ভালোবাসার পুঁথি

0
26

ভোরবেলা উঠে সুরুজ গমের ক্ষেতে চলে যায় আর আদরীনি তড়িঘড়ি করে রান্না করতে বসে। স্বামীর জন্য ভাত নিয়ে তাকে ক্ষেতে যেতে হয়। সে ক্ষেত থেকে ফিরার সময় বাড়ির নিচের সরিষা ক্ষেত দেখে আসে। সরিষার ফুল এসেছে, ছাগল ঢুকে ফসল নষ্ট করে বলে দেখে রাখতে হয়। তারপর তাদের গরু পারুলকে গোয়াল থেকে বের করে সে। পারুল মা হতে চলেছে তাই তার বিশেষ যত্ন নিতে হয়। ক্ষেত থেকে আসার সময় সুরুজ কাঁচা ঘাষ নিয়ে আসে পারুলের জন্য। সুরুজের বাবার বয়স হয়েছে তাই তাকে আর ক্ষেতে কাজ করতে দেয় না সে। এখন ক্ষেতের সব কাজ সুরুজ একাই করে। আদুরীনি আর সুরুজের একমাত্র ছেলে রইচ স্কুলে যায়, স্কুলটা অনেক পথ হেটে যেতে হয়। রইচ বড় আগ্রহ নিয়ে স্কুলে যায়। সকালে তাকে খাইয়ে স্কুলে পাঠায় আদরিনী। দুপুর হবার আগেই তড়িঘড়ি সে করে রান্না বসায়। ছেলে স্কুল থেকে ফিরেই বলে-
__”মা ভাত দাও খুব খিদা লাগচে।”
ছেলের মলিন মুখটা দেখে আদরিনীর খুব মন খারাপ হয়ে যায়। মাঝে মাঝে তার মনে হয়, থাউক ইস্কুলে যাইতে হইবো না। সে গভীর মমতা নিয়ে বলে-
__”বাজান কাইল থাইকা আর ইস্কুলে যাইয়ো না। এত দূর হাইটা যাইতে আইতে তোমার কষ্ট হয়। আমার যে পরাণখান পুড়ে রে বাপ।”
একগাল হেসে রইচ বলল-
__”মা তুমি যে কি কও না? কিয়ের কষ্ট? আমি তো পোলা, মাইয়াগো মতন অল্পতেই কষ্ট পাইলে চলবো?”
ছেলের কথাতে অবাক হয় আদরিনী। এইটুকু ছেলের মুখে কত দামী কথা!
__”এই সব কি কও বাজান? কষ্ট তো সবারই হয়। তোমার আব্বা ক্ষেতে খামারে কাম করে তারও তো কষ্ট হয়।”
রইচ এবার বেশ ভাব নিয়ে বলল-
__”আমি লেখা পড়া শিইখা মাস্টার হমু। রাস্তায় সবাই আমারে সালাম দিবো। তোমার ভালা লাগবো না মা?”
ছেলের কথা শুনে খুশিতে আদরিনীর বুক ভরে গেলো।
__”লাগবো তো বাজান, খুব ভালা লাগবো।”
__”তাইলে এই সব কষ্ট নিয়া ভাববা না আর।”
__”আইচ্ছ্যা। এখন ভাত খাও বাজান।”

