১৪ ফেব্রুয়ারি,২০১৭

0
50

সকাল সাতটায় ঘুম থেকে উঠে আসিফের দেয়া লাল জামদানিটায় নিজেকে সাজালাম, খোপায় গুঁজেছি রজনীগন্ধা। আয়নায় অসম্ভব রকমের সুন্দরী লাগছিলো নিজেকে, ফিরে ফিরে আমাকে দেখছি, আলতো করে ঘোমটাটা টানতেই লজ্জায় লাল হয়ে যাচ্ছিলাম, আমাকে দেখতে নতুন বউয়ের মতো লাগছে।

সকাল সাড়ে নয়টা। গুটি গুটি পায়ে মায়ের সামনে একগুচ্ছ গোলাপ হাতে দাঁড়ালাম, বললাম, “তোমাকে ভালোবাসি মা।” বিষ্ময়ভরা চোখে মা আমার দিকে তাকিয়ে কেঁদে দিলেন। আমি হাসতে হাসতে বুকে জড়িয়ে বললাম, “ধুর বোকা, ভালোবাসার কথা শুনে কাঁদতে হয়?”

ঘড়িতে সময় সাড়ে দশটা। মোবাইলে রিং বেজে উঠলো। গলির মোড়ে আসিফ আমার জন্য অপেক্ষা করছে। মায়ের খাবারটা টেবিলে দিয়ে আমি বের হলাম। পাড়ার সবাই আমাকে ফিরে ফিরে দেখছে। আমার ভেতরে কেমন জড়তা কাজ করছে, তাহলে সবাই কি বুঝে যাচ্ছে আমি কি করতে যাচ্ছি? সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আমি আসিফের কাছে পৌঁছে গেলাম। ও আমাকে দেখে অবাক হয়নি বরং আমার সাজে ভুল ধরে বললো, “হাতে রেশমি চুড়ি লাগবে, কোথায় পাওয়া যায় বলোতো?”

বেলা পৌনে একটা। আসিফ টিএসসিতে দাঁড়িয়ে রেশমি চুড়ি বাছাই করছে। আমি খুব মনোযোগ দিয়ে ওকে দেখছি। অসম্ভব রকমের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একটা ছেলে, কথায় কোন জড়তা নেই, আবেগে ভেসে যাওয়া নেই এমনকি অবান্তর কোন স্বপ্নও নেই। বাস্তবতাকে ঘিরেই ওর জীবন, চিন্তা। মুখের উপর খটাখট সত্য বলার অভ্যাসটা ওর চমৎকার। অতীত, বর্তমান কিংবা ভবিষ্যৎ না ভেবেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম ছেলেটাকে।

আসিফ চুড়ি এনে দিলো, পড়লাম। পা থেকে মাথা অবধি এক নজর তাকিয়ে বললো, “সুন্দর লাগছে তোমাকে। ফুলের ঘ্রাণটা মাতাল করা। আমার হাতটা ধরো, কিছুসময় তোমার উষ্ণতা নেই।” আমি হাসতে হাসতে হাতে হাত রাখলাম। পুরো ক্যাম্পাস দু’জন একসাথে হাটছি, আসিফ অফ হোয়াইট রঙের পাঞ্জাবি পড়েছে। আমাদেরকে অনেকেই দেখছে, দেখে নিশ্চয়ই ভাবছে, “আমরা সুখি কাপল।” আমার বেশ আনন্দ হচ্ছে।

ঘুড়তে ঘুড়তে সন্ধ্যা ছয়টা। আমাদের দীর্ঘ সাত বছরের প্রেমের সম্পর্কের নামটা আর একটু পরেই বদলে যাবে। আসিফ আর আমি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। কেনো জানি আমি ওর দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারছি না, অস্বস্তি হচ্ছে, সাথে লজ্জাও, তবুও ওর চোখে চোখ রাখলাম, সাথে সাথে ভড়কে গেলাম! এই চোখজোড়া আমার বহু বছরের চেনা, এই চোখে কখনোই কোন কোমলতা দেখিনি আমি, এতো বছরের চেনা চোখ আজ নিমেষে কেমন অচেনা লাগছে। ওর চোখে আমি কোমলতা দেখতে পাচ্ছি। বললাম,
– কাজী আসবে কখন?
– সাড়ে আটটায়।
– তোমার মা?
– তৈরি হচ্ছেন।
– বোন?
– চলে এসেছে।
– বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে কিছু ভেবেছো?
– না, সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিবে। আপাতত বিয়েটা হোক।
– হ্যাঁ, সেই ভালো। তোমাকে পাঞ্জাবিটায় মানিয়েছে। স্মার্ট লাগছে খুব।
– বিয়ের আগে তোমার কিছু বলার আছে?
– না, নেই।
– তোমার মা জানেন?
– জানেনা।
– জানাবে না?
– হয়তো মা জেনে গেছেন।
– কি করে বুঝলে?
– আমি ঘর থেকে বের হবার সময় তিনি কাঁদছিলেন।
আসিফের ফোন বাজলো। বুঝতে পারছিলাম, বিবাহের সময় ঘনিয়ে আসছে। আমি ওর হাতদুটো ধরে মৃদু হাসিতে বললাম, “বেস্ট অফ লাক।”

