুকটা তখন হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তার চোখে রাগের পাশাপাশি এক অদ্ভুত আর্তি ফুটে উঠল।
​”কিন্তু আন্টি, ওরা তো—” মিথিলা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু মা তাকে থামিয়ে দিলেন।
​”ওরা চৌধুরী বংশের র** ক্ত, মিথিলা! ওরা আমার সায়নের সন্তান!” রাবেয়া চৌধুরীর গলার স্বর এবার কেপে উঠল। এতক্ষণ ধরে যে পাথরের মতো শক্ত আবরণ তিনি ধরে রেখেছিলেন, তা যেন এক নিমিষেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
​তিনি সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। তার মনের কোণে ভেসে উঠল একটু আগের সেই দৃশ্যটা—দুটো ফুলের মতো নিষ্পাপ বাচ্চা, বড় বড় চোখ করে ভ*য়ার্ত মুখে মারিয়ার আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের অবিকল সায়নের ছোটবেলার মতো টানা টানা চোখ, মায়াবী মুখ। হাজার হলেও তারা তার নিজের আপন নাতিন, এই চৌধুরী বংশের একমাত্র আলো।
​রাবেয়া চৌধুরী নিজের অজান্তেই তার দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন। তার চোখের কোণ দিয়ে দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। “এতক্ষণ ড্রয়িংরুমে যখন বাচ্চা দুটো আমার সামনে বসে ছিল, আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মায়া মায়া লাগছিল। ওদের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজের রাগ ধরে রাখতে পারছিলাম না। আমার নিজের বংশের আলো ওরা। ওদের গায়ে আঁচড় কাটার কথা তো দূর, কেউ যদি ওদের দিকে বাঁকা চোখে তাকায়, আমি তার চোখ উপড়ে ফেলব!”
​মিথিলা আর রিয়াদ একে অপরের দিকে তাকাল। তারা বুঝতে পারল, রাবেয়া চৌধুরীর ভেতরের ‘মা’ এবং ‘দাদী’ চরিত্রটা জাগ্রত হয়ে গেছে। টাকার অহংকার আজ এক মাতৃত্বের টানের কাছে হার মানতে শুরু করেছে।
​মা চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তার চোখ এখন মিথিলার দিকে স্থির। “সায়নকে আমি শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম কারণ ও আমার অবাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমার নাতনিদের কোনো ক্ষতি আমি সহ্য করব না। মিথিলা, তোমরা এখন এখান থেকে যাও। এরপর যদি আমার নাতনিদের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করো, তবে মনে রেখো—রাবেয়া চৌধুরীর চেয়ে বড় শত্রু তোমার লাইফে আর কেউ হবে না।”
​মিথিলা চরম অসন্তোষ আর ক্ষোভ নিয়ে রিয়াদকে নিয়ে রাবেয়া ভিলা থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় মনে মনে ভাবল, ‘বুড়িটা তো ইমোশনাল হয়ে গেল! কিন্তু আমি এত সহজে সায়নকে ছাড়ছি না। বুড়ি না করুক, আমি নিজেই মারিয়াকে শেষ করব!’
​পরদিন সকাল। কারওয়ান বাজারে আমি যখন করিম ভাইয়ের আড়তে পৌঁছে কাজে হাত দেব, ঠিক তখনই করিম ভাই আমার দিকে একটা খাম বাড়িয়ে দিলেন।
​”সায়ন ভাই, সকালে এক ভদ্রলোক এই খামটা আপনার নামে দিয়া গেছে। কইছে খুব জরুরি,” করিম ভাই বললেন।
​আমি অবাক হয়ে খামটা খুললাম। ভেতরে কোনো চিঠি নেই, বরং একটা নতুন ব্যাংকের চেকবই আর একটা ছোট চিরকুট। চিরকুটে কেবল দুটি লাইন লেখা—
​”চৌধুরী বংশের র** ক্ত কখনো কারো দয়ায় বাঁচে না, নিজের যোগ্যতায় বাঁচে। তোর মায়ের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু তোর বাবার রেখে যাওয়া এই গোপন ট্রাস্ট ফান্ডের টাকা ছোঁয়ার ক্ষমতা কারো নেই। এটা তোর বাবার পক্ষ থেকে তোর সন্তানদের জন্য উপহার। মাথা উঁচু করে দাঁড়া, সায়ন।”
​চিরকুটের নিচে কোনো নাম ছিল না, কিন্তু আমি হাতের লেখা দেখেই চিনতে পারলাম—এটা আমার মায়ের বিশ্বস্ত পিএ-র (Personal Assistant) হাতের লেখা। তার মানে… মা নিজে এই টাকা পাঠিয়েছেন? মুখে অহংকারের বাণী বললেও, মা কি তবে ভেতরে ভেতরে তার নাতনিদের মায়ায় গলে গেছেন?
​আমার চোখে জল চলে এল। কিন্তু একই সাথে আমার বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কার ঘণ্টা বেজে উঠল। মা যদি শান্ত হয়ে যান, তবে মিথিলা আর রিয়াদ কি চুপ করে থাকবে? ওরা কি নতুন কোনো বড় ধরনের বিপদ নিয়ে আসছে মারিয়া আর আমার সন্তানদের দিকে?

​(চলবে…)

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