জুয়াড়ি

0
45

রমনাপার্কে একটা বেঞ্চে চোখ বুজে কাউকে শুয়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। শামীম দূর থেকে লোকটা সম্পর্কে তার ধারণা করার চেষ্টা করছে। লোকটা সম্ভবত নেশাখোর। কারণ এরকম ত্রিশ পঁয়ত্রিশ বয়সী কেউ পার্কে অকারণে শুয়ে থাকে না শুধুমাত্র নেশাখোর ছাড়া। শামীম মানুষ সম্পর্কে খুব ভাল ধারণা করতে পারে না কারণ তার ছোটবেলা কেটেছে খুব খারাপ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। শামীম ধারনা করছে লোকটা অবিবাহিত। আরও দুইচারটা ধারণা করেছে যা লেখ্য ভাষায় মানানসই নয়। এগিয়ে গেল লোকটার দিকে। না, লোকটা ঘুমাচ্ছে না। গুনগুন করব গান গাইছে আর পা দোলাচ্ছে। ঘুমের মধ্যে পা দোলানো সম্ভব না।

-এক্সকিউজ মি ভাই, আপনার সাথে একটু কথা বলব।
-কী কথা?
-আপনি কী করেন?
-মানুষ আগে নাম জিজ্ঞেস করে, আর আপনি সরাসরি পেশায় চলে এলেন। ঘটকালি করবেন নাকি?
শামীম লোকটার সুক্ষ্ম অপমান বুঝতে পারেনি। হোহো করে হেসে বলল, আপনার সেন্স অব হিউমার দারুণ তো।

এরকম সস্তা প্রশংসায় লোকটার কোন প্রতিক্রিয়া নেই। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়। সিগারেটের প্যাকেটটা খালি। এই সুযোগ শামীম হাতছাড়া করল না। নিজের পকেট থেকে সিগারেট বের করে দিল। গোল্ডেন কালারে প্যাকেজ। তার উপর লেখা B&H.

“আপনার নাম কী?” প্রশ্ন করল শামীমকে।
-সাজ্জাদ শামীম।
-এটা কোন নাম হল? হয় সাজ্জাদ না হয় শামীম। দুইটা নামের বারোটা বাজিয়েছেন।
-আপনার নামটা?
-অনিমেষ। কী করেন আপনি?
-ছোটখাটো ব্যবসা।
-ছোটখাটো ব্যবসা বলে কোন ব্যবসা নাই। কিসের ব্যবসা?
-চামড়ার ব্যবসা। মানে ট্যানারি।
-চামড়ার ব্যবসা তো ছোটখাটো হয় না, বড়ই হয়।
-এই আর কী, আপনাদের দোয়া।
-আমি কারও জন্য দোয়া করি না।
-আপনি কী করেন, বললেন না?
-জুয়া খেলি।
শামীম অবাক হল। যতটুকু অবাক হল তারচেয়ে বেশি বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, কী বলেন?
-যা শুনেছেন, তাই বলেছি।
-এইটা কারও পেশা হতে পারে?
-না হওয়ার কী আছে?

শামীম কিছু বলতে যাবে তখন একটা পঁচিশ ছাব্বিশ বছর বয়সী একটা ছেলে এসে অনিমেষকে বলল, দাদা, চলেন। ব্যবস্থা হয়েছে।
অনিমেষ উঠে ছেলেটার সাথে হাঁটা ধরল। শামীমের সাথে কোন কথা বলল না। এই জীবনে এতটা অবাক হয়নি শামীম। হা করে তাকিয়ে আছে অনিমেষের পথের দিকে।

বেশ কয়েকদিন পর গুলশানে এক কাজে গেল শামীম। সন্ধ্যা হবে কিছুক্ষণ পর। গাড়িতে উঠতে যাবে তখন পাশে কাউকে দেখল পিছন দিক থেকে। আস্তে করে কাঁধে হাত রাখল। লোকটা পিছনে তাকিয়ে বলল, কেমন আছেন ট্যানারির মালিক? নামটা ভুলে গেছি।
শামীম বলল, আমি ভাল আছি। আর আমি শামীম। আপনি কেমন আছেন মি. অনিমেষ?
-ভাল।
-এখানে কী মনে করে?
-জুয়া খেলতে এসেছি।
-আপনার কী সময় হবে?
-কিসের জন্য?
-আপনার সাথে একটু কথা বলব।
কিছু একটা ভেবে মোবাইল বের করে কাউকে ফোনে বলল অনিমেষ, আজ পারব না। একটা মিটিংএ আছি।
তারপর শামীমকে বলল, চলেন।

