Tuesday, June 9, 2026







হৃদয়ের টান পর্ব-৩+৪

হৃদয়ের টান
পর্ব ০৩
কলমে The Story Haven

​মিথিলার দেওয়া সেই চেনা হু*মকি আর দূর গলির মোড়ে মিলিয়ে যাওয়া মারিয়ার অবয়ব—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো চারপাশের বাতাস আচমকা ভারী হয়ে গেছে। চার বছর আগে ঠিক এই একই মোহ আমাকে অন্ধ করেছিল। আজ চার বছর পর, নিয়তি আমাকে আবার সেই একই চৌরাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
​”কী হলো সায়ন? এত ভাবার কী আছে? ওই জরাজীর্ণ অতীতকে আঁকড়ে ধরে ফুটপাতে নামবে, নাকি আমাদের রাজকীয় ভবিষ্যৎ বেছে নেবে?” মিথিলা আমার উত্তরের অপেক্ষায় এক হাত কোমরে রেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল।
​আমি মিথিলার দিকে তাকালাম। এই সেই মেয়ে, যাকে আমার মা আমার জন্য নির্বাচন করেছেন। যার আভিজাত্য আছে, রূপ আছে, কিন্তু একটা ক্ষুধার্ত শিশুর জন্য বুকে এক ফোঁটা দয়া নেই। অথচ মারিয়া? এক কাপড়ে আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েও আজ চার বছর ধরে আমারই সন্তানদের বুকে আগলে এই তীব্র রোদে লড়াই করে যাচ্ছে।
​আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। ভেতরের সমস্ত দ্বিধা, ভ’য় আর সম্পত্তির লো’ভ যেন এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
​”মিথিলা…” আমার গলা এবার আর কাঁপল না, বরং এক অদ্ভুত দৃঢ়তা খেলে গেল কণ্ঠে, “তোমার ওই কোটি টাকার রাজপ্রাসাদ আর তোমার আভিজাত্য তোমাকে নিয়েই থাকুক। চার বছর আগে মায়ের সম্পত্তির লোভে আমি একটা জ্যান্ত মানুষকে খু** ন করেছিলাম, আজ নিজের র** ক্তকে চিনে নেওয়ার পর যদি আবার সেই ভুল করি, তবে খোদা আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবেন না।”
​”তার মানে? তুমি কী বলতে চাও সায়ন?” মিথিলার চোখ দুটো রাগে বড় বড় হয়ে গেল।
​”আমি বলতে চাই—আমাদের এই বিয়ে এখানেই শেষ। আমার মায়ের সম্পত্তি ওনার কাছেই থাক, আমি আমার সন্তানদের ফেরত চাই।”
​কথাটা বলেই আমি মিথিলার ধরে রাখা হাতের বাঁধন এক ঝটকায় মুক্ত করে দিলাম। মিথিলা পেছনে চিৎকার করে বলতে লাগল, “সায়ন! তুমি একটা আস্ত পা*গল! তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে সায়ন! আমার মা-বাবা আর তোমার মা তোমাকে রাস্তায় নামিয়ে ছাড়বে!”
​কিন্তু সেই চিৎকার তখন আমার কাছে কেবলই অর্থহীন কিছু শব্দ মাত্র। আমি তখন দৌড়াচ্ছি। যে গলিটা দিয়ে মারিয়া তার দুই সন্তানকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে, আমি সেই গলির দিকে অন্ধের মতো ছুটতে লাগলাম।
​গলিটা বেশ সরু আর নোংরা। চারপাশটা কেমন যেন ঘিঞ্জি। একটু এগোতেই বুঝলাম এটা শহরের একটা অবহেলিত বস্তি এলাকা। ভাঙাচোরা টিনের চাল, নর্দমার গন্ধ আর চারপাশের অভাবের ছাপ স্পষ্ট। আমি দুচোখ মেলে মারিয়াকে খুঁজতে লাগলাম। তীব্র অপ*রাধবোধে আমার ফুসফুস ফেটে যাচ্ছিল। যে মারিয়া ধানমন্ডির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটে রাজকন্যার মতো থাকত, সে আজ এই ন*রককুণ্ডে দিন কাটাচ্ছে?
