গৃহত্যাগী

0
34

ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে যাওয়ার একটু পর থেকেই ফোনটা বেজে যাচ্ছে, মুখে সাবান মাখা অবস্থায় যেতেও পারছি না। সাবান ঘসে ঘসে লাইনার তুলছি, উফফ মেয়েরা যে কিভাবে ঘন্টা লাগিয়ে মেকআপ তোলে কে জানে। মুখ ধোয়ার পর মনে পড়লো, আমার ফোন তো আজীবন থাকে সাইলেন্ট মুডে, রিংটোন কি সেট করা ছিলো সেটাও ভুলে গিয়েছি, এতো সাউন্ডে রিং হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না যেহেতু বাসায় আমি ছাড়া দ্বিতীয় কেউ নেই।
কিন্তু আমি রুমে গিয়ে যা দেখলাম তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। আমার বয়ফ্রেন্ড রিফাত আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে যে কিনা বছর দুয়েক আগে মাত্র সাত দিনের জ্বরে ভুগে মারা যায়। যার দুদিন আগেও আমরা কথা কাটাকাটি করছিলাম আমাদের বিয়ে কিভাবে হবে তা নিয়ে। তার বিশ্বাস ছিলো একদিন ওর অনেক টাকা হবে, বিয়েটা হবে ধুমধাম করে। আর আমি চাইতাম দুজনে পড়ালেখা শেষ করে নিজ নিজ পরিবার আর কিছু বন্ধু-বান্ধব কে নিয়ে বিয়েটা খুব সিম্পলিভাবে হোক।

কিন্তু কথা হচ্ছে এই মুহুর্তে আমার সামনে রিফাত দাঁড়িয়ে, মৃত অথবা ভুত রিফাত, যা কিনা বাস্তব জ্ঞানে অসম্ভব একটা ব্যাপার।
একটু খেয়াল করে তাকালেই বোঝা যাবে তার উপর দিয়ে যেনো কোন ঝড় বয়ে গিয়েছে, বিধ্বস্ত অবস্থা, অগোছালো চুল, লাল রগরানো চোখে অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে ঠিক আমার দিকে। আমার কেনো যেনো ব্যাপারটাতে একদমই ভয় কাজ করছে না। রিফাতের মতো সহজসরল একটা ছেলেকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, এমনকি রিফাতের ভুত কে ও না। ওর হাতে তার ব্যাবহৃত সেই ছোট্ট বাটন ফোন, যেটায় কোন কল আসলে বিকট আওয়াজে বেজে উঠত, এখনও তাই। কিন্তু বুঝলাম না, ওর হাতে ফোন থাকবে কেন, মোবাইলের তো মরে ভুত হয়ে যাবার সম্ভাবনা নেই। লৌকিক আর অলৌকিক দুটি ঘটনাও একসাথে ঘটতে পারে না। অবশ্য সেটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছি না, সমস্যা হলো ওর পড়নে ক্যাটক্যাটে হলুদ রঙের পাঞ্জাবি। এই পাঞ্জাবিটা আমার কখনোই পছন্দের ছিলো না, একবার বলার পর আর আমার সামনে এটা পড়ে আসেনি। আজ এতোদিন বাদে এসবের মানে কি? কিন্তু প্রথম কথাতেই কি জিজ্ঞেস করা উচিত “কি ব্যপার রিফাত, তুমি এই পাঞ্জাবিটা পড়ে আবার আমার সামনে আসছো কেন?”