গাড়ির পিছনের সিটে শামীম আর অনিমেষ বসে আছে। ড্রাইভারকে বলল, গান চালাও।
স্লো মিউজিকে ইংলিশ গান চলছে। আর দুজনেই আছে চুপচাপ। শামীম বুঝতে পারছে না যে কিভাবে কথা শুরু করবে।
-আচ্ছা, আপনি সত্যিই জুয়া খেলেন?
-হ্যাঁ।
-কোথায় খেলেন?
-ক্যাসিনোতে খেলি। আর আমাদের একটা জায়গা আছে, সেখানেও।
-কিভাবে খেলেন?
-আমি মূলত হায়ারে জুয়া খেলি।
-মানে?
-মানে হল, যার টাকা আছে, সে আমাকে নিয়ে খেলতে যায়। আমি খেলি আর সে টাকা দেয়।
-আপনার লাভ?
-জুয়া খেলে যা লাভ হয় তার ফিফটি ফিফটি।
-আর লস হলে?
-যার টাকা তার।
-আপনি হারজিতের হার কেমন?
-আমি কখনো হারিনি।
-সত্যি?
-একটা ঘটনা শুনুন। আমার জুয়াড়ি হওয়ার ঘটনা। গাড়িটা একটা চায়ের দোকানের সামনে থামতে বলুন।

গাড়ি ফুটপাতে চায়ের দোকানে থামল না। একটা থ্রি-স্টার হোটেলে গেল। সামান্য চা খাওয়ার জন্য এতটা আয়োজন না মূলত, অনিমেষের প্রতি শামীমের প্রবল আগ্রহেই আসা।

চা এসেছে। অনিমেষ বলল, এত বড় হোটেলে যেহেতু এসেছেন, তাহলে চা খাবো কেন? ড্রিংক করব।
-আপনি ড্রিংক করেন?
-আপনি করেন না?
-করি তো।
-তাহলে ব্যবস্থা করেন।

ততক্ষণে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত হয়ে গেছে। শামীম রুমে ড্রিংক অর্ডার করল। এক বোতল হুইস্কি, দুইটা গ্লাস, বরফ আর চিকেন ফ্রাই চলে এলো পাঁচ মিনিটের মধ্যে।

শামীম নিজের হাতে বানাচ্ছে। অনিমেষের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, Let’s enjoy.
গ্লাস হাতে নিয়ে অনিমেষ বলল, তখন আমি সবেমাত্র মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি। রেজাল্ট খুব ভাল। কিন্তু ভাল রেজাল্টে অন্তত এ দেশে কিছু হয় না। আমারও হল না। কোথাও কোন চাকরি পাইনি। একদিন পকেটের শেষ সম্বল হাজার খানেক টাকা নিয়ে বারে আসলাম। মদ খেয়ে শেষ করলাম টাকাগুলো। তখন বারটায় ক্যাসিনো ছিল। একটা জুয়ার টেবিলে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছি। চরকি ঘুরছে। আমি যেটা ভাবছি, ওইটাই হচ্ছে। তখন আফসোস করলাম, ইশ! টাকাগুলো যদি এইখানে লাগাতাম! তাহলে ভাল হত। তখন এক মাতাল ফ্রেন্ড পেয়ে গেলাম। তাকে বললাম, আমাকে কিছু টাকা দেন। আপনাকে আধাঘণ্টায় ডবল ফেরত দিব। সে বলল, আধাঘণ্টায় ডবল হবে কিভাবে?
বললাম, জুয়া খেলে।
তখন সে বলল, আমার টাকার ডবল না, যা লাভ হবে তার অর্ধেক। রাজি?
আমার রাজি না হওয়ার কোন কারণ ছিল না। আমি তার কাছ থেকে এক হাজার টাকা নিয়ে জুয়া খেললাম।

এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিল শামীম। থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করল, জিতলেন?
-হ্যাঁ। দশহাজার টাকা জিতলাম। আমার সেই বন্ধুকে তার কথামতো অর্ধেক অর্থাৎ পাঁচহাজার টাকা ফেরত দিলাম।
-এরপর?
-পরদিন আবার গেলাম। ভাবলাম নিজের টাকায় খেলব। পাঁচ হাজার থেকে আমার কাছে তিন হাজার ছিল। কিন্তু সেই ফ্রেন্ড আমাকে ডেকে ড্রিংক করালো। সিগারেট খাওয়ালো। তারপর নিয়ে গেল তিন পাত্তির টেবিলে। সে টাকা দিল। আমাকে কিছু বলার সুযোগই দিল না।
-এদিনও জিতলেন?
-হ্যাঁ। এদিন চল্লিশ হাজার।
-এভাবে জিতে আসতেছেন?
-হুম।
-হারেন নি কখনো?
-একদিন হেরেছিলাম।
-আপনার ফ্রেন্ড সেদিন মন খারাপ করেনি?
-তার সাথে বেশিদিন দেখা হয়নি। এতদিনে আমার পরিচয় ‘ভাড়াতে জুয়াড়ি’ নামে হয়ে গেল। আমাকে ভাড়া করে নিয়ে জুয়া খেলে। আর সেই ফ্রেন্ড চলে গেল বাইরে। একদিন ভাবলাম, নিজের টাকায় খেলব। আমি কষ্ট করে খেলি, অন্যকে লাভ করে দিব কেন? তো, গেলাম একদিন খেলতে। বিশ হাজার টাকা নিয়ে খেলতে বসেছি। মাত্র আধাঘণ্টা খেললাম।
-জিতলেন?
-না। সব হেরে গেলাম। আর সেদিন থেকে বুঝলাম, আমি নিজের জন্য খেললে জিতি না, অন্যের জন্য জিতি। তাই ভাড়াটে জুয়াড়ি হিসেবে খেলে যাই।
-চলেন। আজ এখানে খেলবেন?
-আপনি কি লোভ করে আমাকে দিয়ে খেলাবেন?
-না। কৌতূহল থেকে। আমার টাকার অভাব নাই। অন্তত জুয়ায় টাকার প্রতি তো নেইই।
-ওকে। কোনটা খেলব?
-আপনি কোনটা খেলেন বেশি?
-তিন পাত্তি।
-ওকে।

গোল টেবিল। উপরে হালকা আলো। টেবিলের চারপাশে চারজন বসা। খালি চেয়ারটা টেনে বসল অনিমেষ। বয়কে ডেকে পাশে আরেকটা চেয়ার টেনে বসল শামীম।

টেবিলের একজন বলল, আপনারা দুজনেই খেলবেন?
অনিমেষ বলল, না। আমি একা। আমার বন্ধু। খেলা দেখবে। কোন সমস্যা আছে?
-না। ব্লাইন্ড একশো, সিনে দুইশো।
-ওকে। ডিল কার?
-আপনিই করেন।
অনিমেষ তাস হাতে নেওয়ার আগে নতুন এক প্যাকেট সিগারেট বের করল। সিগারেট বের করে ধরিয়ে ঠোঁটে ঝুলিয়ে রেখেছে। এবার তাস হাতে নিয়ে ক্রস, শাফল দিচ্ছে। অন্যান্য খেলোয়াড়ের চোখ অনিমেষের হাতের দিকে। কী অদ্ভুত! এত দ্রুত শাফল দেওয়াটা যেনতেন কারিশমা নয়। অনিমেষের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সিগারেট ঠোঁটেই পুড়ছে। সবাইকে তাস ভাগ করে দিল। প্রত্যেকের সামনে তিনটা করে তাস। কিন্তু কেউই তাস তুলছে না।

একশো টাকার একটা বান্ডিল সামনে রাখল অনিমেষ। ব্লাইন্ডে সবাই একশো করে দিচ্ছে। দুই রাউন্ড দেওয়ার পর তিনজনে তাস সিন করল অর্থাৎ দেখল। তার মধ্যে একজন আছে, দুইজন প্যাক করেছে। অনিমেষের সামনের জনও তার মত ব্লাইন্ডে দিয়ে যাচ্ছে। অনিমেষ দেখল সে তাকিয়ে আছে অনিমেষের চোখের দিকে। অনিমেষ সিগারেটের প্যাকেটটা এগিয়ে দিল লোকটার দিকে। এতক্ষণ সবকিছু চুপচাপ দেখছিল শামীম। সে অনিমেষকে কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু অনিমেষ তাকে ইশারায় নিষেধ করল। জুয়া খেলায় নীতি দেখানোও একটা আর্ট।

