বসন্ত এসে গেছে পর্ব-৩+৪+৫

0
98

গল্পঃবসন্ত এসে গেছে
লেখাঃনুশরাত জেরিন
৩.৪.৫
পর্বঃ৩
—একটা কথা রাখবে নোমান?

—হুমম, বলো।

—বিয়েশাদি করে সংসারি….

আরমান খানের কথার মাঝেই বলে উঠলো নোমান,

—স্টপ ইট বাবা।আমি কোন বিয়ে টিয়ে করতে পারবোনা।

—কিন্তু কেনো?

নোমান কপাল কুঁচকে তাকালো আরমান খানের দিকে।পরক্ষনে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে কাঠ কাঠ গলায় বললো,

—কেনোর কোন উত্তর নেই।বিয়ে করবো না মানে করবো না।

আরমান খান আশা ছাড়লেন না।ফের প্রশ্ন ছুড়লেন,

—না করার কোন কারন তো বলো।

নোমানের চোখটা যেনো জ্বলে উঠলো।আগুনের শিখার মতো দাউদাউ আগুন চোখ ফুটে বেরোতে চাইলো যেনো।
আরমান খানের দিকে কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললো,

—কি দরকার সেই জিবনসঙ্গীর যে কিনা অসুস্থ হলে অন্যজন তার পাশে না থেকে,সেবা করে সুস্থ করার চেষ্টা না করে ছুড়ে ফেলে দেয়?কি দরকার সেই জীবনসঙ্গীর যার অসহায়ত্বর সময় তাকে ফেলে অন্যকারো হাত ধরা যায়?
বিয়ে মানে তো জন্ম জন্মান্তরের বন্ধন তাই না বাবা?এটা কি সত্যি নাকি শুধু কথার কথা?নাকি অভিনয়?
কি দরকার শুধু শুধু এই মিথ্যা নাটকের?জন্ম জন্মান্তর দুরে থাক যাকে এক জন্মেই তাকে ভুলে অন্য কাউকে নিয়ে জিবন শুরু করা যায়,কি দরকার সেই মিথ্যা সম্পর্কে জড়ানোর?

আরমান খান মাথা নিচু করে বসে থাকেন।এই একটা ভুলের জন্য তিনি ছেলের চোখে কতোটা নিচে নেমে গেছেন সেটা তিনি বুঝতে পারেন।
এসব কথা শোনার পর আর কোন কথা বাড়াতে ইচ্ছে হয়না তার।

,
খা খা রোদ্দুর মাথার ওপরে কড়া নাড়ছে।পথ ঘাট শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে।
বাতাস দুরে থাক গাছের একটা পাতাও যেনো নড়ছেনা।

অপু ফিরছে ভার্সিটি থেকে।
হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে তার।এতো গরমে জিবন ওষ্ঠাগত হয়ে আছে।এতোটা পথ হাঁটতে হাঁটতে আরও হাপিয়ে উঠেছে।রিকশা ডাকার ইচ্ছে হলেও ইচ্ছেটাকে প্রাধন্য দিচ্ছে না অপু।

রিকশা চড়ে টাকা ওড়ানোর মতো শৌখিন সে নয়।
টিউশনির সামান্য টাকায় পড়াশোনার খরচ,মায়ের ঔষধপত্রের খরচসহ যাবতীয় টুকটাক খরচ করতে হয় তাকে।অপুর ভাই শুধু খাওয়া বাদে কোন রকম ব্যায় বহন করে তাদের।

এসবের ভেতর রিকশায় ওঠার মতো বাড়তি খরচ সে করতে চায়না।

এই মধ্যদুপুরের গরমে হাসফাস করতে করতে জোরে জোরে পা চালায় সে।
গরমে শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার হয়েছে।পেছনের জামার কাধ ভিজে চুপচুপ।
রাস্তায় হেটে চলা লোকদের ভেতর কেউ কেউ আড়চোখে তাকাচ্ছে সে দিকে।

