হামেলা বুড়ি

0
33

“হামেলা বুড়ি”

প্রায় রাতেই হামেলা বুড়ি মিলিটারি দেখে। আঙ্গিনায় বুট জুতোর ঘট ঘট শব্দ হয়। বুড়ি চিল্লায়- মিলিটারি আইছে, সব্বনাশ! আজ রাতে হামেলা বুড় আরও কয়েকবার মিলিটারি দেখবে। হামেলা বুড়ির কথা কেউ কানেই তুলছে না। ঐ আফাজ, ঐ মনসুর। ছেলেদের নাম ধরে বার বার ডাকাডাকি করেও কারো কোন সাড়া পায় না। আজ হামেলা বুড়ি থামবে না। সারারাত পাকিস্তানি মিলিটারি দেখে ফজরের ওয়াক্তে মিলিটারির মৃত্যু কামনা করে তারপর হামেলা বুড়ি ঘুমাবে।

আফাজ ও মনসুরের তখনো জন্ম হয়নি। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়। তখন আকাশ ফেটে বৃষ্টি হয়। সারাদিনের বৃষ্টিতে আঙ্গিনা, রাস্তা, ঘর-দোয়ার, মাটির দেয়াল ফুঁড়ে ফুঁড়ে শ্যাওলা গজিয়েছে। কাঁদা কাঁদা একটা গন্ধ চারদিক। সন্ধ্যার পর মিলিটারির আসার খবর পাওয়া গেলো। হামেলা বুড়ি তখন আজমল শেখের নতুন বউ। তার খুব শখ ছিলো মিলিটারির দেখার। বাপের বাড়িতে থাকার সময় দু একটা দফাদার দেখার অভিজ্ঞতা আছে তার। মিলিটারি নিয়ে অনেক গাল গপ্পো শুনে শুনে তার মনেও মিলিটারি দেখার শখ ছিলো। আজ মিলিটারি আসার খবরেও তার দেখার শখ নেই। শালার পুতেরা মানুষ মারে, বেইজ্জত করে। থুঁ। দলা দলা থুঁতু আঙ্গিনার কাঁদা পানিতে ছুড়ে ফেলে হামেলা।

আজমল শেখ এখনো ফেরেনি। বাড়ির সামনের রাস্তার কাঁদা ভেঙ্গে দলে দলে গ্রামবাসী পালাচ্ছে। বাড়ির মধ্যকার আম গাছ তলায় দাঁড়িয়ে দু একবার রাস্তায় উঁকি দেয়, অনেক দূর পর্যন্ত শুধু অন্ধকার।
এইসব ঘটনা সারারাত ধরে সে বকর বকর করবে। রোজকার ঘটনায় অভ্যস্ত তার ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি পুতিরা। তবে আজকের ঘটনাটা অন্য রকম হয়ে যায় হঠাৎ। হামেলা বুড়ি মিলিটারি দেখতে দেখতে টাকার ডেকচি দেখেছে। কাঁচা কাঁচা টাকা, রুপালী রঙের টাকা। তার ছেলে আফাজ ও মনসুর বাড়ি ফিরে পুরো ঘটনা জানার পর ঝগড়া শুরু করে টাকার ভাগ নিয়ে। বাপের যেহেতু দুই ছেলে সেহেতু সম্পত্তির ভাগ হবে সমান সমান। আফাজ মানতে চায় না। মায়েরে সে তিন বেলা খাবার দেয়। টাকার ডেকচি হবে তার। হামেলা বুড়ি বলে, ও বাপ ভাগ তো হবে তিনডে। চুপ বুড়ি থাম তুই বলে আফাজ হামেলা বুড়িকে ধমক দেয়।
পরদিন বাড়ির উঠোনে শালিস। গ্রামের মুরুব্বি লাল মিয়া, শামসুল সহ অনেকেই আছে। টাকার ডেকচির কথা এর আগেও শোনা গেছে আজমল শেখের মুখে। শেষকালে বিছানায় শুয়ে শুয়ে আজমল শেখ টাকার ডেকচি দেখতো। তারপর বুড়ো ডেকচির হদিস না দিয়েই মরে যায়। ছেলেদের অনেক আফসোস হয় তখন। গ্রামের অনেকেই বলে, ইশ আজমল শেখের পোলাগোর ভাগ্য খুলতে খুলতে বন্ধ হইয়া গেলো রে!
অনেক বছর পরে টাকার ডেকচি আবার সামনে এসে পরছে। শালিসে বড় ছেলে আফাজ শেখ তার ভাগের কথা বলে, মায়েরে সে খাইতে দেয়, দেখভাল করে। বছর বছর দুই ঈদে নতুন কাপড় দেয় তাই টাকার ডেকচির ভাগ হবে তার। ছোট ছেলের যুক্তি আলাদা। বাপের যেহেতু দুই ছেলে তাই ভাগ হবে সমান সমান। হামেলা বুড়ি তিন ভাগের কথা বলে। শালিসে বুড়ির কথায় কেউ পাত্তা দেয় না। টাকার ডেকচি কোথায় পোঁতা আছে সেটা হামেলা বুড়ি বারবার মনে করার চেষ্টা করে, মনে পরে না। মর বুড়ি তুই বলে আফাজ ধমক দেয়। লাল মিয়া ফয়সালা টানে শালিসের। আগে টাকার ডেকচি বের হোক তারপর ভাগাভাগি। গ্রামের মুরুব্বিরা সাক্ষী থেকে টাকার ডেকচি খোঁজা হয়। ঘরের মেঝে, বাড়ির আঙ্গিনা, পুরনো কলপাড় সব জায়গায় খোঁড়া হয়। খুঁড়তে খুঁড়তে বড় বড় গর্ত হয়ে যায় গোটাবাড়ি। টাকা ডেকচির খোঁজ পাওয়া যায় না। সেদিনের মত শালিস শেষ হয়। টাকার ডেকচি কই পোঁতা আছে হামেলা বুড়ি দেখবে, তার জন্য এখন সবার অপেক্ষা।