আমাকে আর বেশীক্ষণ ভাবতে হলো না, ও নিজেই প্রথম কথাটা বললো,
“অরু, আমি কি তোমার বিছানায় একটু ঘুমাতে পারি? প্রচন্ড রকমে ঘুম পাচ্ছে আমার। আর শোনো, এই যন্ত্রটাকে কোথাও ছুড়ে ফেলে দাও তো, বড্ড ডিস্টার্ব করে।”
আমি কোন উত্তর দেওয়ার আগেই ও শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। আমার এপার্টমেন্টটা একটু বর্ননা করি। একটা রুম, দুইপাশে খোলামেলা বারান্দা, সাথে একটা বিশাল ডাইনিং একপাশে সোফা অন্যদিকে ছোট একটা ডাইনিং টেবিল আর রান্নাঘর তার পাশেই। এপার্টমেন্ট টা প্রথমে তিনজন মিলে ভাড়া নিয়েছিলাম। ক্যাম্পাস থেকে কাছে, ভাড়া কম, আর সবচে সুন্দর এই বাড়িটা। দ্বিতীয় বর্ষে উঠে হলে সিট পেলেও মায়া কাটিয়ে বাড়িটা ছাড়তে ইচ্ছে হয়নি আমার বা সুমির কারোরই। সুমি আর টুম্পা ছিল আমার রুমমেট। টুম্পা হলে চলে গেলেও আমরা থেকে যাই। সুমির গত মাসে বিয়ে হয়ে যাওয়াতে এখন আমি একাই থাকি। বাড়িওয়ালা আন্টিও বেশ ভালো। অবশ্য আন্টি না বলে রুশু ভাবি বা আপু বলা মানানসই, বয়সে আমার থেকে খুব বেশি বড় না, এটা আংকেলের দ্বিতীয় বিয়ে। একদিন হেসে চুপিচুপি আমাকে বলছিলেন, তোমার আংকেলের সামনে ছাড়া অন্য সময় চাইলে তুমি আমাকে আপু বলতে পারো, শুনতে ভালোই লাগে। রুশু আপু প্রায়ই বিকেলবেলা আসে আমার সাথে গল্প করতে, আমি নাকি চা টা খুব ভালো বানাতে পারি। কিন্তু আজ এসে যদি দেখে আমার রুমে একটা ছেলে এভাবে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে, সেটা নিশ্চয়ই ভালো চোখে দেখবেন না। আবার রিফাত কে আমি সত্যি সত্যিই দেখছি কিনা সেটা বুঝার জন্য আমার কাউকে দিয়ে দেখানো উচিত। আমি পড়লাম বিশাল বিপদে। মনে হচ্ছে টেনশন কাটাতে আমার নিজেরই এক কাপ চা খাওয়া উচিত।

চা বানাতে গিয়ে ভীষণ হাসি পেলো, হয়তো পুরোটাই ছিলো আমার কল্পনা। আর এতোদিন পর আমার কল্পনাতেই বা সে কেনো আসবে। দুদিন পর বাবার ঠিক করা পছন্দের ছেলের সাথে আমার দেখা করার কথা। ফাইনাল পরীক্ষা টা দিলেই আমার গ্রাজুয়েশন শেষ, তারপর মাস্টার্স-পিএইচডি করতে আমার ইচ্ছা দেশের বাহিরে যাওয়ার। কিন্তু বাবা যেনো উঠেপড়ে লেগেছে আমায় বিয়ে দিতে, যেখানে রিফাতকে ছাড়া আমি আমার জীবনে দ্বিতীয় কোন পুরুষকে কল্পনা করতে পারি না। রিফাতের জায়গা কাউকে দেওয়া যেমনি সম্ভব না তেমনি হাসিমুখে এক জীবন কাউকে ঠকিয়ে পার করে দেওয়ার মতোন মানুষও আমি নই৷ এই সহজ ব্যাপারটাই বাড়ির কেউ বুঝতে পারছে না। আশ্চর্য!
চা পাতা দিয়ে চুলা টা কমিয়ে দিলাম। এই চা খাওয়ার অভ্যেস করেছিলাম রিফাতের সাথে থেকে, এতো চা খেতে পারতো ছেলেটা! চায়ের সাথে হাতে থাকতো সিগারেট আর সারাদিন ফিলোসফি কপচাতো। দেখতে দেখতে কিভাবে যেনো চশমা পড়া, লম্বাটে এই সাদামাটা চেহারার মানুষটাকেই ভালো লেগে যায়। তারপর কেটে গেলো কতো বসন্ত! একসাথে, বিচ্ছেদে!
আচ্ছা বেঁচে থাকতে তো ওকে কোনদিন চা বানিয়ে খাওয়ানো হয়নি, আজ কি এক কাপ সাধবো? মৃত মানুষ যদি ফোন ব্যবহার করতে পারে তাহলে চা খেতে দোষ কোথায়?

আমার ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। ও কোথাও উবে যায় নি, পাশ ফিরে ডান থেকে এখন বাম কাত হয়ে ঘুমিয়ে আছে। চশমা টা বিছানার পাশে। ঘুমন্ত মানুষকে নাকি দেবদ্যুতের মতো লাগে। রিফাত তুমি কে? ভুত নাকি দেবদ্যুত? হ্যালুসিনেসন কি এতটা দীর্ঘ হয়?

অথচ তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোন কিছুর অপেক্ষায় অনেক জীবন ধরে ঘুম হয় নি, এখন সে তার আকাংখিত জিনিস খুঁজে পেয়েছে, তাই শান্তির একটা ঘুম দরকার। আমি আর ওকে ডিস্টার্ব করলাম না, চা নিয়ে বারান্দায় চলে এলাম। আচ্ছা, আকাশ টা কি আজ একটু বেশীই মেঘলা? নাকি শুধু আমার একারই কান্না পাচ্ছে?