আদরিনী মনে করে তার স্বামী খুবই ভালো মানুষ। সে তাকে খুব ভালোবাসে। গাঁয়ের পালাগানের অনুষ্ঠানে সে আদরিনীকে সাথে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু আদরিনীর লজ্জা করে। তার স্বামী খুব জোরাজোরি করে। রাতে হ্যারিকেন জ্বালিয়ে আদরিনী নকশি কাঁথা সেলাই করে। পাশে শুয়ে থেকে সুরুজ খোশগল্প করে। হ্যারিকেন এর আলোতে আদরীনির মুখটা চাঁদের জোছনার মতো লাগছে সুরুজের চোখে। মনে হচ্ছে হ্যারিকেনের কাঁচের ভেতরে কোনো আলো নেই, সব আলো এই শ্যামবর্ণের মুখ জুড়ে। সুরুজ অপলক চেয়ে দেখছে। বিয়ের দশ বছর পরেও আদরীনিকে তার সেই প্রথম দেখার মতোই নতুন লাগে। এখনও তার মুখের দিকে তাকালে সুরুজের বুকে বিদ্যুৎ খেলে যায়। সুরুজ বলল-
__”শুনলাম কাইল গাঁয়ে পালা গান হইবো। তুমি কিন্তু আমার লগে দেখতে যাইবা রইচের মা।”
আদরিনী লজ্জায় আঁচল মুখে গুঁজে বলল-
__”কি যে কও না রইচের আব্বা। মাইয়া মানুষ এই সব দেখে নাকি?”
বউয়ের কথাকে অগ্রাহ্য করে সুরুজ বলল-
__”ক্যান মাইয়াগো মন নাই? তাগো কি ইচ্ছা করে না?”
আদরীনি কাঁথা সেলাইয়ে মনোযোগ দিয়ে বললো-
__”গাঁয়ে মানুষ বদনাম করবো। কইবো অমকের বউ বেশরম। এই সব শুনতে কি তোমার ভালা লাগবো?”
__”যে যা কয় কউক। আমি তো জানি যে আমার বউ কতখানি শরমের ঝাড়। আমি জানলেই হইবো। মাইনষের জানোনের কাম নাই। কাইল তুমি যাইবা।”
কাঁথায় ফোঁড় তুলে আদরীনি বলল-
__”আব্বা শুনলে কি ভাববো? আমি তো শরমে আব্বার সমুখে খাড়াইতেই পারুম না।”
__”আব্বা কিছুই ভাববো না। তুমি জানো কী যে আব্বা অহনো গভীর রাইতে মায়েরে কিচ্চা শোনায়?”
সুরুজের কথা শুনে আদরীনি কাঁথায় সুঁচ গুঁজে বেশ আগ্রহ নিয়ে বলল-
__”কও কি? কিয়ের কিচ্চা?”
__”কত রকমের ভালোবাসার কিচ্চা। লাইলী মজনু চন্ডী দাশের কিচ্চা।”
__”তুমি এই সব পারো না?”
__”না।”
সুরুজ এসব পারে না শুনে আদরীনির মন খারাপ হয়ে গেল। সে যদি কিচ্চা পারতো তাহলে কতই না ভালো হতো। সে রাগ করে বলল-
__”তা পারবা ক্যা? পারো তো খালি পালাগান দ্যাখতে।”
__”গোস্যা করো ক্যা রইচের মা? না পারলে কি করুম কও?”
মুখ ভেংচিয়ে আদরীনি বললো-
__”না পারলে শিখবা?”
__”কার থাইকা?”
__”আব্বার থাইকা।”
__”কও কি? এই সব তো শরমে জিগাইতেই পারুম না।”
__”তাও তো ঠিক। তাইলে এই গাঁয়ে আর ক্যাডায় ক্যাডায় কিচ্চা পারে হ্যার খবর নিবা। তাগো থাইকা শিখবা।”
__”শিইখা কি করুম?”
__”আমারে শোনাইবা।”
__”তাইলে কাইল পালাগান দেখতে যাইবা?”
__”না যামু না।”
রাগ করে সুরুজ বলল-
__”তাইলে শিখুমও না। হুহ।”
আদরীনি মুখ ভেংচি কেটে মুখ ঘুরিয়ে বলল-
