আমি তুমিতেই আসক্ত পর্ব-০৯

0
517

#আমি_তুমিতেই_আসক্ত।
#পর্ব_ ৯
#সুমাইয়া_মনি।

পানির ছিটা পড়তেই জায়রার হুঁশ ফিরে। চোখ পিটপিট করে মেলে চারদিকে তাকায়। একটু মাথায় জোর দিতেই মনে পড়ে যায় সকালের ঘটনা। আর এখন রাত। ওঠে বসে। সামনে দু’জন লেডি কনস্টেবল দাঁড়িয়ে আছে। একজন হাঁকিয়ে ‘স্যার’ বলে ডাক দেয়। এক মিনিট অতিবাহিত হতেই নিভ্র দু’জন পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। জায়রা ততক্ষণে ওঠে বসতে সক্ষম হয়। নিভ্রকে দেখা মাত্রই রাগ চড়ে বসে তার। নিভ্র জায়রার মুখোমুখি চেয়ারে বসে। পায়ের উপর পা উঠিয়ে চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে তীক্ষ্ণ নজর ফেলে বলে,
-“প্রচুর ঘুমিয়েছেন মিস.জায়রা। এবার আমাদেরও একটু ঘুমাতে সাহায্য করুন।”

জায়রা নিভ্রর কথার তাৎপর্য ঠিক বুঝতে পারে। মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলে,
-“আমি কিছু বলতে পারব না।”

-“না বললে, আমরা চেন সে ঘুমাবো কী করে মিস.জায়রা।”

জায়রা মুখ ঘুরেই রাখে। কিছু বলে না। নিভ্র পকেট থেকে রুমাল বের করে সানগ্লাস মুছতে মুছতে ফের বলে,
-“হাতে সময় খুব কম। তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন। ওকে, আপনাকে তিন মিনিট সময় দিলাম। টাইম স্ট্রাট নাউ..”

জায়রা নিভ্রর দিকে তাকিয়ে চোখ ছোট ছোট করে বলে ওঠে,
-“বৃথা চেষ্টা।”

-“তাহলে আর কি করার। লেডি কনস্টেবলরা আপনার একটু খাতির যত্ন করুক।” বলেই ওঠে চলে যায় নিভ্র, সঙ্গে পুলিশ দু’জনও। লেডি কনস্টেবল দু’জন জায়রাকে ঘিরে দাঁড়ায়। জায়রার মুখ শুঁকিয়ে আসে। বুঝতে পারে সে এবার চরম ভাবে ফেঁসে গেছে।

নিভ্র বাহিরে বের হয় দু’জন পুলিশের সঙ্গে কথা বলতে বলতে।
-“কঁড়া নজর রাখবে। যদি সে স্বীকার করতে প্রস্তুত হয় তখনই আমাকে ইনফর্ম করবে।”

-“ইয়েস, স্যার।”

নিভ্র গাড়িতে ওঠে বসে। থানা থেকে বেরিয়ে পড়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে।
.
নবনী জিনান ও মায়ার কথা ভাবছে। ক্যান্টিনে বসে মায়া জিনানের বলা সব কথা খুলে বলে। শুনে প্রথমে নবনী একটু ক্ষেপে গেলেও পরে মায়ার কিছু কথা শুনে নিজেকে শাস্ত করে। আসলে তারা যতোটা খারাপ ভাবছে জিনানকে। সে ততটাও খারাপ নয়। এটা তার তারা বুঝতে পারে। এসবকে ছুঁটে ফেলে নবনীর নিভ্রর কথা মনে পড়ে। তখনই মনে প্রেমের ঘন্টি বেজে ওঠে। মুখে গান গেয়ে নাচতে নাচতে রুম থেকে ড্রইংরুমে বের হয়।

-“আমি তোমার মনের ভেতর, একবার ঘুরে আসতে চাই। আমায় কতটা ভালোবাসো সে-ই কথাটা জানতে চাই। ভালো,,ভালো….।” গান গাইতে গাইতে সোফায় বসে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ে নবনী। আর তখনই মাথা তুলে ওপরে তাকাতেই গানের বাকি লাইন বলা বন্ধ হয়ে যায়। কেননা, নবনী গান ও নাচতে এতটাই ব্যস্ত ছিল ড্রইংরুমে যে কেউ উপস্থিত আছে সেটা খেয়াল করার সময় টুকুও হলো না। বসেই চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল নিভ্রর কোলে। নিভ্র অবাক চোখে নবনীকে দেখছে। কিছু বলার ভাষা আপাতত তার মাথাতে নেই। নবনী সে তো স্বপ্ন মনে করে নিভ্রর পানে চেয়ে আছে। একজনের চোখেমুখে বিস্মিত ভাব, আরেক জনের চোখে এক সাগর ভালোবাসা! নবনী মিষ্টি হেসে নিভ্রকে দেখতে দেখতে বলে ওঠে,
-“আমি আপনাতেই আসক্ত!”