দুই ছেলের মায়ের প্রতি ভালোবাসা-
খাতির যত্ন আগের চাইতে বেড়ে যায়। মায়ের জন্য জিলাপী আনে আফাজ, মনসুর আনে বাতাসা। হামেলা বুড়ি দলা দলা জিলাপী চিপে মুখের ভিতরে পুরে দেয়। গিলে ফেলে। জিলাপীর রসে ভিজে যায় কাপড়। পিঁপড়া দল আসতে থাকে হাজারে হাজারে। হামেলা বুড়ির শরীর তারা দখল নেয়। হামেলা বুড়ি আজ আবার চিৎকার শুরু করে, পাকিস্তানি মিলিটারি তারে খেয়ে ফেলতেছে। আফাজ ও মনসুরের রাগ লাগে খুব। আফাজের বউ মমিতন ঘরের বাহিরে থেকে বলে, টাকার ডেকচি কই পোঁতা আছে আম্মা। যা মাগী যা, ভাগ তুই। ছেলের বউরে খেদায়া দেয় হামেলা বুড়ি। অন্যদিন হলে মমিতন ঝগড়া লাগাতো। মাগী বলে শ্বাশুড়িকে গালি দিতো। আজ চুপচাপ ঘরে ফিরে যায়। মনসুর আর তার বউ ঘরের পাশে ওৎ পেতে আছে এখনো। যেকোন সময় বুড়ি টাকার ডেকচি দেখে ফেলবে। তারপর ডেকচি উঠায়া সাবার করে দিবে। কিন্তু বুড়ি মিলিটারি দেখতেছে আবার।
দলে দলে পাকিস্তানি মিলিটারি হামেলা বুড়ির শরীরে বেয়ে বেয়ে উঠতে থাকে, পাকিস্তানি সব মিলিটারি যেনো হামেলা বুড়ির শরীর ছাড়া কোন জমিন খুঁজে পায় না এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গ মাইলে। কামড়ায়া দাগ করে দেয় তারা, গোল গোল, লাল লাল। হামেলা বুড়ির চিৎকার চেঁচামিচিতে বাড়ির সবাই বিরক্ত। আফাজ শেখ বিরক্তি নিয়ে বলে এই বুড়ি মরে না ক্যা! অনেক রাত পর্যন্ত বাড়িত সবাই জেগে থাকে সেদিন। টাকার ডেকচি কই পোঁতা আছে বলে দিলেই হামেলা বুড়ির দুই ছেলে বড়লোক হয়ে যাইতো। আফাজ পানের ব্যবসাটা বড় করতো। নতুন পাইকার আসতো, ইনকাম হতো অনেক। মনসুর নতুন আরেকটা ঘর উঠাতো। মেয়ের বিয়ে দিয়ে জামাই সহ নতুন ঘরে তুলতো। এইসব স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না খুব তাড়াতাড়ি।
হামেলা বুড়ি কাপড় খোলা শুরু করে। কাপড় খুলে ঘরের মেঝেতে ছুড়ে দেয়। ধপ করে কুপিবাতি নিভে যায়। এখন গভীর রাত, হামেলা বুড়ির জীবনের মতই অন্ধকার নেমে আসে ঘরে। পাকিস্তানি মিলিটারি বুড়ির শরীর ছাড়ে না। দলে দলে হাজারে হাজারে উঠছে বেয়ে বেয়ে।