__”আইচ্ছ্যা শিখা লাগবো না অহন ঘুমাও।”
__”এত শরম কই পাও হ্যাঁ? বিয়ার আগে তো সারা পাড়া টই টই কইরা ঘুরতা। চৈতালী বৈশাখী ম্যালা তো একটাও বাদ থও নাই আর যত শরম অহন হইছে?”
__”তখন আমি আছিলাম মাইয়া আর এখন হইছি বউ। বয়সও কম আছিল। ফারাক তো রইছেই।”
__”কোনো ফারাক নাই। ম্যালায় যাইয়া যদি মারামারি করতে পারো তাইলে পালাগানে কি সমেস্যা?”
আদরীনি সুচ কাঁথায় গুজে সুরুজের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বললো-
__”কার লগে কবে মারামারি করচি আমি হ্যাঁ ?”
__”ম্যালায় গিয়া চুড়িওয়ালার লগে তো পারলে মারামারি শুরু করছিলা। ভাইগ্য ভালা আমি বাঁচাইছি।”
__”কারে বাঁচাই ছিলা?”
__”চুড়িওয়ালারে।”
__”সেই কারণে তোমার উপর গোস্যা আছে আমার অহনো।”
__”ক্যা?”
__”ঐ হারামজাদারে মারতে পারি নাই তোমার লাইগা তাই।”
__”চুড়ি পরাইনার লাইগা হাতখান ধরছিল তাই বইলা মারবা ডাকাত মাইয়া?”
__”আমি কি চুড়ি পরতে পারি না? তার হাত ধইরা পরাইতে হইবো? ব্যাক্কল লোকটা।”
আদরীনির কথা শুনে সুরুজ শব্দ করে হেসে বললো-
__”হেই ব্যাডা তো আর জানতো না যে এই হাতখান একটা দস্যি ডাকাত মাইয়ার। তয় অমন ঘটনা না ঘটলে তোমার লগে আমার বিয়াও হইতো না। সেই দিনই তো তোমারে পয়লা দেখছিলাম। মাইয়া মাইনষের চন্ডীরূপ দেইখা আমি তো অবাক হইছি। পাশের গায়ে চন্ডী থাকে আর সুরুজ তা জানতোই না।”
__”ম্যালা হইছে অহন ঘুমাও। ভোরে উইঠাই তো ক্ষেতে দৌড়াইবা।”
সুরুজ রোমান্টিক দৃষ্টিতে তাকিয়ে করুণ স্বরে বলল-
__”তোমার মুখের দিকে তাকাইলে ঘুম আসে না গো চন্ডী বউ।”
__”আইচ্ছ্যা হ্যারিকেন নিভাইয়া দিতাছি, মুখের দিকে তাকাইতে হইবো না।”
__”তোমার খ্যাঁতা সেলাইয়ের কি হইবো তাইলে? আন্ধারেই সিলাইবা নাকি?
__”আমিও ঘুমামু অহন। খ্যাঁতা কাইল সিলাই করুম।”
__”আরেকটু কথা কই না! এমন চন্ডী চন্ডী ভাব দেখাও ক্যা?”
__”একটা কথা কই রইচের আব্বা?”
__”কও”
__”আব্বায় অনেক দিন ধইরাই খবর দিতাছে। আইজ যাই, কাইল যাই কইরা দুই মাস গেলো। আব্বারে দেখতে যামু? রইচও চাইতাছে নানার বাড়ি গিয়া কয়ডা দিন থাকবো।”
সুরুজ চোখ কপালে তুলে বলল-
__”কয় দিন থাকবো মানে? বিয়ানবেলা যাইবা সাঁঝবেলা ফিরবা। রাইত থাকনের কাম নাই।”
__”ক্যান?”
__”সারাদিন খাইটা আইসা বউ ঘরে না থাকলে দম আটকাইয়া আসে গো বউ।”
__”কী সব অলক্ষইনা কথা কও তুমি?”
__”ঠিকই কই।”
__”চুপ যাও, আর এই সব কথা মুখে আনবা না। আল্লাহ তোমারে হাজার বছর হায়াৎ দিক।”
“শুভ রাত” বলে ঘুমাতে না গেলেও রাতটা ওদের শুভই হয়। সুরুজ আদরীনিকে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আর আদরীনি রইচের মাথায় হাত বুলায়। ছেলে তার মাস্টার হবে। ছাতা মাথায় দিয়ে পাঞ্জাবি পরে রাস্তায় হাঁটবে। সবাই তাকে সালাম দিয়ে বলবে, “মাস্টার সাব ভালা আছেন?” এই সব ভাবতে ভাবতেই চোখ এটে এলো আদরীনির।

