মল্লিকা

0
43

চল্লিশ বছর বয়সের ছিপছিপে গঠনের ফ্যাশন সচেতন নারী মল্লিকা রায় ৷ একটা বেসরকারী ব্যাংকে চাকুরী করেন ৷ চাকুরীর বেতনে তার দিব্বি চলে যায় ৷ প্রয়োজন শখ সবই মেটে ঐ চাকুরীর বেতনে ৷ প্রতিদিন খুব সকালে উঠে মল্লিকা রায় ৷ ততক্ষনে রানুর মা চলে আসে ৷ রানুর মা নাস্তা বানাতে শুরু করে আর মল্লিকা জগিং করতে বাইরে চলে যায় কানে হেডফোন গুজে ৷ ফিরে এসে শাওয়ার নিয়ে নাস্তা করতে বসে ৷ একদম বাড়তি তেল , মিস্টি ছাড়া নাস্তা করে সে ৷ নিজের ছিপছিপে শরীরটা তার বড্ড বেশী পছন্দ ৷ প্রতিদিনকার মতো আজও জগিং শেষে নাস্তা খেতে বসে সে ৷ রানুর মা নাস্তা সামনে দিয়ে চলে যায় ৷ মল্লিকা খেয়াল করে পরোটা তেলে চুপচুপ করছে ৷

—রানুর মা , কই সামনে আসো

—জে আফা বলেন

—তোমাকে কতবার বলছি এমন তেলতেলে খাবার আমি খাইনা , তারপরও কেন এমন খাবার দাও ? বলো আমাকে ? তোমার কি মনে হয় স্বাদ সব তেলে ? খেয়ে নিজের শরীরটা তো বানিয়েছো হাতির মতো , আমাকেও তাই বানাতে চাও !

—আফা ভুলে তেল বেশী পইড়া গেছে ৷ খেয়াল করি নাই ৷

—খেয়াল কেন করবে না ? মাস শেষে কি বেতন দেই না আমি ? আমার সকালটা খারাপ করে দিলে তুমি ৷ শোন , নিজেও তেল মিস্টি বাদ দাও … দিন দিন যা হচ্ছো , তোমাকে দেখলে আমার গা ঘিনঘিন করে..

রানুর মা সচারচর মুখে মুখে উত্তর দেয়না ৷ আজ তার খুব খারাপ লাগলো ৷ এমন ভাবে শরীরের খোটা দিলো ! রানুর মা কিছু বলবে না বলবে না ভেবেও বলে ফেলে..

—আফা , আমি হাতিই হই আর ইন্দুর হই , রাত্তিরে সোহাগ করার জন্য আমার সোয়ামী আছে ৷ এমুন পাতলা কোমরের অহংকার যে করেন , সেই তো থাকেন একলাই .. সোয়ামী তো জুটাইতে পারেন নাই ৷ এই গরীবের কিছু থাক না থাক আল্লায় দিলে সোয়ামীর সুখ আছে.. অনেক সহ্য করছি আফা ৷ আপনের বেতনের মুখে লাথ্থি ৷ না খাইয়া থাকলেও আপনের দুয়ারে আসমু না ৷ এই আমি গেলাম ৷

রানুর মা চলে যাবার পর অনুতপ্ত হয় মল্লিকা ৷ এখন ঢাকা শহরের যে অবস্থা তাতে রানুর মায়ের মতো একনিষ্ঠ কাজের লোক পাওয়া রীতিমত আলাদিনের চেরাগ পাবার মতো ব্যাপার ৷ নিজের উপর রাগ হয় মল্লিকার ৷ সব দোষ আসলে আশফাকের ৷ অথবা সব দোষ তার নিজের ভাগ্যের ৷ না হয় আঠারো বছর পর এই সকাল বেলায় কেন দেখা হবে আশফাকের সাথে ৷ এই এলাকায় সিফ্ট করেছে নাকি ৷ সে না দেখার ভান করেই সামনে এগুচ্ছিলো ৷ কিন্তু আশফাক ওকে থামিয়ে দেয় ৷

—আরে মল্লিকা নাকি ? ওহ মাই গড ! এতদিন পর ৷

—কেমন আছো আশফাক ? এদিকেই থাকো নাকি ?

—এইতো দুদিন হলো সিফ্ট করেছি এখানে ৷ মেয়েটার স্কুল কাছে হয় এখান থেকে ৷ রোজ রোজ জার্নি করে অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলো ৷ তাই আর কি .. তা তুমি এখানেই থাকো নাকি ?