​কিছুদূর গিয়ে একটা কুয়োর পাড়ে কয়েকজন মধ্যবয়সী মহিলাকে কাপড় কাচতে দেখে আমি হাপালে হাপাতে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, একটু আগে কোলে দুটো যমজ বাচ্চা নিয়ে একটা মেয়ে এই দিকে এসেছে… আপনারা কি দেখেছেন ও কোথায় গেছে?”
​মহিলারা প্রথমে আমার স্যুট-বুট আর দামি ঘড়ি দেখে একটু অবাক হলেন। তারপর একজন হাত উঁচিয়ে ভেতরের একটা ভাঙা টিনের ঘরের দিকে ইশারা করে বললেন, “ওই যে উত্তরের শেষ মাথায় তালি দেওয়া টিনের ঘরটা দেখতাছেন, ওইখানে থাহে মারিয়া। আজ কয়েক বছর ধইরা দুইডা এতিম বাচ্চা লইয়া অনেক কষ্টে দিন কাটতাছে মেয়েটা।”
​’এতিম বাচ্চা’ শব্দটা আমার বুকে তীরের মতো বিঁধল। ওরা এতিম নয়, ওদের বাবা বেঁচে আছে, অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপ*রাধী হয়ে বেঁচে আছে।

​আমি ধীর পায়ে সেই ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজার নামমাত্র একটা পুরোনো চটের পর্দা ঝুলছে। ভেতর থেকে একটা বাচ্চার মৃদু কান্নার আওয়াজ আর মারিয়ার শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, “কেঁদো না বাবা, আর একটুখানি সহ্য করো। মা একটু পরেই তোমাদের জন্য ভাত ফুটিয়ে দিচ্ছি। লক্ষ্মী বাবা আমার, কেঁদো না…”
​আমার চোখের জল আর বাধা মানল না। আমি কাঁপতে কাঁপতে চটের পর্দাটা সরিয়ে ঘরের ভেতর পা রাখলাম।
​ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে আমার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে গেল। একটা জরাজীর্ণ চৌকি, কোণায় কয়েকটা অ্যালুমিনিয়ামের থালাবাসন, আর মেঝেতে ছড়ানো কিছু কুড়ানো প্লাস্টিকের বোতল আর ভাঙারি। মারিয়া একটা মাটির চুলার সামনে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আর তার চোখের জল গিয়ে পড়ছে চুলার খড়কুটোয়। দুই পাশে দুই যমজ শিশু ক্ষুধার্ত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
​”মারিয়া…” আমি খুব মৃদুস্বরে ডাকলাম।
​আমার গলার আওয়াজ পেয়ে মারিয়া চমকে পেছনে তাকাল। আমাকে এই ভাঙা ঘরে দেখে তার চোখের জল মুহূর্তে শুকিয়ে গেল। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের নিজের পেছনে আড়াল করল, যেন আমি কোনো হিং*স্র পশুপাখি, যা তার বাচ্চাদের ক্ষতি করতে এসেছে।
​”আপনি এখানে কেন এসেছেন? কে আপনাকে আমার ঘরের ঠিকানা দিয়েছে? দয়া করে চলে যান!” মারিয়ার গলার স্বর এবার আর শান্ত ছিল না, তাতে ছিল এক তীব্র আর্তনাদ।