সকালে ঘুম থেকে উঠে উঠোন ঝাড়ু দিতেই সুরুজের বাবা বারান্দায় এসে বসতে বসতে বললেন-
__”মা পিঠা বানা তো! বেশি কইরা খেজুর গুড় দিয়া ভাপা পিঠা।”
একগাল হেসে আদরীনি বলল-
__”আইচ্ছ্যা আব্বা।”

হাতমুখ ধুয়ে এসে পিঠা বানাতে বসলো সে। সুরুজের মা পানের বাটা নিয়ে স্বামীর পাশে বসতে বসতে বললেন-
__”খবর পাইছি ভাইজান নাকি বেজায় অসুস্থ। তারে দেখতে যাওন লাগবো। তুমি কী কও সুরুজের আব্বা?”
__”কওনের কী আছে? আমিও যামুনে তোমার লগে।”
__”তুমি আমার লগে থাকবা তো?”
__”থাকুম ক্যা? রোগী দেখতে যামু, দেইখা চইলা আসুম।”
__”তাইলে তুমি চইলা আইসো, আমি দুই দিন পর আসুম।”
__”ক্যা? দুই দিন থাইকা কী করবা?”
__”ভাইজানের অসুখ তাই।”
__”তুমি কব্রিজ নাকি যে রোগীর কাছে দুই দিন থাইকা তারে নিরোগ করবা?”
__”চোখের সমুখে থাকুম। ভাইজানের ভালা লাগবো।”
__”দেখো সুরুজের মা, তোমার ভাইয়ের বাড়ি খুব দূরে না, চাইলে দৈনিক যাইতে পারবা, তাই থাকনের চিন্তা কইরো না। আমার লগে যাইবা আর আমার লগেই ফিরবা। দরকার হইলে পরের দিন আবার যাইবা।”
__”এইডা কেমন কথা কইলা?”
__”ঠিকই কইছি।”
__”চিরকাল তুমি আমারে বাপের বাড়িতে গিয়া থাকতে দাও নাই, অহন বয়স হইছে, আহন বাড়িত পোলার বউ রইছে সব দেখনের লাইগা অহন তোমার কি সমেস্যা?”
__”সমেস্যা কি ব্যাকের সমুখেই কমু?”
সুরুজের মা কেমন যেন লাজুক চোখে আদরীনির দিকে তাকালেন। আদরীনি অবাক হলো। শাশুড়ি মা লজ্জা কেনো পাচ্ছে সেটা সে বুঝে পেলো না। অনেক ভেবে ভেবে সে বের করলো, সুরুজের বাবারও বোধহয় বউ ছাড়া ঘরে দম আটকে আসে। সে মনে মনে বললো, “বাপ ব্যাটায় এক কিচিমের। ফারাক হইলো বাপে কিচ্চা পারে আর পোলায় অকর্মা।”

আদরীনি বলে কয়ে সুরুজের থেকে দুই দিন বাপের বাড়ি থাকার অনুমতি নিয়ে সকালে বাপের বাড়ি গেল। সবাই তাকে দেখে খুশি, আর সেও তাদের দেখে খুশি। সারাটা দিন ভালো কাটলেও রাতে ঘুম এলো না তার। বারবার স্বামীর মুখটা তার চোখে ভেসে উঠল। আর কানে বেজে উঠল, “বউ ঘরে না থাকলে দম আটকাইয়া আসে।” এসব ভেবে ভেবেই সে অস্থির হয়ে গেল। তার মনে হলো সন্ধ্যায় স্বামীর বাড়ি ফিরে গেলেও হতো। কী এমন আছে এখানে যে দু দিন থাকতে হবে?