—হুম এখানেই থাকি ৷

—তুমি কিন্তু একটুও বদলাওনি মল্লিকা ৷

—কিন্তু তুমি অনেক বদলে গেছো ৷

ঠিক তখনি একজন বেশ স্বাস্থবতী মহিলা হাঁফাতে হাঁফাতে এলেন ৷

—হ্যাঁ গো তোমার জগিং শেষ ? কার সাথে গল্প করছো !

—অনু , এ হচ্ছে মল্লিকা , মল্লিকা রায় ৷ আমরা একি এলাকায় থাকতাম ৷ দীর্ঘদিন পর দেখা হলো ৷ এখানেই থাকে ৷

—ও .. দিদি আসবেন আমাদের বাসায় ৷ ঐ যে ডান দিকে যে গলিটা গেছে ওটার শেষ মাথায় সাদা বিল্ডিংটার চার তলায় উঠেছি ৷ আসবেন কিম্তু ৷

—জ্বি আচ্ছা আসবো ৷

মল্লিকা চলে আসে ৷ তখন থেকেই মাথাটা দপদপ করছে ওর ৷ ” একি এলাকায় থাকতাম ” বাহ ! কি সুন্দর সে বলে দিলো ৷

রোজ সকালে পূজো দিয়েই প্রসাদ নিয়ে মন্দিরের পেছনে চলে যেতো সে সবার আড়ালে ৷ মন্দিরের দেয়ালে হেলান দিয়ে ঘাসের ডগা চিবুতো আশফাক .. আশফাক রহমান .. মল্লিকাকে দেখেই প্রথম যে কথাটি বলতো আশফাক তা হলো “তোমার জন্য অপেক্ষা করতে করতেই মরবো আমি ”

না , সে মরেনি ৷ দিব্যি বেঁচে আছে ৷ বউ কন্যা নিয়ে সুখে ঘর করছে .. এসব ভেবে তার কি কাজ ! অফিসে দেরী হয়ে যাচ্ছে ৷ প্লেট সরিয়ে দ্রুত আয়নার সামনে বসে সে ৷ পুরোদস্তুর মেকআপ সেরে অফিসে চলে যায় …

অফিস থেকে সে বাসায় ফেরেনা ৷ সোজা চলে যায় নিমতলী বস্তিতে ৷ রানুর মায়ের ঘুপচি ঘরে ঢুকে বসে ৷

—আজ সকালে ওর সাথে দেখা হয়েছিলো রানুর মা ৷ এত বছর পর ওকে দেখে মাথা ঠিক ছিলোনা ৷ মাফ করে দাও আমাকে ৷ কাজ না করলেও চলবে তবে আমার উপর রাগ রেখোনা ৷

—আফায় যে কি কন ৷ আপনের লগে এতদিন আছি , কোনদিন এমন হয়নি ৷ আইজ আমিও বেদ্দপী করছি ৷ মাফ কইরা দিয়েন আফা ৷

—রানুর মা , আজ যদি তোমাদের এখানে থাকি আমাকে রাখবে ? আমার আজ বাড়ি ফিরতে মন চাচ্ছে না ৷

—এইডা কোন কথা কইলেন আফা ? একদিন ক্যান আপনের যে কয়দিন মন চায় থাকেন ৷

কয়েক মূহুর্ত ভাবে মল্লিকা ৷ তারপর বলে ” না রে আজ যাই …”

বাড়ির পথে পা বাড়ায় মল্লিকা ৷ মাথার ভিতরটা দপদপ করছে ..সারাজীবন শুধু আশফাককে ভেবেই একা থেকে গেল সে ৷ সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো ৷ আশফাক তার ছোট বোনকে দিয়ে খবর পাঠায় দেখা করতে ৷ বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে একাকার হয়ে মল্লিকা যায় দেখা করতে ৷ বৃষ্টির ছোয়ায় ভিজে গেছে আশফাকও ৷ মল্লিকা ভেবেছিলো হয়তো ভালোবাসার কথা বলবে আশফাক ৷ কিন্তু সেদিনের কথা ভেবে তীব্র যাতনায় কেঁপে উঠে আজও ৷ আশফাক এসে দুহাত ধরে মল্লিকার … কাঁপা কাঁপা গলায় বলে “মল্লিকা আমার চাকরী হয়েছে.. যার মাধ্যমে চাকরী হলো তার মেয়েকে বিয়ে করতে হবে আমার , মাকে তোমার কথা বলেছিলাম মল্লিকা..মা বলেছে তোমাকে বিয়ে করলে মা আত্মহত্যা করবে , তোমার আমার ধর্ম আলাদা ,মা কিছুতেই মানবে না এটা ..আমি পারবো না মল্লিকা , আমাকে ক্ষমা করো …”

মল্লিকা কাতর গলায় বলেছিলো ” আমি ধর্ম বদলাবো , আমাকে ছেড়োনা আশফাক.. তুমি এই চাকরীটা নিওনা , ভালো রেজাল্ট তোমার , তুমি চাকরী পাবে অবশ্যই ..”

আশফাক বলে ” আমাকে চাকরীটা করতেই হবে , আবার একটা সুযোগের অপেক্ষায় এত বড় সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে পারিনা..আমার বাড়ীর সবাই অপেক্ষায় আছে আমার একটা চাকরীর জন্য ..”

এরপর আর মল্লিকা কথা বাড়ায়নি ৷ এক দৌড়ে চলে এসেছিলো নিজেদের বাড়ীতে.. এরপর মল্লিকার বাবা মা কম চেস্টা তো করেনি ওর বিয়ে দেবার ৷ অপেক্ষা করতে করতে শেষমেশ না পেরে ওর ছোট বোনদের বিয়ে দেয় একে একে ৷ আসলে পুরুষ শব্দটার উপরেই কেমন একটা বিদ্বেষ চলে এসেছিলো ওর..তারপর বাবা মার মৃত্যুর পর থেকেই এভাবেই একা সে..এভাবেই দিন যাচ্ছে ৷

দিনে দিনে রুক্ষ হয়ে যাচ্ছে মল্লিকা ৷ মল্লিকা বোঝে সে কথা ৷ আজ তার হঠাৎ মনে হয় খুব কি বেশী দেরী হয়ে গেছে ? এখন কি আর সম্ভব না ছোট্ট একটা সংসার গড়া…ছোট্ট একটা তুলতুলে শিশু কি তার হতে পারেনা ?

ছোট্ট একটা নরম তুলতুলে শিশুর মুখ ভেবে নিজের মনে হাসে সে ৷ একলা ঘরে ঢুকে নিয়ে ফেলে জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত..এবার মল্লিকা সংসারী হবে ..
*******
নতুন করে মল্লিকার ভাবনার জগৎ যেন আবার খুলে গেলো ৷ মল্লিকা রায় ঠিক করলেন এবার তিনি বিয়ে করবেন ৷ পত্রিকায় ছাপালেন “চল্লিশ বছরের মধ্যবয়স্কা নারীর জন্য একজন সৎ ব্রাহ্মন পাত্র চাই , ডিভোর্সী বা বিপত্নীক হলে অসুবিধা নাই ৷ যোগাযোগ : সরাসরি পাত্রী, মোবাইল নং ০১৭১২*****২৩…”

দুদিন কেটে গেলো কোন ফোন এলো না ৷ তৃতীয় দিনে একটি ফোন এলো ৷

—হ্যালো ! মল্লিকা রায় বলছেন ? আমি ঈশান চক্রবর্তী ৷

—জ্বি বলুন ৷ বলছি ..

—পত্রিকায় দেখে কল করলাম ৷আপনি পাত্র চাই বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন ৷

—আচ্ছা ৷ পাত্র কি আপনি নিজে নাকি অন্য কেউ ?

—ত্রিভুবনে আমার কেউ নেই ৷ পাত্র আমি নিজে ৷

—আপনি কি আগে বিবাহীত ছিলেন ?

—জ্বি ৷ বিবাহীত আছিও ৷

—আপনি কি আমার সাথে মজা করতেছেন ? এটা কি ধরনের কথা ! আপনি বিবাহীত , ঘরে বউ আছে তারপরও আপনি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছেন !

—এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলার জন্য আমাদের দেখা করা জরুরি ৷ আপনি কি সন্ধ্যায় আমাকে আধঘন্টা সময় দিবেন ?

—অবশ্যই না ৷ আমি বিবাহীত কারোর সাথে দেখা করতে আমি আগ্রহী নই ৷ দীর্ঘজীবন আমি একা ছিলাম , এখন আমি সংসারে আগ্রহী ৷ তারমানে এই না যে আমি অন্যের সংসার ভাঙবো ৷ আপনি দয়াকরে আর কল করবেন না ৷

—কিন্তু আমার কথাটা তো …

ঈশানের কথা শেষ করতে দেয়না মল্লিকা ৷ মোবাইলটা বিছানায় ছুড়ে মারে ৷ ভীষণ রাগ হতে থাকে ৷ তাকে সবাই ভেবেছেটা কি ! এটা কোন কথা ! ঘরে বউ রেখে আবার বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিচ্ছে ! অদ্ভুত !

সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার সময় ওর মনটা একটু কেমন কেমন করতে থাকে ৷ “আহা ! লোকটার কথাটা অন্তত শোনা দরকার ছিলো” ৷ মল্লিকা অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে মোবাইল হাতে নেয় ৷ নম্বরটা সেভ করা হয়নি , খুঁজে বের করতে হবে ৷ সময় মনে করে নম্বরটা খুঁজে বের করে কল করে মল্লিকা ৷

—নমস্কার , ঈশান চক্রবর্তী বলছেন ?

—জ্বি ৷ আপনি ভালো আছেন মল্লিকা ?

—জ্বি ভালো আছি ৷ আমার মনে হলো অপর পক্ষের সম্পূর্ণ কথা না শুনে সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ঠিক হবে না ৷ আপনি কি ফ্রি আছেন ? আমি গুলশানে , আপনি চাইলে দেখা করা যায় ৷

—আমিও গুলশানেই আছি ৷ গ্লোরিয়া জিন্সের পাশেই একটা কাজে এসেছিলাম , আপনি চাইলে এখানে আসতে পারেন .. কফি খেতে খেতে গল্প করলাম ৷ অথবা আপনি অন্য কোথাও বসতে চাইলেও আমার আপত্তি নাই ৷

—না ঠিক আছে ৷ আপনি দশ মিনিট অপেক্ষা করেন , আমিও কাছেই আছি ৷

মুখোমুখি দুটো চেয়ারে বসে মল্লিকা আর ঈশান ৷ দু’কাপ ল্যাটে দিতে বলে ওয়েটারকে ৷ মল্লিকাকে আজ বেশ সুন্দর লাগছে ৷ হালকা টিয়ে রঙা একটা শাড়ী আর সাথে গাঢ় নীল রঙা ব্লাউজ ৷ একদম হালকা সাজ ৷ ছোট্ট একটা নীল টিপ কপালে ৷ ঈশান এক পলক দেখে মল্লিকাকে ৷ এরপর কথা শুরু করে ৷

—মল্লিকা , আপনি কি চাকরি করেন না কি করেন ? আসলে পত্রিকায় আপনার সম্পর্কে তেমন কোন ইনফরমেশন ছিলোনা ৷

—ব্যাংকে আছি আমি ৷ আপনি কি করেন ?

—আমি বিজনেস করি ৷ এক্সপোর্ট ইমপোর্টের বিজনেস ৷ আপনাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে ৷

—আচ্ছা ! তাহলে কাজের কথায় আসা যাক ৷ প্রসংশার বাক্যে আন্দোলিত হবার বয়সটা আসলে আর নেই আমার ৷ এখন বরং একটু নির্ভরতার জায়গা দরকার ৷

—বেশ , তাহলে মূল কথাতেই আসি ৷ আমার জন্মের আগে আমার মায়ের আরো পাঁচটি সন্তান হয়েছিলো যাদের কেউ বাঁচেনি ৷ তখন আমি জন্মালাম ৷ আমার বাবা মা শুধু চেয়েছিলেন আমি যেন বেঁচে যাই ৷ সকল ধরনের চেস্টাই তারা করেছেন ৷ তখন একজন সাধু বাবা ছিলেন আমার মা যার ভক্ত ছিলেন ৷ তো তিনি মা কে বললেন তোর ছেলেকে বিয়ে দে , তেরো বছরের কিশোরী কুমারী নারীর সাথে ৷ আপনি হয়তো হাসবেন ৷ কিন্তু আমার জীবনের ধ্রুব সত্যি এটাই ৷ আমার এক মাস সাত দিন বয়সে আমার বিয়ে হয় তেরো বছরের অলকার সাথে ৷ তা সে যেভাবেই হোক আমার প্রাণ বেঁচে গেলো ৷ আমার মায়ের ধারণা আমার প্রাণ বাঁচলো অলকার দয়ায় ৷

—ইন্টারেস্টিং ! তারপর ?