ব্যাপারটা বোধগম্য হতেই অপু আরও দ্রুত পা চালায়।

,
পেছন থেকে গাড়ির শব্দ পেছন ঘুরে তাকায় ঠিক তখনি ঘটে অঘটন।
সামনের ইটের টুকরোয় হোচট খায় সে।
এবং সাথে সাথেই ফট করে স্যান্ডেল টা ছিড়ে যায়।
অপু অসহায় দৃষ্টিতে স্যান্ডেলটা দেখে।
সেলাই করা কমদামি স্যান্ডেলটা ছেড়াতে অপুর দুঃখ আকাশ সম ভর করে।মাসের মাঝে এসে এমন অঘটন হতে হলো?
অপু ভেবেছিলো মাসটা কোনমতে এই স্যান্ডেলটা দিয়েই কাটাবে,সামনের মাসে টিউশনির টাকা পেলে একটা নতুন স্যান্ডেল কিনবে।
কিন্তু কি হলো এটা?
এখানে স্যান্ডেল সেলাই করা দোকানই বা কোথায় পাবে?
পুরোটা পথ কি সে খালি পায়ে যাবে।
মুহূর্তে সমস্ত রাগ গিয়ে পরে গাড়িওয়ালার ওপর।
কেন সে পেছন থেকে ওতো জোড়ে হর্ন বাজাবে?
তাহলে তো আর অপু পেছন ফিরে তাকাতো না?
স্যান্ডেলটাও ছিড়তো না।
তেড়ে এগিয়ে যায় গাড়ির দিকে।জানালায় পরপর কয়েকদফা টোকা দেয় অপু।
ড্রাইভার সামনের কাচ নামিয়ে উঁকি দেয়,বিরক্তি মাখা মুখ করে বলে,

—কি হয়ছে,কি চাই?

—হর্ন কেন বাজায়ছেন?

ড্রাইভার অবাক হয়ে বলে,

—আরে কি আশ্চর্য,হর্ন বাজায়ছি তাতে কি হয়ছে?

অপু আবার বলে,

—বিনা কারনে হর্ন বাজিয়ে ভয় কেনো দেখায়ছেন আমায়?আমি কি আপনার গাড়ির সামনে আসছিলাম?আপনার জন্য আমার স্যান্ডেলটা ছিড়ে গেলো।

ড্রাইভার কিছু বলার আগেই গাড়ির ভেতর থেকে গম্ভীর কণ্ঠে কেউ ড্রাইভারকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,

—এতো ফালতু কথা কেনো বলেন জহির।যা ক্ষতি হয়েছে টাকা দিয়ে পুষিয়ে দিন।

কন্ঠ টা শুনে অপু চমকে ওঠে।এমন গম্ভীর রাগী কন্ঠ কোথায় যেন শুনেছে সে।কিন্তু কোথায় শুনেছে সেটা ঠিক মনে করতে পারেনা।
তারআগেই মাথায় আরেকটা কথা আসে।
লোকটা তাকে টাকা দিতে চেয়েছে?অপুকে কি ফকির মনে হয়?কতো অহংকারী লোক রে বাবা।এইজন্যই অপু বড়লোকদের দেখতে পারেনা।

অপু চোখ ছোট করে কাচ ভেদ করে ভেতরে থাকা মানুষটাকে দেখার চেষ্টা করে,কিন্তু ব্যার্থ হয়।

হাতে থাকা ছোট ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে আতকে ওঠে।
টিউশনির টাইম পেরিয়ে যাচ্ছে। দেরি করলে মাস শেষে বেতন কাটা যাবে তার।
সাতপাঁচ না ভেবে হাতে স্যান্ডেল ঝুলিয়ে খালিপায়েই হাটা শুরু করে সে।

,
গাড়ির কাচটাকে সামান্য নামিয়ে সেদিকে একবার চোখ রেখে আবার কাচ তুলে দেয় নোমান।
মুখে বিরবির করে,

