একটি শোক সংবাদ

0
34

বাসায় বড়সড় মিটিং বসেছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে মারাত্মক কিছু একটা ঘটেছে। আমার বড় চাচা, বড় চাচী আর ছোট চাচা রাজশাহী থেকে এসেছে মিটিংয়ে যোগ দিতে। বাবা, মাও ভ্রু কুঁচকে বসে আছে। শুধু আমাকে মিটিংয়ে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। এর কারণ, পরিবারে আমি সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। ক্লাস ফাইভে পড়ি। তারা ভাবে আমি অনেক ছোট, কিছুই বুঝি না। আমি কিছু বুঝি আর না বুঝি মিটিংয়ে কি হচ্ছে তা আমাকে দেখতেই হবে।
তাই দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে উঁকি দিয়ে দেখছি ভিতরে কি হচ্ছে।
প্রথমে আমি যে রুমে মিটিং বসেছে সেই রুমেই ছিলাম। হঠাৎ আমার বড় চাচা কর্কশ গলায় বললেন,
জয় তুই ছোট মানুষ, তোর এখানে থেকে কাজ নেই। তুই টিভি দেখ গিয়ে যা।
বড় চাচার কথা আমি শুনেও কিছুক্ষণ জায়গা থেকে নড়লাম না। এরপর আমার বাবার ধমকে সেখানে আর টিকতে পারি নি।
মুখ কালো করে বেরিয়ে এসেছি।
মিটিংয়ে যারা আছে সবাই খুব রাগান্বিত। আমার বাবার মুখটাও হিংস্র দেখাচ্ছে। এরকমটা আগে কখনো দেখি নি। শুধু আমার মাকে খানিকটা চিন্তিত মনে হলো।
আমার আপু মিটিংয়ের মাঝখানটায় বসে আছে। তার মুখ শুকিয়ে গেছে। চোখের নিচে কালি পড়েছে। আপুর বয়স যেন অনেক বেড়ে গেছে গত দুইদিনে। কি এমন হলো বুঝতে পারছি না।
আপুকে এতো বিষন্ন দেখাচ্ছে কেন ভেবে পাচ্ছি না। অথচ আপুকে আমি সবসময় হাসিখুশিতে মেতে থাকতে দেখেছি।
অনেকক্ষণ ধরেই রুমে কোন সাড়াশব্দ নেই। কেউ কথা বলছে না। কি অদ্ভুত একধরনের নিস্তব্ধতা ভর করেছে।
হঠাৎ ছোট চাচা চোখের ইশারায় বড় চাচাকে কি যেন বললেন। এর পরপরই শুরু হলো কথপোকথন।
বড় চাচা আপুকে জিজ্ঞেস করলেন,
কিরে জুঁই, রাসেল নামের কাউকে চিনিস?

কথাটা শুনে আপু কেঁপে উঠলো। কিন্তু কোন কথা বললো না। আপু মাথাটা যতটা নিচে নামিয়ে রাখা যায় ততটাই নামিয়ে রেখেছে।
মনে হচ্ছে কেউ যদি তার এই মুখ না দেখতে পেত তবে আপু শান্তি পেত।

বড় চাচা আবার প্রশ্ন করলেন,
কথা বলছিস না কেন? চিনিস রাসেল নামের কাউকে?

না।
এতোটুকুই উচ্চারিত হলো আপুর মুখ থেকে।

এবার চাচী একটু নরম স্বরে বললেন,
মিথ্যা কথা বলো না জুঁই। সব কিছু খুলে বল। তুমি কি চেন রাসেল নামের কাউকে?

আপু কোন কথা বললো না। এবার বাবা তার হিংস্রতার চূড়ান্ত পরিচয় দিলেন। উঠে গিয়ে আপুর মুখ বরাবর ঠাস করে কষে এক চড় বসিয়ে দিলেন।
এক চড়ে আপুর ঠোঁট কেটে গেল। রক্তের দাগ দেখতে পাচ্ছি। আপু কাঁদছে। কি ভয়ংকর দৃশ্য। বাবাকে খুব অপরিচিত মনে হচ্ছে। কে বলবে এই বাবা কতো মজা করেন আমাদের দুই ভাইবোনের সাথে।
বাবা হুংকার দিয়ে বললেন,
মিথ্যা কথা বলিস। এত বড় সাহস। এই দেখ তোর কুকর্মের নমুনা।

এই বলে বাবা আপুর মুখ বরাবর একটা কাগজ ছুঁড়ে দিলেন। কাগজটা আপুর পায়ের কাছে এসে পড়লো। এই কাগজে কি এমন আছে বুঝতে পারছি না। আপুর কান্না দেখে আমারও খুব খারাপ লাগছে। শুধু কি আমারই খারাপ লাগছে? বাবা মার কি খারাপ লাগছে না?
বাবা বললেন, এই চিঠিতে রাসেল কে তা তুই নিজেই লিখেছিস। এখন আবার মিথ্যা বলিস।

ছোট চাচা বললেন,
ভাইজান আপনি শান্ত হোন। এতো উত্তেজিত হবেন না। বসেন।

বড়চাচা আবার আপুকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
সময় নষ্ট করিস না। সবকিছু খুলে বল।

আপু কান্না থামাল। চোখ দুটি হাত দিয়ে মুছে নিল। এরপর কাপা গলায় বলতে শুরু করলো,
আমি রাসেলকে চিনি। আমারা একই কলেজে পড়ি। আমি পড়ি ফার্স্ট ইয়ারে আর রাসেল পড়ে সেকেন্ড ইয়ার। আমি…

আপু আর কিছু বলতে পারলো না। কি ভেবে যেন চুপ হয়ে গেল।
এবার মা বললেন,
থামলি কেন? কথা শেষ কর।
সবাই উৎসুক শ্রোতা। আমি দরজার আড়াল থেকে শুনছি। রাসেল ভাইয়াকে আমি চিনি। সে আমাকে খুব আদর করে। যেদিন দেখা হয় আমাকে চকলেট কিনে দেয়। ভাইয়া তো অনেক ভালো। তার জন্য আপুকে সবাই কেন যে বকাবকি করছে কে জানে। আমার খুব খারাপ লাগছে। আপু কাঁদছে। আমারও খুব কান্না পাচ্ছে।

আপু খুব মৃদু স্বরে বলল,
আমি রাসেলকে পছন্দ করি।

একথা শোনা মাত্রই বাবা আবার উঠে গেলেন। আমার ধারণা আবার কষে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিতেন। বড় চাচা বাবাকে থামালেন। আপু ভয়ে শিউরে উঠলো। রুমে আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। কেউ কোন কথা বলছে না। শুধু আপুর কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। এভাবে কিছুক্ষণ কেটে গেল। বড় চাচা বললেন,
তুই যে এমন একটা কাজ করবি আমরা তা কল্পনাই করি নি। তোর বাবা মার কথা একবারও ভাবলি না?

চাচী একথায় সায় দিলেন। তিনি বললেন,
আশেপাশের মানুষজন কি বলবে? তোমার পরিবারের মান সম্মান বলেও তো একটা কথা আছে।
এদিকে মা আর ছোট চাচা নিশ্চুপ। কোন কথা বলছেন না। তবে তাদের মুখ দেখে তাদের বিরক্তি বেশ ভালোভাবে প্রকাশ হচ্ছে।
আপু এখন আর কাঁদছে না। কেন কাঁদছে না বুঝতে পারছি না। আমার কিন্তু এখনো কান্না পাচ্ছে। আপুর পাচ্ছে না কেন?

এবার বাবা কথা বললেন,
তুই আমার মেয়ে হওয়ার যোগ্যই না। তোর মতো মেয়েকে দিয়ে আমার কোন কাজ নেই। মনে হচ্ছে এক কোপে তোর মাথাটা গলা থেকে নামিয়ে দেই। বংশে যা কেউ করেনি তুই তা করেছিস। বেয়াদব মেয়ে।

বাবার কথাগুলো খুব কঠিন শোনাল আমার কাছে। আপুকে কি বাবা সত্যিই মেরে ফেলবে। ভয়ে বুকটা ধুকপুক করে উঠলো।
তিরস্কার কিন্তু থেমে থাকলো না। সবাই মিলে যতরকম দোষারোপ করা যায় সবটাই আপুকে করা হলো। মা তেমন কিছু বলেননি কিন্তু বাধাও দেননি। হয়তো মাও সবার সাথে একমত।
মিটিং যখন শেষ হলো তখন গভীর রাত। ঠিক কয়টা বাজে তা আমি জানি না। মিটিংয়ের সর্বশেষ কথাগুলো বলেছে আমার বাবা। কথাগুলো এরকম,
তুই আমার চোখের সামনে আসবি না। তোর বাসা থেকে বের হওয়া যাবে না। পড়লেখা বাদ। ঘরে বসে থাকবি।
আপু কিছুই বলে নি। আপু কি সব মেনে নিয়েছে? মনে হয় নিয়েছে।
যে যার যার রুমে ফিরে গেল। আমিও রুমে গেলাম। আজ আমি থাকবো আমার ছোট চাচার সাথে। বড়চাচা আর চাচী এক রুমে। বাবা মা এক রুমে থাকবে। আপুর তার নিজের রুমেই থাকবে। আজ বাসায় রান্না হয় নি। সবাই না খেয়ে আছে। আমিও না খেয়ে আছি। কিন্তু আমার খিদে লাগে নি। সবারই কি তাই? আপুর কি খিদে লেগেছে। জানি না।

আমি ঠিক কখন ঘুমিয়ে পড়লাম জানি না। এর আগেও ছোট চাচার সাথে আমি ঘুমিয়েছি। তখন অনেকরকমের গল্প হয়েছে। আজ কেউ কারও সাথে কথা বলি নি। দুজন চুপচাপ শুয়ে পড়েছি, ঘুমটাও চুপচাপ চোখে নেমে এসেছিল তাই।

যখন ঘুম ভাঙলো তখন ভোর হয়েছে। আশেপাশ থেকে অস্ফুট শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে যখন বিছানায় উঠে বসলাম আর ঘুমের ঘোরটা কেটে গেল তখন শব্দটা কানে পরিষ্কার হয়ে ধরা দিল। কান্নার আওয়াজ। কিন্তু কে কাঁদছে?
আমি দেরি না করে গেস্ট রুমের দিকে গেলাম। হ্যাঁ মা কাঁদছে। সবার চোখেই পানি। রুমের ফ্লোরে সাদা কাপড় দিয়ে কাউকে ঢেকে রাখা হয়েছে। কাকে ঢেকে রাখা হয়েছে? সবাই এখানে দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু আপু নেই। আপু কোথায়? সে কি এখনো ঘুমোচ্ছে? হয়তো ঘুমোচ্ছে। কাল রাতে এতো বকাবকি করা হয়েছে তাই বোধহয় কেউ আপুকে ডাকে নি।
কিন্তু সাদা কাপড়ে কাকে ঢেকে রাখা হয়েছে?

হঠাৎ বাড়ির বাইরে থেকে একটা মাইকের আওয়াজ ভেসে এলো। মসজিদের মাইকে একটা ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে,
একটি শোক সংবাদ। একটি শোক সংবাদ। জাহির আহমেদের মেয়ে জুই আহমেদ আজ সকাল পাঁচ ঘটিকায় ইন্তেকাল করেছে। ইন্না-লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহির রাজিউন। তার জানাজার নামাজ……

আর কিছু শুনতে পেলাম না। আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। আপু চলে গেল। কেন চলে গেল? আমি এখন কার সাথে স্কুলে যাব? কে গল্প শুনাবে আমাকে?
আমি আপুর কাছে ছুটে গেলাম। কিন্তু আমাকে আপুর একদম কাছে যেতে দেওয়া হলো না। আমি নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে আপুর কাছে যেতে চাইছি কিন্তু আমাকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আমি ছোট বলে হয়তো যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আজকেও কি আমাকে এখান থেকে চলে যেতে বলবে?
বললে বলুক। আমি যাব না। কিছুতেই যাব না।
আমি আপুর পাশেই দাঁড়িয়ে থাকব। হঠাৎ দেখলাম রাসেল ভাইয়া এসেছে। রুমের এক কোনায় বসে সে কাঁদছে। তাকে কেউ কিছুই বলছে না। আমার কিন্তু খুব রাগ হচ্ছে। মনে হচ্ছে তার জন্যই আপু চলে গেল।
কিন্তু রাসেল ভাইয়া কাঁদছে। হাউ মাউ করে কাঁদছে। আচ্ছা বাবা কোথায়? বাবাও কি আপুর জন্য হাউ মাউ করে কাঁদছে?

“একটি শোক সংবাদ ” || আদিল মাহফুজ রনি
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here