-“হোয়াট?” বলেই উত্তেজিত হয়ে ওঠে দাঁড়ায় নিভ্র।

চট নেশা কেঁটে যায় নবনীর। যে নেশা একটু আগে নিভ্রকে দেখার পানে হয়েছিল। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে আহাম্মকের মতো দাঁড়িয়ে আছে নবনী। স্বপ্ন নাকি সত্যি! বুঝতে অসুবিধা হয়না এখন। তার মানে এতক্ষণ নিভ্রর কোলে মাথা রেখে বলেছিল, ভাবতেই নবনীর লজ্জায় মুখ লাল হয়ে আসে। নিভ্রর চাহনি তখনি নবনীর ওপর স্থির। নবনী হাত জাগিয়ে উৎকন্ঠে বলে,
-“স্যরি,স্যরি স্যার।” বলেই বো দৌড় রুমে। ঠাস করে দরজা লাগিয়ে বিছানার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। লজ্জায় বিড়বিড় করে শীট! শীট! বলছে।

এদিকে নিভ্রর কানে এখনো নবনীর বলার কথাটি প্রতিধ্বনি হচ্ছে। অস্বস্তিকর লাগছে তার।
একদিন পর পর খাবার পাঠানোর জন্য নিভ্র মিসেস.নিলুফা বেগমের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন। এই কলোনিতে সে-ই একমাত্র ব্যক্তি, যে নিভ্রকে কিছু না কিছু রেঁধে পাঠায়। মূলত সেটা নিষেধ করার জন্য তার আজ এখানে আসা। নিভ্র উপস্থিত হতেই চা বানাতে চলে যায় নিলুফা বেগম। আর ততক্ষণেই ঘটে যায় এমন কাণ্ড। নিভ্রর কেমন অদ্ভুত লাগছে। আজ পর্যন্ত কোনো মেয়ের স্পর্শে যায় নি। নবনীর কোলে মাথা রাখার দৃশ্য চোখে ভাবসেই কেমন অস্বস্তি এসে ঘিরে ধরছে। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সোজা বাহিরে আসে। কয়েকবার বড়ো নিঃশ্বাস নিয়ে হেঁটে বাড়ি ফিরে।

নিলুফা বেগম রান্নাঘর থেকে চা-নাস্তা নিয়ে এসে দেখে নিভ্র নেই। নিয়ানও এখানে বসা ছিল না।তাই ওঁকে জিজ্ঞেস করে লাভ নেই নিভ্র কথা। হুট করে নজর পড়ে নবনীর রুমের দিকে। দরজা বন্ধ। কিন্তু এতক্ষণ ঠিক খোলা ছিল। হয়তো ও নিশ্চয় জানে নিভ্র না বলে কেন চলে গেল। সে এগিয়ে যায় নবনীর রুমের দিকে। দরজায় করাঘাত করে।
নবনী দরজার আঘাত শুনেই লজ্জা ফেলে ওঠে এসে দরজা খুলে দেয়। নিলুফা বেগম ভেতরে এসেই জিজ্ঞেস করে,
-“নিভ্র কোথায়?”

-“এই যে আমার চোখের ভেতরে।” বলেই এক চোখ আঙ্গুল দিয়ে দেখায়।

নিলুফা বেগম নবনীর মাথায় গাঁট্টা মেরে বলে,
-“ফাজলামো করছিস?”

-“ফাজলামো তুমি করছো আমার সঙ্গে। ” বলেই কোমড়ে হাত রাখে নবনী।

-“কখন?”

-“নিভ্র স্যার আমাদের বাসায় এসেছে। সেটা আমাকে আগে বলো নি কেন?”

-” বললে কি তুই চা-নাশতার জোগার করে দিতি?”