—যত্তসব ছোটলোক।

গল্পঃবসন্ত এসে গেছে
লেখাঃনুশরাত জেরিন
পর্বঃ৪

টিউশনি শেষ করে ফিরতে ফিরতে সন্ধা হয়ে এসেছে।
আসেপাশে মানুষের আনাগোনা কমতে শুরু করেছে।অপু দ্রুত হাটার চেষ্টা করে কিন্তু ছেড়া স্যান্ডেলের জন্য গতি বাড়াতে পারেনা।খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যতো তাড়াতাড়ি পারে হাটার চেষ্টা করে।
এদিকে পেট বারবার জানান দেয় ক্ষুধার পরিমান।পেটে ইদুর বেড়াল সব একসাথে যেনো মহাযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে।
সেই যে সাত সকালে যেমন তেমন করে কিছু মুখে দিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিলো আর এপর্যন্ত একটা দানাও পেটে পরেনি তার।
গলির রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তা ধরে অপু।গলির মোড়ে বখাটে কিছু ছেলে অপুকে দেখে শিষ বাজানো শুরু করে,উল্টা পাল্টা গান গায়।বাজে ইঙ্গিত দেয়।
অপু চোখ মুখ শক্ত করে সামনে এগোয়।
এসব ছেলেদের কাজই রাস্তায় দাঁড়িয়ে থেকে যাতায়াত রত মেয়েদের বিরক্ত করা।
এদের পাত্তা না দেওয়াই ভালো।
আবার প্রতিবাদ করারও জো নেই।
এরা এলাকার প্রভাবশালী নেতার ছেলে আর তার চেলাপেলা।
এদের কিছু বলতে যাওয়া মানে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।

,

অপু আরেকটু সামনে এগোনোর পর কিছু মানুষের জটলা দেখে।একবার ভাবে এড়িয়ে যাবে,পরমুহূর্তেই মনে কৌতূহল দানা বাঁধে।
কি জন্যে মানুষের ভিড় লেগেছে দেখার জন্য এগিয়ে যায়।
কয়েকজনকে পাশ কাটিয়ে সামনে উঁকি দেয়।

একটা বয়স্ক লোককে গাড়ির পাশে মুখ থুবড়ে পরে থাকতে দেকে আঁতকে ওঠে।

লোকটা নিশ্চই এক্সিডেন্ট করেছে ভেবে এদিক ওদিক তাকায় অপু।
এতো এতো মানুষ দাড়িয়ে আছে এখানে কিন্তু কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছে না?
তাহলে ভিড় লাগিয়ে কি করছেটা কি সবাই?সার্কাস দেখছে নাকি লোকটার মৃত্যুর অপেক্ষা করছে?
অপু পাশে দাড়িয়ে থাকা একটা লোককে ডেকে বলে

—এই যে ভাই,ওনাকে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করছে না কেন কেউ?

লোকটা বললো,

—পুলিশ কেস এটা।পুলিশ না আসলে কেউ হাতও লাগাবেনা।

অপু উত্তেজিত হয়ে বললো,

—কিন্তু ততক্ষণে যদি লোকটার কিছু হয়ে যায়?

দাড়িয়ে থাকা লোকটা অপুর আপাদমস্তক একবার ভালো করে দেখে বললো,

—আপনার এতো মায়া লাগে কেন?আপনার চেনা কেউ?

—আপন বা চেনা না হলে বুঝি কারও প্রতি মায়া দেখানো যাবেনা?

লোকটা এবার বেশ বিরক্ত হলো।

—এতো মায়া লাগলে আপনি কেন হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন না?

অপুও তেজ দেখিয়ে বললো,

—আমিই নিয়ে যাচ্ছি।আপনাদের মতো মনুষ্যত্বহীন আমি নই।

রাস্তায় চলাচল রত এক সিএনজি দাড় করিয়ে আরও কয়েকজন লোকের সাহায্য নিয়ে অসুস্থ লোকটাকে সিএনজিতে টেনে তুললো অপু।
সিএনজি চালক কে পাশের হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলে অপুও উঠে বসলো।

,
—-স্যার স্যার।

কর্মচারী লোকটার আকস্মিক চিৎকারে কিছুটা চমকে উঠলো নোমান।সে তার রুমে সোফায় বসে লেপটপে অফিসের প্রয়োজনীয় কাজ সারছিলো।এমন সময় সচারাচর কেউ নোমানকে বিরক্ত করেনা।কড়া নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে তার।এ সময় অফিসের যাবতীয় কাজ সারে নোমান।অফিসেও কাজ করে আবার বাড়িতেও বাড়তি কাজগুলো সম্পাদন করে সে।
এভাবে চিৎকার করে মনযোগ নষ্ট করায় কর্মচারী ছেলেটার উপর বেশ বিরক্ত হলো নোমান।
তারচেয়েও বেশি বিরক্ত হলো নক না করে রুমে ঢুকে পরায়।
লেপটপ বন্ধ করে পাশের সেন্টার টেবিলে রেখে থমথমে মুখ নিয়ে ছেলেটার দিকে তাকালো নোমান।

এক তাকানোতেই ছেলেটা যা বোঝার বুঝে নিলো।
আবার রুমের বাইরে ফেরত গিয়ে দরজায় নক করে উকি দিয়ে বললো,

—আসবো স্যার?

নোমান চেহারায় আরো কঠোরতা এনে বললো,

—না।

ছেলেটা অপ্রস্তুত হলো।রুমে ঢোকার পারমিশন চাইলে কেউ যে মুখের ওপর না বলে সেটা তার জানা ছিলো না।

আমতা আমতা করে বলে,

—কেনো স্যার?

নোমান দু-হাত বুকে ভাজ করে শরীর সোফায় এলিয়ে দিয়ে বলে,

—প্রথমবার তো পারমিশন না নিয়েই রুমে ঢুকেছিলেন,এবার নাহয় পারমিশন নিয়ে রুমের বাইরে থাকুন।

ছেলেটা অসহায় দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলে,

—কিন্তু একটা জরুরি খবর বলবো স্যার।খবরটা খুব জরুরি তাই উত্তেজনায় না বলে রুমে ঢুকে পরেছিলাম।

—কি এমন জরুরি কথা?ভেতরে আসুন।তারপর বলুন।

ছেলেটা রুমে ঢুকে বললো,
—আপনার বাবা এক্সিডেন্ট করেছেন স্যার।

নোমান তড়িৎ গতিতে উঠে দাড়ালো।

—কিন্তু বাবা তো বাসায় ছিলো।অসুস্থ তো তিনি।
আমি কাল দেখা করে এলাম।

একটু থেমে আবার বললো,

—কোথায় যাচ্ছিলেন বাবা?

—আপনার ফ্লাটে নাকি আসছিলেন।

—আমার ফ্লাটে? কিন্তু কেনো?

—আমি জানিনা স্যার।

—কোন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে,ঠিকানাটা বলুন।

ছেলেটা ঠিকানা বলার সাথে সাথে বিছানার পাশ থেকে জ্যাকেটটা তুলে পরতে পরতে বেড়িয়ে পরলো নোমান।

গল্পঃবসন্ত এসে গেছে
লেখাঃনুশরাত জেরিন
পর্বঃ৫

,

,
অপু মেজাজ সপ্তমে উঠিয়ে হাসপাতালের করিডোরের চেয়ারে বসে আছে।
এই মুহুর্তে অপুর মনে হচ্ছে নিজের চুল টেনেটেনে ছিড়তে।নয়তো পাশের কাউকে ডেকে বলতে ইচ্ছে করছে,আমার গালে জোরে জোরে থাপ্পড় মারুন তো।ততক্ষণ ধরে মারুন যতক্ষণ না গাল ফেটে রক্ত বের হচ্ছে।
পারলে মারতে মারতে আমায় মেরে ফেলুন।পেছনে বড় সাইনবোর্ড টানাতে ইচ্ছে হচ্ছে। সাইনবোর্ডে লিখে রাখবে আমি হলাম গাধা,বিশ্ব গাধা।আমাকে সবাই গাধা বলে ডাকুন।

কিন্তু এটা সম্ভব নয় বিধায় অপু রাগে কিড়মিড় করছে।নিজেকে নিজে বকতে বকতে গালির রেকোর্ড তৈরী করে ফেলেছে।

এখন বাজে রাত নয়টা।এতো রাতে বাড়ির বাইরে বসে মশা মারতে মোটেও ভাল লাগেছেনা।কিন্তু কি করবে?সে তো দয়ার রানী হতে গেছিলো?নয়তো এমনভাবে কেউ ঝামেলায় ফাঁসে?
এত্তো এতো লোক ছিলো রাস্তায়, কই কেউ তো নিজে যেচে ঝামেলা ঘারে নেয়নি,তাহলে অপুই কেনো নিলো?কেনো?ওই ওই লোকটার জন্য?যে রাস্তায় অপুকে রাগিয়ে দিয়েছিলো তার জন্য?

,
তাছাড়া শুধু বসে থাকলেও অপু রাগতো না।রাগার কারন অন্য।
মায়ের ঔষধ ফুরিয়ে গেছে,অপুর ইয়ার ফাইনাল পরিক্ষার ফিস জমা দিতে হবে।অনেক বলে কয়ে ছাত্রীর মার কাছ থেকে অগ্রীম টাকা এনেছিলো আজ,আর সেই টাকাটা কিনা হাসপাতালে জমা দিতে হলো?
যতো যাই হোক অসুস্থ লোকের কাছে তো আর চিকিৎসার টাকা চাইতে পারেনা অপু।
এখন নিজের কপাল চাপড়ানো ছাড়া আর কোন উপায় নেই তার কাছে।কি করবে এখন?টাকা ম্যানেজ করবে কোথা থেকে?পরিক্ষার ব্যাপারটাও চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ মায়ের ঔষধ।সেটাই বা কোথায় পাবে?ভাই তো আর দেবেনা।

,
ভাবনার মাঝে নার্স এসে বলে উঠলো,

,
—রোগী আপনার সাথে দেখা করতে চায়।

অপু উঠে দাড়ালো।রাত অনেক হয়েছে।বাড়ি ফিরতে হবে তাকে,যাওয়ার আগে লোকটার সাথে একবার দেখা করে নেওয়াটাই ভালো।
তাছাড়া এক্সিডেন্টটা বেশী গুরুতর ছিলো না।মাথায় আঘাত লাগার কারনে লোকটা অজ্ঞান হয়ে পরেছিলো,আর হাতে পায়ে একটু আধটু ছুলে গেছে এই যা।

,

কেবিনের সামনে এসে দরজার কাছে দাড়ালো অপু।
আরমান খান বেডে আধশোয়া হয়ে আছেন।
অপুকে দেখে হাত দিয়ে ভেতরে ঢোকার ইশারা করলেন।
ইশারা পেয়ে অপু গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলো।বেডের পাশে দাড়াতেই আরমান খান বললেন,

—দাঁড়িয়ে আছিস কেন মা,বসে পর।

এতক্ষণ যতোটুকু খারাপ লাগা বা রাগ অপুর মাঝে ছিলো তা হুট করে যেনো গায়েব হয়ে গেলো।ভেতরে ভর করলো একরাশ ভাললাগা।মা ছাড়া কেউ কোনদিন অপুকে এতো ভালবেসে সম্মোধন করেছে কিনা অপুর মনে নেই।অচেনা অজানা লোকের কাছে এমন আদরমাখা সম্মোধন শুনে অপুর চোখ ভরে এলো।

আরমান খান বললেন,

—তুই করে বললাম বলে রাগ করেছিস?

অপু নিজেকে সামলালো।হুট করে এতোটা আবেগী হয়ে ওঠা মানায় না তাকে।তাছাড়া লোকটা অপুর চোখে পানি দেখলে কি ভাববে?

নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,

—না না।

আরমান খান হাসলেন।অপুর মাথায় মমতামাখা হাত বুলিয়ে দিলেন।বললেন,

—তোকে দেখেই আমার মা বলে ডাকতে ইচ্ছে হলো,আর যাকে মা বলে ডাকতে ইচ্ছে হলো তাকে তুমি বা আপনি বলতে ইচ্ছে করলো না।

অপু উত্তর না দিয়ে মাথা নিচু করে মুচকি হাসলো।

আরমান খান আবার বললেন,

—তোর হাসিটাও আমার মায়ের মতো জানিস?আচ্ছা দুটো মানুষের এতো মিল হয় কোনদিন?

—জানিনা তো।

—তোর নাম কি রে মা?

—অপরুপা।

—অপরুপা?বাহ ভারি মিষ্টি নাম।
রাত তো অনেক হলো তুই বাড়ি যাবিনা।আমার জন্য তোকে এতোরাত হাসপাতালে থাকতে হলো।

অপু হাত ঘরির দিকে তাকিয়ে বললো,

—হ্যা এখনি যাবো।

—একা একা যেতে পারবি?

—হ্যা পারবো।আমার কোন সমস্যা হবেনা।

আরমান খান কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেন।
ব্যাপারটা চোখে পরলো অপুর।
বললো,

—আপনি কি কিছু বলবেন?

আরমান খান মৃদু হাসলেন।মেয়েটার স্বভাব ও দেখি তার মায়েরই মতোন।মুখ দেখেই বুঝে ফেলেছে যে সে কিছু বলতে চায়।

—তোর ঠিকানাটা দিবি মা?না মানে একটু যোগাযোগ করতাম আরকি।

অপু কথা বাড়ালো না ঠিকানাটা একটা কাগজে লিখে দিলো।
হাসিমুখে বিদায় জানিয়ে বেরিয়ে পরলো।

,
,
হাসপাতালে পৌছেই নাক মুখ কুঁচকে তাকালো নোমান।এটা কি হাসপাতাল?নোমান আসেপাশে তাকিয়ে আরও একদফা ভ্রু কুঁচকালো। পকেটে হাত দিয়ে রুমাল বের করে নাকে চেপে ধরলো সে।
দু আঙুল নিয়ে কপালে ম্যাসেজ করলো কিছুক্ষণ।
এই মুহুর্তে তার মেজাজ ঠান্ডা রাখতে হবে।হাসপাতালে কোনরকম সিনক্রেট করতে চাচ্ছে না সে।
নোমান ভেবে পায় না তার বাবা,নোমান খানের বাবা এমন একটা লো ক্লাস হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে?এটাকে কি হাসপাতাল বলে?চারদিকে নোংরা, গন্ধ।
এখানে রোগী সুস্থ হওয়ার বদলে তো আরও অসুস্থ হয়ে পরবে।
নোমানের সমস্ত রাগ গিয়ে পরলো তার ওপর,যে তার বাবাকে এখানে ভর্তি করিয়েছে।
কর্মচারী ছেলেটার কাছে শুনেছে তার বাবাকে একটা মেয়ে এখানে নিয়ে এসেছে।
সেই মেয়েটার কি কমনসেন্স বলতে কোন জিনিস নেই?
বিখ্যাত বিজনেস ম্যান নোমান খানের বাবা আরমান খানকে এই রকম একটা হাসপাতালে কি মনে করে ভর্তি করিয়েছে সে?
ভাল কোন হাসপাতাল কি ছিলো না?

,

নোমান রিসিপশনে গিয়ে আরমান খানের কেবিন নাম্বার শোনে।
মুখে রুমাল চেপে বাবার কেবিনে এগোয়।
আশেপাশের সুস্থ-অসুস্থ,নার্স,ডাক্তার সব লোক হা করে দেখে।নোমান খানকে কে না চেনে।এতো অল্প বয়সে নিজেই নিজের বিজনেসকে দেশের প্রথম কাতারে নিয়ে যাওয়া চাট্টি খানিক কথা তো নয়।
কিন্তু সেই নোমান খান এখানে?এই হাসপাতালে?কেনো?

,

,

কেবিলের দরজার সামনে দাড়িয়ে নোমান তার বাবাকে দেখে।মাথায়,হাতে পায়ে ব্যন্ডেজের চিহ্ন দেখে বুকটা মুচড়ে ওঠে তার।ভেতরের কষ্টগুলো চিনচিন করে ওঠে।যতই বাবা তার মাকে অসুস্থ অবস্থায় ফেলে অন্য মহিলাকে বিয়ে করুক,মায়ের মৃত্যুতে তাকে দেখতে না যাক।যতই তার রাগ থাকুক বাবার ওপর।
তবুও বাবা তো!
বাবার এই অবস্থা দেখে ছেলে হয়ে কষ্ট পাওয়াটাই স্বাভাবিক।
,

,

নোমান ধীর পায়ে এগোয় আরমান খানের দিকে।
বেডের পাশের চেয়ার টেনে বসতে যায়,আবারও কপাল কুঁচকে আসে তার।এটা কি চেয়ার?কি নোংরা।
ইতস্তত করে আবার বসে।বাবার জন্য এটুকু করতেই হবে তাকে।
চেয়ার টানার শব্দে আরমান খান চোখের ওপর থেকে হাত সরান।নোমানের মুখের দিকে তাকিয়ে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলেন।

,

নোমান হতভম্ব হয়ে যায়,এতোটা বছরে জিবনে সে তার বাবাকে কাঁদতে দেখেনি,উহু কখনোই দেখেনি।

আরমান খান নোমানের দুহাত নিজের মুঠোয় বন্দি করেন।
বলেন,

—আমার পাপের জন্য আমায় ক্ষমা করা যায়না নোমান?আমি আর এ বোঝা বয়ে বেড়াতে পারছিনা।নিজের ছেলের চোখে দোষী হয়ে থাকতে পারছিনা আমি।

নোমান কি বলবে খুজে পায়না।বললেই কি ক্ষমা করা যায়?এতোটাই কি সহজ?

আরমান খান আবার বলেন,

—এক্সিডেন্ট এর মুহুর্তে আমি ভেবেছিলাম আমি হয়তো মারা যাচ্ছি। তখন মাথায় একটা কথাই ঘুরছিলো আমি আমার ছেলেটার মনের একরাশ ঘৃনা নিয়েই পৃথিবী ছারবো?

,

নোমান কথা ঘোরানোর জন্য বললো,
—বাদ দাও এসব বাবা,আগে বলো তোমার শরীর এখন কেমন?

আরমান খান দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।

—কথা ঘুরাচ্ছো নোমান?
ক্ষমা করা যায়না না?সত্যিই তো আমি হলে কি ক্ষমা করতে পারতাম?
তবে একটা কথা কি জানো নোমান,প্রত্যেকটা কাজের পেছনে একটা কারন থাকে সেটা ভাল হোক বা খারাপ।

নোমান কথা বলে না।ফোন বের করে কাউকে কল করে।অন্য হাসপাতালে বাবার এডমিডের ব্যবস্থা করে।
বলে,
—এসব পুরোনো কথা থাক বাবা।তুমি চলো আমার সাথে।অন্য হাসপাতালে তোমার চিকিৎসা হবে।

—কেনো এখানে খারাপ কি?

—এখানে খারাপ কি বলছো বাবা?এখানে?এখানে ভালো কি সেটা তো দেখাও।

চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াতে যেতেই আরমান খান আবার নোমানের হাত ধরে।নোমান বলে,

—কিছু বলবে?

—আমার একটা কথা রাখবে নোমান?

—বলো।

—না না বলো রাখবে কথাটা।আমি বাবা হিসেবে তোমার কাছে এইটুকু চাইছি।আর কোনদিনও তোমার কাছে কিছু চাইবো না,কোন বিষয়ে জোর করবো না।
শুধু এই কথাটা তোমায় রাখতে হবে।
রাখবে?

নোমানের খারাপ লাগে।
বাবাদের এমনভাবে আকুতি মিনতি করা মানায় না।বাবাদের করতে হয় আদেশ।
সে বলে,

—আচ্ছা রাখবো।

আরমান খান উচ্ছাসিত গলায় বলেন,

—সত্যি?

—হুমমম।এবার বলো কথাটা।

আরমান খান পাশের সেন্টার টেবিল থেকে গ্লাস তুলে পানি খেয়ে গলা ভিজিয়ে নেন।
বলেন,

—বিয়ে করে সংসারি হও নোমান।

নোমান বোঝার ভঙ্গিতে মাথা দুলায়।বাবা যে এরকম কিছু বলবে সে বুঝেছিলো।

—তোমার কথা রাখতে বিয়ে করতে পারি বাবা,তবে সংসারি হতে পারবো কিনা বলতে পারছিনা।

আরমান খান বাচ্চাদের মতো লাফিয়ে ওঠেন।
নোমান তাকে সামলায়।বাবার ব্যবহার তার কাছে অদ্ভুত লাগে।
বৃদ্ধ হলে যে মানুষ বাচ্চা হয়ে যায় সেটা সে বোঝে।

চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here