সেদিন সন্ধ্যার পর পাকিস্তানি মিলিটারিরা তার শরীর থেকে কাপড় খুলে আম গাছ তলায় ছুঁড়ে ফেলে। তারপর দলে দলে শরীর বেয়ে উঠে কামড়ায়। আজমল শেখ বাড়ি ফিরে দেখতে পায় তার বউ হামেলা বেঁহুশ। সেদিনের ঘটনা আজমল শেখ কাউকেই বলে না। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে হামেলা যে বাচ্চাটা জন্ম দেয় তাকে আজমল শেখ কোথায় যেনো ফেলে দিয়ে আসে। হামেলা বুড়ি কান্দে, কান্নাকাটি করে ঘর দুয়ারে গড়াগড়ি করে। আম গাছ তলায় একা একা দাঁড়িয়ে থাকে বাচ্চাটার শোক কাটাতে থাকে।
হামেলা বুড়ি টাকার তিনভাগের কথা কেউ আমলে নেয়নি। সারারাত বুড়ি পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে যুদ্ধ করে, দলে দলে মিলিটারি মেরে ফেলে হাজারে হাজারে। সারা শরীরে গোল গোল দাগ হয়ে যায়। বুড়ি উদোম হয়ে ভোর রাতে পরে থাকে জলচৌকিতে। জলচৌকির পাশে তসবিহ। তসবিহটা আজ ঐরকমই আছে। সকাল সকাল জলচৌকির পাশে হামেলা বুড়িকে পরে থাকতে দেখে আফাজের ছোট ছেলে আশরাফ। আশরাফ বাতাসা জিলাপির লোভে ঘরে ঢুকেছে। আশরাফ চিল্লায়ে উঠে, ও আব্বা, ও ছোট আব্বা বুড়িতো মরে গ্যাছে। হামেলা বুড়ি হা করে তাকিয়ে আছে, তার মুখ থেকে পিঁপড়া বেরিয়ে আসতে থাকে হাজারে হাজারে।

টাকার ডেকচি হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার আফসোস হামেলা বুড়ির ছেলেরা আরও কয়েক বছর করবে। কিংবা বছর বছর। বাড়ির পিছনে বাঁশের ঝাড়। মনসুর আফাজ ঝগড়া করে বুড়ির কবরে কার ভাগের বাঁশ যাবে নিয়ে। মনসুরের ছেলে তখন পুকুর ঘাটে চুরি করা বাতাসা একা একা খাচ্ছে, মেয়েটা তখন রান্না ঘর থেকে কবরে দেয়ার জন্যে বাঁশের পুরনো একটা চাটাই বের করে পুকুরে ধুঁতে গেছে। মনসুরের বউ ধমক দেয়, চাটাই কি বেশী হয়া গ্যাছে রে! সকাল থেকেই রান্না হয়নি এই বাড়িতে। মউতের বাড়িতে রান্না নিষেধ। ক্ষুধা নিয়ে আছে সবাই। চাল ধুঁয়ে ডেচকিতে রাখে ছেলের বউয়েরা। বাড়িতে তখন একটা মরা পরে আছে উঠোনের মাঝখানে, তার চারদিকে দলে দলে পিঁপড়া হাজারে হাজারে। মরাটা কবরে গেলেই বাড়িতে রান্না শুরু হবে।

মেহরাব জাহিদ
অক্টোবর, ২০১৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here