বাপের বাড়িতে কিছু নেই বুঝলাম কিন্তু স্বামীর বাড়িতেই বা কী এমন আছে মেয়েদের? বাবা মায়ের চেয়ে কী বেশি আপন কেউ স্বামীর বাড়িতে আছে যে, একরাত বাপের বাড়িতে না থাকা গেলেও বছরের পর বছর স্বামীর বাড়িতে থাকা যায়?

আদরীনিকে ছাড়া সুরুজের চোখেও ঘুম এলো না। এত বছর ধরে বিয়ে করেও আদরীনি তার কাছে পুরোনো হয়নি। আজও তার চোখে ভাসে চৈতালী মেলায় আদরীনিকে প্রথম দেখার মুহূর্ত।
সুরুজ আর আদরীনিদের বাড়ি পাশাপাশি গ্রামে। অনেক বছর আগে তখন আদরীনি সবে বড় হচ্ছে, কিশোরীও বলা যায়। গ্রামের কোনো মেলাই সে বাদ রাখে না। প্রতিটা মেলাতে তার যেতে হবেই হবে। গ্রামের চৈতালী মেলাতে সে তার বান্ধবীকে সাথে নিয়ে গেলো। নাগরদোলায় চড়ে হাওয়াই মিঠাই খেয়ে তারা গেলো চুড়িওয়ালার দোকানে। পরনের আটপৌরে লাল টুকটুকে শাড়ির সাথে মিলিয়ে সে লাল রেশমি চুড়ি পছন্দ করলো। চুড়িওয়ালা কিছু চুড়ি এক হাতে নিয়ে আরেক হাত দিয়ে আদুরীনির হাত ধরলো। আদরীনি বিদ্যুতের বেগে ঝটকা দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিলো। তারপর ওর মুখে খই ফুটতে শুরু করলো। সে চিৎকার করে বললো-
__”শয়তান ব্যাডা মাইয়া দেখতেই হাত ধরতে মন চায়? বুইড়া খাডাস! দেইখা তো মনে হইতাছে ঘরে বউ পোলা মাইয়া নাতি পুতি সব আছে। নাতনির বয়সী একটা মাইয়ার হাত ধরতে শরম করলো না?”
চুড়িওয়ালা হাবলার মতো হা করে চেয়ে রইলো তার দিকে। কিন্তু আদরীনির মুখ বন্ধ হলো না।
__”আইজ তরে আমি কিলাইয়াই মাইরা ফ্যালামু।”
কথাটা বলেই আদরীনি তার বান্ধবীকে বলল-
__”ঐ রোকেয়া ব্যাডারে কিছু কস না ক্যা?”
রোকেয়া ভয়াতুর মুখ করে বলল-
__”থাউক আদরি, ছাইড়া দে।”
__”আমার হাত ধরছে এই ব্যাডা, এ্যারে তো ছাড়ুম না।”
হট্টগোলে অনেক লোক জড়ো হলো। ভিড় ঠেলে সুরুজ সামনে গেলো। আদরীনির কান্ড দেখে সে অবাক হবে নাকি ভয় পাবে তা বুঝে পেলো না। আদরীনি আর চুড়িওয়ালার মাঝখানে দাড়িয়ে সে বলল-
__”আরে আরে করো কী? করো কী মাইয়া?”
আদরীনি চন্ডী দৃষ্টিতে সুরুজের দিকে তাকিয়ে বলল-
__”কী করি?”
__”মুরব্বী মানুষরে মারবা নাকি?”
__”বদ লোকের বয়স আছেনি? আর তুমি এইহানে পরামানকি করতাছো ক্যা? এইডা তোমার বাপ লাগে নি?”
__”মাইয়া মাইনষের এতো তেজ এই পয়লা দ্যাখলাম।”
__”ক্যান মাইয়া মানুষ কী মানুষ না? তোমার ঘরের মা বৈন কী মানুষ না? সব তেজ কী তোমাগোই থাকতে হইব?”
__”আইচ্ছ্যা বাবাহ আমার ভুল হইছে। এই লোকটারে মাফ কইরা দাও।”
__”মাফ করুম না, এই ব্যাডায় আমার হাত ধরলো ক্যা? ক্যা ধরলো? ক্যা ধরলো?”
__”আর ধরব না, দোহাই লাগে মাফ কইরা দেও।”
আদরীনি মুখ ভেংচি কেটে রোকেয়ার হাত ধরে হনহন করে চলে গেলো। সুরুজ হা করে চেয়ে রইল। এরপর সে আদরীনির খবর নিলো। সে পাশের গাঁয়ের সুখচাঁনের মেয়ে। একটু চন্ডী আর দস্যি টাইপের মেয়ে সে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। আদরীনির সম্পর্কে সব জেনে ভালোলেগে যায় সুরুজের। সে বিয়ে করতে চায় আদরীনিকে। কিন্তু বাড়িতে নিজে মুখে নিজের বিয়ের কথা বলতে সে লজ্জা পায়। একদিন সে সব লজ্জা জলে ঢেলে তার মাকে বলল-
__”মা তোমার বয়স হইছে, আর কত দিন সংসার সামলাইবা?”
__”কি কইতে চাইস সোজা কইরা ক।”
__”মা পাশের গাঁয়ের একটা মাইয়ারে আমার পছন্দ।”
সুরুজের মা ছেলের মুখে বেশরম কথা শুনে অবাক হলেও খুশি হলো। ছেলে তার বিয়ে করতে চায়, নিঃসন্দেহে এটা খুশিরই কথা। সুরুজের বাবা বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় আদরীনির বাবার কাছে। তারপর বিয়েটাও হয়ে গেল সহজ সরল ভাবেই। দেখতে দেখতে সেই বিয়ের দশ বছর পেরিয়ে গেছে। এসব ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেল সুরুজ।