​”মারিয়া, আমি সব ছেড়ে চলে এসেছি। আমি মিথিলাকে ছেড়ে দিয়েছি, মায়ের সম্পত্তি পায়ে ঠেলে দিয়েছি। আমি শুধু তোমাদের চাই। আমাকে একটা সুযোগ দাও মারিয়া, আমি আমার সন্তানদের এই ন*রক থেকে বের করে নিয়ে যাব,” আমি মেঝেতেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। এক কোটিপতি ব্যবসায়ী সায়ন রহমান আজ ফুটপাতে বসে তার প্রাক্তন স্ত্রীর কাছে ভিক্ষা চাচ্ছে।
​মারিয়া একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, “বের করে নিয়ে যাবেন? কোথায় নিয়ে যাবেন? আপনার মায়ের সেই রাজপ্রাসাদে? যেখানে প্রতিদিন আমাকে অপবাদ সইতে হতো? যেখানে সামান্য একটা ভুলের জন্য আমাকে সারারাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে হতো? সায়ন রহমান, এই তালি দেওয়া টিনের ঘরটা দেখতে নোংরা হতে পারে, কিন্তু এখানে কোনো মিথ্যে অভিনয় নেই, কোনো সম্পত্তির লোভ নেই।”
​”আমি ভুল করেছি মারিয়া! আমি স্বীকার করছি আমি পাপিষ্ঠ! কিন্তু ওরাই তো আমার সব…” আমি বাচ্চাদের দিকে হাত বাড়াতেই মারিয়া তীব্র গলায় চিৎকার করে উঠল, “ওরা আপনার কেউ না! চার বছর আগে যখন আপনার মা আমাকে বন্ধ্যা বলে অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছিল, তখন আপনি চুপ ছিলেন। আমার বাবা সেই অপ*মান সইতে না পেরে হার্ট অ্যা*টাক করে মা**রা গেলেন, তখনও আপনি আসেননি। আমি যখন স্টেশনে স্টেশনে এক ফোঁটা পানির জন্য কেঁদেছি, তখন আপনার মা আর আপনি এসি রুমে ঘুমাচ্ছিলেন। আজ কোন অধিকারে আপনি আমার বাচ্চাদের বাবা সাজতে এসেছেন?”

​মারিয়ার মুখ থেকে তার বাবার মৃ**ত্যুর খবরটা শুনে আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে গেল। মারিয়ার সৎ, সাধারণ শিক্ষক বাবা… আমার মায়ের চক্রান্তে আর আমার নীরবতায় আজ দুনিয়ায় নেই! অপরা*ধের বোঝাটা আমার ঘাড়ে এতটাই ভারী হয়ে উঠল যে আমার মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বেরোলো না।
​ঠিক তখনই বস্তির বাইরে একটা দামি গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা গেল। হর্নটা অনবরত বেজেই চলেছে।
​কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের বাইরে ভারী জুতো আর চড়া গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন আমার মা, রাবেয়া চৌধুরী। ওনার পেছনে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দাঁড়িয়ে আছে মিথিলা।
​আমার মা ঘরের চারপাশের নোংরা পরিবেশ দেখে নাক কুঁচকে আঁচল চাপা দিলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বললেন, “সায়ন! এই নোংরা নর্দমায় বসে তুমি কী করছ? এই ভিখারির বাচ্চারাই নাকি তোমার র**ক্ত? মিথিলার কাছে সব শুনে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। এখনই চলো আমার সাথে!”