-“দিতাম।”

-“এহহ! কুইরা মাতারি।” ভেংচি কেটে বললেন।

-“ভেঙ্গাবা না। একটু আগে কত বড় কেলেংকারী ঘটিয়ে ফেলেছি আমি জানো না।”

-“কেলেংকারী তোর কাছে এসেছে, নাকি তুই নিজে কেলেংকারীর কাছে গিয়েছিলি?” ভাবার ভঙ্গিতে বলেন।

-“কথা পেঁচানো কেউ তোমার কাছ থেকে শিখুক।”

-“নবনী।”

-“এত কথা পেঁচাও ক্যা’রে মা…।” মাথায় হাত দিয়ে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল।

-“বল কী কেলেংকারী করেছিস? আর নিভ্র কেন চলে গেল?”

-“কিছুক্ষণ আগে…..” সব খুলে বলে নবনী। মায়ের সামনে সে নিজেও লজ্জা মাথা চুলকাতে আরাম্ভ করে।

নিলুফা বেগম অবাক হয়ে গালে হাত রেখে বলে,
-“এত সুন্দর সিন আমার সামনে পড়ল না।”

-“যাও, তুমিও না আম্মু।” ন্যাকামো করে বলে নবনী।

-“থামা তোর ন্যাকামি। সত্যি করে বল তোর মনে কী চলছে?” ধমকের স্বরে বলে।

-“আমার মনে নিভ্র নিভ্র চলছে আম্মু।” বুড়ো আঙ্গুলের নখ খুঁটে বলে নবনী।

-“পছন্দ নাকি ভালোবাসা?”

-“দুটোই। ”

-“যাক শুনে খুশি হলাম।” কিছুটা নাক ছিটকানো ভঙ্গিতে বলেন।

-“সত্যি।” খুশি মুডে।

-“এত খুশি হোস না। আমি খুশি হয়েছি এই কারণে। নিভ্রর মতো একজন ছেলে তো জীবনে এসে কুইনের গুঁতো দিয়ে তোকে সোজা করুক।”

-“ভালো দোয়া করতে কী ডাক্তারের নিষেধ আছে?”

-“তোর জন্য এই দোয়াই আসে মন থেকে। যাই হোক, পড়াশোনার পাশাপাশি চালিয়ে যা, আমি সঙ্গে আছি। তবে, রেজাল্ট যেন ঠিকঠাক থাকে। নাহলে পিঠের ছালা সরিয়ে দেবো, পিটানোর দায়িত্ব তোর আব্বুর।”

-“ঝুলেছি!” চোখ বন্ধ করে মাথা একটু নিচের দিকে ঝুঁকিয়ে বলে।
নিলুফা বেগম নবনীর মাথায় শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে গুঁতো দিয়ে বলে,
-“বুঝেছি হবে, ঝুলেছি না।”

-“থুক্কু।” দাঁত বের করে হেসে।

-“হুম।” বলেই সে চলে যায়। নবনী খুশিতে বিছানার উপর ফের ঝাপিয়ে পড়ে। একটি বালিশ জড়িয়ে ধরে নিভ্রর সঙ্গে ঘটে যাওয়ার ঘটনা ভাবতে থাকে।
_______
নিভ্র ঝর্ণা ছেড়ে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। একটু আগে ঘটে যাওয়ার কথা ভাবছে। অজানা রাগ এসে জেঁকে বসেছে তার মাথায়। সে যেমন শান্তশিষ্ট, তেমনই প্রচণ্ড রাগী। কথায় আছে শান্ত মানুষরা ক্ষেপে গেলে দুনিয়া এক করার ক্ষমতা রাখে। নিভ্ররও ঠিক তেমনই ফিল হচ্ছে। শাওয়ার নেওয়ার ইচ্ছে না থাকাও, রাগের বশে নিতে হচ্ছে। আজকাল নবনীকে নিভ্রর একদমই সহ্য হয় নয়। কারণ নিভ্রর অজানা। বেশ কিছুক্ষণ শাওয়ার নিয়ে বেরিয়ে আসে বাহিরে।
রাগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। ভাইব্রেশনে থাকা ফোনটি কাঁপতে থাকে। স্ক্রিনে তাকাতেই বুঝে যায় কে কল দিয়েছে। নাম্বারটি তার চিরচেনা অতি আপন মানুষটির। পীক কথা কথা বলে সে।
.
.
.
#চলবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে