গন্তব্যহীন চতুর্থ পর্ব

0
406

গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০

গন্তব্যহীন চতুর্থ পর্ব

সামিহা হোসেন শৈলী

ইলমার তখন এগারো বছর বয়স, স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে দেখলো বাড়ি ভর্তি মানুষ। মামনি হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছে আর সাথে এনেছে একটা ছোট্ট পুতুল বাবু, কি সুন্দর টাওয়েলে মোড়ানো, গুটিশুটি হয়ে মামনির কোলে ঘুমিয়ে আছে। ছোট ছোট হাত-পা, পুতুলের মতো মুখ। ইলমার খুব ইচ্ছে হলো, বাবুটাকে কোলে নেয়ার।
ইলমার এখনো মনে আছে একবার মামনি ওকে ওর জন্মের সময়ের ছবি দেখিয়েছিলো, ছবিটাতে ছোট্ট ইলমা ওর মায়ের কোলে ঠিক এভাবেই ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল। আর মা মমতাপূর্ণ স্নেহশীতল দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলো, চোখে তার আনন্দঅশ্রু আর ঠোঁটে মাতৃত্বের পরিতৃপ্তির হাসি, বড় সাধের সন্তান যে তার, নাড়িছেঁড়া ধন। তবে সেই সুখ দীর্ঘস্থায়ী হলো না। ইলমার জন্মের প্রায় ঘন্টাখানেকের মাথায় শ্বাসকষ্ট শুরু হয় ইলিয়ানার, এরপর হুট করেই চলে গেলো। প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুতে মানসিকভাবে পুরোপুরি ভেঙে পড়লেন ইলমার বাবা মারুফ ইসলাম। তাদের বিয়েটা পারিবারিকভাবে হলেও সম্পর্কটা ছিল আত্মার, একে অপরের সুযোগ্য পরিপূরক যেন। চার বছরের সংসারজীবনের ইতি টেনে হুট করেই যেন ফাঁকি দিয়ে চলে গেল ইলিয়ানা আর তাকে করে দিয়ে গেলেন অপূর্ণ, অসম্পূর্ণ কিংবা শূন্য।

৭.
“আস্সালামু আলাইকুম, কে বলছেন?”
“ওয়ালাইকুমুস্সালাম, আমি শুভ্র আহসানের ওয়াইফ ইলমা আহসান বলছি। আপনি কি সাইফ আলম বলছেন?”
“জ্বী, আপনি আমার ফোন নাম্বার কোথায় পেলেন?”
“আজকে সকালে আমি আপনার অফিসে গিয়েছিলাম, আপনার সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু আপনি তখন অফিসে ছিলেন না। রিসিপশানিস্ট জানালো, আপনি দেশের বাহিরে আছেন। পরে আপনার পি.এর কাছ থেকেই আপনার এই নাম্বারটা কালেক্ট করেছি। আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই।”
“দেখা তো আমিও করতে চাই, অনেক হিসাব নিকাশ বাকি আছে। তাছাড়া আপনার হাসবেন্ড আমার এতোগুলো টাকা চুরি করে গায়েব হয়ে যাবেন, আর আমি চুপ করে…”
“ভদ্রভাবে কথা বলুন!”
“অভদ্রতামির দেখেছেন কি? ভদ্র বলেই এখন অব্দি কোনো স্টেপ নেই নি আমি। একবার শুধু দেশে ফিরে নি, এরপর এমন ব্যবস্থা নেব, ওই শুভ্র পাতালেও পালাতে পারবে না। বিশ্বাস করে এতোগুলো টাকা আনার দায়িত্ব দিলাম, আর সে কি না পগার পার?”
“কি যা তা বলছেন?”
“যা তা নয় ম্যাডাম, অর্ধলক্ষ টাকা, একেবারে কম কিছু না। আর টাকা জিনিসটাই এমন, এর লোভ সামাল দেয়া মোটেও সহজ ব্যাপার না। কত বড় বড় মনুষরাই লোভের দোরগোড়ায় নতি স্বীকার করে, সেখানে শুভ্র আর এমন কি?”
শুভ্র’র অফিসের বস সাইফ আলমের কথা শুনে রাগে-দুঃখে-ঘেন্নায় চোখে পানি চলে আসলো ইলমার, কোনোভাবেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না সে। একটা লোক কি করে এতোটা নিচ হতে পারে?
শুভ্র সেদিন কোথায় গিয়েছিলো, সেই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র এই লোকটাই দিতে পারবে। অাজ সকালে শুভ্র’র অফিসে গিয়ে ওর বেশ কয়েকজন কলিগের সাথে কথা বলেছে সে। তাদের কেউই জানেন না সেদিন শুভ্রকে কোথায় পাঠানো হয়েছিলো। এবং কেন পাঠানো হয়েছিলো সে সম্পর্কেও কিছুই জানেন না। কি এমন দরকারি কাজ ছিল যে এতোটা গোপনীয়তা?
কারো কাছে কাঙ্ক্ষিত উত্তর না পেয়ে একরকম হতাশ হয়েই যখন ইলমা অফিস থেকে বের হয়ে যাচ্ছিলো, ঠিক তখনই সাইফ সাহেবের পি.এ জানায় শুভ্রকে কোথাও টাকার লেনদেনজনিত জটিলতার নিষ্পত্তির জন্য পাঠিয়েছিলেন সাইফ আলম, কিন্তু কোথায় তা সাইফ আলম ছাড়া আর কেউ জানেন না।
ইলমাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে সাইফ আলম আবারো বললেন,
“দেখুন ম্যাডাম, টাকার গন্ধ বড়ই খারাপ জিনিস, নাকে গেলে হাতে না আসা পর্যন্ত সুস্থ থাকা দায়। দেখুন গিয়ে, ওই শুভ্রও হাতে এতোগুলো টাকা পেয়ে আর মাথা ঠিক রাখতে পারে নি। তাই কোথাও গা ঢাকা দিয়েছে। ভেবেছে কিছুদিন বলাবলি হবে, এরপর একসময় মানুষ সবকিছু ভুলে যাবে। তখন ও ফিরে এসে একটা বানোয়াট গল্প শুনিয়ে…”
“প্লিজ, প্লিজ স্টপ নাউ! কীভাবে? কীভাবে পারছেন বলুন তো?
একটা মানুষকে দুদিন ধরে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তার ফোনটাও বন্ধ। মানুষটা কোথায় আছে, কেমন আছে, কি অবস্থায় আছে, কিচ্ছু জানি না। আর আপনি? না জেনেশুনে শুধুমাত্র সন্দেহের বশে তার সম্পর্কে একের পর এক বাজে কথা বলে যাচ্ছেন? মিথ্যে অপবাদ দিচ্ছেন?
আমার ভাবতেও খারাপ লাগছে, আপনার মতো এতো জঘণ্য নিচু মন-মানসিকতার একটা মানুষকে শুভ্র কিনা এতোটা সম্মান দিতো।”
“হা হা হা, এখন তো জঘণ্য মানুষ বলেই মনে হবে। কিন্তু যেদিন সত্যিটা সামনে আসবে, সেদিন এই সাইফ আলমের কথা মিলিয়ে নিবেন। ম্যাডাম সত্য কথা যে মধুর হয়, তা কখনো শুনেছেন কারো কাছে?
সত্য বরাবরই তেতো হয়। আর আমাকে যতটা খারাপ ভাবছেন, ততটা আমি নই। আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে এতোক্ষণে শুভ্র পুলিশ কাস্টাডিতে জামাই আদরে থাকতো। শুধু আমি বলেই দেশে ফেরার সময়টুকু অপেক্ষা করছি, সুযোগ দিচ্ছি সত্যিটা স্বীকার করার। এখন শুভ্র যদি নিজে থেকে সামনে আসে তো ভালো। আর যদি না আসে, তাহলে আমাকে তো স্টেপ নিতেই হবে। চল্লিশ-পঞ্চাশ হাজার টাকার ব্যাপার হলে আমি না হয় দান হিসেবেই ছাড় দিতাম, কিন্তু তা তো নয়। পঞ্চাশ লক্ষ টাকার হিসাব, এমনি এমনি তো ছেড়ে দেয়া যায় না।”
“জানেন মি. সাইফ, আমার আপনার সাথে যোগাযোগ করার পেছনে একটাই কারণ ছিলো, আর তা হলো শুভ্র’র খোঁজ পাওয়া। কারণ সেদিন শুভ্র কোথায় কেন গিয়েছিলো, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর একমাত্র অাপনিই জানেন। কিন্তু এখানেই আমার ভুলটা। আমার সবচেয়ে বড় ভুল এটাই যে, আমি ভেবেছিলাম ও আপনাকে রেসপেক্ট করতো, সেই ভাবনা থেকে হলেও আপনি অন্তত আমাকে সাহায্য করবেন, ওকে খুঁজে বের করতে পাশে দাঁড়াবেন। বিশ্বাস করুন এই একটা কারণেই আমি এই দুদিন ছুটোছুটি করে আপনার নাম্বার কালেক্ট করেছি। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম।”

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


“আহা! ম্যাডাম রাগ করছেন কেন? কেন সাহায্য করবো না? অবশ্যই করবো। দেখুন আমিও তো চাই সত্যটা সামনে আসুক, আসল অপরাধী শাস্তি পাক। তবে একটা কথা জানেন কি, কেউ হারিয়ে গেলে খুঁজে বের করা সহজ। কিন্তু আত্মগোপনে থাকলে কাজটা কঠিন হয়ে যায়।”
“আপনার পরামর্শের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। তবে আপনার কোনো সাহায্যই আমার লাগবে না। আমি একাই খুঁজে বের করবো শুভ্রকে। রাখছি। ভালো থাকবেন।”
“দেখুন কি করতে পারেন। তবে আমিও থেমে থাকবো না।” সাইফ আলমের সাথে কথা শেষ করে ফোনটা বিছানার উপর এক প্রকার ছুঁড়ে ফেললো ইলমা।
বারান্দায় গিয়ে গ্রিল ধরে আকাশের দিকে তাকালো ইলমা, আজও আকাশে চাঁদ উঠেছে, শুধু সঙ্গে নেই তার প্রিয় মানুষ, ভালোবেসে আগলে রাখা রত্নটি। চোখজোড়া জ্বালা করছে। বড্ড অসহায় লাগছে তার। এর আগে কখনো এমন পরিস্থিতিতে পরে নি সে। কেননা তখন শুভ্র তার পাশে থাকতো। কিন্ত সেই শুভ্রই তো আজ হারিয়ে গেছে, কি করে খুঁজবে তাকে?
আকাশের চাঁদটা ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখজোড়া ভরে উঠেছে নীরব অশ্রুতে। চোখ বুঁজে গ্রিলে মাথা রেখে কেবল একটা কথাই বারবার ফিসফিস করে বলতে লাগলো সে,
“ফিরে এসো মেঘালয়,
তুমি ফিরে এসো, দেখে যাও
তুমিহীনা অপ্সরী কতখানি অসহায়…”
.
.
.
তৃতীয় পর্ব:
https://mbasic.facebook.com/groups/884724498624937?view=permalink&id=943575442739842&_rdr