​মারিয়া আমার মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে আজ আর চার বছর আগের সেই ভ*য় বা দয়া ভিক্ষার চাউনি ছিল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনার ছেলেকে নিয়ে যান বড়লকানি সাহেব। আমার এই পবিত্র ঘরে আপনাদের মতো অহংকারী মানুষের নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।”
​মা মারিয়ার দিকে তড়িৎ চোখে তাকিয়ে বললেন, “মুখ সামলে কথা বলো মারিয়া! তোমার মতো সস্তা মেয়ের চাল আমি ভালো করেই বুঝি। বাচ্চার টোপ ফেলে আমার ছেলের কোটি টাকার সম্পত্তি হাতানোর ফন্দি করেছ, তাই না? এই নাও…”
​মা ওনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে এক তাড়া পাঁচশত টাকার নোট বের করে মারিয়ার পায়ের কাছে ছুঁড়ে মারলেন, “এই নাও পাঁচ লাখ টাকা। আমার ছেলেকে আর আমার পরিবারকে মুক্তি দাও। আর কোনোদিন সায়নের সামনে আসবে না।”
​টাকাগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। ঘরের ভেতরের বাতাস যেন মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল। আমি মায়ের এই নিষ্ঠুরতা দেখে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। কিন্তু মারিয়া যা করল, তা আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারিনি।
​মারিয়া নিচু হয়ে টাকাগুলো কুড়ালো না। সে শান্ত পায়ে চুলার পাশ থেকে একটা জ্বলন্ত লাকড়ি তুলে নিল। তারপর তীব্র ঘৃণায় সেই জ্বলন্ত লাকড়িটা মায়ের ছুঁড়ে দেওয়া টাকার ওপর চেপে ধরল। চোখের পলকে কোটিপতির অহংকারের প্রতীক সেই নোটগুলো দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল।
​মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মিথিলা ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
​মারিয়া জ্বলন্ত টাকার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু বজ্রকণ্ঠে বলল, “টাকা দিয়ে সব কেনা যায় না রাবেয়া চৌধুরী। চার বছর আগে আপনার এই টাকা আমার সংসার পু*ড়িয়েছিল, আজ আপনার টাকাই আপনার চোখের সামনে পু*ড়লো। নিয়ে যান আপনার ছেলেকে। কিন্তু মনে রাখবেন, সায়ন রহমান যদি আজ এই ঘর থেকে বের হয়ে যায়, তবে ওনার জন্য এই পৃথিবীর সমস্ত দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।”
​মা রাগে কাঁপতে কাঁপতে আমার হাত ধরে টানলেন, “সায়ন, চলো! এই পাগ*লি মেয়ের সাথে থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। যদি আজ না চলো, তবে আজই আমার ত্যাজ্যপুত্র হবে তুমি!”
​আমি একবার মায়ের দিকে তাকালাম, যেখানে শুধু অহংকার আর টাকা। আর একবার তাকালাম মারিয়া আর আমার দুই নিষ্পাপ সন্তানের দিকে, যাদের চোখে আমার জন্য শুধু ঘৃণা আর এক বুক নীরব প্রশ্ন।
​আমার জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মুহূর্তটি চলে এসেছে। মায়ের কোটি টাকার সম্পত্তি নাকি এই জলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা আমার নিজের পরিবার?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান
পর্ব ০৪
কলমে The Story Haven

​মায়ের টানানো হাতের সেই শক্ত বাঁধন আর মারিয়ার চোখের জ্বলন্ত অগ্নি’কুণ্ড—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো, আজ যদি আমি এক পা-ও পিছিয়ে যাই, তবে আমার ভেতরের মানুষটা চিরতরে ম*রে যাবে। টাকা আর সম্পত্তির লোভে চার বছর আগে একবার নিজেকে বিক্রি করেছিলাম, যার মাসুল আজ একটা ভাঙা টিনের ঘরে আমার দুটো নিষ্পাপ সন্তান আর তাদের মায়ের চোখের জল দিয়ে শোধ হচ্ছে। না, আর না!