অনিমেষ এবার তাস দেখবে। প্রথম তাসটা উল্টিয়ে দেখে ইশকাপনের ৭, দ্বিতীয়টা সামান্য তুলেছে, ওটাও ইশকাপন। শামীমের বুক ধকধক করছে। তোলার পর দেখল ওটা ৮। অনিমেষ তাকালো শামীমের দিকে। স্মিত হেসে তৃতীয় তাসটা তুলে দেখে ইশকাপনের ৬।

অনিমেষের সিগারেট শেষ। আরেকটা ঠোঁটে নিয়ে শামীমকে বলল জ্বালিয়ে দিন। শামীম লাইটার এগিয়ে নিলে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, You are very lucky Mr. Shamim

টেবিলে প্রায় আশি হাজার টাকা পড়েছে। একজন অলরেডি প্যাক গেছে। টেবিলে টিকে আছে দুজন। ওপাশের জন তাস শো করল। তার কাছে ইশকাপনের টেক্কা, ইশকাপনের সাহেব এবং হরতনের বিবি। জিতে গেল অনিমেষ।

অবাক হয়ে গেল শামীম। এরকম ভাগ্য নিয়ে খুব কম লোকে জন্মায়। সামনের লোকটাকে জিজ্ঞেস করল অনিমেষ, নাম কি আপনার ভাই?
-কবির।
-বেটার লাক নেক্সট টাইম।
-থ্যাঙ্ক ইউ।

এবার অনিমেষের পরে যে ছেলেটা আছে, সে তাস বন্টন করছে। দুইবার ব্লাইন্ড দিয়ে সবাই তাস দেখল। অনিমেষও। সে তৃতীয়বার চাল না দিয়ে প্যাক করল।
শামীম দেখল অনিমেষ ভাল তাস পেয়েছে। তবুও যে কেন প্যাক করল। জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে। তবুও করল না। না জানি আবার কী বলে। এবার কবির জিতল।

এবার তৃতীয়বার তাস বন্টন চলছে। ব্লাইন্ডে দুইবার দিয়ে তিন জনে তাস দেখল। একজন প্যাক গেছে। কবির আছে। সে কেমন যেন রাগী চোখে তাকাচ্ছে। অর্ধেক সিগারেট ফেলে দিয়ে নতুন সিগারেট ধরালো। তাস খেলতে এসে প্রচুর সিগারেট খাওয়া পড়ে অনিমেষের। তিন জন টিকে আছে টেবিলে। কবির তার তাস উঠিয়েছে। তার তাস যথেষ্ট ভাল। সেকেন্ড রান। হরতনের সাহেব, বিবি, গোলাম। টেবিলের চারপাশে বেশকিছু দর্শক। সবার মাঝে চাপা উত্তেজনা কাজ করছে।

অনিমেষ প্রথম তাসটা তুলল। রুহিতন এর ৩। দ্বিতীয়টা তুলছে, ওটা ইশকাপন। ইশকাপনের ৩। জোড়া(পেয়ার) হয়ে গেছে। ওপাশে কী পেয়েছে জানে না অনিমেষ। তৃতীয় তাসটা তুলে নিজে দেখল কিন্তু পাশে শামীমকে দেখালো না। রেখে দিল টেবিলের উপর। আর যে আরেকজন আছে, সেও খেলে যাচ্ছে।

টেবিলে টাকার পরিমাণ প্রায় দুই লাখ। একজন প্যাক গেলে কবির শো দিবে। কারণ তার টাকা শেষের পথে। তিনজন থাকতেই শেষ হয়ে গেলে শো দিতে পারবে না। তাকে ইশারায়ও বলা যাচ্ছে না যে প্যাক দে।

টেবিলে এখন টাকার পরিমাণ আড়াই লাখ। আরেকজন প্যাক করেছে। যে টাকা আছে কবিরের, তাতে তিন লাখ পর্যন্ত খেলা যায়। খেলতে থাকল।

শো দিল কবির। তার তাস দেখল অনিমেষ। হরতনের সাহেব, বিবি আর গোলাম। শো দিয়েই টেবিল থেকে টাকা নিতে গেল কবির। সে ধরেই নিয়েছে যে জিতে গেছে সে। অনিমেষ তাকে ইশারায় থামতে বলল। সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে তাসগুলো ছুড়ে দিল কবিরের দিকে। সবাই দেখল। অনিমেষ পেয়েছে ৩ এর ট্রায়াল।

কবিরের মুখ হা হয়ে আছে। আধখাওয়া সিগারেট ঠোঁট থেকে পড়ে গেল। টাকাগুলো নিয়ে চলে গেল অনিমেষ আর শামীম। হোটেলের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ল সে।