রিফাতের স্বাভাবিক হতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে। সেদিন ঘুম থেকে উঠেই আমার হাত দুটো জড়িয়ে ধরে বসেছিলো দীর্ঘক্ষণ। ওর ওই ফোলা চোখে জমে থাকা অশ্রুতে ক্ষোভ ছিলো না হতাশা তা বুঝতে পারিনি, আমি সত্যিই সেদিন চিনতে পারিনি আমার মানুষ টা কে! তবে আমি ভয় পাইনি, ভয় পাচ্ছিলাম এসব না মিথ্যে হয়ে যায়! কোত্থেকে এতোদিন পর কেনো আমার কাছে এলো, এসব কিছুই জানতে চাইনি। ও শুধু বলেছিলো, “আমি ভীষণ রকম একা হয়ে গিয়েছিলাম অরু, তোমায় কতো খুঁজেছি জানো?”

রিফাতের ফোন টা বাসার পাশের পুকুরে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। ও ভাবতো আমি হয়তো তাকে ফোন করবো, তাই সে আশায় কারো ফোনকলই রিসিভ করতো না। উচ্চস্বরে ফোন টা বেজে থেমে যেতো বারবার। তাছাড়া ও সিগারেট খাওয়া থেকে সব রকমের বাজে অভ্যাস ছেড়ে দিয়েছে, কথা বলাও কমিয়ে দিয়েছে আগের চেয়ে। প্রথম কিছুদিন শুধু আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলতো, তুমি বলো। কিন্তু আমি নিজেই যে খানিকটা বোবা হয়ে গিয়েছিলাম তাকে কাছে পেয়ে সেটা কিভাবে বোঝাই।
এই রিফাতকে দেখলে আমার অনেক মায়া হয়, খুব ক্লান্ত মনে হয় তাকে। কতো ভাবনা যে মাথায় আসে! মানুষটা এতকাল একা কোথায় ঘুরেবেড়িয়েছে কে জানে। ক’দিন ঠিকমতো ঘুমালে যদি একটু স্থির হয়, ওর আরও অনেক বিশ্রামের দরকার।

ঘটনার একবছর হতে চললো। গত পরশু সুমি এসেছিলো বাড়িওয়ালার সাথে দেখা করতে। অনেক কথা হলেও ব্যাপারটা একেবারেই এড়িয়ে যান মিসেস রুশু, গত একবছরেও উপর তলার ফ্লাট টি ভাড়া দিতে পারেননি, কিছুদিন থেকেই কেন যেনো চলে যায় সবাই, প্রায়ই নাকি একটা ছেলে আর মেয়েকে হাসিঠাট্টা কর‍তে শোনা যায়। উনার নিজেরও তিনতলার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দু’একবার মনে হয়েছে যেনো পাশের ফ্ল্যাট থেকে চা পাতার গন্ধ আসছে, ঠিক অরু যেভাবে বানাতো, তবে তিনি এসবে একদমই বিশ্বাস করেন না।
কথা প্রসঙ্গে রুশু আপাও বেশ কিছুক্ষন দুঃখ করলেন। বেশ ভালো ছিলো মেয়েটা, কি সুন্দর হেসে গল্প করতো! কিন্তু দুঃখ হলেও সত্যি প্রায় এক বছর আগে এরকমই এক সকালে চলন্ত বাইকের সাথে ধাক্কা খেয়ে রাস্তার উপর ছিটকে পড়ে সাথে সাথেই মৃত্যু হয় অরুনিমার, স্পট ডেথ।

পরিশিষ্টঃ ইদানিং আমার ভুলে যাওয়ার রোগ হয়েছে, অনেক কথাই মনে করতে পারিনা, সব কেমন যেন ভুলে যাই। বাড়িটাও প্রচন্ড রকমের শুনশান, আশপাশটায় কাউকে দেখা যায় না। অথচ রিফাতের এই নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই, সে আগের মতো তার কবি কবি ভাব নিয়ে লেকচার দিতে থাকে, যার একমাত্র শ্রোতা হলাম আমি।
আকাশে ভরা পুর্নিমা, ছাদে শীতল পাটি বিছানো হয়েছে, আজ হবে জোছনা বিলাস। আমার কোলে মাথা রেখে রিফাত আমাকে দূর গ্রহের চন্দ্রবিন্দু দেখাচ্ছে, আমি দেখছি এক আকাশের নিচে লক্ষ্য তারা। আমার আর এতো কিছু মনে থাকবে কই? মন জুড়ে যে সবটা আছে তার সব থাকুক, মানুষটা শুধু আমার হোক!

“প্রতি পূর্ণিমার মধ্যরাতে একবার আকাশের দিকে তাকাই,
গৃহত্যাগী হবার মত জোছনা কি উঠেছে?”

Jeba Samia

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here