​আমি ধীরে ধীরে মায়ের হাত থেকে নিজের কবজিটা ছাড়িয়ে নিলাম। আমার এই আকস্মিক আচরণে মা যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
​”সায়ন! কী করছ তুমি? আমার হাত সরিয়ে দিলে?” মায়ের গলা কাঁপছিল, তবে তা স্নেহে নয়, চরম অহংকারে আঘা*ত লাগার ক্ষোভে।
​আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু অসম্ভব দৃঢ় গলায় বললাম, “মা, তোমার এই কোটি টাকার সম্পত্তি, এই বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি আজ থেকে সব তোমার। চার বছর আগে তোমার ত্যাজ্যপুত্র হওয়ার ভয়ে আমি নিজের বিবেক বন্ধক রেখেছিলাম। কিন্তু আজ আমি আমার র*ক্তকে চিনে ফেলেছি মা। এই তালি দেওয়া টিনের ঘরে যে দুটো বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে, ওরা কোনো ভিখারির বাচ্চা নয়, ওরা সায়ন রহমানের সন্তান। আজ আমি তোমার ওই পাপের টাকা আর অহংকারকে ত্যাজ্য করলাম।”
​”সায়ন! তুমি একটা অকৃতজ্ঞ ছেলে! সামান্য একটা পথের মেয়ের জন্য তুমি তোমার জন্মদাত্রী মাকে অপমা*ন করছ? মনে রেখো, এই রাবেয়া চৌধুরীর অবাধ্য হয়ে এই শহরে কেউ মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেনি। তুমিও পারবে না! রাস্তায় রাস্তায় না খেয়ে ম*রবে তুমি!” মা রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন।
​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিথিলা এতক্ষণ টাকার আগুন আর আমার রূপ দেখে স্তম্ভিত হয়ে ছিল। সে এবার মায়ের হাত ধরে বলল, “আন্টি, ওনাকে বলতে দিন। ওনার মতো একটা পাগ*ল মানুষের সাথে সংসার করার কোনো ইচ্ছে আমারও নেই। চলেন আন্টি, লেট হিম রট ইন দিস হেল!”
​মা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। মারিয়ার পুড়তে থাকা টাকার ছাইয়ের দিকে এক নজর তীব্র ঘৃণায় তাকিয়ে, মিথিলাকে নিয়ে হনহন করে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। বাইরে ওনার দামি গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার শব্দ আর চাকার কর্কশ আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
​ঘরটা আবার স্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু মাটির চুলার ধোঁয়া আর পো*ড়া নোটের গন্ধ বাতাসে ভাসছিল।
​আমি মারিয়ার দিকে তাকালাম। মারিয়া তখনও সেই জ্বলন্ত লাকড়িটা হাতে নিয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার ফর্সা কপাল বেয়ে ঘাম আর চোখের জল মিশে এক হয়ে যাচ্ছে। আমি এক কদম এগিয়ে ওনার হাত থেকে লাকড়িটা আলতো করে কেড়ে নিয়ে মেঝেতে নামিয়ে রাখলাম।
​”মারিয়া…” আমার কণ্ঠস্বর অপ*রাধবোধে বুজে আসছিল।
​মারিয়া আমার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই রাগটা যেন নিভে গিয়ে এখন এক মহাসমুদ্রের মতো ক্লান্তি আর শূন্যতায় রূপ নিয়েছে। সে ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল। দুই যমজ বাচ্চা মায়ের এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে ওনার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল, “মা… ও মা, কাঁদো কেন? খিদে পাইছে মা…”
​বাচ্চা দুটোর ‘খিদে পাইছে’ আকুতি শুনে আমার কলিজাটা যেন কেউ টেনে ছিঁড়ে ফেলল। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। হাঁটু গেড়ে ওদের সামনে বসে পড়লাম। পকেট থেকে আমার দামি ওয়ালেট, ক্রেডিট কার্ড—সব বের করে ছুড়ে ফেলে দিলাম। এই প্লাস্টিকের টুকরোগুলো তো এই মুহূর্তে আমার সন্তানদের এক মুঠো অন্ন এনে দিতে পারবে না!