শামীম বলল, তখন আমাকে তাস দেখতে দিলেন না কেন?
-আপনাকে দেখালে আপনি খুশি হতেন। আর সেই খুশি আপনার মুখে ভেসে উঠল। তাস খেলায় মানুষের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বুঝেই খেলতে হয়। অনেক সময় ভাল তাস না পেয়েও অনেকে চাল দিয়ে যায়। আপনি ভাল তাস পেলেও ভয় পেয়ে বসে গেলেন। বুঝছেন?
-হুম। আসলেই আপনার জুয়া ভাগ্য দারুণ।
-হুম।
-আপনার পরিবারে কে কে আছে?
-আমি ঢাকা শহরে একা থাকি। গ্রামের বাড়িতে মা থাকে ছোট ভাইয়ের সাথে।
-আপনার একাউন্টে টাকা আছে কত?
-প্রায় পঞ্চাশ লাখের মত।
-একটা পরামর্শ দিই। আপনি বিয়ে শাদী করেন। সংসার করেন।
-আরও টাকা দরকার।
-আপনি তাহলে ওই টাকা দিয়ে খেলেন।
-নিজের টাকায় একবার খেলে তো হেরে গেলাম।
-এটা আপনার অবসেশন। ভুল ধারণা। আপনি খেলেন। জিতবেন। ওইটা দিয়ে খেলে কোটিপতি হয়ে যান। তারপর জুয়ার জীবন থেকে অবসর নেন।
-থ্যাঙ্ক ইউ। আপনার কথা ভাল লাগছে।
-চলেন, ডিনার করি। আর হ্যাঁ, আজকের লভ্যাংশ পুরোটাই আপনি রাখেন।
-না। আমি ফিফটি পার্সেন্টের বেশি নিই না।

কয়েকদিন পরের কথা। অনিমেষ তার গ্রামের বাড়ি গেল। বৃদ্ধা মাকে বলল যে সে বিয়ে করবে। তার মা শুনে এতটা খুশি হল যে সবাইকে ডেকে বলছে যে তার ছেলে অনিমেষ বিয়ে করবে। অনিমেষের মা এতদিন অনেক চেষ্টা করেও বিয়ে দিতে পারেনি তাকে।
-কাকে বিয়ে করবি? মেয়ে পছন্দ করেছিস?
-না। তোমরা পছন্দ কর। আগামী মাসেই করে ফেলব।
লজ্জার মাথা খেয়ে মায়ের কাছে বলেই ফেলল নিজের বিয়ের কথা। তার ছোট ভাই বিয়ে করেছে আরও পাঁচ বছর আগে। তার দুইটা বাচ্চাও আছে। তারও হবে। বৌ, বাচ্চা, সংসার। শামীমের জন্যই সে জীবনের স্বপ্ন দেখছে। জীবনের শেষ খেলাটা সে খেলবে।

সব টাকা তুলে অনিমেষ বড় একটা ক্যাসিনোতে গেল। একটা বিয়ারের বোতল আর এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে নিল। আজ অন্যরকম আনন্দ লাগছে। সবচেয়ে বড় টেবিলে গেল সে। এই টেবিলে সাতজন খেলে। এবং ডিল হাজার টাকার। এইমুহূর্তে টেবিলে আছে পাঁচজন। অনিমেষসহ ছয়জন।
বসার সাথে সাথে সবাই স্বাগতম জানালো। এইটা ভিআইপি টেবিল। এখানে খেলতে গেলে দম থাকা লাগে। আর যার যত টাকা, তার দম তত। এখানে বেশিরভাগ রাজনৈতিক নেতারা খেলে। তাদের সাথে টক্কর দিয়ে খেলতে হয় এখানে।

অনিমেষ সিগারেট ধরিয়ে প্যাকেট অন্যদের দিকে এগিয়ে দিল। সবাই সিগারেট ধরিয়েছে। অনিমেষের পাশের জন তাস বাটছে। অনিমেষের বাম পাশের জন জিজ্ঞেস করল, আপনাকে আগে কখনো দেখিনি।
-আসলে আমি এই টেবিলে খেলিনি কখনো। আর এই ক্যাসিনোতেও কম এসেছি।
-ও আচ্ছা। কী করেন?
-কিছুই না বললেই চলে।
-ওকে। খেলেন।