—এরপর একসময় বাবা মা গত হলেন ৷ অলকা বহুবার চেয়েছে আমি যাতে আবার বিয়ে করে সংসারী হই , কিন্তু মা আমাকে দিব্বি দিয়ে রেখেছিলেন ৷ মায়ের মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে মুক্ত করে দেন ৷ কিন্তু এরপর পরই অলকা অসুস্থ হয়ে যায় ৷ ওর সেবা করতে করতে আসলে বিয়ে সংসারের কথা মাথায় আসেনি ৷ অলকার এখন শরীরের অবস্থা খুব খারাপ ৷ সে এখন আমার কাছে একটা জিনিসই চায় ৷ আমাকে সংসারী দেখতে চায় ৷ .. একটা মেয়ে সারাটা জীবন নিজের সবকিছু উৎসর্গ করেছে আমার জন্য , তার শেষ চাওয়াটা পূরণ করাটা আমার জন্য ভীষণ জরুরি তাই .. কোনদিনও আমাদের মধ্যে শারিরীক কোন বন্ধন তৈরী হয়নি ,কিন্তু মানষিক একটা দৃঢ় বন্ধনে বাঁধা আমরা ৷ এরপর থেকেই বিয়ের জন্য পাত্রী খুঁজছি তাও প্রায় ছয় মাস হলো ৷ আসলে আমারও তো বয়স কম হলো না ৷ গত মাসে উণপঞ্চাশতম জন্মদিন করলাম ৷ সব মিলিয়ে মনের মতো কাউকে পাইনি ৷ অলকার দায়িত্ব নিতে রাজী এমন কাউকে আসলে আমি পাইনি ৷

—আপনার বাসাটা কোথায় ? উনি কি আপনার সাথেই থাকেন ?

—এইতো কাছেই আমার বাসা ৷ আমি ছাড়া তো অলকার আর কেউ নেই ৷ বিশাল এই পৃথিবীতে শুধু আমরা দুজনই দুজনার , আর কোন আত্মীয় পরিজন নেই ৷

—আমি কি দেখা করতে পারি একবার তার সাথে ?

—অবশ্যই ৷ চলেন উঠা যাক ৷

অপরিচিত একজন মানুষের সাথে অপরিচিত একটা জায়গায় যাচ্ছে মল্লিকা ৷ মল্লিকার ভয়ও লাগছে একটু কিন্তু আগ্রহটাই যেন বেশী ৷ রূপকথার রহিম রূপবান কে সামনে থেকে দেখার লোভ সামলাতে পারেনা মল্লিকা ৷

বিছানায় একজন বৃদ্ধা শুয়ে আছে আছেন ৷ বৃদ্ধা বোধহয় নিজে থেকে বাথরুমেও যেতে পারেন না ৷ রুমটা পুরো হাসপাতালের রুমের মতো সাজানো ৷
একজন নার্স ও আছে চব্বিশ ঘণ্টা দেখাশোনার জন্য ৷ মল্লিকা গিয়ে বিছানার পাশে বসে ৷ আলতো করে জীর্ণ রোগা হাতটা নিজের হাতে পুরে নেয় ৷ মল্লিকার স্পর্শে চোখ মেলে অলকা , ঘোলাটে ঝাপসা চোখ ৷ মল্লিকার হাত ধরে শিশুর মতো কেঁদে উঠেন তিনি , অনেক কস্টে থেমে থেমে বলেন “আমার ঈশানকে দেখো বোন , দুনিয়ার আর কেউ নাই ওর…” মল্লিকা মুঠোর মধ্যে অলকার হাত পুরে স্মিত হাসে ৷ মনে মনে ভাবে “একটা সন্তান চেয়েছিলাম , তুলতুলে নরম একটা সন্তান …করুণাময় আমাকে একটা সন্তান বর দিলেন ” .. মুখে বলে “ঈশানকে আমরা দুজনেই আগলে রাখবো দিদি .. তুমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাও কেমন …”

পরদিন সকালেই গাটছড়া বাঁধে মল্লিকা আর ঈশান.. গাড়ি রেখে খোলা রিকশায় উঠে দুজনে ৷ নিঃশব্দে যেন অনেক কথা বলে তারা .. তারপর একসময় বাড়ি ফেরে ৷ আফসোফ ! ততক্ষনে পরপারে পারি জমিয়েছে অলকা চক্রবর্তী … সধবার সাজে হরি বোল ডাকের সাথে চন্দন কাঠে পুড়ে যায় এক নারীর গল্প ..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here