​”মারিয়া, আমি জানি আমি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নই। তোমার বাবার মৃ** ত্যুর জন্য, তোমাদের এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী। আমি তোমাকে জোর করব না আমাকে মেনে নেওয়ার জন্য। কিন্তু প্লিজ, এই বাচ্চাদের ওপর অন্যায় করো না। আমাকে ওদের জন্য একটু খাটতে দাও। আমি আজই কাজ খুঁজব। সায়ন রহমান কর্পোরেট অফিস চালাতে পারলে, সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য কুলি-মজুরের কাজও করতে পারবে।” আমার চোখ দিয়ে তখন অবিরল ধারায় জল নামছিল।
​মারিয়া বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরে মাথা নিচু করে রইল। অনেকক্ষণ পর সে তার ভাঙা গলায় বলল, “চারটে বছর, সায়ন… চারটে বছর আমি কীভাবে কাটিয়েছি, আপনি তার এক কনাও কল্পনা করতে পারবেন না। বাবা যখন মা**রা গেলেন, তখন আমার গর্ভে এই দুটো প্রাণ। বাড়িওয়ালা আমাদের বের করে দিয়েছিল। একটা সস্তা কাপড়ের কারখানায় কাজ নিয়েছিলাম, কিন্তু যমজ বাচ্চা পেটে নিয়ে যখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না, মালিক তাড়িয়ে দিল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে যখন যন্ত্রণায় চিৎকার করেছি, তখন একটা চেনা মুখকে খুব ডেকেছিলাম। কেউ আসেনি।”
​মারিয়ার প্রতিটি শব্দ আমার বুকে এক একটা তীরের মতো বিঁধছিল।
​সে চোখের জল মুছে আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “আজ আপনি সব ছেড়ে এসেছেন কার জন্য? অনুশোচনার জন্য, নাকি দয়া দেখানোর জন্য? আমার দয়ার প্রয়োজন নেই।”
​”দয়া নয় মারিয়া, অধিকার… বাবা হিসেবে প্রায়শ্চিত্ত করার অধিকার,” আমি কাঁপানো হাত বাড়িয়ে এবার ছোট ছেলেটার গালটা একটু ছুঁয়ে দিলাম। ছেলেটা ভয় পেয়ে মারিয়ার আঁচলে মুখ লুকাল। আমার নিজের সন্তান আমাকে দেখে ভ*য় পাচ্ছে—এর চেয়ে বড় শাস্তি একজন বাবার জন্য আর কী হতে পারে!
​আমি উঠে দাঁড়ালাম। চোখের জল মুছে বললাম, “আমি আজই এই বস্তির পাশেই একটা ছোট ঘর ভাড়া নেব। তোমরা এই নর*কে আর থাকবে না। আমার মায়ের দেওয়া কোনো টাকা আমি ছোঁব না, আমার নিজের জমানো যেটুকু পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট আছে, তা দিয়ে তোমাদের একটা ভদ্র জায়গায় নিয়ে যাব। তারপর নতুন করে শূন্য থেকে লড়াই শুরু করব। তুমি আমাকে ক্ষমা না করলেও, আমি তোমাদের ছায়া হয়ে পাশে থাকব।”
​কথাটা বলে আমি ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা ক্ষীণ, দুর্বল কণ্ঠ ভেসে এল, “বাবা…”
​আমি চমকে পেছনে তাকালাম। মারিয়ার কোল থেকে অন্য ছোট শিশুটি আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। সে হয়তো মারিয়া আর আমার কথোপকথন থেকে ‘বাবা’ শব্দটা চিনে নিয়েছে।
​আমার পুরো পৃথিবী যেন এক মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল। চার বছরের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, অহংকার আর লোভ ওই একটা ছোট্ট শব্দের কাছে নতজানু হয়ে গেল। আমি আবার দরজার কাছে ফিরে এলাম, বুকভরা এক তীব্র আকুতি নিয়ে।
​কিন্তু মারিয়া কি সায়নকে এত সহজে ক্ষমা করতে পারবে? রাবেয়া চৌধুরী আর মিথিলা কি সায়নকে এভাবে শান্তিতে বাঁচতে দেবে, নাকি শুরু হবে এক নতুন চক্রান্ত?

​(চলবে…)

পূর্ববর্তী নিবন্ধ
পরবর্তী নিবন্ধ
গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