সবাই ব্লাইন্ড খেলছে। দুই হাজার করে চাল দিচ্ছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে কয়েকলাখ হয়ে গেল। সবাই সিন করেছে। সিন করার পরেও কেউ প্যাক করেনি। তার মানে সবাই ভাল তাস পেয়েছে। অনিমেষ তাস তুলল। রানিং পেয়েছে। ৯,১০ আর গোলাম। সে চাল দিল। অনিমেষ চাল দেওয়ার পর তিনজনে প্যাক করল। অদ্ভুত ব্যাপার। এতক্ষণ সিন করেও চাল দিয়েছে। আর এখন!
অনিমেষের পাশেরজন শো দিয়েছে। জিতে গেছে অনিমেষ। তার কাছে চলে এসেছে প্রায় আট লাখ টাকা।

এবার অনিমেষের ডিল। সে খুব কারিশমা দেখালো তাসের শাফল দিয়ে। সবাই দেখছে। তাস বন্টন হল। এবার ব্লাইন্ডে সবাই দিয়ে যাচ্ছে। অনিমেষের চেয়ে এদের টাকা বেশি। সবই কালো টাকা। তাই মায়া নাই। মুঠ করে করে টাকা দিচ্ছে। টেবিল প্রায় ভরে যাচ্ছে। এখনো কেউ সিন করল না। টেবিলে প্রায় আশি লাখের মত টাকা হয়ে গেছে। অনিমেষসহ সবাই তাস সিন করল। অনিমেষ মোটামুটি তাস পেয়েছে। গোলামের জোড়া। অনিমেষ চাল দিতে লাগল। টেবিলে অনিমেষ আর একজন আছে। সে শো দিল। তার কাছে বিবির জোড়া। অনিমেষ হেরে গেল। খারাপ লাগেনি তার। হারজিত থাকবেই। এখনো তার কাছে প্রায় ত্রিশ লাখ আছে।

এবার আরেকজন ডিল করছে। নিজের ডিলে লস হলেও অন্যের ডিলে লাভ করার চান্স থাকে বেশি অনিমেষের।

আবার ব্লাইন্ডে খেলছে সবাই। না দেখে টাকা দিয়ে যাচ্ছে। টেবিলে এখন প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা। অনিমেষ তার তাস তুলল। তিনটা সাহেব। হাসি নিয়ন্ত্রণ রেখে চাল দিয়ে যাচ্ছে। এখন বত্রিশ হাজার করে প্রত্যেক চালে যাচ্ছে। তাতে কী? এবার অনিমেষ কোটিপতি হবেই।

টেবিলে প্রায় দেড় কোটি টাকা জমেছে। অনিমেষ আছে। আর তার সামনের লোকটা। সিগারেট ধরিয়ে টানছে সবাই। ধোঁয়ায় ধোঁয়াচ্ছন্ন। অনিমেষের টাকা প্রায় শেষ। এখন শো দিবে। শো দেওয়ার আগে আরেকটা সিগারেট ধরালো। তারপর শো দিল। তিনটা সাহেব টেবিলের উপর। সবাই হা করে তাকিয়ে আছে অনিমেষের দিকে। কী ভাগ্য তার। প্রায় দুই কোটি টাকা জিতে যাচ্ছে কয়েক মিনিটে। অনিমেষ টাকাগুলো নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালো।

কিন্তু বাধ সাধল অনিমেষের প্রতিদ্বন্দ্বী। সে বলল, রাখেন ভাইজান। একটু রাখেন। হাত ওঠান। আমিও তিনটা তাস পাইছি, দেখেন? বলেই তাস তিনটা ছুড়ে দিল অনিমেষের সামনে। সবাই তাকিয়ে দেখছে। তিনটা তাস। প্রত্যেকটা তাসের উপর ‘A’ লেখা। টেক্কার ট্রায়াল। হেরে গেল অনিমেষ।

পরিশিষ্টঃ অনিমেষ এখনো জুয়া খেলে। পার্কে বসে বসে গাছের পাতা দিয়ে তাস বানিয়ে জুয়া খেলে। নিজেই নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী। কখনো সে হারে না। তার চারপাশে ছোটছোট ছেলেমেয়ে ভিড় করে। কেউ কেউ ব্যঙ্গ্য করব বলে, পাগল! পাগল। অনিমেষ সেসব শোনে না। সে শুধু জুয়াই খেলে।

গল্প- জুয়াড়ি

©জাকারিয়া জ্যাক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here