রাত নয়টা। আমি আমার মায়ের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছি। আসিফ এতোক্ষণে আমার প্রেমিক থেকে সুজাতা নামের এক মেয়ের স্বামী হয়ে গেছে। যে মেয়ের বাবা আছে, মা আছে, ভাইবোন আছে, আত্মীয় আছে, অর্থ আছে, শুধু নেই নিজের বাবা মা লালন পালনের কোন দায়িত্ব। আমার ওই মেয়ের মতো বাবা, আত্মীয়, ভাইবোন, অর্থ সেসব কিছুই নেই, শুধু আছে আমার মা’কে দেখে রেখার দায়িত্ব। যে মেয়ের মাথার উপর বাবা নেই, ভাই নেই সে মেয়ের কপালে বিয়েও নেই। আসিফের মা বলেছিলো, “মেয়ের মা আমার ছেলের সংসারে নাক গলাবে, তা হবে না। আমার মাকে কোন ওল্ডহোমে দিয়ে আসতে কিংবা তার দেখভালের জন্য কোন সেবিকা রেখে দিতে। সাথে এও বলেছিলো, বিয়ের পর আমার চাকরিটা ছেড়ে দিতে হবে, ওদের বংশের কেউ বউয়ের টাকায় চলে না।”

সমাজে প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী একটা সময় ভাবতাম ওল্ডহোমে কেবল সেসব পুত্র সন্তানের বাবা মায়েরা থাকে যেসব পুত্রদের বউ খারাপ। আসিফের মায়ের কথা শুনে গিয়েছিল একদিন ওল্ডহোমে, না, সেখানে কেবল পুত্রের বাবা মা নয়, অনেক কন্যার বাবা মায়েরাও আছে। সুফিয়া নামক নব্বই ছুঁই ছুঁই এক ভদ্রমহিলার সাথে আলাপ হলো, একমাত্র সন্তান তথা একমাত্র মেয়ের বিয়ের এগারো মাস পরে তিনি বিধবা হন, মেয়ে মাকে নিজের কাছে নিয়েছিলো, সংসার ভাঙ্গনের পরিস্থিতি দেখে সাত মাস পর এখানে নিয়ে আসা হয়। মেয়ে প্রতিদিন একবার দেখতে আসে এ নিয়েও নাকি বেশ তুলকালাম চলে মেয়ের সংসারে।

আমাদের সমাজ এমন এক বউয়ের সন্ধান করে যেই বউ পুরো স্বামীর বাড়ির লোকজনকে নিজের ভেবে সেবা যত্ন করবে, মেয়ে পক্ষও তাতে অবশ্য খুশিই হয়, হাসতে হাসতে বলে, লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে আমাদের, সব সামলে নিবে। কিন্তু আমরা এমন একটা জামাই খুঁজতে পারিনা যে অন্তত বউয়ের বাবা মাকে নিজের বাবা মা ভাবতে পারবে। ছেলের বাবা মা ওল্ডহোমে গেলে বউয়ের দোষ, পুত্রহারা মেয়ের বাবা মা যে ওল্ডহোমে যায় সে দোষ কাদের?

রাত বারোটা। আকাশপানে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ভাবছি, কিছু বউ যে বলে, “তোমার মাকে আমি দেখতে পারবো না, সেবা যত্ন করতে পারবো না”, তারা আসলে ঠিকই বলে। একটা মেয়ে যদি নিজের বাবা মাকে নিজেই দেখাশুনা করতে না পারে তবে অন্যের বাবা মাকে সে কি করে ভাববে নিজের বাবা মা? কি করে বা দেখেই রাখবে তাদের, যত্নইবা নিবে কেন? ওল্ডহোম কিংবা বেতনভুক্ত সেবিকাতো আছেই তাদের দেখাশোনার জন্য, তাইনা?

মা পাশে এসে দাঁড়ালেন। এইতো সেই মা, আমি জন্মের তিন মাস আগেই যিনি স্বামী হারিয়েছেন। আমার কথা ভেবে যিনি আর কোনদিন স্বামী সোহাগ পেতে চাননি, আর আমি কি করে পারি সেই মানুষটিকে দূরে ঠেলে নিজেকে স্বামী সোহাগে ভরিয়ে তুলতে? একটু আগেই আসিফের বিদায়ের কথা ভেবে দম বন্ধ লাগছিলো, এখন আর তা লাগছেনা, হৃদযন্ত্রের উঠানামা ঠিকঠাক হচ্ছে, নিজেকে খুব হালকা লাগছে। মনে হচ্ছে, সিদ্ধান্তটা ভুল ছিলো না, এমন এক নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে সাত বছরের প্রেমিক আসিফকে কেন, নিজের জীবনটাও হাসিমুখে বিসর্জন দেয়া যায়। নাহ! আমার সত্যি কোন কষ্ট হচ্ছে না। মায়ের এই মুখটা দেখলে আমার কোন কষ্ট হয় না।

মা বললেন,
– আমার মেয়ের আসিফের বউ পরিচয়ের চাইতে সিনিয়র অফিসার প্রিয়ন্তি পরিচয়টা বেশি স্মার্ট। বান্দরবান যাবি?
– তোমার না শরীর খারাপ?
– ওসব বয়সের ফাঁদ, এগুলোকে পাত্তা দিলেই বিপদ।

গল্পঃ মা-মেয়ে
লিখাঃ রোমানা আক্তার শুদ্ধবালিকা

(ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য বইমেলায় পেন্সিল পাবলিকেশনস থেকে আসছে আমার বই “বিবেকের পোস্টমর্টেম”)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here