ভোরবেলা আদরীনি বাপের বাড়ি থেকে চলে এলো। স্বামীর জন্য তার পরাণ পুড়ে কয়লা হয়ে গেলো তাই ভোর বেলাতেই ছুটে এলো সে। ভোরবেলায় চোখের সামনে আদরীনিকে দেখে সুরুজ খুব অবাক হলেও খুশি হলো। সে বলল-
__”তোমার তো কাইলকা আহনের কথা, আইজকাই আইলা যে?”
__”কাম আছে তাই।”
__”কী কাম?”
__”তোমারে কমু ক্যা?”
__”সুয়ামী ছাইড়া থাকতে পারো না এইডা কইতে পারতাছো না, তাই তো?”
__”উহু, এইডা না।”
__”তাইলে?”
__”কমু না।”

সন্ধ্যায় আদরীনি ভালো একটা শাড়ি বের করে পরলো। মাথায় সুগন্ধি তেল মেখে ফিতা দিয়ে চুল বাঁধলো। সন্ধ্যায় সুরুজ বাড়ি ফিরে বউকে দেখে তো অবাক।
__”সাজচো যে? হঠাৎ কী মনে কইরা?”
__”শুনলাম আইজও নাকি পালাগান হইবো।”
সুরুজ খুশি চোখে বলল-
__”তুমি হাচাই যাইবা রইচের মা?”
__”মিছা মিছা যাওন যায় নাকি?”
রাতে ওরা পালাগান দেখতে গেল। আদরীনি বড় করে ঘোমটা দিয়ে আছে যেন কেউ তাকে চিনতে না পারে। হঠাৎ একটু দূরে তার দৃষ্টি পড়তেই সে দেখলো সুরুজের বাবা আর মা বসে পালাগান দেখছে। আদরীনি অবাক হলো আবার খুশিও হলো। আসলে ভালোবাসা তো কখনও প্রবীন হয় না, ভালোবাসা কখনও পুরোনো হয় না, ভালোবাসার তো কখনও বিয়ে হয় না। সব বয়সের মানুষগুলোর ভালোবাসা এমনই অনুভূতি ঘেরা। যৌবন শেষ হয়ে গেলেও মনের ভালোবাসা থেকে যায় অন্য কোনো রূপে, অন্য কোনো রঙে।
#সমাপ্ত

Written by- Sazia Afrin Sapna

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here